
চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি প্রকাশের পর থেকেই দেশে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। চুক্তির শর্তাবলি যত বিশ্লেষিত হচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে এর ভারসাম্যহীনতা—আর সেই সঙ্গে রাজনৈতিক অঙ্গনে, বিশেষত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পক্ষ থেকে উঠে আসছে প্রশ্ন ও আপত্তি।
চুক্তি স্বাক্ষরের প্রেক্ষাপট
২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশি পণ্যে ৩৭ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করে, যা রপ্তানিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে বছরে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য কেনে, বিপরীতে বাংলাদেশ কেনে মাত্র ২ বিলিয়ন ডলারের—এই ৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর চাপ দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ছিল। এই প্রেক্ষাপটেই ৯ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তিতে স্বাক্ষর করে—জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক প্রাক্কালে, যা নিয়ে গণতান্ত্রিক বৈধতা প্রশ্নে ইতিমধ্যেই সমালোচনা শুরু হয়েছিল।
চুক্তির ভেতরের ভারসাম্যহীনতা
চুক্তির প্রকাশিত বিশ্লেষণ থেকে জানা যাচ্ছে, নথিতে “বাংলাদেশ করবে” এই বাক্যাংশটি ব্যবহৃত হয়েছে ১৩১ বার, অথচ “যুক্তরাষ্ট্র করবে” বাক্যাংশ এসেছে মাত্র ৬ বার। শুল্ক, শ্রম আইন, মেধাস্বত্ব, পরিবেশগত মান ও সরকারি ক্রয়সহ একাধিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ওপর সুনির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতা আরোপিত হয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকার তুলনামূলকভাবে সীমিত ও অনির্দিষ্ট। আরও উদ্বেগজনক একটি শর্ত হলো—বাংলাদেশ ভবিষ্যতে অন্য কোনো দেশের সঙ্গে ডিজিটাল বাণিজ্যচুক্তি করলে এবং তাতে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হচ্ছে মনে করলে, তারা আলোচনার পরও সন্তুষ্ট না হলে এই চুক্তি বাতিল করে ২০২৫ সালের ২ এপ্রিলের নির্বাহী আদেশ অনুযায়ী পুরনো উচ্চ শুল্কহার পুনর্বহাল করতে পারবে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের একতরফা বাতিল-ক্ষমতা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বাণিজ্যনীতির স্বাধীনতাকেও সীমিত করে দেয়।
এনসিপির প্রতিক্রিয়া
এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া সম্প্রতি জানিয়েছেন, দলটি নিজেরাও এই বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে পর্যালোচনা করেছে এবং ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনসহ মার্কিন প্রতিনিধিদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যাও নিয়েছে। এনসিপির মূল আপত্তির জায়গা দুটি—প্রথমত, চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার আগে বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছিল, যা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষ থেকে একই ধরনের ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে বলে দলটি জানিয়েছে; দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতে এ ধরনের বড় জাতীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করার প্রয়োজনীয়তার কথা তারা সরাসরি মার্কিন প্রতিনিধিদের জানিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ এনসিপির আপত্তি মূলত প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে, যদিও চুক্তির বিষয়বস্তুগত অসামঞ্জস্য নিয়েও তাদের অবস্থান নেতিবাচক বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
বৃহত্তর রাজনৈতিক তাৎপর্য
এই আপত্তি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন এনসিপি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নেও সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। উভয় ইস্যুতেই দলটির মূল অভিযোগ একই সুরে বাঁধা—বড় জাতীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ব্যাপক রাজনৈতিক পরামর্শ ও স্বচ্ছতার ঘাটতি। একটি অনির্বাচিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে এত বড় একটি দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য বাধ্যবাধকতায় দেশকে আবদ্ধ করে যাওয়ার সিদ্ধান্ত—এই প্রশ্নটি শুধু এনসিপি নয়, ভবিষ্যতে যেকোনো নির্বাচিত সরকারের জন্যও একটি উত্তরাধিকার-সংকট তৈরি করতে পারে, কারণ চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পরবর্তী সরকারের নীতিনির্ধারণী স্বাধীনতাও একই বাধ্যবাধকতার আওতায় থেকে যাচ্ছে।
সাম্প্রতিকতম অগ্রগতি
গত ২৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ ও ভারতসহ ৬০টি দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে বলে জানা গেছে, যা দেখাচ্ছে ফেব্রুয়ারির চুক্তির পরও বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সম্পর্ক এখনও পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি। এই পরিস্থিতিতে এনসিপির তোলা স্বচ্ছতা ও পরামর্শের দাবিটি সামনে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে, বিশেষত যদি ভবিষ্যতে চুক্তি সংশোধন বা নতুন শর্ত নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন হয়।
আপনার মতামত জানানঃ