মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘদিন ধরেই বৈশ্বিক শক্তির সংঘর্ষ, তেলভিত্তিক অর্থনীতি, ধর্মীয় বিভাজন ও ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রবিন্দু। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, অনেক বিশ্লেষক মধ্যপ্রাচ্যকে কার্যত ওয়াশিংটনের কৌশলগত নিরাপত্তা বলয়ের অংশ হিসেবেই দেখতেন। কিন্তু সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংকট, উপসাগরীয় দেশগুলোর অবস্থান পরিবর্তন এবং নতুন আঞ্চলিক জোটের উত্থান এমন এক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য আর আগের মতো অটুট নেই। বরং ধীরে ধীরে এমন একটি বহুমেরুকেন্দ্রিক ভূরাজনীতি তৈরি হচ্ছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র আর একক সিদ্ধান্তদাতা নয়।
ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। যুদ্ধের শুরুতে অনেক উপসাগরীয় দেশই ধারণা করেছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত চাপ ইরানকে সামরিকভাবে দুর্বল করে ফেলবে কিংবা অন্তত তাদের আঞ্চলিক প্রভাব সীমিত করবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন হয়েছে। ইরান একদিকে সামরিকভাবে টিকে গেছে, অন্যদিকে তাদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করে দিয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র তার ঐতিহ্যগত মিত্রদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি।
বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও বাহরাইনের মতো দেশগুলো বুঝতে পেরেছে যে, ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি বাস্তবে সবসময় কার্যকর নাও হতে পারে। ইরানের হামলার সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মনোযোগ ছিল ইসরায়েলকে রক্ষা করা। উপসাগরীয় দেশগুলোর দৃষ্টিতে এটি ছিল একটি সতর্কবার্তা। তারা উপলব্ধি করেছে যে, সংকটের মুহূর্তে তাদের নিরাপত্তা হয়তো আমেরিকার প্রথম অগ্রাধিকার নয়।
এই উপলব্ধিই মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতে বড় পরিবর্তনের সূচনা করেছে। আগে যেসব দেশ একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল, তারাই এখন শান্তিচুক্তি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার পক্ষে একজোট হচ্ছে। সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক, পাকিস্তান, মিসর, জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো একসঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে, যাতে ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতামূলক চুক্তি হয়। এটি শুধু যুদ্ধ থামানোর প্রচেষ্টা নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি বার্তা—এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ শুধু ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হবে না।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এই পরিবর্তনের পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো অর্থনৈতিক বাস্তবতা। যুদ্ধ ও অস্থিতিশীলতা উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। তেল রপ্তানি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা—সবকিছুই হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। এই প্রণালি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনীতি সংকটে পড়বে। তাই দেশগুলো এখন যুদ্ধের চেয়ে স্থিতিশীলতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
একসময় সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পক্ষে ছিল। এমনকি তারা সামরিক হামলায় অংশও নিয়েছিল। কিন্তু এখন তারাও শান্তিচুক্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। কারণ তারা বুঝেছে, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত শেষ পর্যন্ত পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ধ্বংস করবে। বাস্তববাদী রাজনীতি এখন তাদের প্রধান কৌশল হয়ে উঠছে।
এই পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নতুন আঞ্চলিক জোটের উত্থান। সৌদি আরব ও পাকিস্তানকে কেন্দ্র করে যে নিরাপত্তা কাঠামোর আলোচনা চলছে, সেটিকে অনেকেই “মুসলিম ন্যাটো” হিসেবে দেখছেন। এতে তুরস্ক, কাতার ও মিসরকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে শুধু যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর না রেখে আঞ্চলিক অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে গড়ে তোলা।
অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয়ে আরেকটি জোট গড়ে উঠছে, যা আইটুইউটু নামে পরিচিত। এই দুই ব্লকের উদ্ভব দেখায় যে, মধ্যপ্রাচ্য এখন নতুন শক্তির প্রতিযোগিতার মঞ্চে পরিণত হচ্ছে। এখানে যুক্তরাষ্ট্র এখনো গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হলেও, আর একমাত্র প্রভাবশালী খেলোয়াড় নয়।
ইসরায়েলের অবস্থানও এই প্রেক্ষাপটে নতুনভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মিত্র হিসেবে ইসরায়েল ব্যাপক প্রভাব ভোগ করেছে। কিন্তু ইরান যুদ্ধের সাম্প্রতিক বাস্তবতা দেখিয়েছে যে, উপসাগরীয় দেশগুলো আর সব বিষয়ে ইসরায়েলের কৌশল অনুসরণ করতে আগ্রহী নয়। যুদ্ধের আগে তারা নেতানিয়াহুর কৌশলগত যুক্তির কাছে নতি স্বীকার করলেও পরে তারা বুঝেছে, অবিরাম সংঘাত তাদের নিজেদের অস্তিত্বের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
ফলে এখন অনেক দেশ এমন এক ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিতে চাইছে, যেখানে ইরানকে পুরোপুরি শত্রু হিসেবে না দেখে একটি নিয়ন্ত্রিত সম্পর্কের মধ্যে রাখা যায়। কারণ তারা জানে, ইরানের সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা পুরো অঞ্চলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে। ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়ার অভিজ্ঞতা তাদের সামনে রয়েছে। রাষ্ট্র ভেঙে পড়লে যে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়, তা সামরিক বিজয়ের চেয়েও বেশি ক্ষতিকর।
এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের ভূমিকা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ইসলামাবাদ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে। সৌদি আরবের সঙ্গে তাদের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং মুসলিম বিশ্বে তাদের গ্রহণযোগ্যতা পাকিস্তানকে নতুন কৌশলগত অবস্থানে নিয়ে গেছে। একই সঙ্গে তুরস্কও আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে চাইছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে এক ধরনের বহুমাত্রিক নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।
তবে এর মানে এই নয় যে, যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিদায় নিচ্ছে। অঞ্চলজুড়ে তাদের সামরিক ঘাঁটি এখনো সক্রিয়। উপসাগরীয় দেশগুলোর অস্ত্রব্যবস্থা, গোয়েন্দা সহযোগিতা ও প্রতিরক্ষা কাঠামোর বড় অংশ এখনো আমেরিকান প্রযুক্তিনির্ভর। কিন্তু পার্থক্য হলো, আগের মতো অন্ধ নির্ভরতা আর নেই। এখন দেশগুলো বিকল্প নিরাপত্তা অংশীদার খুঁজছে—কখনো পাকিস্তান, কখনো তুরস্ক, কখনো ইউরোপ কিংবা চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়ে।
চীনও এই পরিবর্তনের সুযোগ নিচ্ছে। সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে বেইজিংয়ের ভূমিকা দেখিয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন শক্তিগুলো নিজেদের প্রভাব বিস্তার করছে। রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যস্ত থাকলেও সিরিয়া ও ইরানের মাধ্যমে এখনো আঞ্চলিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি ধরে রেখেছে।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। এটি এমন একটি সময়, যখন পুরোনো জোটগুলো ভাঙছে, নতুন অংশীদারিত্ব গড়ে উঠছে এবং আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের স্বার্থকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। তারা আর শুধু ওয়াশিংটনের নির্দেশনার অপেক্ষায় নেই; বরং নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করতে চাইছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বুঝে গেছে, বহিরাগত শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। তাই তারা এখন সংঘাতের বদলে কূটনীতি, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং বাস্তববাদী রাজনীতির দিকে ঝুঁকছে।
মার্কিন আধিপত্যের অবসান হয়তো এখনো পুরোপুরি ঘটেনি, কিন্তু এর একচ্ছত্র প্রভাব যে আগের মতো নেই, তা স্পষ্ট। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো আজ এমন এক নতুন যুগে প্রবেশ করছে, যেখানে শক্তির কেন্দ্র একক নয়, বরং বহুস্তরবিশিষ্ট। আর সেই পরিবর্তিত বাস্তবতাই আগামী কয়েক দশকে বিশ্বরাজনীতির নতুন মানচিত্র নির্ধারণ করতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