
গ্রিনল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত পিটুফিক স্পেস ঘাঁটি বহু বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলের একটি নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। শীতল যুদ্ধের সময় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগাম সতর্কীকরণ কেন্দ্র হিসেবে এর ভূমিকা ছিল স্পষ্ট; আজকের ভূরাজনীতিতে সেটি আরও বিস্তৃত ও স্পর্শকাতর। এই ঘাঁটিকে কেন্দ্র করেই নতুন করে উত্তেজনার জন্ম দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলতে গিয়ে তিনি শুধু কূটনৈতিক চাপই নয়, বরং শুল্ক আরোপ ও শক্তি প্রয়োগের হুমকিও উচ্চারণ করেছেন। এই বক্তব্য অনেকের কাছেই নিছক নিরাপত্তা উদ্বেগ নয়; বরং একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতায় পুরোনো সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতার পুনরুত্থান বলে মনে হচ্ছে।
গ্রিনল্যান্ড আনুষ্ঠানিকভাবে ডেনমার্কের অধিভুক্ত হলেও এটি একটি স্বশাসিত অঞ্চল। নিজস্ব সংসদ ও সরকার আছে, স্থানীয় জনগণের মতামত ছাড়া কোনো ভূখণ্ডগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই—এটাই আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতি। কিন্তু ট্রাম্পের বক্তব্যে এই নীতির প্রতি শ্রদ্ধা খুব একটা দেখা যায় না। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, সহজ উপায়ে হোক বা কঠিন উপায়ে, যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ড নেবে। ‘সহজ’ শব্দটি দ্বীপটি কেনার পুরোনো প্রস্তাবকে ইঙ্গিত করলেও ‘কঠিন’ শব্দটি যে সামরিক চাপ বা বলপ্রয়োগের দিকে যায়, তা বুঝতে কূটনীতিক হতে হয় না। এই ভাষা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় একটি বিপজ্জনক নজির তৈরি করে—যেখানে শক্তিশালী রাষ্ট্র তার নিরাপত্তার অজুহাতে দুর্বল বা ছোট অঞ্চলের সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
গ্রিনল্যান্ডের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। উত্তর আমেরিকা ও আর্কটিক অঞ্চলের মাঝামাঝি অবস্থান, সম্ভাব্য নতুন নৌপথ, বিপুল খনিজ সম্পদ এবং ক্ষেপণাস্ত্র নজরদারির সুবিধা—সব মিলিয়ে এটি বড় শক্তিগুলোর আগ্রহের কেন্দ্রে। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে পিটুফিক ঘাঁটিতে একশর বেশি সেনা মোতায়েন রেখেছে এবং ডেনমার্কের সঙ্গে চুক্তির আওতায় প্রয়োজন অনুযায়ী আরও সেনা পাঠাতে পারে। তা সত্ত্বেও ‘মালিকানা’ নেওয়ার দাবি আসলে নিরাপত্তার সীমা ছাড়িয়ে ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে গিয়ে ঠেকে। এখানেই ট্রাম্পের রাজনীতির সাম্রাজ্যবাদী চরিত্রটি স্পষ্ট হয়—যেখানে উপস্থিতি বা প্রভাব যথেষ্ট নয়, চাই সরাসরি কর্তৃত্ব।
এই অবস্থানের বিরোধিতা শুধু ডেনমার্ক বা গ্রিনল্যান্ড থেকেই আসেনি। ইউরোপের একাধিক দেশ—ফ্রান্স, জার্মানি, সুইডেন, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাজ্য—গ্রিনল্যান্ডে সৈন্য পাঠিয়ে যৌথ মহড়ায় অংশ নিচ্ছে। এটি একদিকে আর্কটিক অঞ্চলের যৌথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বার্তা, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে ইঙ্গিত—এই অঞ্চল কোনো একক শক্তির সম্পত্তি নয়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ট্রাম্পের এই অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় দলের কংগ্রেস সদস্যদের গ্রিনল্যান্ড সফর মূলত উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা, শক্তি প্রদর্শনের পাল্টা নয়।
এই পুরো পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন বিষয়টি ন্যাটো–র কাঠামোর মধ্যে দেখা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্ক—দুই দেশই ন্যাটোর সদস্য। ন্যাটোর মূল নীতিই হলো, সদস্যদেশের বিরুদ্ধে আক্রমণ মানে সবার বিরুদ্ধে আক্রমণ। কিন্তু এখানে প্রথমবারের মতো এমন এক পরিস্থিতির আভাস মিলছে, যেখানে এক সদস্য অন্য সদস্যের ভূখণ্ড নিয়ে প্রকাশ্যে হুমকি দিচ্ছে। ডেনমার্ক সতর্ক করে দিয়েছে, গ্রিনল্যান্ডে সামরিক পদক্ষেপ নিলে ন্যাটোর অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। এটি কেবল একটি জোটগত সংকট নয়; বরং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পশ্চিমা নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভিত কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা।
