রাত তখন প্রায় দুইটা। রাজধানীর এক তরুণ সাংবাদিক নিজের প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের নিচে আসা মন্তব্যগুলো দেখছিলেন। কয়েক ঘণ্টা আগেও পোস্টটিতে সাধারণ আলোচনা চলছিল। হঠাৎ করেই শত শত নতুন মন্তব্য আসতে শুরু করে। কেউ তাকে “দেশদ্রোহী” বলছে কেউ “বিদেশি এজেন্ট” আবার কেউ ব্যক্তিগত আক্রমণ করছে। অদ্ভুত বিষয় হলো অধিকাংশ প্রোফাইলের নাম বিদেশি আর ছবিগুলোও কৃত্রিম মনে হচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর তার পেজে একের পর এক রিপোর্ট যেতে শুরু করে। পরদিন সকালে তিনি দেখলেন নিজের অ্যাকাউন্ট সাময়িকভাবে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। বাস্তবে তার বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ মানুষের ঢল নামেনি বরং এটি ছিল এক অদৃশ্য ডিজিটাল বাহিনীর আক্রমণ।
বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন এমন দৃশ্য ক্রমেই সাধারণ হয়ে উঠছে। ফেসবুক ইউটিউব কিংবা এক্স খুললেই দেখা যায় হঠাৎ করে কোনো একটি বিষয় নিয়ে একই ধরনের হাজারো মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ছে। মনে হয় যেন পুরো দেশ একই মতের পক্ষে দাঁড়িয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবে এই জনমতের বড় অংশই কৃত্রিম। এর পেছনে কাজ করছে বট বাহিনী ট্রল আর্মি এবং সংঘবদ্ধ ডিজিটাল প্রচারণা চক্র।
একসময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে মানুষের স্বাধীন মতপ্রকাশের জায়গা হিসেবে দেখা হতো। সাধারণ মানুষ সংবাদমাধ্যমের বাইরে নিজের মত তুলে ধরতে পারত। কিন্তু ধীরে ধীরে এই জায়গাটি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার অপপ্রচার বিভ্রান্তি ছড়ানো এবং চরিত্রহননের শক্তিশালী ময়দানে পরিণত হয়েছে। এখন অনলাইনের যুদ্ধ আর শুধু কথার যুদ্ধ নয় বরং এটি মনস্তত্ত্ব নিয়ন্ত্রণের যুদ্ধ।
প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বটের ব্যবহারও বেড়েছে। “বট” মূলত এমন একটি সফটওয়্যার যা মানুষের মতো আচরণ করতে পারে। এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মন্তব্য করতে পারে পোস্ট ছড়াতে পারে এমনকি মানুষের মতো কথাও বলতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নতির ফলে এখন এসব বটকে সাধারণ মানুষের থেকে আলাদা করা অনেক কঠিন হয়ে গেছে। তারা এমনভাবে প্রতিক্রিয়া দেয় যেন মনে হয় বাস্তব কোনো মানুষ কথা বলছে।
শুধু সফটওয়্যারনির্ভর বট নয় এর পাশাপাশি রয়েছে মানবনিয়ন্ত্রিত ট্রল বাহিনী। এরা বাস্তব মানুষ হলেও ভুয়া পরিচয়ে অসংখ্য অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করে। নির্দিষ্ট নির্দেশনা পেলেই তারা একযোগে কোনো ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান বা রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে আক্রমণ শুরু করে। একজন ব্যক্তি কখনও কখনও বিশ থেকে ত্রিশটি পর্যন্ত ভুয়া অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করে থাকে। ফলে অনলাইনে কৃত্রিম জনমত তৈরি করা অনেক সহজ হয়ে গেছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই সংস্কৃতি এখন ভয়ংকরভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের পক্ষে সমর্থন তৈরি করতে এবং প্রতিপক্ষকে দুর্বল করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। কোনো রাজনৈতিক ঘটনা ঘটার পর মুহূর্তের মধ্যেই দেখা যায় হাজার হাজার একই ধরনের মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ছে। এতে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং মনে করে এটাই হয়তো সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত।
মনোবিজ্ঞানে এর একটি বিশেষ নাম আছে। একে বলা হয় “ব্যান্ডওয়াগন ইফেক্ট”। মানুষ সাধারণত যে মতকে বেশি জনপ্রিয় মনে করে তার দিকেই ঝুঁকে পড়ে। বট বাহিনী এই মনস্তত্ত্বকেই কাজে লাগায়। তারা এমন পরিবেশ তৈরি করে যেন মনে হয় একটি নির্দিষ্ট মতই পুরো সমাজের মতামত। বাস্তবে এটি একধরনের ডিজিটাল প্রতারণা।
এই কৃত্রিম জনমত শুধু রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই। সেলিব্রেটি নারী কনটেন্ট নির্মাতা সাংবাদিক এমনকি সাধারণ মানুষও এর শিকার হচ্ছেন। কোনো নারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মত প্রকাশ করলেই তার পোস্টে হঠাৎ শত শত বিদ্রূপাত্মক প্রতিক্রিয়া চলে আসে। সাংবাদিকরা কোনো দুর্নীতির প্রতিবেদন প্রকাশ করলেই তাদের বিরুদ্ধে সংগঠিত আক্রমণ শুরু হয়। হাজার হাজার ভুয়া রিপোর্টের কারণে অনেক সময় তাদের পেজ বা অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যায়।
