বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে কিছু সিদ্ধান্ত কেবল মাঠের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকে না, সেগুলো ছড়িয়ে পড়ে রাজনীতি, কূটনীতি ও জাতীয় আত্মমর্যাদার পরিসরে। ২০২৬ সালের আইসিসি টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত ঠিক তেমনই এক মুহূর্ত, যা ক্রীড়া প্রশাসনের একটি বৈঠক থেকে শুরু হয়ে রাষ্ট্রের অবস্থান, খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক রাজনীতির জটিল বাস্তবতাকে সামনে এনে দিয়েছে। সিলেটে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে নেওয়া এই সিদ্ধান্তটি আকস্মিক মনে হলেও এর পেছনে জমে থাকা ক্ষোভ, আশঙ্কা ও চাপের ইতিহাস দীর্ঘ।
সবকিছুর সূত্রপাত মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে। উগ্রপন্থীদের হুমকি, সামাজিক মাধ্যমে বিদ্বেষমূলক প্রচারণা এবং নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ—এই সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় পেসারকে টুর্নামেন্ট থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্ত শুধু একজন খেলোয়াড়ের পেশাগত ক্ষতি নয়, বরং বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের ভারতে নিরাপত্তা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলে দেয়। বোর্ডের ভেতরে প্রথমে যে মনোভাব ছিল তা ছিল সংযত; অধিকাংশ পরিচালক চেয়েছিলেন পরিস্থিতি শান্ত রাখতে। কিন্তু সরকারের মনোভাব স্পষ্ট হওয়ার পর দৃশ্যপট দ্রুত বদলে যায়।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড, বা সংক্ষেপে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড, দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি থেকে দূরে থেকে ক্রিকেট পরিচালনার চেষ্টা করেছে। কিন্তু উপমহাদেশের বাস্তবতায় ক্রিকেট কখনোই পুরোপুরি রাজনীতিমুক্ত থাকে না। আইপিএল থেকে মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার ঘটনা সেই বাস্তবতাকে আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। একসময় যাকে ভারতের দর্শকরা ‘ফিজ’ নামে ভালোবেসে ডাকত, সেই খেলোয়াড়ই হুমকির কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত হয়ে পড়লেন—এই বার্তাটি বিসিবির জন্য উপেক্ষা করার মতো ছিল না।
ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের ফেসবুক পোস্ট ছিল এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক স্বীকৃতি। তিনি স্পষ্ট ভাষায় ভারতের ক্রিকেট বোর্ডের ‘উগ্র সাম্প্রদায়িক নীতি’র কথা উল্লেখ করে বিসিবির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান। এর মধ্য দিয়ে বিষয়টি আর শুধু ক্রীড়া প্রশাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকল না; এটি হয়ে উঠল রাষ্ট্রের অবস্থান। ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা, সমর্থকদের অনুভূতি এবং জাতীয় মর্যাদা—সবকিছু এক সুতোয় গাঁথা হয়ে গেল।
২০২৬ সালের টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ যৌথভাবে আয়োজন করার কথা ভারত ও শ্রীলঙ্কার। সূচি অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচ কলকাতায়, প্রতিপক্ষ ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এরপর গ্রুপ পর্বের বাকি ম্যাচগুলো মুম্বাই ও কলকাতায়। এই শহরগুলো ক্রিকেটের তীর্থস্থান হলেও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে সেগুলোই হয়ে উঠেছে উদ্বেগের কেন্দ্র। বিসিবির একটি সূত্র জানিয়েছে, খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে কি না—এই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর তারা পাননি। ফলে আইসিসির কাছে ভেন্যু পরিবর্তনের অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এখানে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে—ক্রিকেটের বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা কী ভূমিকা নেবে? আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল বরাবরই বলে এসেছে, খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। অতীতে বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা নিরাপত্তাজনিত কারণে ভেন্যু পরিবর্তনের নজির রয়েছে। কিন্তু ভারত–বাংলাদেশের মতো দুই বড় ক্রিকেটপ্রেমী দেশের ক্ষেত্রে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া আইসিসির জন্যও সহজ হবে না। কারণ এখানে জড়িয়ে আছে সম্প্রচার স্বার্থ, দর্শকসংখ্যা, বাণিজ্যিক চুক্তি এবং আঞ্চলিক রাজনীতি।
