মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে যুদ্ধ, জোট আর বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস বহু পুরোনো। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো যেন সেই পুরোনো ইতিহাসকে নতুন করে লিখতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত নিজেদের নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ছাতার ওপর নির্ভর করে এসেছে। ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়লেও তারা সাধারণত সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে কূটনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক কৌশল কিংবা প্রক্সি যুদ্ধের পথ বেছে নিয়েছে। অথচ এবার দৃশ্যপট ভিন্ন। ইরানের মাটিতে সৌদি ও আমিরাতের সরাসরি বিমান হামলার খবর শুধু একটি সামরিক প্রতিক্রিয়া নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
গত কয়েক বছরে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি এমনভাবে বদলেছে, যেখানে পুরোনো বন্ধুদের ওপর নির্ভরশীলতা কমছে এবং প্রতিটি দেশ নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন কৌশল খুঁজছে। যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে এই অঞ্চলে নিজেদের সরাসরি সামরিক সম্পৃক্ততা কমানোর চেষ্টা করছে। আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার, ইরাক ও সিরিয়ায় সীমিত উপস্থিতি এবং চীনের উত্থান মোকাবিলায় ওয়াশিংটনের মনোযোগ এশিয়ায় সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোকে এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। সেই শূন্যতাই এখন নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে।
তিন দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় দেশগুলোকে আধুনিক অস্ত্র, যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ করেছে। এর পেছনে কেবল ব্যবসায়িক স্বার্থ ছিল না; বরং একটি কৌশলগত উদ্দেশ্যও ছিল। ওয়াশিংটন চেয়েছিল, ভবিষ্যতে যেন সৌদি আরব, আমিরাত কিংবা অন্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো নিজেদের নিরাপত্তা নিজেরাই নিশ্চিত করতে পারে। অর্থাৎ, আমেরিকা সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে না নেমেও আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রাখতে পারবে। অনেকদিন পর্যন্ত এই পরিকল্পনা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ ছিল। কারণ বাস্তবে উপসাগরীয় দেশগুলো বড় ধরনের যুদ্ধে জড়াতে ভয় পেত। তারা জানত, ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত মানে শুধু সামরিক যুদ্ধ নয়, বরং পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া।
কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতি যেন তাদের হিসাব বদলে দিয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর সৌদি আরব ও আমিরাতের ধৈর্যের সীমা ভেঙে যায়। এতদিন ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিক্রিয়া দেখানোর দায়িত্ব অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এবার তারা নিজেরাই যুদ্ধবিমান উড়িয়ে ইরানি ভূখণ্ডে হামলা চালিয়েছে। এটি প্রতীকী দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে প্রতীকই অনেক সময় বাস্তবতার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে।
এই হামলার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও নানা আলোচনা চলছে। প্রকাশ্যে ওয়াশিংটন হয়তো সরাসরি অংশগ্রহণের কথা স্বীকার করছে না, কিন্তু বিভিন্ন পশ্চিমা সূত্রের দাবি, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম উপসাগরীয় নেতাদের পাল্টা হামলার জন্য উৎসাহিত করেছে। এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ স্পষ্ট। তারা চায়, ইরানের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক প্রতিরোধ এমনভাবে দাঁড়াক, যাতে ভবিষ্যতে আমেরিকাকে একা যুদ্ধের বোঝা টানতে না হয়।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—ইরান কি এই পরিস্থিতি আগে থেকে অনুমান করতে পেরেছিল? তেহরান দীর্ঘদিন ধরে একটি কৌশল অনুসরণ করেছে। তারা সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে না গিয়ে প্রক্সি গোষ্ঠী, সীমিত হামলা এবং মনস্তাত্ত্বিক চাপের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছে। ইয়েমেনে হুথি, লেবাননে হিজবুল্লাহ, ইরাকে শিয়া মিলিশিয়া কিংবা সিরিয়ায় বিভিন্ন গোষ্ঠীর মাধ্যমে ইরান পুরো অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করেছে। এই কৌশলের মূল শক্তি ছিল, প্রতিপক্ষের মধ্যে বিভাজন তৈরি করা। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস বাড়ানো ছিল তেহরানের বড় লক্ষ্য।
২০১৯ সালে সৌদি আরবের আরামকো তেল স্থাপনায় হামলার পর এই বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। সেই সময় সৌদি নেতৃত্ব আশা করেছিল, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেবে। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন সরাসরি সংঘাতে যায়নি। এতে রিয়াদ হতাশ হয়েছিল। একই ঘটনা ২০২২ সালে আমিরাতে হুথিদের হামলার পরও দেখা যায়। তখনও উপসাগরীয় নেতারা মনে করেছিলেন, আমেরিকার প্রতিক্রিয়া যথেষ্ট দ্রুত বা শক্তিশালী ছিল না। সেই অভিজ্ঞতা তাদের উপলব্ধি করিয়েছে যে শেষ পর্যন্ত নিজেদের নিরাপত্তা নিজেদেরই নিশ্চিত করতে হবে।
