Trial Run

ভেজাল মদ খেয়ে ১২ জনের মৃত্যু

ছবি: গ্রেটি ইমেজ

ভেজাল মদ খেয়ে বিষক্রিয়ায় মৃত্যু, অঙ্গহানি বা অসুস্থ হওয়ার খবর বাংলাদেশে মাঝেমধ্যেই শোনা যায়। গত কয়েকদিনে এরকম বেশ ক’টি ঘটনা ঘটে গেছে। বিষাক্ত মদপানে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই জন শিক্ষার্থী এবং একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার তিন কর্মীসহ ঢাকা ও বগুড়ায় অন্তত ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত শুক্রবার একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার প্রায় ৪১ কর্মী গাজীপুরের একটি রিসোর্টে অফিস ট্যুরে গিয়েছিলেন। মদপানে কয়েক জন সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ঢাকায় ফেরার পরে তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার দুই জন এবং সোমবার একজনের মৃত্যু হয়েছে।

এর আগে ১ জানুয়ারি, ২০২১ মদের বিষক্রিয়ায় অসুস্থ হয়ে অন্তত ১৬ জন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। পরের দুই দিনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মোট পাঁচ জনের মৃত্যু হয়। ৪ জানুয়ারি রাজশাহী মহানগর পুলিশ ভেজাল মদ তৈরির চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। গত বছরের ২৭ আগস্ট রাজশাহীর একটি বেসরকারি হাসাপতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক রাশিয়ান নাগরিকের মৃত্যু হয়। চিকিৎসকরা জানান, মদের বিষক্রিয়ায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওই কর্মীর মৃত্যু হয়েছে।

চিকিৎসকরা বলেন, ঢাকার অন্তত চারটি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে  গত কয়েক সপ্তাহে মদ পানের পর বিষক্রিয়ার উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক ভাবে বেড়েছে।

বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপতালের উপপরিচালক আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, বিষাক্ত মদপানে অসুস্থ পাঁচ জন বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

এদিকে বিষাক্ত মদ বিক্রির বিষয়ে বগুড়া সদর থানায় একটি মামলা হয়েছে। মামলার বাদী রঞ্জুর বড় ভাই মনোয়ার। মামলায় তিনজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আসামীরা হলেন, খান হোমিও হলের মালিক শাহিনুর রহমান শাহীন, পারুল ও পুনম হোমিও হলের মালিক নুর আলম ও নুর নবী। নুর আলম ও নুর নবী আপন দুই ভাই।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বগুড়ার ফুলবাড়ী এলাকার পলাশ মিয়াকে সোমবার ১১টার দিকে হাসপাতালে নেওয়ার পর তিনি মারা যান। পলাশের ভাই পায়েল ও তার বন্ধু আইয়ুব বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেলে ভর্তি আছেন। হাসপাতালেই পলাশের ভাগ্নে বাধন বলেন, জন্মদিনের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ওই সন্ধ্যায় তার মামার সাথে আব্দুর রহিম (৪২) নামের আরেকজনও মদ পান করেন। পরে তিনি তার বাড়ি ফুলবাড়ী দক্ষিণ পাড়ায় গত রোববার মারা যান। নিহত সুমন রবিদাসের ভাই সুজন রবিদাস বলেন, রমজান তাদের এলাকার বাসিন্দা। তারা শহরের তিনমাথা রেলগেট এলাকায় একটি হোমিও দোকান থেকে স্পিরিট কিনে খান। খাওয়ার পরই রমজান অসুস্থ হয়ে তার নিজ বাড়িতে মারা যান।

পুলিশ দাবি করেছে, মোহাম্মপুরের এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ভেজাল মদপানে মারা গেছেন। গত রোববার তার বাবা একই বিশ্বদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে একটি ধর্ষণ মামলা দায়ের করেছিলেন। শনিবার মোহাম্মদপুরের সিটি হাসপাতালে মামলায় অভিযুক্ত পাঁচ জনের মধ্যে এক যুবকের মৃত্যু হয়। ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার হারুন-উর-রশিদ বলেন, আমরা ধারণা করছি, ভুক্তভোগী এবং অভিযুক্ত যুবক দুজনেরই মদপানে মৃত্যু হয়েছে। আমাদের তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

ডিবি গুলশান বিভাগের উপকমিশনার মসিউর রহমান বলেন, গত কয়েক দিনে ঢাকায় বিষাক্ত মদপানে অন্তত ছয় জনের মৃত্যু হয়েছে। যারা এই মদ সরবরাহ করেছিল প্রথমে আমরা তাদের শনাক্ত করি। এরপর ভেজাল মদ তৈরির চক্রের সন্ধান পাওয়া যায়। শেষে আমরা কারখানার সন্ধান বের করি।

