খালেদা জিয়ার জানাজা পরিণত হয়েছিল কেবল একটি রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানে নয়, বরং বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গভীর প্রতীকী মুহূর্তে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, কূটনীতিক, বিদেশি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের উপস্থিতি দেখিয়ে দেয়—খালেদা জিয়া শুধু একটি দলের নেত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি সময়, একটি ধারার প্রতিনিধি। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে তাঁর রাজনৈতিক পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা যে বিস্তৃত ছিল, জানাজার এই বহুমাত্রিক উপস্থিতি তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই শোকাবহ মুহূর্তের আড়ালেই বিএনপির জন্য শুরু হয়ে গেছে এক নতুন, কঠিন অধ্যায়—খালেদা-পরবর্তী রাজনীতির বাস্তবতা।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের তারিখ নির্ধারিত হয়েছে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। এই নির্বাচন এমন এক সময় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন দেশের রাজনৈতিক মানচিত্র নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতন, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া এবং অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজন—সব মিলিয়ে এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী সন্ধিক্ষণ। ঠিক এই মুহূর্তে বিএনপি মাঠে নামছে এমন এক শূন্যতা নিয়ে, যেখানে তাদের দীর্ঘদিনের ঐক্যের প্রতীক খালেদা জিয়া আর নেই। তাঁর মৃত্যু দলটিকে কার্যত খালেদা-পরবর্তী যুগে ঠেলে দিয়েছে, যেখানে নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব এবং রাজনৈতিক দায়ভার কেন্দ্রীভূত হয়েছে তাঁর ছেলে ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে খালেদা জিয়া শুধু আনুষ্ঠানিক নেত্রী হিসেবেই নয়, বরং দলের ভেতরে এক নীরব কিন্তু কার্যকর অভিভাবকের ভূমিকা পালন করে এসেছেন। এমনকি যখন তিনি অসুস্থতা ও কারাবরণের কারণে সক্রিয় রাজনীতির বাইরে ছিলেন, তখনও দলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে তাঁর ছায়া উপস্থিত ছিল। এই প্রতীকী কর্তৃত্ব বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল দমন করেছে, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এড়াতে সাহায্য করেছে এবং তৃণমূল থেকে শীর্ষ নেতৃত্ব পর্যন্ত একটি ভারসাম্য বজায় রেখেছে। তাঁর অনুপস্থিতিতে সেই ভারসাম্যের জায়গাটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তারেক রহমানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন আল জাজিরাকে দেওয়া বক্তব্যে খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের এক ঐক্যবদ্ধ প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর ভাষায়, বিএনপি যদি নির্বাচিত হয়, তাহলে নীতি ও সুশাসনের অগ্রাধিকারের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকারকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার রাজনীতির মূল বৈশিষ্ট্য ছিল শক্তিশালী সংসদীয় গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে যে প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, বিএনপি সেগুলো পুনরুদ্ধার করতে চায় বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তারেক রহমানের নেতৃত্বে প্রণীত ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচিকে তিনি ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার রূপরেখা হিসেবে তুলে ধরেন।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে বিষয়টি এতটা সরল নয়। লেখক ও বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমেদের মতে, খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত ক্যারিশমা বিএনপিকে দীর্ঘদিন চাঙ্গা ও ঐক্যবদ্ধ রেখেছে। তাঁর অনুপস্থিতিতে সেই ছন্দে স্বাভাবিকভাবেই ব্যাঘাত ঘটবে। এখন তারেক রহমানকে কেবল উত্তরাধিকারসূত্রে নয়, একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিজের নেতৃত্ব প্রমাণ করতে হবে। তাঁর নেতৃত্ব এখনো পুরোপুরি পরীক্ষিত নয়—এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