তবে এবার পরিস্থিতি অন্যরকম। ইরানের হামলা উপসাগরীয় দেশগুলোকে ভীত করার বদলে আরও আক্রমণাত্মক করে তুলেছে। পেন্টাগনের সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, তেহরানের কৌশল উল্টো ফল দিয়েছে। কারণ সৌদি আরব ও আমিরাত এখন বুঝতে পারছে, নীরব থাকা মানে ভবিষ্যতে আরও বড় হামলার ঝুঁকি তৈরি করা। তাই তারা শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে ইরানকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চাইছে—এই অঞ্চলে একতরফাভাবে ভয় দেখানোর দিন শেষ।
এই পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উপসাগরীয় দেশগুলোর সামরিক সক্ষমতা। গত দুই দশকে তারা বিপুল পরিমাণ আধুনিক অস্ত্র কিনেছে। সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বড় অস্ত্র আমদানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। আমিরাতও অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও সাইবার প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করেছে। এতদিন এই সামরিক শক্তিকে অনেকেই কেবল প্রদর্শনী বলে মনে করতেন। কিন্তু ইরানে হামলার মাধ্যমে তারা দেখাতে চেয়েছে, প্রয়োজনে এই অস্ত্র ব্যবহার করতেও তারা প্রস্তুত।
তবুও প্রশ্ন থেকে যায়—এই সংঘাত কি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নিতে পারে? বাস্তবতা হলো, কেউই বড় যুদ্ধ চায় না। কারণ ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সংঘাত পুরো বিশ্ব অর্থনীতিতে ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্বের বড় অংশের জ্বালানি সরবরাহ এই অঞ্চলনির্ভর। হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা বাড়লে তেলের দাম আকাশছোঁয়া হতে পারে। ফলে যুদ্ধের প্রতিটি পদক্ষেপ হিসাব করেই নেওয়া হচ্ছে।
সৌদি আরবের সাম্প্রতিক আচরণও সেই বাস্তবতাই ইঙ্গিত করে। একদিকে তারা ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়েছে, অন্যদিকে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করেনি। বরং রিয়াদ এখনও তেহরানের সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর পথ খুঁজছে। এমনকি একটি সম্ভাব্য অনাক্রমণ চুক্তির বিষয়েও আলোচনা চলছে। এটি বোঝায়, সৌদি নেতৃত্ব একই সঙ্গে দুটি পথ খোলা রাখতে চাইছে—প্রয়োজনে শক্তি প্রদর্শন, আবার প্রয়োজন হলে আলোচনার টেবিলে ফেরা।
এখানেই মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির জটিলতা। এই অঞ্চলে কোনো দেশ পুরোপুরি বন্ধু নয়, আবার পুরোপুরি শত্রুও নয়। স্বার্থ বদলালে সম্পর্কও বদলে যায়। কয়েক বছর আগেও সৌদি আরব ও ইরানের সম্পর্ক ছিল চরম উত্তেজনাপূর্ণ। পরে চীনের মধ্যস্থতায় তারা সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের পথে হাঁটে। এখন আবার সংঘাতের আবহ তৈরি হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যেও যোগাযোগের দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
আমিরাতের অবস্থান তুলনামূলকভাবে বেশি কঠোর। আবুধাবি মনে করে, ইরানের আগ্রাসন ঠেকাতে শক্ত প্রতিরোধ ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। তবে সৌদি আরব অনেক বেশি সতর্ক। কারণ অঞ্চলজুড়ে অর্থনৈতিক সংস্কার ও বিনিয়োগ আকর্ষণের যে পরিকল্পনা যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান হাতে নিয়েছেন, বড় যুদ্ধ শুরু হলে তা হুমকির মুখে পড়বে। ‘ভিশন ২০৩০’-এর মতো প্রকল্প সফল করতে স্থিতিশীলতা জরুরি।
এই সংঘাতের আরেকটি বড় দিক হলো চীন ও রাশিয়ার ভূমিকা। যুক্তরাষ্ট্র যখন ধীরে ধীরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে মনোযোগ সরাতে চাইছে, তখন চীন অর্থনৈতিকভাবে এই অঞ্চলে প্রভাব বাড়াচ্ছে। সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে বেইজিংয়ের মধ্যস্থতা ছিল তার বড় উদাহরণ। ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো এখন আর কেবল আমেরিকার ওপর নির্ভর করছে না; তারা বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলছে। এটি ভবিষ্যতের ভূরাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলবে।
সব মিলিয়ে ইরানে সৌদি-আমিরাতের হামলা শুধু একটি সামরিক ঘটনা নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। এখানে একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমার ইঙ্গিত রয়েছে, অন্যদিকে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠার চেষ্টাও স্পষ্ট। তবে এই পরিবর্তন স্থায়ী হবে কি না, তা নির্ভর করছে পরবর্তী পদক্ষেপগুলোর ওপর। যদি উত্তেজনা আরও বাড়ে, তাহলে পুরো অঞ্চল দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতার দিকে যেতে পারে। আর যদি কূটনৈতিক সমঝোতার পথ খোলা থাকে, তাহলে হয়তো নতুন ধরনের এক ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হবে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র থাকবে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে, কিন্তু একমাত্র নিয়ন্ত্রক হিসেবে নয়।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, এখানে স্থায়ী কিছু নেই। বন্ধু বদলায়, শত্রু বদলায়, জোট বদলায়। আজকের হামলা হয়তো আগামীকালের আলোচনার পথও তৈরি করতে পারে। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট—উপসাগরীয় দেশগুলো আর আগের মতো পুরোপুরি অন্যের নিরাপত্তা ছাতার নিচে থাকতে চায় না। তারা এখন নিজেদের শক্তি দেখাতে প্রস্তুত, আর সেই পরিবর্তনই ভবিষ্যতের মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হয়ে উঠতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