বাংলাদেশের ব্যাংক খাত এক সময় দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হতো। শিল্পায়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, আমদানি-রফতানি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের সঞ্চয়—সবকিছুর মূল ভরসা ছিল ব্যাংক। কিন্তু গত দেড় দশকে সেই খাতই পরিণত হয়েছে অনিয়ম, দুর্নীতি, ঋণ কেলেঙ্কারি ও রাজনৈতিক প্রভাবের এক গভীর অন্ধকার অধ্যায়ে। এখন পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে দেশের একাধিক সাবেক ব্যাংক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কারাগারে, কেউ পলাতক, কেউ আত্মগোপনে, আর অনেকে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। দেশের ব্যাংকিং খাত নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়; বরং এটি জাতীয় অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একসময় জনতা ব্যাংকের ক্ষমতাধর এমডি ছিলেন মো. আব্দুছ ছালাম আজাদ। দীর্ঘ ছয় বছর দায়িত্ব পালন করা এ ব্যাংকার এখন দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলায় কারাগারে। অভিযোগ উঠেছে, এননটেক্স গ্রুপের বিশাল ঋণ কেলেঙ্কারির সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন। একইভাবে কারাগারে আছেন সোনালী ও রূপালী ব্যাংকের সাবেক এমডি ওবায়েদ উল্লাহ মাসুদ। তিনি ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কিন্তু অগ্রণী ব্যাংকের ১৮৯ কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারিতে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এক সময় দেশের ব্যাংক খাতে যাদের প্রভাব ছিল প্রবল, আজ তারাই আদালত, মামলা ও জেলখানার বাস্তবতার মুখোমুখি।
ইসলামী ব্যাংকের সাবেক এমডি মনিরুল মওলা প্রায় এক বছর ধরে কারাগারে আছেন। অভিযোগ, হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ আত্মসাতে সহযোগিতা করেছেন তিনি। এক্সিম ব্যাংকের সাবেক এমডি ফিরোজ হোসেনের বিরুদ্ধেও শত শত কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন, আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত দুর্নীতির চিত্র নয়; বরং পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলা একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের প্রতিচ্ছবি।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও আর্থিক কেলেঙ্কারিতে ব্যাংকারদের কারাদণ্ডের নজির রয়েছে। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের পর ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে বহু ব্যাংকারের বিরুদ্ধে মামলা হয়। আইসল্যান্ডে ২৫ জন শীর্ষ ব্যাংকারকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। স্পেনে ব্যাংকিং বিপর্যয়ের দায়ে শাস্তি পেয়েছিলেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাবেক প্রধান রদ্রিগো রাতোও। যুক্তরাষ্ট্রে সাবপ্রাইম মর্টগেজ সংকটের ঘটনায় ক্রেডিট সুইসের এক প্রাক্তন ট্রেডারকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সিঙ্গাপুরেও সাম্প্রতিক মানি লন্ডারিং কেলেঙ্কারিতে একজন ব্যাংকার জেলে গেছেন। ফলে বাংলাদেশে ব্যাংকারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে প্রশ্ন হচ্ছে—বাংলাদেশের পরিস্থিতি কি শুধুই ব্যক্তিগত দুর্নীতির ফল, নাকি এর পেছনে আরও বড় কোনো কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে?
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের বাস্তবতা বলছে, সমস্যার শিকড় অনেক গভীরে। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব, ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর হস্তক্ষেপ, দুর্বল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং কিছু অসাধু ব্যবসায়ী-ব্যাংকার-রাজনীতিকের যোগসাজশে ব্যাংকগুলোকে পরিকল্পিতভাবে লুটপাটের জায়গায় পরিণত করা হয়েছিল। ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে হাজার হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত জামানত ছাড়াই ঋণ দেয়া হয়েছে, আবার কোথাও একই গ্রুপকে একাধিক ব্যাংক থেকে অস্বাভাবিক পরিমাণ ঋণ দেয়া হয়েছে।
বিশেষ করে শরিয়াহভিত্তিক কয়েকটি ব্যাংকের পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা কয়েকটি ইসলামী ধারার ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার ৯০ শতাংশেরও বেশি বলে জানা গেছে। গ্রাহকদের আমানত ফেরত দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে এসব ব্যাংককে। একইভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অবস্থাও খুব নাজুক। মূলধন ঘাটতিতে ভুগছে একাধিক ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের পরিমাণ কয়েক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এটি শুধু একটি আর্থিক সংখ্যা নয়; এর অর্থ হলো সাধারণ মানুষের আমানত ঝুঁকিতে পড়া, বিনিয়োগ কমে যাওয়া, শিল্পে অর্থায়ন সংকুচিত হওয়া এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হওয়া।
অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক বিবেচনায় লোক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ছাত্রলীগ-যুবলীগের তরুণ নেতাদের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পরিচালক বানানো হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠে এসেছে। ব্যাংক পরিচালনায় অভিজ্ঞতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। ফলে পেশাদার ব্যাংকিং সংস্কৃতি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। শীর্ষ নির্বাহীরা অনেক সময় রাজনৈতিক চাপ বা পরিচালনা পর্ষদের নির্দেশে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ইস্টার্ন ব্যাংকের সাবেক এমডি আলী রেজা ইফতেখার যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা পুরো পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। তার মতে, দিন শেষে দায় চাপানো হচ্ছে কেবল ব্যাংকারদের ওপর, অথচ ভুল সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপও ছিল। এই বাস্তবতায় এখন যোগ্য ব্যাংকাররাও শীর্ষ পদে যেতে ভয় পাচ্ছেন। কারণ একটি ভুল সিদ্ধান্ত বা চাপের মুখে নেয়া কোনো সিদ্ধান্ত পরবর্তী সময়ে তাদের জেল পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে। ফলে ব্যাংকিং খাতে নেতৃত্বের সংকটও তৈরি হচ্ছে।
ব্যাংকারদের মধ্যে এখন এক ধরনের ভীতি কাজ করছে। ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রেও সতর্কতা বেড়ে গেছে। এর প্রভাব পড়ছে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিতে। শিল্প উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাচ্ছেন না। নতুন বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে। অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ব্যাংক যদি আস্থাহীনতায় ভোগে, তবে পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের পতনের ইতিহাসে বেসিক ব্যাংকের নাম বিশেষভাবে আলোচিত। একসময় সরকারি খাতের অন্যতম সেরা ব্যাংক হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানটি কয়েক বছরের মধ্যেই ভয়াবহ দুর্নীতিতে জর্জরিত হয়ে পড়ে। শেখ আব্দুল হাই বাচ্চুর নেতৃত্বে ব্যাংকটিতে হাজার হাজার কোটি টাকার অনিয়ম হয় বলে অভিযোগ ওঠে। বহু মামলা হলেও তাকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। এই ঘটনাই পরবর্তী সময়ে অন্যান্য ব্যাংকে দুর্নীতির একটি ‘মডেল’ হিসেবে কাজ করেছে বলে অনেকের ধারণা।
অগ্রণী ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে একই ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে। কোথাও অনিয়মের দায়ে এমডিকে অপসারণ করা হয়েছে, কোথাও মামলা হয়েছে, আবার কেউ বিদেশে পালিয়ে গেছেন। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এত বড় বড় অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে কীভাবে চলল? নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কি কিছুই বুঝতে পারেনি? নাকি তারা রাজনৈতিক চাপে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি?
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে, কিন্তু সমালোচকদের মতে, অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবস্থা নিতে দেরি হয়ে গেছে। যখন একটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৯০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, তখন বোঝা যায় সমস্যাটি একদিনে তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর ধরে নিয়ম ভেঙে ঋণ দেয়া, পুনঃতফসিলের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ আড়াল করা এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় ছাড় দেয়ার ফলেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ব্যাংক খাতের এই সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। যারা সারা জীবনের সঞ্চয় ব্যাংকে জমা রেখেছেন, তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অনেকে আতঙ্কে টাকা তুলে নিচ্ছেন। ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা কমে গেলে অর্থনীতির ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ আধুনিক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তির একটি হলো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনআস্থা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু কয়েকজন ব্যাংকারকে গ্রেফতার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার সংস্কার। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানো, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, দক্ষ ও পেশাদার পরিচালনা পর্ষদ গঠন, ঋণ অনুমোদনে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি বাড়ানো ছাড়া এ সংকট থেকে বের হওয়া কঠিন। একই সঙ্গে বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। কেবল ছোট কর্মকর্তা বা ব্যাংকারদের শাস্তি দিয়ে প্রকৃত পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাত এখন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে রয়েছে ভয়াবহ অনিয়মের দীর্ঘ ছায়া, অন্যদিকে রয়েছে সংস্কারের সুযোগ। যদি এখনই কার্যকর ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপ নেয়া না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে সংকট আরও গভীর হতে পারে। আর যদি সত্যিকার অর্থে জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়, তবে এখনো পরিস্থিতি সামাল দেয়া সম্ভব। কারণ ব্যাংক শুধু একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং মানুষের ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তাই ব্যাংক খাতকে রক্ষা করা মানে দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা।
আপনার মতামত জানানঃ