২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি—ঢাকার পিলখানায় ঘটে যাওয়া সেই বিভীষিকাময় দিনগুলো আজও বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত হয়ে আছে। অনেকের কাছে এটি ছিল এক রক্তাক্ত বিদ্রোহ, আবার ভেতরে আটকে থাকা অসংখ্য পরিবারের কাছে এটি ছিল এক অবর্ণনীয় আতঙ্ক, এক নির্মম হত্যাযজ্ঞের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। তখন নবম শ্রেণির ছাত্রী ফাবলিহা বুশরা সেই ভয়াল ঘটনার মাঝখানে ছিলেন—মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে তিনি হারান তার বাবা, তৎকালীন বিডিআর হাসপাতালের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ লেফটেন্যান্ট কর্নেল লুৎফর রহমান খানকে। বুশরার স্মৃতিতে সেই ৩৬ ঘণ্টা শুধু সময় নয়, এক অনন্ত দুঃস্বপ্ন।
সেদিনের সকালটা ছিল একেবারেই স্বাভাবিকভাবে শুরু হওয়া একটি দিন। বুশরা তখন নাশতা করছিলেন। হঠাৎ করেই চারপাশে গুলির শব্দ শুরু হয়। প্রথমে বিষয়টি বোঝার সুযোগই ছিল না—কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে, কিছুই পরিষ্কার ছিল না। তাদের বাসা ছিল ডিজির বাসার ঠিক পাশেই। ঠিক সেই সময় বাবার একটি ফোন আসে। ফোনটি ধরেছিলেন বুশরা নিজেই। খুব বেশি কথা হয়নি—শুধু বলা হয়েছিল, “তোমার আম্মুকে দাও।” সেটিই ছিল বাবার সঙ্গে শেষ যোগাযোগ।
এরপর পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ হয়ে ওঠে। গুলির শব্দ বাড়তে থাকে। চারতলার বাসায় থাকা অবস্থায় একটি বুলেট জানালার রড বাঁকিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে। নিচে পার্ক করা তিনটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। মুহূর্তের মধ্যে স্বাভাবিক জীবন ভেঙে পড়ে আতঙ্কে। বুশরা বলেন, তিনি দেখেছিলেন অনেক সৈনিক—কারও মুখে কাপড় বাঁধা, কেউ মাস্ক পরে। এত সৈনিক তিনি আগে কখনো দেখেননি। তখনও তারা বুঝতে পারেননি বাইরে কী ভয়াবহতা unfolding হচ্ছে।
অল্প সময়ের মধ্যেই দুজন সৈনিক এসে তাদের ঘর থেকে বের করে নিয়ে যায়। সেই মুহূর্তের একটি দৃশ্য বুশরার মনে গেঁথে আছে আজও—এক সৈনিক তার মায়ের বুকে বন্দুক ঠেকিয়ে বলছিল, “তুই শেষ… তোর জামাই তো শেষ।” তখন মায়ের দুই হাতে শক্ত করে ধরা ছিল বুশরা আর তার ছোট ভাই। আতঙ্ক, অসহায়ত্ব আর অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে এক নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসা পরিস্থিতি।
তাদের নিয়ে যাওয়া হয় কোয়ার্টার গার্ডে। বুশরা তখন জানতেনই না কোয়ার্টার গার্ড কী জায়গা। সেখানে পৌঁছে তিনি দেখেন, আগেই অন্য পরিবারগুলোকে এনে রাখা হয়েছে। একে একে সবাইকে লাইনে দাঁড় করিয়ে একটি ঘরে ঢোকানো হচ্ছিল। ঘরের ভেতরের দৃশ্য ছিল আরও ভয়াবহ। বুশরার ভাষায়, সবচেয়ে বীভৎস ছিল অফিসারদের স্ত্রী, এমনকি মা ও সন্তানদের ওপর বেধড়ক মারধর। সেই বিশৃঙ্খলার মাঝেই তার পেছনে লাথি মারা হয়, আর কানের পেছনে বন্দুকের বাঁট দিয়ে আঘাত করা হয়।
একটি ঘরে গাদাগাদি করে রাখা হয় প্রায় ৭০ থেকে ৮০ জন মানুষকে। বাতাস ভারী হয়ে ছিল ভয় আর কান্নায়। কিন্তু এর মধ্যেই আরেকটি বিষয় তাকে শিউরে তোলে—বিডিআর জওয়ানদের উল্লাস। তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিল, কে কতজনকে মেরেছে। একটি শিশুমনের জন্য এর চেয়ে ভয়ংকর অভিজ্ঞতা আর কী হতে পারে—চারপাশে আতঙ্কে জমে থাকা মানুষ, আর অন্য পাশে হত্যার হিসাব নিয়ে উল্লাস।
বুশরা একটি ঘটনার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। একজন ধোপা এক অফিসারকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তিনি ধরা পড়ে যান। এরপর প্রায় ২০–২৫ জন তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। যা পেয়েছে তাই দিয়ে মারতে থাকে। সেই মানুষের চিৎকার আজও বুশরার কানে বাজে। তিনি বলেন, সেই অভিজ্ঞতার পর বহু রাত তিনি ঘুমাতে পারেননি।
