
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়। ভৌগোলিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক নির্ভরতা, সীমান্ত, সংস্কৃতি ও ইতিহাস—সবকিছু মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক কখনো উষ্ণ, কখনো টানাপড়েনপূর্ণ। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই সম্পর্ক আবারও নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান, শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং দীর্ঘ দুই দশক পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের ক্ষমতায় আসা পুরো আঞ্চলিক সমীকরণকেই পাল্টে দিয়েছে। এই নতুন পরিস্থিতিতে ভারত যে নতুনভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে, তারই একটি বড় ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে দীনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকায় ভারতের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে পাঠানোর সিদ্ধান্তকে।
ভারত সাধারণত বাংলাদেশে পেশাদার কূটনীতিকদেরই হাইকমিশনার হিসেবে পাঠিয়ে এসেছে। কিন্তু এবার একজন সক্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে বেছে নেয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত কেবল কূটনৈতিক নয়, বরং স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তাও বহন করছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দিল্লি বুঝতে পেরেছে যে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা আগের মতো নেই। তাই কেবল আমলাতান্ত্রিক যোগাযোগ দিয়ে আর সম্পর্ক এগিয়ে নেয়া সম্ভব হবে না। রাজনৈতিক বোঝাপড়া, জনমত এবং নতুন ক্ষমতাকাঠামোকে বিবেচনায় নিয়েই ভারত এখন কৌশল পরিবর্তনের পথে হাঁটছে।
দীনেশ ত্রিবেদী পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় ছিলেন। তিনি কেন্দ্রীয় রাজনীতিতেও পরিচিত মুখ। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে তার পরিচয় রয়েছে, যা ঢাকার রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ বোঝার ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে। দিল্লি হয়তো মনে করছে, বাংলাদেশে এখন এমন একজন প্রতিনিধি প্রয়োজন যিনি সরাসরি রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন এবং জটিল ইস্যুগুলোকে কেবল কূটনৈতিক নথির ভেতরে সীমাবদ্ধ রাখবেন না।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতবিরোধী মনোভাব নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে সীমান্ত হত্যা, পুশইন, পানি বণ্টন, বাণিজ্য বৈষম্য এবং রাজনৈতিক আশ্রয়ের প্রশ্নে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। শেখ হাসিনা সরকারের সময় ভারতকে বাংলাদেশের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে দেখা হলেও সেই সম্পর্কের সমালোচনাও ছিল প্রবল। বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করতো, দিল্লি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর সেই সমালোচনা আরও জোরালো হয়।
নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর দিল্লির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা। কারণ এতদিন ভারতের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য রাজনৈতিক অংশীদার ছিল আওয়ামী লীগ। কিন্তু রাজনৈতিক পালাবদলের পর দিল্লিকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হচ্ছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে এগোবে, সেটি এখন ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
শেখ হাসিনার অবস্থানও এই সম্পর্কের বড় একটি অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। তিনি ভারতে অবস্থান করছেন কি না, তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে কি না—এসব প্রশ্ন দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছে। একই সঙ্গে শরীফ ওসমান হাদীর হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের দেশে ফেরানো এবং বিচারিক সহযোগিতার বিষয়গুলোও আলোচনায় রয়েছে। এসব ইস্যু শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং জনমতের সঙ্গেও জড়িত। ফলে ভারতকে এখন অনেক বেশি সতর্ক ও হিসাবি কূটনীতি অনুসরণ করতে হচ্ছে।
সীমান্ত প্রশ্ন বরাবরই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি। সীমান্ত হত্যা নিয়ে বাংলাদেশে বহু বছর ধরে ক্ষোভ রয়েছে। প্রায়ই অভিযোগ ওঠে, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করছে। অন্যদিকে ভারত তাদের নিরাপত্তা, অবৈধ অভিবাসন এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের স্থিতিশীলতার কথা বলছে। বিশেষ করে তথাকথিত ‘চিকেন নেক’ করিডোর ভারতের জন্য অত্যন্ত কৌশলগত একটি এলাকা। ফলে সীমান্ত এখন কেবল নিরাপত্তা নয়, বরং আঞ্চলিক রাজনীতির কেন্দ্রীয় ইস্যুতেও পরিণত হয়েছে।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতাও দিল্লির উদ্বেগ বাড়িয়েছে। গত এক দশকে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা খাতে চীনের উপস্থিতি ভারতের দৃষ্টিতে কৌশলগত চ্যালেঞ্জ। তাই দিল্লি চায় না বাংলাদেশ পুরোপুরি চীনের প্রভাববলয়ে চলে যাক। এই কারণেও ভারত এখন সম্পর্ক পুনর্গঠনে আগ্রহী।