এই চ্যালেঞ্জ আরও জটিল হয়ে উঠেছে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায়। তিন দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের নির্বাচন মানেই ছিল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দ্বিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ১৯৯০ সালে সামরিক শাসনের পতনের পর থেকে এই ধারা শক্তিশালী হয় এবং ৯০ ও ২০০০-এর দশকে তা প্রায় একচেটিয়া রূপ নেয়। কিন্তু ইউনূস সরকারের অধীনে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার ফলে সেই পরিচিত দ্বিদলীয় কাঠামো ভেঙে পড়েছে। বিএনপিকে এখন অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক রাজনৈতিক মাঠে নামতে হচ্ছে, যেখানে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন একটি শক্তিশালী জোট সক্রিয়। এই জোটে যুক্ত হয়েছে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
এই নতুন মেরুকরণ বিএনপির জন্য সহজ হবে না বলেই মনে করেন মহিউদ্দিন আহমেদ। তাঁর মতে, জুলাই-পরবর্তী রাজনীতি পুরো সমীকরণ বদলে দিয়েছে। দুই দলের একচেটিয়া আধিপত্য আর অবশিষ্ট নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নির্বাচন নিয়ে নানা অনিশ্চয়তা—সময়মতো ভোট হবে কি না, নির্বাচন কতটা শান্তিপূর্ণ হবে, বড় দলগুলো জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারবে কি না—এসব প্রশ্ন এখনো খোলা রয়ে গেছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী মনে করেন, খালেদা জিয়া কেবল বিএনপির জন্য নয়, গোটা দেশের জন্যই একজন অভিভাবকসুলভ ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক জ্যেষ্ঠ ও স্থিতিশীল উপস্থিতির অবসান ঘটিয়েছে। তবে তিনি এটিও মনে করেন, ২০০৮ সাল থেকে যুক্তরাজ্যে নির্বাসনে থাকা তারেক রহমানের ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরা দলের ভেতরের বিভক্তির আশঙ্কা অনেকটাই কমিয়েছে। সাম্প্রতিক ভাষণগুলোতে জাতীয়তাবাদী শক্তির পুনর্নিশ্চয়তা, স্বৈরতন্ত্র প্রত্যাখ্যান এবং ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা—এসব বার্তা বিএনপির সমর্থকদের আদর্শিক ধারাবাহিকতা সম্পর্কে আশ্বস্ত করেছে। তাঁর মতে, বিএনপি ও আওয়ামী লীগ—দুটিই ব্যক্তিকেন্দ্রিক দল, এবং খালেদা জিয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই তারেক রহমান সেই কেন্দ্রস্থলে উঠে এসেছেন।
তবে উত্তরাধিকারই যে সব সমস্যার সমাধান—এমন ভাবনায় বিএনপি নেতারাও নেই। দলের ভেতরে শৃঙ্খলা রক্ষা, কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে দ্বিমত—এসব চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। মাহদী আমিন এসব অভিযোগকে ‘অতিরঞ্জিত’ বলে অভিহিত করলেও স্বীকার করেন, কঠোর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এগুলো সামাল দেওয়া কঠিন। তৃণমূল পর্যায়ের নেতারাও বাস্তবতা স্বীকার করছেন—সমস্যা থাকবে, কিন্তু নেতৃত্বের দক্ষতার ওপরই নির্ভর করবে তা কতটা সামাল দেওয়া যায়।
দলের সিনিয়র নেতৃত্ব অবশ্য তারেক রহমানের বিষয়ে আস্থাশীল। স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্পষ্ট করে বলেছেন, তারেক রহমানের নেতৃত্ব ইতিমধ্যেই প্রমাণিত। তাঁর মতে, দল পরিচালনা ও আন্দোলন সংগঠনে তারেক রহমান কার্যকর সক্ষমতা দেখিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এখন মূল পরীক্ষা হবে—নির্বাচনের প্রস্তুতির সময়ে দলকে শৃঙ্খলাবদ্ধ রাখা, সংস্কার পরিকল্পনাকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরা এবং একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী পরিবেশে অবদান রাখা।
রাজনীতির এই জটিল সমীকরণের বাইরে রয়েছে মানুষের আবেগ। অনেক সমর্থকের কাছে বিএনপি কেবল একটি দল নয়, একটি পারিবারিক উত্তরাধিকার, একটি ব্যক্তিগত স্মৃতি। কিশোরগঞ্জের ৫৭ বছর বয়সী দুলাল মিয়ার গল্প সেই আবেগেরই প্রতিফলন। ১৯৭৯ সালে ছাত্রাবস্থায় জিয়াউর রহমানের সঙ্গে হাত মেলানোর স্মৃতি আজও তাঁকে বিএনপির সঙ্গে বেঁধে রেখেছে। তাঁর চোখে জিয়াউর রহমানের উন্নয়ন ও সাধারণ মানুষের কাছাকাছি থাকার রাজনীতি, খালেদা জিয়ার আজীবন লালন করা সেই ধারাই বিএনপির মূল শক্তি। দুলাল মিয়ার বিশ্বাস, তারেক রহমান যদি এই উত্তরাধিকার বহন করতে ব্যর্থ হন, মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেবে; আর যদি পারেন, তাহলে বিএনপি আবারও জনগণের দল হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হবে।
সব মিলিয়ে খালেদা জিয়ার মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তির বিদায় নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক যুগের অবসান। তাঁর অনুপস্থিতিতে বিএনপি এখন দাঁড়িয়ে আছে এক কঠিন পরীক্ষার মুখে—যেখানে উত্তরাধিকার, নেতৃত্ব, জনমত ও পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা একসঙ্গে মিলে দলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। এই পরীক্ষায় তারেক রহমান কতটা সফল হবেন, তা নির্ভর করবে শুধু নির্বাচনের ফলের ওপর নয়, বরং তিনি খালেদা জিয়ার রেখে যাওয়া ঐক্য, গণতন্ত্র ও জনগণের রাজনীতিকে কতটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে এগিয়ে নিতে পারেন—তার ওপরই।
আপনার মতামত জানানঃ