আন্টার্কটিকা বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে অন্তহীন সাদা প্রান্তর, তুষারঝড়, হিমবাহ আর পেঙ্গুইনের সারি। পৃথিবীর একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত এই মহাদেশকে আমরা চিনি বরফের রাজ্য হিসেবে, যেখানে মানুষের স্থায়ী বসতি নেই, জীবন টিকে থাকে কেবল চরম প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে। কিন্তু সাম্প্রতিক এক বৈজ্ঞানিক গবেষণা যেন এই পরিচিত ছবিটিকেই ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। বরফের প্রায় দুই কিলোমিটার গভীরে সন্ধান মিলেছে এক হারিয়ে যাওয়া অরণ্যের—যার বয়স প্রায় সাড়ে তিন কোটি বছর। এই আবিষ্কার শুধু আন্টার্কটিকার অতীত নয়, গোটা পৃথিবীর জলবায়ু ইতিহাসকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
আজ যে আন্টার্কটিকাকে আমরা দেখি, তা আদিকাল থেকেই এমন ছিল না। কোটি কোটি বছর আগে এই মহাদেশ ছিল সবুজে ঘেরা, উর্বর, নদী আর গভীর বনভূমিতে পরিপূর্ণ। তখন এখানকার আবহাওয়া ছিল তুলনামূলক উষ্ণ, আর্দ্র, জীবনধারণের জন্য উপযোগী। বিশাল বৃক্ষ, ঘন অরণ্য, নানা ধরনের উদ্ভিদ আর অণুজীবের অস্তিত্ব ছিল এখানে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর ভূ-গঠনে যে বিপুল পরিবর্তন এসেছে, তার ফলেই আজকের বরফে ঢাকা আন্টার্কটিকার জন্ম। কিন্তু সেই প্রাচীন সবুজ পৃথিবীর স্মৃতি এত দিন ছিল কেবল তত্ত্ব আর অনুমানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এবার প্রথমবারের মতো তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ উঠে এল বরফের নীচ থেকে।
এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন ব্রিটেনের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টুয়ার্ট জেমিসন। মূলত আন্টার্কটিকার বরফের স্তরে কীভাবে দীর্ঘ সময় ধরে পরিবর্তন এসেছে, সেটাই ছিল তাঁদের গবেষণার লক্ষ্য। সেই সূত্র ধরেই তাঁরা পূর্ব আন্টার্কটিকার উইলকিস ল্যান্ড এলাকায় বরফের আস্তরণে ড্রিল করে গর্ত খুঁড়তে শুরু করেন। অত্যন্ত ধৈর্য আর সতর্কতার সঙ্গে ড্রিল মেশিন ব্যবহার করে একের পর এক স্তর ভেদ করা হচ্ছিল। প্রায় দুই কিলোমিটার গভীরে পৌঁছনোর পর যা তাঁরা আবিষ্কার করেন, তা গবেষকদেরও বিস্মিত করে দেয়।
বরফের নীচে জমে থাকা পলির নমুনায় মিলতে থাকে উদ্ভিদের জীবাশ্ম। পরাগরেণু, গাছের পাতার ক্ষুদ্র টুকরো, এমনকি বহু বছর আগে মৃত অণুজীবের চিহ্নও পাওয়া যায়। এই নমুনাগুলি পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন, এগুলির বয়স প্রায় ৩ কোটি ৪০ লক্ষ বছর। অর্থাৎ, আজ থেকে সাড়ে তিন কোটি বছর আগে আন্টার্কটিকার এই অঞ্চল ছিল একেবারেই ভিন্ন রূপের—বরফে ঢাকা নয়, বরং গভীর অরণ্যে আচ্ছাদিত।
এই আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের কাছে এক ধরনের ‘টাইম ক্যাপসুল’-এর মতো। বরফের স্তর যেন সময়কে আটকে রেখেছিল, লুকিয়ে রেখেছিল এমন এক পৃথিবীকে, যা মানবসভ্যতার কল্পনারও বাইরে। জেমিসনের ভাষায়, এটি এমন এক সময়ের গল্প বলে, যখন আন্টার্কটিকা আজকের মতো নিষ্ঠুর শীতল প্রান্তর ছিল না। বরং এখানে ছিল প্রাণের উচ্ছ্বাস, সবুজের আধিপত্য, নদী আর বনভূমির সহাবস্থান।
গবেষকেরা মনে করছেন, এই অরণ্য কোনও বিচ্ছিন্ন বা ছোট আকারের বনভূমি ছিল না। উদ্ভিদের যে ধরনের জীবাশ্ম মিলেছে, তা ইঙ্গিত দেয় যে গোটা অঞ্চলজুড়েই ছিল ঘন বন। বড় বড় বৃক্ষ, দীর্ঘদিন টিকে থাকা উদ্ভিদ আর একটি স্থিতিশীল বাস্তুতন্ত্রের অস্তিত্বের প্রমাণ মিলেছে এই নমুনায়। আজ যেখানে পেঙ্গুইনেরা বরফের উপর গুটি গুটি পায়ে হাঁটে, সেই জায়গাগুলো এক সময় ছায়াঘেরা অরণ্যে ঢাকা ছিল—এই ধারণাই রীতিমতো রোমাঞ্চকর।
বরফের নীচে লুকিয়ে থাকা এই অরণ্যের খোঁজ পাওয়ার পর গবেষণা আরও বিস্তৃত করেন বিজ্ঞানীরা। তাঁরা কানাডার কৃত্রিম উপগ্রহ ব্যবস্থা ‘র্যাডারস্যাট’-এর সাহায্য নেন। এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বরফের স্তরের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়। সেই বিশ্লেষণে বরফের নীচে নদী-উপত্যকার মতো গঠন চোখে পড়ে। বিজ্ঞানীদের অনুমান, কোটি কোটি বছর আগে আন্টার্কটিকায় নদী প্রবাহিত হত। সেই নদীর তীরেই গড়ে উঠেছিল এই বনভূমি, যা দীর্ঘ সময় ধরে একটি সমৃদ্ধ পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল।
এই গবেষণা আমাদের পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের দিকেও নতুন আলো ফেলে। যে সময়ে এই বনভূমি গড়ে উঠেছিল, তখন আন্টার্কটিকা আজকের মতো স্বতন্ত্র মহাদেশ ছিল না। তখন এটি ছিল ‘সুপার কন্টিনেন্ট’ গন্ডোয়ানার অংশ। আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া—সব একসঙ্গে যুক্ত ছিল এই বিশাল ভূখণ্ডে। জুরাসিক যুগে, প্রায় ১৮ কোটি বছর আগে, গন্ডোয়ানা ধীরে ধীরে ভাঙতে শুরু করে। সেই ভাঙনের ফলেই আজকের পরিচিত মহাদেশগুলোর জন্ম হয়। কিন্তু তার আগে এবং এমনকি ভাঙনের পরও দীর্ঘ সময় ধরে আন্টার্কটিকায় নদী, জঙ্গল আর উষ্ণ আবহাওয়ার অস্তিত্ব ছিল।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর কক্ষপথের পরিবর্তন, সমুদ্রস্রোতের রূপান্তর এবং বায়ুমণ্ডলের গঠনে পরিবর্তনের ফলে আন্টার্কটিকার আবহাওয়া ধীরে ধীরে শীতল হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত তৈরি হয় বিশাল বরফের চাদর, যা ধীরে ধীরে ঢেকে ফেলে সেই প্রাচীন বনভূমিকে। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে জমতে থাকা বরফ এক সময় সেই অরণ্যকে সম্পূর্ণভাবে চাপা দেয়, কিন্তু মুছে ফেলতে পারে না তার অস্তিত্বের সব চিহ্ন। সেই চিহ্নই আজ বিজ্ঞানীদের হাতে উঠে এসেছে।
এই আবিষ্কারের গুরুত্ব শুধু অতীত জানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, আন্টার্কটিকার বরফের নীচে লুকিয়ে থাকা এই ইতিহাস ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোটি কোটি বছর ধরে বরফের স্তর কীভাবে গঠিত হয়েছে, কীভাবে তা পরিবর্তিত হয়েছে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর লুকিয়ে আছে এই অরণ্যের গল্পে। বিশেষ করে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এই গবেষণার তাৎপর্য আরও বেড়ে যায়।
আজকের পৃথিবী যখন দ্রুত উষ্ণায়নের দিকে এগোচ্ছে, তখন আন্টার্কটিকার বরফ গলার আশঙ্কা নতুন করে মাথাচাড়া দিচ্ছে। অতীতে যখন পৃথিবী উষ্ণ ছিল, তখন আন্টার্কটিকার চেহারা কেমন ছিল—এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের ভবিষ্যৎ অনুমান করতে সাহায্য করতে পারে। বরফের নীচে চাপা পড়া বনভূমি দেখিয়ে দেয়, পৃথিবীর জলবায়ু কতটা নাটকীয়ভাবে বদলাতে পারে। এটি একদিকে সতর্কবার্তা, অন্যদিকে গবেষণার জন্য অমূল্য তথ্যভান্ডার।
এই আবিষ্কার মানবসভ্যতার ভাবনাকেও নাড়া দেয়। আমরা প্রায়ই ভাবি, পৃথিবীর বর্তমান চেহারাই চিরস্থায়ী। কিন্তু আন্টার্কটিকার এই হারিয়ে যাওয়া অরণ্য মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবী এক চিরপরিবর্তনশীল গ্রহ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মহাদেশের অবস্থান বদলায়, জলবায়ু পাল্টায়, জীবনরূপের উত্থান-পতন ঘটে। আজ যে বরফের রাজ্য, কাল সে-ই ছিল সবুজের সাম্রাজ্য—এই সত্য আমাদের বিনয়ী হতে শেখায়।
সব মিলিয়ে আন্টার্কটিকার বরফের দুই কিলোমিটার গভীরে পাওয়া এই অরণ্য শুধু একটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার নয়, এটি পৃথিবীর দীর্ঘ স্মৃতির এক উন্মোচিত অধ্যায়। বরফের নীচে লুকিয়ে থাকা সেই সবুজ পৃথিবীর গল্প আমাদের জানায়, আমরা যে গ্রহে বাস করি, তার অতীত কতটা বিস্ময়কর এবং ভবিষ্যৎ কতটা অনিশ্চিত। এই গল্প হয়তো আগামী দিনে আরও গভীর গবেষণার পথ খুলে দেবে, আর একই সঙ্গে আমাদের মনে করিয়ে দেবে—প্রকৃতির ইতিহাসের কাছে মানুষ কতটা ক্ষুদ্র।
আপনার মতামত জানানঃ