Trial Run

যদি বইতো পরিবর্তনের হাওয়া

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : নর-নারীর সম্পর্কের ব্যাপারটা একেবারেই প্রাথমিক। পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা নারীকে অধস্তন করে রাখে। আমরা জানি বিদ্যাসাগরের চোখে বড় দু’টি সমস্যা ছিল বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ। তার জন্মের পরে দু’শ বছর তো পার হতে চলল কিন্তু এখনো বাল্যবিবাহের সমস্যাটা বাংলাদেশে ভয়াবহ মাত্রায় বিদ্যমান। বহুবিবাহও আছে, তবে ওই পথে যাওয়ার তেমন প্রয়োজন পড়ে না, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের প্রচলন রয়েছে, আর ধর্ষণ তো মোটেই অসম্ভব নয়। এই যে করোনার আক্রমণ, এই সময়ে বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। মূল কারণ মেয়েদের নিরাপত্তাহীনতা। এ বছর কোরবানির সময়ে পশুর হাট তেমন না জমলেও বাল্যবিবাহের সামাজিক হাটে ভালো কেনাবেচা চলছে। বাজার ক্রেতারই, বিক্রেতার নয়।

ওদিকে বিবাহের ভেতর কেমন ভয়ংকর সব ঘটনা ঘটছে তার কিছু কিছু নিদর্শন সংবাদপত্রে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পাওয়া যাচ্ছে। যেমন ১৪ সেপ্টেম্বরের সব পত্রিকাতেই আছে, এই খবরটি। একটি পত্রিকায় তার শিরোনাম : ‘পারিবারিক কলহ থেকে উন্মত্ততা, তিন জনকে খুন।’ ভেতরের বিবরণ এরকমের। নরসিংদীর শিবপুর উপজেলায় একটি দোচালা টিনের ঘরের দু’টি কক্ষে দুই বছর ধরে ভাড়া থাকেন কাঠমিস্ত্রী বাদল মিয়া (৫০) ও নাজমা বেগম (৪০) দম্পতি। মুখোমুখি আরেকটি টিনশেডে থাকেন বাড়িওয়ালা নিজে। ১১ সেপ্টেম্বর সকালে পারিবারিক কলহের এক পর্যায়ে উন্মত্ত বাদল মিয়া তার স্ত্রী নাজমা এবং বাড়িওয়ালা তাইজুল ইসলাম (৭০) ও বাড়িওয়ালার স্ত্রী মনোয়ারা বেগমকে (৬০) হত্যা করে। বাদলের ছুরির আঘাতে নিহত বাড়িওয়ালা দম্পতির মেয়ে কুলসুম বেগম (২৬) ও নিহত নাজমার ছেলে সোহাগ (১৫) আহত হয়েছে। জানা গেছে নয় বছর আগে বাদল ও নাজমা বিয়ে করেন। দুজনেরই এটি দ্বিতীয় বিয়ে। আগের সংসারে দুজনেরই তিনটি করে সন্তান রয়েছে। এই দম্পতির কোনো সন্তান নেই। নাজমার আগের সংসারের তিন সন্তান বাদল-নাজমা দম্পতির সঙ্গেই থাকত। বাদলের বাড়ি কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার জাঙ্গালিয়া এলাকায়। বাদলের প্রথম স্ত্রী সেখানে বাস করেন। এক মাস আগে কাউকে কিছু না জানিয়ে বাদল মিয়া হঠাৎ উধাও হয়ে যান। ১৫ দিন আগে খবর পেয়ে নাজমা কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় তার সাবেক স্ত্রীর বাড়ি থেকে বাদল মিয়াকে ধরে নিয়ে আসেন। এর আগেও বাদল মিয়া একবার সেখানে চলে গিয়েছিলেন। এসব নিয়ে দুজনের মধ্যে ঝগড়াঝাটি চলছিল। ধারণা করা হচ্ছে যে, এর জেরেই নাজমার সঙ্গে বাদলের কথাকাটাকাটি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে ধারালো ছুরি দিয়ে নাজমাকে কুপিয়ে মারেন এবং সেই সময়ে যে-ই এগিয়ে এসেছেন, বাদল তাকেই এলোপাতাড়ি কোপান। (প্রথম আলো, ১২-০৯-২০)

