বিশ্বজুড়ে যখন গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, তখন বাংলাদেশেও সেই আলোচনাটি নতুন করে সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে শত শত সাংবাদিক বিভিন্ন ধরনের হয়রানি, চাপ ও প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছেন—যা শুধু একটি পেশার সংকট নয়, বরং একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক স্বাস্থ্য নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান যে তথ্য তুলে ধরেছেন, তা এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে।
তার মতে, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত অন্তত ৩৮৯ জন সাংবাদিক বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন। এই হয়রানির ধরন ছিল বহুমাত্রিক—কখনো আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে, কখনো রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব খাটিয়ে, আবার কখনো স্থানীয় ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর দ্বারা। এই সংখ্যা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি প্রতিটি সাংবাদিকের পেশাগত স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং মতপ্রকাশের অধিকারের উপর আঘাতের প্রতিফলন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যম বরাবরই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত এই খাতটি দুর্নীতি উন্মোচন, ক্ষমতার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং জনমত গঠনে অপরিহার্য। কিন্তু যখন এই খাত নিজেই চাপের মুখে পড়ে, তখন তা পুরো সমাজব্যবস্থার উপর প্রভাব ফেলে। ড. ইফতেখারুজ্জামানের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশে ভিন্নমতকে নিয়ন্ত্রণের একটি উপায় হিসেবে গণমাধ্যমকে ব্যবহার করা হচ্ছে—যা গণতন্ত্রের জন্য একটি বড় হুমকি।
এই সমস্যার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রয়োগের বিষয়টি। ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অন্তত ৪,৫০০ জনের বিরুদ্ধে এই আইন ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৫০ জনের বেশি ছিলেন মিডিয়া পেশাজীবী, এবং অন্তত ২৫০ জনকে তাদের পেশাগত কাজের কারণে সরাসরি টার্গেট করা হয়েছে। এই তথ্যটি দেখায় যে আইনটি কেবল অপরাধ দমন নয়, বরং মতপ্রকাশের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের একটি হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। সমালোচকরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, এই আইন অস্পষ্ট সংজ্ঞা ও কঠোর শাস্তির কারণে সাংবাদিকদের মধ্যে আত্মসংযম বা “self-censorship” তৈরি করে। অর্থাৎ, অনেক সময় সাংবাদিকরা নিজেরাই সংবেদনশীল বা সমালোচনামূলক বিষয় এড়িয়ে চলেন, যাতে কোনো আইনি ঝামেলায় পড়তে না হয়। এর ফলে গণমাধ্যমের মৌলিক কাজ—সত্য তুলে ধরা—বাধাগ্রস্ত হয়।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি একটি বৈশ্বিক ইস্যু। বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইডেন দূতাবাসের ফাস্ট সেক্রেটারি পাওলো ক্যাস্ট্রো নেইদারস্টাম উল্লেখ করেছেন, সাম্প্রতিক বৈশ্বিক প্রতিবেদনগুলো দেখাচ্ছে যে বিশ্বজুড়েই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হুমকির মুখে। বিভিন্ন দেশে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হয়রানি, এমনকি হত্যা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। এই প্রবণতা গণতন্ত্রের জন্য একটি অশনি সংকেত।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও একই উদ্বেগ প্রকাশ করছে। UNESCO-এর বাংলাদেশ অফিসের ইনচার্জ সুসান ভাইজ বলেছেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। প্রতি বছর বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে এই বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা হয়, কারণ এটি কেবল একটি পেশাগত অধিকার নয়, বরং একটি মৌলিক মানবাধিকার। তার মতে, শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বজুড়েই এই স্বাধীনতা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের অবস্থানও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূচকে কিছুটা পিছিয়ে গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও এসব সূচক নিয়ে অনেক সময় বিতর্ক থাকে, তবুও এগুলো একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে। যখন কোনো দেশে সাংবাদিকরা নিরাপদে কাজ করতে পারেন না, তখন সেই দেশের তথ্যপ্রবাহও সীমিত হয়ে পড়ে, যা নাগরিকদের সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে দুর্বল করে।
তবে এই চ্যালেঞ্জের মধ্যেও সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। সরকার পরিবর্তনের ফলে একটি নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করা হয়েছে, যার মাধ্যমে সাংবাদিকতার মান উন্নয়ন এবং জনআস্থা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে কয়েকটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে—যেমন সঠিক ও নিরপেক্ষ তথ্য প্রদান, ভুল তথ্য সংশোধনের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
গণমাধ্যমের উপর জনআস্থা তৈরি হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যখন মানুষ বিশ্বাস করে যে তারা যে তথ্য পাচ্ছে তা নির্ভরযোগ্য, তখনই একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশ গড়ে ওঠে। কিন্তু যদি সেই আস্থা নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে গুজব, ভুয়া তথ্য এবং বিভ্রান্তি সমাজে ছড়িয়ে পড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর।
এখানে সাংবাদিকদেরও একটি বড় দায়িত্ব রয়েছে। পেশাগত নীতিমালা মেনে চলা, তথ্য যাচাই করা এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখা—এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে পারলে গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে। একইসাথে রাষ্ট্র এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের কাজের স্বাধীনতা রক্ষা করা।
বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে গণমাধ্যমের ভূমিকা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে উন্নয়ন, সামাজিক পরিবর্তন, রাজনৈতিক প্রক্রিয়া—সবকিছুতেই গণমাধ্যম একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। তাই এই খাতের উপর যে কোনো ধরনের চাপ বা সীমাবদ্ধতা পুরো সমাজকে প্রভাবিত করে।
সাংবাদিকদের হয়রানির ঘটনাগুলো যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে তা ভবিষ্যতে নতুন প্রজন্মের জন্য এই পেশাকে অনাকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। অনেক মেধাবী তরুণ হয়তো সাংবাদিকতা পেশায় আসতে আগ্রহ হারাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে গণমাধ্যমের মানের উপর প্রভাব ফেলবে।
অন্যদিকে, প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে গণমাধ্যমের ধরনও বদলেছে। এখন শুধু প্রথাগত সংবাদপত্র বা টেলিভিশন নয়, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, সোশ্যাল মিডিয়া—সবকিছুই তথ্যপ্রবাহের অংশ। এই নতুন বাস্তবতায় আইনি কাঠামো এবং নীতিমালাও সময়োপযোগী হওয়া জরুরি, যাতে স্বাধীনতা এবং দায়িত্ব—দুটোর মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় থাকে।
সব মিলিয়ে, টিআইবি যে তথ্য তুলে ধরেছে তা একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা যেতে পারে। এটি কেবল সাংবাদিকদের সমস্যা নয়; এটি পুরো সমাজের সমস্যা। কারণ একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং নিরাপদ গণমাধ্যম ছাড়া একটি গণতান্ত্রিক সমাজ টিকে থাকতে পারে না।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ। সরকার, গণমাধ্যম, সিভিল সোসাইটি এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়—সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে। নীতিমালা সংস্কার, আইনের অপব্যবহার বন্ধ, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পেশাগত মান উন্নয়নের মাধ্যমে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
শেষ পর্যন্ত, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি মৌলিক অধিকার। এই অধিকার রক্ষা করা মানে শুধু সাংবাদিকদের সুরক্ষা নয়, বরং পুরো সমাজের সত্য জানার অধিকার নিশ্চিত করা। আর সেই লক্ষ্য অর্জনেই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
আপনার মতামত জানানঃ