
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে যে উত্তাপ তৈরি হয়েছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী (জামায়াত)–এর মধ্যকার ক্রমশ দৃশ্যমান তীব্র লড়াইয়ের আভাস। এই লড়াই শুধু দুই দলের রাজনৈতিক কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতি, আদর্শিক অবস্থান, ভোটব্যাংক পুনর্বিন্যাস এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তার দিকনির্দেশক হয়ে উঠছে। একসময় যাদের সম্পর্ক ছিল কৌশলগত মিত্রতার, আজ তাদের মধ্যকার দূরত্ব, অবিশ্বাস এবং প্রতিযোগিতা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে একটি বড় ছাতার দল হিসেবে উপস্থাপন করে এসেছে—যেখানে জাতীয়তাবাদ, উদার গণতন্ত্রের ভাষ্য এবং সরকারবিরোধী ঐক্যের রাজনীতি মিলেমিশে আছে। অন্যদিকে জামায়াত মূলত আদর্শিকভাবে সংগঠিত, শৃঙ্খলাবদ্ধ ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী। অতীতে এই দুই শক্তির মিলন ঘটেছিল রাজনৈতিক প্রয়োজনের তাগিদে। ক্ষমতার বাইরে থাকা অবস্থায় তারা পরস্পরের দুর্বলতা ঢেকে শক্তি সঞ্চয় করেছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাস্তবতা বদলেছে। এখন আর কেবল ‘সরকারবিরোধিতা’ই একমাত্র বন্ধন হিসেবে যথেষ্ট নয়; বরং প্রশ্ন উঠছে—আগামী দিনের বাংলাদেশ কেমন হবে, আর সেই ভবিষ্যৎ বর্ণনায় নেতৃত্ব দেবে কে?
এই লড়াইয়ের প্রথম স্তরটি দৃশ্যমান হচ্ছে জনভাষ্য ও সাংগঠনিক তৎপরতায়। বিএনপি নিজেদেরকে তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থী ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চায়। তারা বোঝাতে চায় যে, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তারা একটি ‘নরম’ রাজনৈতিক কাঠামোর প্রতিনিধিত্ব করে, যেখানে ধর্ম থাকবে সমাজে, কিন্তু রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে একক আধিপত্য বিস্তার করবে না। জামায়াতের রাজনীতি এখানে একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। জামায়াত তাদের আদর্শিক দৃঢ়তা ও নৈতিক রাজনীতির দাবি দিয়ে মাঠে নামছে, যা একটি অংশের ভোটারের কাছে আকর্ষণীয় হলেও আন্তর্জাতিক ও শহুরে মধ্যবিত্তের মধ্যে সংশয় তৈরি করে।
দ্বিতীয় স্তরের লড়াইটি হচ্ছে ভোটব্যাংকের। গ্রামাঞ্চল, মফস্বল শহর এবং ধর্মপ্রবণ জনগোষ্ঠীর একটি অংশ ঐতিহাসিকভাবে জামায়াতের প্রতি সহানুভূতিশীল। অন্যদিকে বিএনপির শক্তি বিস্তৃত—তরুণ, মধ্যবিত্ত, ব্যবসায়ী শ্রেণি এবং প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি নেটওয়ার্ক তাদের আছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার কারণে বিএনপির এই ভোটব্যাংক কিছুটা ভঙ্গুর হয়েছে। জামায়াত সেই শূন্যস্থান পূরণে তৎপর, বিশেষ করে সামাজিক সেবামূলক কার্যক্রম, ধর্মীয় নেটওয়ার্ক এবং তৃণমূল সংগঠনের মাধ্যমে। ফলে দুই দলের মধ্যে নীরব প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে—কে কাকে ছাড়িয়ে যাবে জনসমর্থনের দৌড়ে।
এই প্রতিযোগিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নেতৃত্বের প্রশ্ন। বিএনপি এখনো মূলত ঐতিহ্যগত নেতৃত্বকেন্দ্রিক দল। সিদ্ধান্ত আসে ওপর থেকে, কাঠামো অপেক্ষাকৃত কেন্দ্রনির্ভর। জামায়াতের কাঠামো তুলনামূলকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়মতান্ত্রিক। এই পার্থক্য রাজনৈতিক সংকটে ভিন্ন ভিন্ন ফল তৈরি করে। আন্দোলন-সংগ্রামের ক্ষেত্রে জামায়াত দ্রুত সংগঠিত হতে পারে, শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারে। বিএনপি সেখানে জনসমাবেশ ও বড় রাজনৈতিক ঢেউ তৈরি করতে পারলেও ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হিমশিম খায়। এই বাস্তবতা দুই পক্ষকেই নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে—কার মডেল বেশি কার্যকর?