ট্রাম্পের এই আচরণকে আলাদা করে দেখা যায় না তাঁর সাম্প্রতিক বৈশ্বিক নীতির ধারাবাহিকতা থেকে। লাতিন আমেরিকায় তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি দীর্ঘদিন ধরেই ‘ব্যাকইয়ার্ড’ মানসিকতায় ভর করে আছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভেনিজুয়েলা–কে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ সেই পুরোনো সাম্রাজ্যবাদী নীতিরই আধুনিক রূপ। গণতন্ত্র বা মানবাধিকার রক্ষার ভাষা ব্যবহার করে একতরফা নিষেধাজ্ঞা, সামরিক হুমকি ও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ হস্তক্ষেপ—এসবই ওয়াশিংটনের পরিচিত কৌশল। গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্পের বক্তব্য যেন সেই একই মানসিকতার উত্তর মেরুর সংস্করণ, যেখানে ভূগোল বদলালেও ক্ষমতার ভাষা অপরিবর্তিত।
ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রে যেমন তেল ও আঞ্চলিক প্রভাব ছিল মূল চালিকাশক্তি, গ্রিনল্যান্ডের ক্ষেত্রে তেমনি খনিজ সম্পদ, আর্কটিক নৌপথ এবং চীন-রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত প্রতিযোগিতা। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই একটি মিল স্পষ্ট—স্থানীয় জনগণের ইচ্ছা গৌণ, আর বড় শক্তির নিরাপত্তা ও স্বার্থ মুখ্য। এই দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিক আইন ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের মৌলিক ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একবিংশ শতাব্দীতে এসে এমন মনোভাব কেবল নৈতিক প্রশ্নই তোলে না, বরং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
গ্রিনল্যান্ডের জনগণ সংখ্যায় কম হলেও তাদের রাজনৈতিক সচেতনতা ও স্বার্থবোধ কম নয়। তারা বহু বছর ধরেই স্বায়ত্তশাসন জোরদার করার পথে হাঁটছে, ভবিষ্যতে পূর্ণ স্বাধীনতার প্রশ্নও আলোচনায় আছে। সেই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের ‘মালিকানা’ নেওয়ার কথা তাদের জন্য শুধু অসম্মানজনকই নয়, ভয়াবহও। কারণ এতে তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার কার্যত বড় শক্তির দরকষাকষির বস্তুতে পরিণত হয়।
ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের হুমকি এই চাপকে আরও প্রকাশ্য করে তোলে। কূটনৈতিক মতপার্থক্য মেটানোর বদলে অর্থনৈতিক শাস্তির ভাষা ব্যবহার আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে এক ধরনের বাণিজ্যিক ব্ল্যাকমেইলের দিকে ঠেলে দেয়। কোন আইনি ক্ষমতায়, কোন দেশের ওপর এই শুল্ক আরোপ করা হবে—তা তিনি স্পষ্ট করেননি। এই অস্পষ্টতাই তাঁর রাজনীতির বৈশিষ্ট্য: অনিশ্চয়তা তৈরি করে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা। কিন্তু রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এই কৌশল বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অনাকাঙ্ক্ষিত ধাক্কা দিতে পারে।
সব মিলিয়ে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্পের অবস্থান একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনে দেয়—আধুনিক বিশ্ব কি আবার প্রভাববলয়ের রাজনীতিতে ফিরে যাচ্ছে? শক্তিধর রাষ্ট্র কি আবার প্রকাশ্যে ভূখণ্ড দখল বা নিয়ন্ত্রণের ভাষা ব্যবহার করতে পারে? ভেনিজুয়েলা থেকে গ্রিনল্যান্ড—দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এই আচরণ ইঙ্গিত দেয়, অন্তত ট্রাম্পের দৃষ্টিতে শক্তিই শেষ কথা। কিন্তু ইতিহাস দেখিয়েছে, এমন সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষা শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধই ডেকে আনে—চাই তা লাতিন আমেরিকার রাজপথে হোক বা আর্কটিকের বরফে ঢাকা প্রান্তরে।
গ্রিনল্যান্ডের বরফের নিচে শুধু খনিজ নয়, লুকিয়ে আছে এক বড় ভূরাজনৈতিক পরীক্ষাও। এই পরীক্ষায় বিশ্ব দেখছে—আন্তর্জাতিক আইন, জোটগত সংহতি ও ছোট জাতির অধিকার আদৌ বড় শক্তির নিরাপত্তা বয়ানের সামনে টিকে থাকতে পারে কি না। ট্রাম্পের বক্তব্য সেই পরীক্ষাকে আরও কঠিন করে তুলেছে। এখন প্রশ্ন একটাই: একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব কি এই সাম্রাজ্যবাদী ভাষাকে মেনে নেবে, নাকি সম্মিলিতভাবে এর বিরুদ্ধে দাঁড়াবে? সময়ই এর উত্তর দেবে, কিন্তু গ্রিনল্যান্ড ইতিমধ্যেই সেই উত্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
আপনার মতামত জানানঃ