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের বর্তমান নীতিতে বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট হচ্ছে। আগে দিল্লি হয়তো বাংলাদেশের একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির ওপর বেশি নির্ভর করতো। কিন্তু এখন তারা বুঝতে পারছে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক বাস্তবতা দ্রুত বদলাচ্ছে। তাই সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা জরুরি। বিএনপি, ইসলামপন্থি দল, নাগরিক সমাজ এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা দিল্লি উপলব্ধি করছে।
বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবিরের বক্তব্যও এই বাস্তবতাকে সামনে আনে। তার মতে, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে পরিবর্তন এসেছে, সেটি মেনে নিয়েই ভারতকে নতুন সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। আগের কৌশল আর কার্যকর হবে না। একইভাবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক আমেনা মহসিনও মনে করেন, বাংলাদেশ ভারতের জন্য ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে দিল্লি কখনোই সম্পর্ক খারাপ অবস্থায় ফেলে রাখবে না। তবে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হলে জনগণের ইচ্ছা ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সম্মান করতে হবে।
এখানে একটি বড় প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশও কি একইভাবে সম্পর্ককে নতুনভাবে সাজাতে প্রস্তুত? কারণ দুই দেশের সম্পর্কের ভেতরে যেমন সহযোগিতা আছে, তেমনি রয়েছে অবিশ্বাসও। পানি বণ্টন, তিস্তা চুক্তি, সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্য বৈষম্য—এসব ইস্যু বহু বছর ধরে অমীমাংসিত। ফলে কেবল নতুন হাইকমিশনার পাঠালেই সম্পর্কের জট খুলে যাবে, এমনটা মনে করার সুযোগ নেই।
তবে এটাও সত্য, বাংলাদেশ ও ভারত কেউই একে অপরকে উপেক্ষা করতে পারবে না। অর্থনীতি, নিরাপত্তা, যোগাযোগ, আঞ্চলিক বাণিজ্য—সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন। দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেও ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ।
দীনেশ ত্রিবেদীর নিয়োগকে তাই কেবল কূটনৈতিক বদলি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি মূলত ভারতের নতুন বার্তা। দিল্লি হয়তো বুঝাতে চাইছে যে তারা সম্পর্ককে রাজনৈতিকভাবে নতুন উচ্চতায় নিতে চায়। বিশেষ করে এমন একজনকে পাঠানো হয়েছে যিনি কেবল কূটনীতিক নন, বরং রাজনৈতিক বাস্তবতা বোঝেন, আলোচনায় দক্ষ এবং কেন্দ্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখেন।
বাংলাদেশের জন্যও এটি একটি সুযোগ হতে পারে। নতুন সরকার যদি জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে পারে, তাহলে ভারত ও চীনের মধ্যে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সীমান্ত, পানি ও বাণিজ্য ইস্যুতেও আরও কার্যকর আলোচনা এগিয়ে নেয়া যেতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি এখন দ্রুত বদলাচ্ছে। বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা, চীনের উত্থান, ভারতের আঞ্চলিক নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা এবং বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক গুরুত্ব—সব মিলিয়ে এই অঞ্চল নতুন এক বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। সেই বাস্তবতায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আর কেবল প্রতিবেশী সম্পর্ক নয়; এটি এখন বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সমীকরণের অংশ।
দিল্লি হয়তো এখন বুঝতে পারছে, বাংলাদেশের জনগণের মনোভাব ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তাই সম্পর্ক পুনর্গঠনের এই প্রচেষ্টা কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে পারস্পরিক সম্মান, আস্থাবোধ এবং বাস্তব সমস্যাগুলোর সমাধানের ওপর। কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং সীমান্তে সহিংসতা কমানো, বাণিজ্যে ভারসাম্য আনা, পানি বণ্টনে অগ্রগতি এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সংবেদনশীল আচরণই ভবিষ্যতের সম্পর্ক নির্ধারণ করবে।
বাংলাদেশের মানুষও এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। তারা চায় প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, কিন্তু সেই সম্পর্ক যেন সমতার ভিত্তিতে দাঁড়ায়। তাই আগামী দিনগুলোতে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক কোন পথে যাবে, সেটি নির্ভর করবে দুই দেশ কতটা আন্তরিকভাবে নতুন বাস্তবতাকে গ্রহণ করতে পারে তার ওপর। দীনেশ ত্রিবেদীর ঢাকা মিশন সেই নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে, তবে সফলতা আসবে তখনই, যখন কথার চেয়ে কাজের পরিবর্তন বেশি দৃশ্যমান হবে।
আপনার মতামত জানানঃ