মানুষের নিরাপত্তা আগেও কম ছিল, এখন আরও কমেছে। কারণ দেশের মানুষ তো মুক্তি পায়নি, মুক্তি পেয়েছে পুঁজিবাদ।

এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, ব্যতিক্রমীও নয়। অহরহ ঘটছে। পরিবার এখন আর আগের মতো নেই। মূল কারণ মোটেই নৈতিক নয়, পুরোপুরি অর্থনৈতিক। নরসিংদীর শিবপুরে একাত্তরে প্রবল মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। নয় মাস সেখানে হানাদার বাহিনী ঢুকতে পারেনি। মুজিব বাহিনীও নয়। এলাকাটি শত্রুমুক্ত ছিল। হানাদাররা চেষ্টা করেছে এবং প্রতিহত হয়েছে। সেই এলাকাতেই এখন এই ঘটনা। আমরা স্বাধীন হয়েছি সে তো পঞ্চাশ বছর হতে চলল। অনেক উন্নতি যে হয়েছে অস্বীকার করবে কোন মিথ্যাবাদী। কিন্তু বাদল মিয়া তার দুই স্ত্রী এবং দুই পক্ষের ছয় সন্তানরা কোন অবস্থায় ছিল ও এখন আছে? কোন নিরাপত্তায় রয়েছে টিনের ঘরের মালিক ও তার স্ত্রী? পুঁজিবাদী উন্নতির চাপে পারিবারিক জীবন এই দশাতেই এসে পৌঁছেছে। উনিশ শ’ একাত্তরে যে বাঁচার লড়াইয়ে এদেশের মানুষেরা জিতেছিল, এখন দু’ হাজার বিশে এসে সেই মানুষেরা ওই বাঁচার যুদ্ধই করছে। স্পষ্ট বোঝা যায় যুদ্ধটা শেষ হয়নি। পুরনো ব্যবস্থাটা রয়ে গেছে এবং আগের চেয়েও খারাপ হয়েছে। ধনীরা ধনী হয়েছে, গরিবরা আরও গরিব।

পুরনো ব্যবস্থাটার গায়ে ছাপ পড়েছে আধুনিকতার এবং অগ্রগতির চাপে ধাপে ধাপে ভেতরকার মানবিক সম্পর্কগুলো নাজুক হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও একেবারে ভেঙেই গেছে। যেমন ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপারে খবর রাখে এরকমের একটি দৈনিকের ক্লান্তকণ্ঠ শিরোনাম বলছে, ‘যৌথ পরিবারের অনৈক্যে ধুঁকছে পারিবারিক ব্যবসা।’ খবরটা এই রকমের যে এক যুগ আগেও চট্টগ্রামের ব্যবসা-বাণিজ্যের নেতৃত্বটা ছিল কয়েকটি পারিবারিক ব্যবসায়িক গ্রুপের হাতে। প্রতিষ্ঠাতা-উদ্যোক্তারা শ্রম, মেধা, সময় দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু এখন তাদের আর আগের অবস্থা নেই। নতুন প্রতিযোগীদের আগমন, পরিবারের সদস্যদের মত-পথের ভিন্নতা, সম্পত্তিগত অনৈক্য ইত্যাদি কারণে পারিবারিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এখন রুগ্ণদশা। (বণিক বার্তা, ১৪-০৯-২০) ঘটনা ওই একই, পুরাতন ঈশ্বর ছিলেন কিছুটা সামন্তবাদী, তিনি বিদায় নিয়েছেন; নতুন ঈশ্বর এসেছেন, তিনি পুরোপুরি পুঁজিবাদী। আগের জনের তুলনায় ইনি অধিকতর বস্তুতান্ত্রিক, মুনাফা ছাড়া আর কিছুই চেনেন না, তার আরাধনা মুনাফা লাভের মধ্য দিয়ে ঘটে, এবং তিনি তাদের ওপরই সন্তুষ্ট যারা মুনাফা করছে। যত অধিক মুনাফালাভ তত অধিক ঈশ্বরসন্তুষ্টি।

