
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর মানচিত্রে এক নজরেই চোখে পড়েছে একটি বিশেষ ভূগোল—দক্ষিণ-পশ্চিমের সাতক্ষীরা থেকে শুরু করে উত্তরে মেহেরপুর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ হয়ে রংপুর বিভাগের একাধিক আসন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সীমান্ত ঘেঁষা বিস্তীর্ণ এলাকায় হলুদ রঙের ছড়াছড়ি। এই হলুদ রং চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটকে। সীমান্তবর্তী বহু আসনে তাদের জয়ের এই চিত্র শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, গভীর আগ্রহ ও সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ-এও। কারণ ভৌগোলিক নৈকট্য এখানে রাজনৈতিক আলোচনাকে দ্রুত সীমান্ত পেরিয়ে নিয়ে আসে।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাতক্ষীরা, যশোর, খুলনা, কুষ্টিয়া কিংবা পাবনার মতো জেলা থেকে শুরু করে উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ—এই অঞ্চলগুলোর বড় অংশই ভারতের সঙ্গে সরাসরি সীমান্ত ভাগ করে। ভারতের দিকে সেই সীমান্ত ঘেঁষে রয়েছে উত্তর ২৪ পরগনা, নদিয়া, মুর্শিদাবাদ, মালদা, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর, কোচবিহারের মতো জেলাগুলি। ফলে সীমান্তের ওপারের রাজনৈতিক প্রবণতা এপারে নির্বাচনী বয়ানে রূপ নিতে সময় লাগে না। বিশেষত যখন সামনে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন, তখন এই ফলাফলকে ঘিরে রাজনৈতিক ব্যাখ্যার লড়াই আরও তীব্র হওয়াই স্বাভাবিক।
পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ ইস্যু নির্বাচনী রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অনুপ্রবেশ, সীমান্ত সুরক্ষা, জনবিন্যাসের পরিবর্তন—এই শব্দগুলি বিশেষ করে গত এক দশকে বারবার উঠে এসেছে। ভারতীয় জনতা পার্টি বহুদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে যে সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ হচ্ছে এবং রাজ্যের শাসক দল সেই অনুপ্রবেশকারীদের রাজনৈতিক স্বার্থে প্রশ্রয় দিচ্ছে। তাদের দাবি, সীমান্তের বহু অংশে এখনও কাঁটাতারের বেড়া সম্পূর্ণ হয়নি এবং এর পেছনে রাজ্য সরকারের অনীহা কাজ করেছে। এই প্রেক্ষাপটে সীমান্তবর্তী বাংলাদেশি আসনগুলিতে জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের সাফল্য বিজেপির কাছে একটি নতুন রাজনৈতিক যুক্তি হয়ে উঠতে পারে—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিজেপির বক্তব্যের সারমর্ম দাঁড়ায় এই যে, যদি সীমান্তের ওপারে কট্টরপন্থী শক্তি প্রভাব বাড়ায়, তবে তার প্রভাব এপারের সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশেও পড়তে পারে। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করছে যে সীমান্ত দিয়ে আরও ‘অনুপ্রবেশ’ ঘটতে পারে এবং সেই প্রক্রিয়ার সঙ্গে আদর্শিক প্রভাবও যুক্ত হতে পারে। ফলে সীমান্ত সুরক্ষা, নাগরিকপঞ্জি, ভোটার তালিকার সংশোধন—এসব ইস্যু আবারও জোরালোভাবে সামনে আসতে পারে। রাজনৈতিক ভাষ্যে এই ফলাফলকে ব্যবহার করে ধর্মীয় মেরুকরণের চেষ্টা হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন অনেক পর্যবেক্ষক।
অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস ভিন্ন ব্যাখ্যা সামনে আনছে। তাদের বক্তব্য, হিন্দু মৌলবাদ ও ইসলামি মৌলবাদ একে অপরের পরিপূরক—এক পক্ষের উত্থান অন্য পক্ষকে শক্তিশালী করে। এই যুক্তিতে তারা দাবি করছে, ভারতের অভ্যন্তরে যে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি জোরদার হয়েছে, তার প্রতিক্রিয়াতেই বাংলাদেশের কিছু অঞ্চলে ইসলামপন্থী শক্তির সংগঠন মজবুত হয়েছে। তৃণমূল নেতারা এটাও তুলে ধরতে চাইছেন যে বাংলাদেশের নির্বাচনে সামগ্রিকভাবে একটি বৃহত্তর জোট জয়ী হয়েছে, যার ভেতরে জামায়াত থাকলেও সেটি একমাত্র শক্তি নয়। ফলে গোটা ফলাফলকে কেবল কট্টরপন্থার উত্থান হিসেবে দেখানো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচনের ফল ঘোষণার দিনই বাংলাদেশের বিরোধী জোটের নেতৃত্বকে অভিনন্দন জানান। সেই জোটের প্রধান মুখ তারেক রহমান-কে শুভেচ্ছা জানানোর ঘটনাও রাজনৈতিক বার্তাবাহী হিসেবে দেখা হয়েছে। এর মাধ্যমে তৃণমূল একদিকে বাংলাদেশে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সৌহার্দ্য বজায় রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে, অন্যদিকে বিজেপির সম্ভাব্য ‘কট্টরপন্থা’ আখ্যানকে ভারসাম্যপূর্ণ করার চেষ্টা করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলিতে জামায়াতের প্রভাব নতুন কিছু নয়। দেশভাগের পর থেকেই এই অঞ্চলে তাদের সংগঠনগত ভিত্তি ছিল। সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা, ধর্মীয় জনসংখ্যার বিন্যাস, সীমান্তের পারাপার—সব মিলিয়ে এখানে ইসলামপন্থী রাজনীতির একটি ধারাবাহিক উপস্থিতি রয়েছে। ফলে এবারের ফলাফলকে হঠাৎ উত্থান হিসেবে চিত্রিত করা ইতিহাস-সচেতন দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে খাপ খায় না। তবে নির্বাচনী রাজনীতিতে ইতিহাসের সূক্ষ্মতা প্রায়ই সরলীকৃত বয়ানে পরিণত হয়।
পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর থেকেই বিজেপির প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কোচবিহার থেকে শুরু করে নদিয়া, উত্তর ২৪ পরগনা—বহু এলাকায় তারা শক্ত ঘাঁটি গড়ে তুলেছে। এই ভূগোল আবার বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী সেই অঞ্চলগুলির সঙ্গেই মিলে যায় যেখানে জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোট ভালো ফল করেছে। এই সমান্তরাল চিত্র রাজনৈতিক বক্তব্যে সহজেই ব্যবহারযোগ্য। বিজেপি বলতে পারে—সীমান্তের দুই প্রান্তেই কট্টর আদর্শ শক্তিশালী হচ্ছে, তাই ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ’ সম্প্রদায়ের ঐক্য দরকার। বিপরীতে তৃণমূল বলতে পারে—এই মেরুকরণই দুই প্রান্তে মৌলবাদের খাদ্য জোগাচ্ছে।
আসামের সীমান্তবর্তী কিছু এলাকাতেও জামায়াতের জয়ের খবর পশ্চিমবঙ্গে আলোচনায় এসেছে। কারণ উত্তরবঙ্গের সঙ্গে আসামের সামাজিক ও রাজনৈতিক যোগাযোগ ঘনিষ্ঠ। ফলে এই গোটা পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত বেল্টকে ঘিরে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক কল্পনা তৈরি হতে পারে—যেখানে নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, ধর্মীয় পরিচয়, শরণার্থী প্রশ্ন একসূত্রে গাঁথা হবে। বিজেপি ইতিমধ্যেই নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) ইস্যুতে সীমান্ত রাজ্যগুলিতে জোরালো অবস্থান নিয়েছে। নতুন ফলাফল সেই প্রচারে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
তবে সব বিশ্লেষকই মনে করছেন না যে এর প্রভাব সরাসরি বা একমুখী হবে। পশ্চিমবঙ্গের ভোটাররা বহুদিন ধরেই সীমান্ত-রাজনীতির ভাষ্য শুনে আসছেন। তারা স্থানীয় ইস্যু—চাকরি, শিল্প, কৃষি, সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প—এসবকেও গুরুত্ব দেন। ফলে বাংলাদেশের নির্বাচনী ফলাফল কতটা বাস্তব ভোট-আচরণে প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে কোন দল কতটা দক্ষতার সঙ্গে আখ্যান নির্মাণ করতে পারে তার ওপর। শুধুমাত্র ভয়ের রাজনীতি বা শুধুমাত্র আদর্শিক স্লোগান—কোনোটিই একা যথেষ্ট নাও হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কূটনৈতিক সম্পর্ক। ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক গত এক দশকে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকে গভীর হয়েছে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, চোরাচালান রোধ, জলবণ্টন, যোগাযোগ—এসব বিষয়ে দুই দেশের সহযোগিতা রয়েছে। ফলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বক্তব্য কেন্দ্রীয় সরকারের কূটনৈতিক অবস্থানের সঙ্গেও সাযুজ্যপূর্ণ হতে হয়। অতিরিক্ত উত্তেজক ভাষ্য কখনও কখনও পররাষ্ট্রনীতির জটিলতা তৈরি করতে পারে। তাই দলগুলিকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক লাভ ও বৃহত্তর কূটনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।
সব মিলিয়ে সীমান্তবর্তী বাংলাদেশি আসনগুলিতে জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের সাফল্য পশ্চিমবঙ্গে এক বহুমাত্রিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এটি একদিকে নিরাপত্তা ও অনুপ্রবেশের প্রশ্নকে সামনে আনছে, অন্যদিকে ধর্মীয় মেরুকরণ বনাম ধর্মনিরপেক্ষতার বিতর্ককে নতুন করে উসকে দিচ্ছে। বিজেপি চেষ্টা করবে এটিকে কট্টরপন্থার উত্থানের সতর্কবার্তা হিসেবে তুলে ধরতে; তৃণমূল চেষ্টা করবে এটিকে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রেখে বিজেপির মেরুকরণ রাজনীতির সমালোচনা করতে। বিশ্লেষকদের মতে, চূড়ান্ত প্রভাব নির্ভর করবে কোন আখ্যান জনমানসে বেশি গ্রহণযোগ্য হয় তার ওপর।
সীমান্ত মানচিত্রে হলুদের বিস্তার তাই কেবল একটি দেশের নির্বাচনী পরিসংখ্যান নয়; এটি দুই বাংলার রাজনৈতিক কথোপকথনের নতুন উপাদান। ভৌগোলিক সান্নিধ্য এখানে মানসিক দূরত্ব কমিয়ে দেয়, আবার কখনও সন্দেহ ও আশঙ্কাও বাড়ায়। আগামী মাসগুলিতে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রচারে এই ফলাফল কতবার এবং কীভাবে উচ্চারিত হয়, সেটিই নির্ধারণ করবে সীমান্তের ওপারের ভোট এপারের রাজনীতিতে কতটা বাস্তব ছাপ ফেলতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