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও এই লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বৈশ্বিক রাজনীতিতে এখন গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং স্থিতিশীলতার প্রশ্নগুলো নতুন করে আলোচনায়। বিএনপি এই জায়গায় নিজেদের অবস্থান জোরদার করতে চায়, কারণ তারা জানে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ছাড়া ক্ষমতায় যাওয়ার পথ কঠিন। জামায়াতের ক্ষেত্রে এই জায়গাটি বরাবরই সংবেদনশীল। অতীতের রাজনৈতিক ভূমিকা ও আদর্শিক অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিক মহলে তাদের গ্রহণযোগ্যতা সীমিত। ফলে বিএনপি চাইছে এই পার্থক্যকে সামনে এনে নিজেদের ‘একক বিকল্প’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে। জামায়াত আবার পাল্টা যুক্তি দিচ্ছে—দেশের রাজনীতি বিদেশি স্বীকৃতির ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়; বরং জনগণের নৈতিক ও আদর্শিক সমর্থনই মুখ্য।
রাজপথের রাজনীতিতে এই দ্বন্দ্ব আরও স্পষ্ট। সরকারবিরোধী কর্মসূচিতে একসময় যে সমন্বয় দেখা যেত, এখন সেখানে দূরত্ব লক্ষ করা যায়। একই দাবিতে আলাদা কর্মসূচি, ভিন্ন ভাষ্য এবং আলাদা সাংগঠনিক প্রস্তুতি চোখে পড়ছে। এটি শুধু কৌশলগত পার্থক্য নয়; বরং আস্থার সংকটের বহিঃপ্রকাশ। বিএনপি আশঙ্কা করছে, জামায়াত অতিরিক্ত দৃশ্যমান হলে আন্দোলনের চরিত্র বদলে যেতে পারে এবং তার দায় শেষ পর্যন্ত বিএনপিকেই নিতে হবে। জামায়াত মনে করছে, বিএনপি তাদের ব্যবহার করতে চায়, কিন্তু ন্যায্য রাজনৈতিক স্বীকৃতি দিতে চায় না।
এই লড়াইয়ের সবচেয়ে গভীর স্তরটি আদর্শিক। বাংলাদেশের রাজনীতি কি আরও ধর্মভিত্তিক হবে, নাকি একটি জাতীয়তাবাদী-গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে—এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে এই দ্বন্দ্বের ভেতর দিয়েই। বিএনপি চায় একটি নমনীয় অবস্থান, যেখানে ধর্মীয় অনুভূতিকে সম্মান জানানো হবে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় নীতিতে সেটি চূড়ান্ত নিয়ামক হবে না। জামায়াত চায় ধর্মকে কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক নীতির জায়গায় আনতে। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির সংঘর্ষ অনিবার্য, এবং সেটিই এখন ধীরে ধীরে প্রকাশ পাচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই লড়াই কেবল বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর প্রভাব পড়বে পুরো বিরোধী রাজনীতিতে। ছোট দলগুলোকে বেছে নিতে হবে—কার সঙ্গে যাবে তারা। নাগরিক সমাজ, মিডিয়া এবং সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও বিভক্তি তৈরি হবে। কেউ দেখবে বাস্তববাদী ক্ষমতার রাজনীতি, কেউ দেখবে আদর্শিক দৃঢ়তা। এই বিভাজনই আগামী দিনের রাজনৈতিক সমীকরণ নির্ধারণ করবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বিএনপি-জামায়াতের তীব্র লড়াইয়ের আভাস আসলে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি রূপান্তরপর্বের ইঙ্গিত। এটি কেবল দুই দলের দ্বন্দ্ব নয়; এটি রাষ্ট্রচিন্তা, ক্ষমতার কৌশল এবং আদর্শিক অবস্থানের এক জটিল সংঘর্ষ। এই সংঘর্ষের ফল কী হবে, তা এখনই বলা কঠিন। তবে এটুকু স্পষ্ট—আগামী দিনের রাজনীতি আর আগের মতো সরল মিত্রতা বা সুবিধাবাদী সমঝোতার জায়গায় থাকবে না। এখানে থাকবে কঠিন প্রশ্ন, স্পষ্ট অবস্থান এবং একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার নির্দয় প্রতিযোগিতা।
আপনার মতামত জানানঃ