একবিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো—যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার প্রতিযোগিতা শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যাবে এবং সেই পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের মতো একটি মধ্যম আকারের উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের অবস্থান কী হওয়া উচিত। গত তিন দশকে বিশ্ব রাজনীতিতে যে পরিবর্তন ঘটেছে, তা শুধু শক্তির ভারসাম্য বদলে দেয়নি; বরং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি এবং কূটনীতির চরিত্রও পাল্টে দিয়েছে। একসময় যুক্তরাষ্ট্র ছিল একক পরাশক্তি, যার প্রভাব বিশ্বব্যবস্থার প্রায় প্রতিটি স্তরে বিস্তৃত ছিল। কিন্তু চীনের দ্রুত অর্থনৈতিক উত্থান, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং সামরিক সক্ষমতার বিকাশ বিশ্বকে নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
বিশ্বরাজনীতির বিশ্লেষকেরা বহুদিন ধরেই ‘থুসিডিডিস ফাঁদ’ ধারণা নিয়ে আলোচনা করছেন। প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদ থুসিডিডিস তাঁর বিখ্যাত রচনা ‘পেলোপনেসীয় যুদ্ধের ইতিহাস’-এ দেখিয়েছিলেন, কীভাবে উদীয়মান এথেন্স এবং প্রতিষ্ঠিত শক্তি স্পার্টার মধ্যে প্রতিযোগিতা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের দিকে গড়িয়েছিল। আধুনিক যুগে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গ্রাহাম এলিসন এই ধারণাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে যে যখন একটি নতুন শক্তি দ্রুত উত্থান ঘটায় এবং পুরোনো শক্তির অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করে, তখন সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হয়। বর্তমান বিশ্বে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ককে সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখেন।
চীনের উত্থান নিঃসন্দেহে আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর ঘটনা। মাত্র কয়েক দশকের ব্যবধানে দেশটি বিশ্বের বৃহত্তম উৎপাদনকেন্দ্র, অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি এবং প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ১৯৯০-এর দশকে যে চীনকে মূলত সস্তা শ্রমনির্ভর অর্থনীতি হিসেবে দেখা হতো, আজ সেই দেশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং উন্নত সামরিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলেও চীনের প্রভাব ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো অর্থনীতি, সামরিক শক্তি, গবেষণা, উচ্চশিক্ষা, আর্থিক বাজার এবং উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাষ্ট্র। বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ডলারের আধিপত্য, শক্তিশালী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, বৈশ্বিক সামরিক ঘাঁটির নেটওয়ার্ক এবং দীর্ঘদিনের কৌশলগত জোট যুক্তরাষ্ট্রকে এখনো অনন্য অবস্থানে রেখেছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উচ্চপ্রযুক্তি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব অনেক বিশ্লেষকের মতে আগামী কয়েক দশকেও বিশ্ব শক্তির ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
এই বাস্তবতায় অনেকেই মনে করছেন, বিশ্ব ধীরে ধীরে একটি ‘জি-২’ বা দুই পরাশক্তিকেন্দ্রিক ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। অর্থাৎ এমন একটি বিশ্ব, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনই হবে প্রধান শক্তি এবং অন্যান্য দেশগুলোকে তাদের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে হবে। যদিও এই ধারণা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তবু বাস্তবতা হলো—বিশ্ব অর্থনীতি, প্রযুক্তি এবং নিরাপত্তা প্রশ্নে এই দুই রাষ্ট্রের প্রভাব সবচেয়ে বেশি।
বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতি একই সঙ্গে সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, রপ্তানি বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়েরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম বড় রপ্তানি বাজার। তৈরি পোশাক শিল্প থেকে শুরু করে প্রবাসী আয়, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার—সব ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন সহযোগী। পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সড়ক এবং শিল্প অবকাঠামোসহ অসংখ্য প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণ রয়েছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে চীন উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যে বিনিয়োগ করছে, বাংলাদেশ তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ফলে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—কোনো এক পক্ষকে বেছে নেওয়া উচিত কি না। বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশের জন্য এমন নীতি কার্যকর হবে না। কারণ, জাতীয় স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে উভয় শক্তির সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার, প্রযুক্তি ও কূটনৈতিক প্রভাব; অন্যদিকে চীনের বিনিয়োগ, অবকাঠামো সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক সুযোগ—দুটিই বাংলাদেশের জন্য মূল্যবান।
বাংলাদেশের কৌশল হওয়া উচিত ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তববাদী। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘স্ট্র্যাটেজিক ব্যালান্সিং’। অর্থাৎ কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে সবার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করা। এই নীতি বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ঐতিহ্যের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময় থেকেই বাংলাদেশ ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতি অনুসরণ করে এসেছে। বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় এই নীতির গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
তবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রতিবেশী ভারত। ভৌগোলিক অবস্থান, ইতিহাস, অর্থনীতি, যোগাযোগ এবং নিরাপত্তার কারণে ভারত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রীয় উপাদান। বাংলাদেশের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক অপরিহার্য। একই সঙ্গে জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব এবং ন্যায্য অধিকার রক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই দুই লক্ষ্যকে সমন্বয় করেই কূটনৈতিক পথ নির্ধারণ করতে হবে।
বিশ্ব যদি সত্যিই দুই পরাশক্তিকেন্দ্রিক ব্যবস্থার দিকে এগোয়, তাহলে বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। কারণ, তখন ছোট ও মাঝারি শক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য তুলনামূলক বেশি কৌশলগত পরিসর পাবে। একক পরাশক্তির বিশ্বে যে ধরনের নির্ভরশীলতা তৈরি হয়, বহুমাত্রিক শক্তির ভারসাম্যে তা কিছুটা কমে আসে। ফলে বাংলাদেশও বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজের অবস্থানকে আরও দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরতে পারবে।
ভবিষ্যতের বিশ্বে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তাই বাংলাদেশের জন্য কেবল কূটনৈতিক ভারসাম্যই যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। শক্তিশালী অর্থনীতি ও দক্ষ জনশক্তি ছাড়া কোনো রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কার্যকর অবস্থান তৈরি করতে পারে না।
বাংলাদেশের সামনে তাই একদিকে রয়েছে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে রয়েছে নতুন সম্ভাবনার দরজা। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতাকে কেবল সংঘাত হিসেবে দেখলে চলবে না; বরং এটিকে জাতীয় উন্নয়নের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে হবে। বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, বাণিজ্য, শিক্ষা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে উভয় দেশের সঙ্গে পারস্পরিক লাভজনক সম্পর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন।
অবশেষে বলা যায়, বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। শক্তির ভারসাম্য বদলাচ্ছে, নতুন জোট গড়ে উঠছে এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির পুরোনো সমীকরণগুলো নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে। এই পরিবর্তনের সময়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে তার কৌশলগত অবস্থান, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কোনো এক পক্ষের প্রতি ঝুঁকে পড়া নয়, বরং জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে উভয়ের সঙ্গে সমানভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখাই হতে পারে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ। কারণ একটি অনিশ্চিত বিশ্বে টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন বিচক্ষণতা, বাস্তববাদ এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি।
আপনার মতামত জানানঃ