অনলাইনের এই আক্রমণের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে সত্য এবং মিথ্যার সীমারেখা ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া। মানুষ এখন বুঝতে পারছে না কোন তথ্য সত্য আর কোনটি পরিকল্পিত প্রচারণা। কেউ একটি ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে দিলে সেটিকে মুহূর্তের মধ্যে হাজারো অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে সেটি সত্য বলে মনে হতে শুরু করে।
বিশ্বজুড়েও বট বাহিনী এখন বড় উদ্বেগের বিষয়। বিভিন্ন দেশ অভিযোগ করছে বিদেশি শক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। নির্বাচন প্রভাবিত করা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক দুর্বল করা পর্যন্ত নানা অভিযোগ উঠছে। সামরিক যুদ্ধের পাশাপাশি এখন চলছে ডিজিটাল যুদ্ধ যেখানে অস্ত্র হলো তথ্য বিভ্রান্তি এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব।
বাংলাদেশেও এর প্রভাব স্পষ্ট। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন আন্দোলনকে ঘিরে সংগঠিত অনলাইন প্রচারণা দেখা গেছে। আন্দোলনকারীদের কখনও রাষ্ট্রবিরোধী কখনও বিদেশি এজেন্ট আবার কখনও দেশদ্রোহী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অন্যদিকে সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগগুলোকেও অনেক সময় বিরোধী পক্ষের বট বাহিনী প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে। ফলে সত্যিকার আলোচনা আড়ালে চলে গেছে এবং বিভ্রান্তি বেড়েছে।
করপোরেট জগতেও এখন এই কৌশল ব্যবহৃত হচ্ছে। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বয়কট প্রচারণা চালানো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের বদনাম করা কিংবা কৃত্রিম জনপ্রিয়তা তৈরির জন্য ভাড়া করা ট্রল বাহিনী ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে ভোক্তারা বিভ্রান্ত হচ্ছেন এবং সুস্থ প্রতিযোগিতা নষ্ট হচ্ছে।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো অনেক মানুষ বুঝতেই পারছেন না তারা আসলে কৃত্রিম প্রচারণার মধ্যে বাস করছেন। একটি পোস্ট প্রকাশের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে শত শত মন্তব্য চলে আসা একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করা অস্বাভাবিক প্রোফাইল বা ভুয়া পরিচয়—এসবই বট কার্যক্রমের লক্ষণ। কিন্তু সাধারণ ব্যবহারকারীদের বড় একটি অংশ এসব বিষয়ে সচেতন নন।
ডিজিটাল মিডিয়া লিটারেসির অভাব এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। মানুষ তথ্য যাচাই না করেই শেয়ার করছে মন্তব্য করছে এবং বিভ্রান্তির অংশ হয়ে যাচ্ছে। ফলে বট বাহিনী আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। কারণ তাদের মূল শক্তি প্রযুক্তি নয় বরং মানুষের আবেগ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভবিষ্যতে এই পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নতির ফলে বটগুলো আরও মানবসদৃশ হয়ে উঠবে। তারা শুধু মন্তব্যই করবে না বরং মানুষের সঙ্গে বাস্তব কথোপকথনের মতো যোগাযোগও করতে পারবে। তখন সত্যিকার মানুষ আর কৃত্রিম সত্তার মধ্যে পার্থক্য করা আরও কঠিন হয়ে যাবে।
এই সংকট মোকাবিলায় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা ভাষা এবং স্থানীয় বাস্তবতা বোঝার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ভুয়া অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করা সংঘবদ্ধ অপপ্রচার বন্ধ করা এবং কৃত্রিম কার্যক্রম দ্রুত অপসারণ করা জরুরি। তবে একই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও নিশ্চিত করতে হবে যাতে আইনের অপব্যবহার না হয়।
শিক্ষা ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন প্রয়োজন। স্কুল কলেজ থেকেই শিক্ষার্থীদের তথ্য যাচাই সমালোচনামূলক চিন্তা এবং দায়িত্বশীল অনলাইন আচরণের শিক্ষা দিতে হবে। কারণ প্রযুক্তির এই যুগে শুধু ইন্টারনেট ব্যবহার জানলেই হবে না বরং সত্য এবং বিভ্রান্তির পার্থক্য বোঝার ক্ষমতাও থাকতে হবে।
গণতন্ত্র শুধু ভোটের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। এটি দাঁড়িয়ে থাকে সত্য তথ্য স্বাধীন মতপ্রকাশ এবং সচেতন নাগরিকের ওপর। যদি কৃত্রিম জনমত মানুষের চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে তাহলে গণতন্ত্রের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়বে। তখন সমাজে সত্যের চেয়ে প্রোপাগান্ডা বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে জোরে শোনা যাওয়া কণ্ঠটাই সব সময় মানুষের প্রকৃত কণ্ঠ নয়। হাজার হাজার লাইক মন্তব্য কিংবা শেয়ারের পেছনে হয়তো বাস্তব মানুষ নেই। থাকতে পারে একটি সুপরিকল্পিত ডিজিটাল বাহিনী। আর সেই কারণেই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সচেতনতা। কারণ প্রযুক্তির এই যুগে সত্যকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াইটাও এখন ডিজিটাল পর্দার ভেতরেই চলছে।
আপনার মতামত জানানঃ