হেফাজতে ইসলামের ঘটনাটাও লক্ষ করবার মতো। হেফাজতে ইসলাম তো দায়িত্ব নিয়েছে বাংলাদেশে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠা না করে ছাড়বে না। ২০১৩ সালে গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মাদ্রাসা ছাত্রকে ঢাকায় নিয়ে এসে তারা শক্তি প্রদর্শন করেছে। করোনাকালে কিন্তু দেখা গেল শক্তিমানরা দু’ভাগ হয়ে গেছে। মহাপরিচালক আহমদ শফী একদিকে, মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরী বিপরীত দিকে। বিরোধটা কি মতাদর্শিক? সেটা কেমন করে হবে, তারা তো একই আদর্শের। বিরোধটা বস্তুগত স্বার্থের। বিরোধ চরম আকার ধারণ করছিল। আহমদ শফী অসুস্থ ছিলেন। তিনি পরলোক গমন করেছেন। যাওয়ার আগে টের পেয়ে গেছেন স্বার্থের কাছে অন্য সব আদর্শ কত অসহায়।

মানুষের নিরাপত্তা আগেও কম ছিল, এখন আরও কমেছে। কারণ দেশের মানুষ তো মুক্তি পায়নি, মুক্তি পেয়েছে পুঁজিবাদ। এ দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জনমানুষের নিরাপত্তার জন্য তৈরি করা হয়নি, জনমানুষের তারা নিরাপত্তার বোধ দেয় এমন প্রশংসা কারও পক্ষেই করা সম্ভব নয়, সরকারের খাস বান্দা ছাড়া। সাধারণ মানুষ হরদম গুম হচ্ছে, মারা পড়ছে ক্রসফায়ারে, প্রাণ হারাচ্ছে পুলিশি হেফাজতে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য তারা এসব খবর জানে না। পুলিশের বড় কর্তারা বলেন ক্রসফায়ার বলে কিছু নেই, ওসব এনজিওদের আবিষ্কার।

২০১৭ সাল থেকে আজ পর্যন্ত হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে ১,৪২৬ জনের।  অথচ হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইনে গত সাত বছরে মামলা হয়েছে মাত্র ১৮টি, তার মধ্যে ১৪টিই খারিজ হয়ে গেছে।

সাত বছর আগে পাস হয়েছে হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন। কোনো দৈব টানে হয়নি নিশ্চয়ই, হয়েছে হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনার সংখ্যা এত অধিক ছিল যে ঢেকে রাখা আর সম্ভব হচ্ছিল না বলেই। আচ্ছাদন খাটো হয়ে পড়েছিল আচ্ছাদিতের বিশাল তুলনায়। স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো নানা রকমের আওয়াজ তুলছিল। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের অনুসন্ধান অনুযায়ী ২০১৭ সাল থেকে আজ পর্যন্ত হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে ১,৪২৬ জনের। (ঢাকা ট্রিবিউন, ১০-০৯-২০)। অথচ হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইনে গত সাত বছরে মামলা হয়েছে মাত্র ১৮টি, তার মধ্যে ১৪টিই খারিজ হয়ে গেছে। খারিজ হওয়ার কারণ সাক্ষী পাওয়া যায়নি। পুলিশের বিরুদ্ধে সাক্ষী? অত প্রশস্ত কার বুকের পাটা? থানায় গিয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করতে যে সাহস তা-ইবা কয় জনেরই আছে? আবার থানায় গেলেই যে মামলা নেবে এমন কথাই বা কে বলল? ক্ষমা ঘেন্না করে মামলা যদি-বা নেয়ও তবে বাদী তো বটেই সাক্ষীদের বিরুদ্ধেও পুলিশের যে তৎপরতা শুরু হবে তা থেকে রক্ষা করবে ইহজাগতিক কোন শক্তি? তবে শেষ পর্যন্ত একটি মামলার রায় পাওয়া গেছে, সেপ্টেম্বরের ১০ তারিখে। রায়ে শাস্তিও দেওয়া হয়েছে। যাবজ্জীবন জেল হয়েছে তিনজন পুলিশের, সঙ্গে জরিমানাও। ৭ বছর করে জেল হয়েছে পুলিশের দুই সোর্সের; তাদের জরিমানাও দিতে হবে। বিচারক বলেছেন যাবজ্জীবন কারাদন্ডই এই আইনে সর্বোচ্চ সাজা; তিনি সেটাই দিয়েছেন। সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে দুজন, একজন পুলিশ অন্যজন পুলিশের সোর্স, পলাতক আছে। এই রায়কে বলা হচ্ছে ঐতিহাসিক। কেউ কেউ বলছেন যুগান্তকারী। যে নামেই ডাকুন অপ্রত্যাশিত তো বটেই। আসলে যে রায় পাওয়া গেছে সেটাই কিন্তু পাওয়ার কথা। অপরাধীদের সাজা ঘোষিত হয়েছে আইনসম্মত ভাবেই।