ভারতের ক্রিকেট বোর্ড, অর্থাৎ বোর্ড অব কন্ট্রোল ফর ক্রিকেট ইন ইন্ডিয়া, এই পুরো ঘটনায় এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে আইপিএল থেকে মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত যে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ থেকেই এসেছে, সেটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। প্রশ্ন হলো, সেই নিরাপত্তা যদি আইপিএলের মতো ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে কীভাবে নিশ্চিত করা হবে? এই দ্বন্দ্বই বিসিবির সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে।
বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মানসিক অবস্থাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বকাপ মানে স্বপ্ন, প্রস্তুতি আর দীর্ঘ পরিকল্পনা। বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রমের ফল এই মঞ্চে গিয়ে ধরা দেওয়ার কথা। কিন্তু সেই মঞ্চেই যদি নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকে, তাহলে পারফরম্যান্সের ওপর তার প্রভাব পড়া স্বাভাবিক। দলের একাধিক সদস্য ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন বলে জানা গেছে। বোর্ডের কাছে এই উদ্বেগগুলো আর উপেক্ষা করার মতো ছিল না।
এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের ক্রিকেট সমর্থকদের মধ্যেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। একদল মনে করছেন, এটি সময়োপযোগী ও সাহসী পদক্ষেপ, যা খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা ও জাতীয় মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। অন্যদিকে অনেকে হতাশ—বিশ্বকাপের মতো আসরে দলকে না দেখতে পাওয়ার আশঙ্কা তাদের ব্যথিত করছে। সামাজিক মাধ্যমে এই দুই মতের টানাপোড়েন স্পষ্ট। কেউ বলছেন, “ক্রিকেটের চেয়েও জীবন বড়”, আবার কেউ প্রশ্ন তুলছেন, “রাজনীতির বলি হচ্ছে কি আমাদের ক্রিকেট?”
আসলে এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। উপমহাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে রাজনীতি ও খেলাধুলা বহুবার একে অপরকে ছুঁয়ে গেছে। পাকিস্তানে দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বন্ধ ছিল নিরাপত্তার কারণে। শ্রীলঙ্কা হামলার পর ভুগেছে একই সমস্যায়। বাংলাদেশ নিজেও একাধিকবার নিরাপত্তা ইস্যুতে বিদেশি দল না পাওয়ার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বিসিবি জানে, খেলোয়াড়দের ঝুঁকিতে ফেলে ক্রিকেট চালিয়ে যাওয়ার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে বিসিবির সিদ্ধান্তকে অনেকেই দেখছেন একটি বার্তা হিসেবে—বাংলাদেশ ক্রিকেট আর নীরব দর্শক থাকবে না। তারা নিজেদের খেলোয়াড়, নিজেদের স্বার্থ এবং নিজেদের অবস্থান নিয়ে স্পষ্ট কথা বলতে প্রস্তুত। এটি ভবিষ্যতে ভারত–বাংলাদেশ ক্রিকেট সম্পর্কের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলবে। দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ, আইপিএলে বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণ, এমনকি আঞ্চলিক ক্রিকেট রাজনীতিতেও এর প্রতিধ্বনি শোনা যেতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে না যাওয়ার সিদ্ধান্তটি শুধু একটি টুর্নামেন্ট সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নয়; এটি বাংলাদেশের ক্রিকেটের আত্মপরিচয় ও আত্মসম্মানের প্রশ্ন। মাঠের বাইরে এই লড়াইয়ে বিসিবি দেখিয়েছে, তারা খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা ও দেশের অবস্থানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে প্রস্তুত। এখন চোখ থাকবে আইসিসির দিকে—তারা কীভাবে এই সংকটের সমাধান করে এবং ক্রিকেটকে আবার মাঠের আলোচনায় ফিরিয়ে আনে। বিশ্বকাপের ট্রফি হয়তো সাময়িকভাবে দূরে সরে গেছে, কিন্তু এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে দীর্ঘদিন আলোচিত হয়ে থাকবে।
আপনার মতামত জানানঃ