বাংলাদেশে ধর্ষণ যেন ধীরে ধীরে একটি ভয়াবহ সামাজিক মহামারিতে পরিণত হয়েছে। প্রতিবার কোনো নৃশংস ধর্ষণ বা শিশু নির্যাতনের ঘটনা সামনে এলে দেশজুড়ে ক্ষোভ, বিক্ষোভ, সামাজিক মাধ্যমে উত্তেজনা এবং দ্রুত বিচারের দাবি ওঠে। সম্প্রতি আট বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় পুরো দেশ আবারও শোক, ক্রোধ এবং আতঙ্কে কেঁপে উঠেছে। সংবাদমাধ্যমে শিশুটির ব্যক্তিগত তথ্য, পরিবারের পরিচয় এবং ছবিও প্রকাশ করা হয়েছে ব্যাপকভাবে। টেলিভিশন, অনলাইন পোর্টাল এবং সামাজিক মাধ্যম যেন প্রতিযোগিতায় নেমেছে আরও বেশি “ভয়াবহ” তথ্য প্রকাশের জন্য।
মানুষের এই ক্ষোভ অস্বাভাবিক নয়। একটি নিষ্পাপ শিশুর নির্মম মৃত্যু যে কোনো বিবেকবান মানুষকে নাড়া দেবে। কিন্তু এই ক্ষোভের মধ্যেই আরেকটি বিপজ্জনক প্রবণতা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে— প্রতিশোধস্পৃহা। বিচার নয়, বরং প্রকাশ্য ফাঁসি, গণপিটুনি কিংবা আইনের বাইরে গিয়ে “শাস্তি” দেওয়ার দাবি ক্রমশ জোরালো হয়। এমনকি সামাজিক মাধ্যমে দেখা যায় ভয়ঙ্কর সব মন্তব্য, যেখানে ভিকটিম ব্লেমিং, নারী বিদ্বেষ কিংবা অপরাধকে আড়াল করার প্রবণতাও প্রকাশ পায়। একটি শিশুর ক্ষেত্রেও মানুষ তার পরিবারকে দায়ী করতে দ্বিধা করে না।
সমস্যাটি এখানেই। আমরা ধর্ষণকে একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখি, কিন্তু এটি আসলে একটি গভীর সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের বহিঃপ্রকাশ। প্রতিবার কোনো ভয়াবহ ঘটনা ঘটলে মানুষ ক্ষুব্ধ হয়, রাস্তায় নামে, কয়েকদিন ধরে প্রতিবাদ চলে, তারপর ধীরে ধীরে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যায়। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে খুব কম মানুষই প্রশ্ন তোলে— কেন এমন ঘটনা বারবার ঘটছে? কেন বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ভেঙে পড়েছে? কেন ধর্ষণের শিকার অধিকাংশ নারী ও শিশু কখনোই ন্যায়বিচার পায় না?
২০২০ সালে ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের সময়ও একই চিত্র দেখা গিয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর এবং নোয়াখালীর এক নারীর গণধর্ষণের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। তখন অন্যতম প্রধান দাবি ছিল ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা। পরে সরকার আইন সংশোধন করে ধর্ষণের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান যুক্ত করে। তখন অনেকে মনে করেছিলেন, কঠোর শাস্তিই হয়তো ধর্ষণ কমিয়ে আনবে।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। মৃত্যুদণ্ড চালু হওয়ার পরও ধর্ষণের সংখ্যা কমেনি। বরং দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন গবেষণা বলছে, মৃত্যুদণ্ড ধর্ষণ কমাতে কার্যকর নয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। কারণ ধর্ষক যদি জানে ধর্ষণের শাস্তি এবং হত্যার শাস্তি একই, তাহলে সে ভিকটিমকে হত্যা করতেই বেশি উৎসাহিত হতে পারে, যেন সাক্ষী না থাকে।
বাংলাদেশের সমাজে নারীর “সম্মান” ধারণাটিও এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। ধর্ষণকে এখানে কেবল একটি সহিংস অপরাধ হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটি পরিবার ও সমাজের তথাকথিত সম্মানের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলা হয়। ফলে বিচার ও সহায়তার পরিবর্তে অনেক পরিবার চুপ করে যায়, মামলা করতে ভয় পায়, অথবা সামাজিক চাপে পড়ে আপস করতে বাধ্য হয়। এখনও এমন বহু ঘটনা ঘটে, যেখানে ধর্ষণের শিকার মেয়েকে তার ধর্ষকের সঙ্গেই বিয়ে দিতে চাপ দেওয়া হয় “সম্মান রক্ষার” নামে।
একটি শিশুর ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা আমাদের বিচলিত করে, কারণ তা অত্যন্ত নির্মম। কিন্তু প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য নারী ও শিশু যৌন সহিংসতার শিকার হলেও সেগুলোর অধিকাংশ খবরই আলোচনায় আসে না। যে ঘটনাগুলো ভাইরাল হয় না, সেগুলোর বিচারও অনেক সময় হয় না। তদন্তে গাফিলতি, মামলা নিতে অনীহা, রাজনৈতিক প্রভাব, সামাজিক চাপ, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা— সব মিলিয়ে অধিকাংশ ভিকটিম ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়।