তিনি আরও বলেন, ভাটারা এলাকা থেকে ভেজাল মদ তৈরির চক্রের ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কারখানাটির মালিক মো. নাসির। গ্রেপ্তার মো. জাহাঙ্গীর মূলত বিদেশি মদের পুরনো বোতল সরবরাহ করতেন। পরবর্তীতে তিনি ওই কারখানায় চিফ কেমিস্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন। তাকেও আমরা গ্রেপ্তার করেছি। দুই জন মূলহোতাসহ মোট ছয় জনের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে। সজ্ঞানে ভেজাল ক্ষতিকর পণ্য বিক্রির অপরাধে তাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হবে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভেজাল মদ খেয়ে মারা যাওয়া বা অসুস্থ হওয়ার ঘটনাগুলোয় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে ভেজাল মদ তৈরির ক্ষেত্রে মূল উপাদান হিসেবে মিথানল ব্যবহার করা হয়েছে। যাদের মৃত্যু হয়েছে এবং যারা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে রয়েছেন, তাদের অধিকাংশের স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রতিবেদনে ‘মিথানল বিষক্রিয়া’র উল্লেখ রয়েছে। মিথানল বা মিথাইল অ্যালকোহল হচ্ছে স্পিরিটের সবচেয়ে অশোধিত পর্যায়। সাধারণত এটি হালকা, বর্ণহীন এবং উগ্র গন্ধযুক্ত হয়। কাঠের বা প্লাস্টিকের কাজ, বার্নিশ বা রং করা অথবা ছাপাখানার কাজ – এরকম বহু ক্ষেত্রে মিথানল ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ চৌধুরী বলেন, খুব সামান্য পরিমাণ মিথানলেও অনেক সময় মানুষের বড় ধরণের শারীরিক ক্ষতি হতে পারে। ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা মিথানলের প্রভাব একেকজনের দেহে একেকরকম হয়। মিথানলের দাম বাজারে পাওয়া যাওয়া অন্য স্পিরিট জাতীয় দ্রব্যের চেয়ে তুলনামূলক ভাবে অনেক কম হওয়ায় ভেজাল মদ তৈরির কাজে মূলত এটিকেই ব্যবহার করা হয় বলে ধারণা প্রকাশ করেন তিনি।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান সোহেল মাহমুদ বলেন, মিথানল শরীরে প্রবেশ করলে ব্যক্তির হার্ট অ্যাটাক হতে পারে, স্নায়ুতন্ত্রও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে – এই দুই কারণেই মানুষের মৃত্যু হতে পারে। মিথানল গ্রহণ করার পর যত সময় যায়, ততই তা শরীরের সাথে মিশে যেতে থাকে এবং শরীরের তত বেশি ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়তে থাকে। মিথানলের বিষক্রিয়ার সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব পড়ে চোখের স্নায়ুর ওপর। বিষক্রিয়ার শিকার হওয়ার পর বেঁচে যাওয়া অনেকেই অন্ধত্ব বরণ করেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বাংলাদেশে মদ বিক্রি ও সেবনের বিষয়ে আইনের কড়াকড়ি থাকলেও পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা নেই। দীর্ঘসময় ধরে যারা মদ্যপান করেন তাদের অনেকেই বাইরে থেকে দেখে বা গন্ধ শুঁকে বুঝতে পারেন যে মদে ভেজাল আছে কি না। তবে সাধারণ মানুষের পক্ষে আসল ও নকল মদের মধ্যে পার্থক্য করা সব সময় সম্ভব হয় না।

মদের ভেজাল নির্ণয় করার নির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি না থাকলেও একটি সহজ উপায়ে মদে ভেজালের উপস্থিতি নির্ণয় করা যেতে পারে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পানশালার কর্মচারী বলেন, মদ পরীক্ষা করার সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি একটু মদ নিয়ে তাতে আগুন জ্বালিয়ে পরীক্ষা করা। মিথানল মিশিয়ে ভেজাল মদ তৈরি করতে হলে তাতে সামান্য পরিমাণ হলেও পানি দিতেই হবে। আর এক ফোঁটা পানি থাকলেও ঐ মদে আগুন জ্বলবে না। কাজেই মদে যদি আগুন জলে, তাহলে ধরে নিতে পারেন যে সেটিতে ভেজাল থাকার সুযোগ নেই।

এসডব্লিউ/এমএন/ এফএ/১৮৪৫

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 16
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    16
    Shares

আপনার মতামত জানানঃ