জিম্মি অবস্থায় মা ও ভাইয়ের সঙ্গে একই ঘরে বসে ছিলেন তিনি। হঠাৎ এক সৈনিক গরাদের ফাঁক দিয়ে বন্দুক ঢুকিয়ে তার দিকে তাক করে বলে, “চোখ বন্ধ কর।” সৈনিকটি হাসছিল—যেন এটি কোনো মজা। কিন্তু বুশরা তখন ভয়ে গুটিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি অনুভব করেছিলেন, তারা সত্যিই ভাবছিল—এবার হয়তো তাদের মেরে ফেলা হবে। সেই ৩৬ ঘণ্টা তারা প্রায় শুধু পানি খেয়ে কাটিয়েছেন। দোয়া-কলেমা পড়েছেন, মৃত্যুর অপেক্ষায় থেকেছেন।
রাতের ঘুমও ছিল আতঙ্কে ভরা। বুশরা বলেন, তিনি স্যান্ডেল মাথায় দিয়ে একটু ঘুমিয়েছিলেন—যেন যে কোনো মুহূর্তে কিছু ঘটতে পারে। অবশেষে যখন তাদের বের হতে বলা হয় এবং ট্রাকে তোলা হয়, তখনও ভয় কাটেনি। বরং মনে হচ্ছিল—গাড়িতে তুলেই হয়তো পেছন থেকে গুলি করা হবে। এমন গভীর ছিল সেই মানসিক আঘাত।
কিন্তু জিম্মি অবস্থার ভয়াবহতার চেয়েও বড় আঘাত আসে পরে—বাবার মৃত্যুসংবাদ। বুশরা বলেন, জিম্মি থাকার কষ্ট যতটা ছিল, বাবার জন্য অপেক্ষা করা এবং পরে তার লাশ পাওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল আরও বেশি যন্ত্রণাদায়ক। মানসিকভাবে তিনি ভেঙে পড়েন। তিনবার আইসিইউতে যেতে হয় তাকে। বাবার জানাজার দিন তাকে চারটি সেডেটিভ দিতে হয়েছিল স্নায়ু শান্ত রাখতে। তিনি কাঁদতে পারছিলেন না—বরং চিৎকার করতেন, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতেন।
পরবর্তী সাত বছর তাকে টানা মানসিক চিকিৎসা ও থেরাপির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। বিষয়টি এক ধরনের নির্মম পরিহাস—তার বাবা ছিলেন একজন সাইকিয়াট্রিস্ট, অথচ তাকেই ঘুরতে হয়েছে অসংখ্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে। পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারে ভুগেছেন তিনি। নিয়মিত ওষুধ, থেরাপি—সবকিছুই নিতে হয়েছে। ছিল তীব্র রাগের সমস্যা, মানসিক অস্থিরতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা।
তিনি বলেন, বাবার সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক ছিল। পুরো ঘটনাটা তিনি নিজের চোখে দেখেছেন—মন অন্যদিকে সরানোর সুযোগ ছিল না। পড়াশোনায়ও প্রভাব পড়ে। অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, হয়তো তিনি আর পড়াশোনায় এগোতে পারবেন না। কিন্তু ধীরে ধীরে, দীর্ঘ লড়াইয়ের পর তিনি আবার নিজের জীবন গুছিয়ে নেন।
নয় বছর পর যখন তিনি সেই ঘটনার কথা বলেন, তখনও স্পষ্ট—ক্ষত পুরোপুরি শুকায়নি। মৃত্যুবার্ষিকী এলে তিনি ব্যক্তিগতভাবে শোক পালন করেন। সবাই চলে যাওয়ার পর কবরস্থানে যান, একা কিছু সময় কাটান। সেই নীরব সময়টাই তার জন্য সবচেয়ে ব্যক্তিগত মুহূর্ত।
বর্তমানে তিনি একটি মেডিকেল কলেজে পড়ছেন এবং আশা করেন শিগগিরই গ্রাজুয়েশন শেষ করবেন। তবু তিনি স্বীকার করেন—মনের দিক থেকে হয়তো কখনোই পুরোপুরি সেরে ওঠা সম্ভব নয়।
২০০৯ সালের ঘটনাকে তিনি “বিদ্রোহ” বলতে রাজি নন। তার অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলে। তার ভাষায়, তারা ভেতরে কোনো ন্যায়বিচারের দাবিতে প্রতিবাদ দেখেননি; দেখেছেন মানুষ হত্যা, নির্যাতন, শিশুদের গালিগালাজ, নারীদের ওপর হামলা। তিনি এটিকে “কারনেজ” বা “ম্যাসাকার” বলতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তার প্রশ্নটি আজও কাঁপিয়ে দেয়—“বিদ্রোহ করা হয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে। আমার বাবা কী অন্যায় করেছিলেন?”
পিলখানার সেই ৩৬ ঘণ্টা বাংলাদেশের ইতিহাসে শুধু একটি ঘটনা নয়—এটি বহু পরিবারের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির সমষ্টি। ফাবলিহা বুশরার স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বড় রাজনৈতিক বা সামরিক ঘটনার ভেতরে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য মানুষের ভাঙা জীবন, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ক্ষত, আর না-ফেরা প্রিয়জনের শূন্যতা। সময় এগিয়ে যায়, মানুষ নতুন জীবন গড়ে—তবু কিছু স্মৃতি থাকে, যা কখনোই পুরোপুরি মুছে যায় না।
আপনার মতামত জানানঃ