অপরাধের ঘটনাটি ঘটে ২০১৪ সালে। ঢাকার পল্লবী এলাকাতে একটি গায়েহলুদের অনুষ্ঠান চলছিল। অনুষ্ঠানের সুযোগ নিয়ে সুমন নামে এক যুবক মেয়েদের উত্ত্যক্ত করছিল। আয়োজকদের পক্ষ থেকে দুই ভাই, ইশতিয়াক ও ইরতিয়াজ, সুমনকে চলে যেতে বলেন। তা সুমন তো সামান্য লোক নয়। সে হচ্ছে পুলিশের সোর্স। ব্রিটিশ আমলে এই সোর্সদের বলা হতো ইনফরমার। এদের খুব প্রতাপ ছিল। বঙ্গদেশে বিপ্লবী আন্দোলন কেন ব্যর্থ হয়ে গেল তার একটা কারণ কিন্তু এই ইনফরমারদের তৎপরতা। বিপ্লবীদের এরা ধরিয়ে দিত। এখন বিপ্লবী আন্দোলন নেই, কিন্তু এদের তৎপরতা থামেনি, বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এরা সাধারণত নিরীহ লোকদের ধরিয়ে দিয়ে থাকে, যাতে করে আটকে রেখে এবং নানারকমের ভয়ভীতি দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা নিংড়ে নেওয়া যায়। পল্লবীর গায়েহলুদ অনুষ্ঠানে পুলিশের সোর্স অপমানিত হয়েছে। শোধ নেওয়া চাই। সোর্স ফোন করেছে, এবং সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের লোক এসে দু’ভাইসহ আরও কয়েকজনকে ধরে নিয়ে গেছে। থানায় এই দু’ভাইয়ের ওপর যথেচ্ছ নির্যাতন চলে, তাতে এক ভাই মারা যান। বেঁচে-যাওয়া ভাইটি পুলিশ বাহিনীর তিনজন সদস্য এবং তিনজন সোর্সের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। সাহসী যুবক বলতে হবে। তাকে কিছুটা সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ লিগাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)। পাঁচ বছর পেরিয়ে ছয় বছরে এসে মামলার একটা রায় পাওয়া গেল। পাওয়া যেত কি-না সন্দেহ, যদি না আবহাওয়াতে সামান্য কিছু পরিবর্তন ঘটত।

লেখক ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


We chose a different approach. Will you support it? We believe everyone deserves to read quality, independent, factual news and authoritative, calm analysis – that’s why we keep State Watch journalism open to all. The free press has never been so vital. No one sets our agenda, or edits our editor, so we can keep providing independent reporting each and every day. Every contribution, however big or small, is so valuable for our future – in times of crisis and beyond. Support the State Watch today a little amount. Thank you.

ছড়িয়ে দিনঃ
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •