নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি অদ্ভুত এবং তাৎপর্যপূর্ণ দৃশ্য ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে—দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দলীয় কার্যালয়ে প্রবেশের চেষ্টা করছেন, কোথাও তালা খুলে ঢুকছেন, আবার কোথাও প্রতিপক্ষের বাধা ও হামলার মুখে পড়ছেন। ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন মনে হলেও সামগ্রিকভাবে এগুলো বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার এক জটিল ও বহুস্তরবিশিষ্ট চিত্র তুলে ধরছে। প্রশ্ন উঠছে—এটি কি স্বতঃস্ফূর্ত তৃণমূল উদ্যোগ, নাকি দলীয় কৌশলের অংশ? অথবা এর পেছনে কি কোনো নীরব রাজনৈতিক সমঝোতা কাজ করছে?
২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হওয়ার পর দলটি কার্যত সাংগঠনিকভাবে স্থবির হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের মে মাসে নিষেধাজ্ঞা আরও স্পষ্টভাবে জারি করা হয়, যেখানে দল ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর সভা-সমাবেশ, প্রচারণা, এমনকি অনলাইন কার্যক্রমও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ফলে আওয়ামী লীগের আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক উপস্থিতি প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়। কিন্তু নির্বাচনের পরপরই যে দৃশ্যপট তৈরি হয়েছে, তা ইঙ্গিত করছে—দলটির তৃণমূল কাঠামো পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়নি।
দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের বক্তব্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের কার্যালয়গুলো আইনগতভাবে বাজেয়াপ্ত হয়নি, ফলে সেখানে যাওয়া বা প্রবেশ করা রাজনৈতিকভাবে অস্বাভাবিক নয়। তাঁর ভাষ্য—কর্মী-সমর্থকদের জন্য দলীয় কার্যালয়ে যাওয়া স্বাভাবিক রাজনৈতিক অধিকার। এই বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা রয়েছে: দলটি নিজেকে এখনও নিষিদ্ধ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে মানতে রাজি নয়, বরং পরিস্থিতিকে সাময়িক রাজনৈতিক বাধা হিসেবে দেখছে।
অন্যদিকে মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মী ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছেন। ছাত্রলীগের এক কর্মী রিহান সরদার দাবি করেছেন, দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার কাছ থেকে একটি বার্তা এসেছে—যেখানে যার পক্ষে সম্ভব, সে যেন দলীয় কার্যালয়ে যায়। দলীয় সূত্রগুলোও বলছে, বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় এমন পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যদি এই তথ্য সত্য হয়, তাহলে কার্যালয়ে প্রবেশের ঘটনাগুলোকে পুরোপুরি স্বতঃস্ফূর্ত বলা কঠিন হয়ে পড়ে; বরং এটি একটি “সফট রিঅ্যাক্টিভেশন” কৌশল হিসেবেও ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।
নির্বাচনের পর পঞ্চগড় থেকে শুরু হওয়া ঘটনাপ্রবাহ দ্রুত দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। চাঁদপুর, ঠাকুরগাঁও, সাতক্ষীরা, বরগুনা, পটুয়াখালী, খুলনা, নারায়ণগঞ্জ, শরীয়তপুর, নোয়াখালী, জামালপুর ও রাজবাড়ী—বিভিন্ন স্থানে একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। কোথাও তালা খুলে কার্যালয়ে প্রবেশ, কোথাও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, কোথাও জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও স্লোগান—সব মিলিয়ে এটি এক ধরনের “রাজনৈতিক উপস্থিতি জানান দেওয়া” কর্মসূচি বলেই মনে হচ্ছে।
তবে ঘটনাগুলো একমুখী নয়। কিছু এলাকায় কার্যালয় খোলার পরপরই পাল্টা হামলা, ভাঙচুর বা পুনরায় তালাবদ্ধ করার ঘটনাও ঘটেছে। ময়মনসিংহের তারাকান্দায় আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলার পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক পার্টির কর্মীদের বিক্ষোভ এবং টায়ারে আগুন দেওয়ার ঘটনা রাজনৈতিক উত্তেজনার ইঙ্গিত দেয়। অর্থাৎ মাঠপর্যায়ে এখনও ক্ষমতার ভারসাম্য অনিশ্চিত এবং সংঘাতের সম্ভাবনা বিদ্যমান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ঘটনাগুলোকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছেন। কেউ কেউ মনে করছেন, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে একটি নীরব সহনশীলতা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীনের মতে, আওয়ামী লীগ দেশের একটি বড় রাজনৈতিক শক্তি; তাদের পুরোপুরি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে বাইরে রাখা দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এই দৃষ্টিভঙ্গি ইঙ্গিত দেয়—কার্যালয় খোলার ঘটনাগুলো হয়তো ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের পূর্বাভাস।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমানের পর্যবেক্ষণ আরও তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর মতে, নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম পুনরারম্ভের একটি প্রক্রিয়া হয়তো শুরু হয়েছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বাস্তবতা কাজ করছে—কোনো বড় দল দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকলে তার শূন্যতা রাজনৈতিক ব্যবস্থায় চাপ তৈরি করে। ফলে ধীরে ধীরে “স্পেস ওপেনিং” বা রাজনৈতিক জায়গা তৈরি হওয়ার প্রবণতা দেখা যেতে পারে।