পরিসংখ্যান আরও ভয়াবহ বাস্তবতা তুলে ধরে। শিশু ধর্ষণের ঘটনা গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। অথচ ধর্ষণ মামলায় দণ্ডের হার অত্যন্ত কম। অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ধর্ষণ মামলার দণ্ডের হার তিন শতাংশেরও কম। এর মানে হলো অধিকাংশ অপরাধী শেষ পর্যন্ত শাস্তি এড়াতে সক্ষম হয়। ফলে সমাজে একটি বার্তা যায়— ধর্ষণ করেও পার পাওয়া সম্ভব।
এই পরিস্থিতিতে মানুষ যখন আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার কথা বলে, সেটি মূলত বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতার প্রকাশ। দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষ দেখেছে ক্ষমতাবানদের জন্য আইন একরকম, আর সাধারণ মানুষের জন্য আরেকরকম। ফলে জনগণের একাংশ মনে করে দ্রুত প্রতিশোধই একমাত্র সমাধান। কিন্তু এই মানসিকতা একটি সমাজের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।
প্রকাশ্য ফাঁসি, টেলিভিশনে মৃত্যুদণ্ড সম্প্রচার কিংবা বিচার ছাড়াই শাস্তি— এসব সভ্য সমাজের পথ হতে পারে না। আইনের শাসন দুর্বল হয়ে গেলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষই। কারণ বিচারব্যবস্থা যদি আবেগের ওপর দাঁড়ায়, তাহলে নিরপরাধ মানুষও একদিন ভুক্তভোগী হতে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আমরা যৌন সহিংসতার মূল কারণগুলো নিয়ে খুব কম কথা বলি। পরিবারে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ, শিশুদের নিরাপত্তাহীনতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি, অনলাইনে নারীবিদ্বেষী কনটেন্ট, সামাজিকভাবে নারীকে ভোগের বস্তু হিসেবে দেখার সংস্কৃতি— এসবই ধর্ষণ সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখছে।
বাংলাদেশে এখনও “সম্মতি” নিয়ে স্পষ্ট সামাজিক ও আইনি ধারণা গড়ে ওঠেনি। একজন নারী বা শিশুর নিজের শরীর সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারকে আমরা পুরোপুরি স্বীকৃতি দিতে পারিনি। অনেক পরিবার এখনও ছেলেদের শেখায় না কীভাবে নারীদের সম্মান করতে হয়। বরং মেয়েদের পোশাক, চলাফেরা বা আচরণ নিয়েই বেশি প্রশ্ন তোলা হয়।
সংবাদমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় সংবাদ প্রকাশের নামে ভিকটিমের পরিচয়, ছবি বা ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা হয়, যা আইনত নিষিদ্ধ। এতে পরিবার আরও ট্রমার মধ্যে পড়ে এবং অন্য ভিকটিমরাও সামনে আসতে ভয় পায়। ধর্ষণকে “সেন্সেশনাল” সংবাদে পরিণত করা হলে মানুষ কিছু সময়ের জন্য আবেগপ্রবণ হয় ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের আলোচনা চাপা পড়ে যায়।
একটি সভ্য সমাজে ধর্ষণ প্রতিরোধের জন্য শুধু কঠোর শাস্তি নয়, প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার, ভিকটিম সহায়তা ব্যবস্থা, নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ এবং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন। পুলিশকে আরও সংবেদনশীল হতে হবে, তদন্ত প্রক্রিয়া দ্রুত করতে হবে, আদালতের জট কমাতে হবে এবং ভিকটিমদের আইনি ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন— সবার ভূমিকা জরুরি। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই নিরাপত্তা, সম্মতি এবং পারস্পরিক সম্মানের শিক্ষা দিতে হবে। নারীর প্রতি বিদ্বেষমূলক মন্তব্য, কৌতুক কিংবা অনলাইন হয়রানিকেও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। কারণ এসবই শেষ পর্যন্ত সহিংস সংস্কৃতিকে স্বাভাবিক করে তোলে।
ধর্ষণ কোনো একক ব্যক্তির বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি একটি অসুস্থ সমাজের প্রতিফলন। তাই প্রতিবার কোনো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটলে শুধু ক্ষোভ প্রকাশ করলেই হবে না। প্রয়োজন গভীর আত্মসমালোচনা এবং কাঠামোগত পরিবর্তনের দাবি।
আমরা যদি সত্যিই শিশু ও নারীদের নিরাপত্তা চাই, তাহলে প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে বের হয়ে ন্যায়বিচার, মানবিকতা এবং সামাজিক সংস্কারের পথে হাঁটতে হবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির চেয়ে অনেক বেশি জরুরি হলো এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে কোনো শিশুকে আর কখনো ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হতে না হয়।
আপনার মতামত জানানঃ