ঘটনাগুলোর আরেকটি আলোচিত দিক হলো—কিছু এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতাদের উপস্থিতিতে বা নীরব সম্মতিতে আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলার অভিযোগ। পঞ্চগড়ের ঘটনাটি বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে, যেখানে বিএনপির এক স্থানীয় নেতার উপস্থিতিতে তালা খোলার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। যদিও সংশ্লিষ্ট নেতা দাবি করেছেন তিনি জানতেন না এটি আওয়ামী লীগের কার্যালয়, তবু রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে এটি কৌতূহলের বিষয় হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় পর্যায়ের সূত্রগুলো বলছে, নির্বাচনের আগে ভোটের সমর্থন পাওয়ার আশায় কিছু বিএনপি বা জামায়াত-ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। সেখানে নাকি আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল—নির্বাচনের পর কার্যালয় খুলতে বাধা দেওয়া হবে না। যদিও এই দাবির স্বাধীন যাচাই কঠিন, তবু এটি মাঠপর্যায়ের রাজনীতির বাস্তবতাকে সামনে আনে, যেখানে জাতীয় পর্যায়ের তীব্র বিরোধিতা স্থানীয় পর্যায়ে কখনও কখনও নরম সমীকরণে রূপ নেয়।
তবে একই সঙ্গে বিপরীত প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। কিছু এলাকায় যে বিএনপি বা অন্যান্য রাজনৈতিক পক্ষ প্রথমে সহনশীল ছিল, তাদের ভেতরের অন্য গ্রুপ পরে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে কার্যালয় খোলার পর আবার হামলা বা দখলের ঘটনা ঘটেছে। এটি দেখায়—স্থানীয় রাজনীতি এককেন্দ্রিক নয়; বরং বহুস্তরীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা সেখানে সক্রিয়।
কেন্দ্রীয় পর্যায়ের চিত্রও কম নাটকীয় নয়। বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, তেজগাঁওয়ের ঢাকা জেলা কার্যালয় এবং ধানমন্ডিতে সভাপতির কার্যালয়—সবগুলোই গত বছরের রাজনৈতিক পালাবদলের পর হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের শিকার হয়ে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। তবু নির্বাচনের পর কয়েকজন নেতাকর্মীর সেখানে গিয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন প্রতীকীভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি সরাসরি রাজনৈতিক কর্মসূচি না হলেও একটি বার্তা বহন করে—দলটি নিজেদের সম্পূর্ণ প্রান্তিক মনে করছে না।
ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়ি ভাঙার ঘটনাও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের মধ্যে আবেগগত প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। রাজনৈতিক মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, প্রতীকী স্থাপনাগুলো অনেক সময় সংগঠনের মনোবল পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখে। ফলে কার্যালয়ে প্রবেশের চেষ্টা কেবল প্রশাসনিক বা সাংগঠনিক পদক্ষেপ নয়; এটি মনস্তাত্ত্বিক পুনর্গঠনের অংশও হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও আওয়ামী লীগের কর্মীদের সক্রিয়তা লক্ষ করা যাচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন সময় ঝটিকা মিছিল, অনলাইন প্রচারণা এবং ‘নো ভোট’ ধরনের ক্যাম্পেইন দেখা গেছে। এসব কার্যক্রম ইঙ্গিত করে—দলটির সংগঠন কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি; বরং আন্ডারকারেন্ট হিসেবে সক্রিয় রয়েছে।
সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিকে কয়েকভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। প্রথমত, এটি তৃণমূলের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে। দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকার পর কর্মীরা নিজেদের দৃশ্যমান করতে চাইছেন—এটি রাজনৈতিক সংগঠনের স্বাভাবিক প্রবণতা। দ্বিতীয়ত, এটি দলীয়ভাবে অনুমোদিত “লো-প্রোফাইল রি-এন্ট্রি” কৌশলও হতে পারে, যেখানে সরাসরি বড় কর্মসূচি না দিয়ে ছোট ছোট প্রতীকী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তৃতীয়ত, স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তব রাজনৈতিক সমঝোতার উপাদানও থাকতে পারে, যা জাতীয় পর্যায়ের কঠোর অবস্থানের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে নতুন সরকারের রাজনৈতিক কৌশল, আইনগত অবস্থান এবং মাঠপর্যায়ের শক্তির ভারসাম্যের ওপর। যদি নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে কিন্তু মাঠপর্যায়ে নীরব সহনশীলতা অব্যাহত থাকে, তাহলে এমন “গ্রে জোন” রাজনীতি আরও বাড়তে পারে। আর যদি কঠোর প্রয়োগ শুরু হয়, তাহলে সংঘাতের ঝুঁকিও বাড়বে।
একটি বিষয় পরিষ্কার—বাংলাদেশের রাজনীতি এখনও রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, এবং আওয়ামী লীগের কার্যালয় ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই পরিবর্তনের সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে। এটি শুধু কয়েকটি তালা খোলার গল্প নয়; বরং ক্ষমতা, বৈধতা, সংগঠন টিকে থাকা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণের একটি চলমান অধ্যায়।
আপনার মতামত জানানঃ