চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ বহু দশক ধরে বাংলাদেশের ভোগ্যপণ্যের বাজারের কেন্দ্রবিন্দু। দেশজুড়ে যেকোনো পণ্যের খুচরা দামের আগে পাইকারি ওঠানামা নির্ধারণ হয়ে যায় এখানকার আড়ত, ডিও ব্যবসায়ী এবং মিলারদের কার্যকলাপের ওপর। দীর্ঘসময় ধরে খাতুনগঞ্জের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছিল কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠী, যাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল ভোজ্যতেল থেকে শুরু করে চিনি—দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে ব্যবহার্য পণ্যের বাজার। বিশেষ করে চিনির বাজারে এমন একটি অদৃশ্য শক্তি কাজ করত, যাকে সবাই ‘মিলার সিন্ডিকেট’ বলতে অভ্যস্ত। দাম বাড়লে যে কারণ দেখানো হতো—বিশ্ববাজার, ডলারের মূল্য, যাতায়াত ব্যয় বা উৎপাদন ঘাটতি—তার আড়ালে এই সিন্ডিকেটের একচ্ছত্র ক্ষমতা সাধারণ মানুষের পকেট থেকে বাড়তি টাকা বের করে আনত।
কিন্তু ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পালাবদল ঘটতেই ছবিটা বদলে যেতে থাকে। দীর্ঘ সময় ধরে যেসব ব্যবসায়িক গ্রুপ সরকারি প্রভাব, প্রশাসনিক যোগাযোগ এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতার ওপর ভর করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করত, তাদের প্রভাব হঠাৎই দুর্বল হয়ে পড়ে। খাতুনগঞ্জের সেই বহু পুরনো অভ্যস্ত চিত্র বদলে যায়—ব্যবসায়ীরা আর আগের মতো নির্দেশাবলীর অপেক্ষা করেন না, বড় গ্রুপগুলোর ডিও নির্ভরতা কমে যায়, আর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে চিনির বাজারে। সিন্ডিকেটের শক্তি ভেঙে যাওয়ায় পাইকারি পর্যায়ে দাম একের পর এক কমতে থাকে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে খুচরা বাজারে। বহু বছর পর চিনি মানুষ কিনছে ৯৫ থেকে ১০০ টাকায়—এমন দামে যা একসময় কল্পনারও বাইরে ছিল।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে খাতুনগঞ্জে প্রতি মণ চিনি বিক্রি হতো ৪৪৪০ টাকায়। সেখানে এখন দাম নেমে এসেছে ৩২৪৫ টাকায়। পাইকারিতে প্রতি মণে কমেছে ১১৯৫ টাকা, অর্থাৎ কেজিতে প্রায় ৩০ টাকা। খুচরা বাজারেও একইসঙ্গে ৩৫-৪০ টাকার মতো কমেছে দাম। এক বছর আগেও যে চিনি ১৩০-১৩৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছিল, সেটাই এখন ৯৫-১০০ টাকায় কিনছে মানুষ। এই নাটকীয় পতনের পেছনে মূল কারণ হলো—সিন্ডিকেটের আধিপত্য ভেঙে যাওয়া।
দেশে বছরে ২০–২২ লাখ টন পরিশোধিত চিনির চাহিদা আছে। রাষ্ট্রীয় চিনিকলগুলো থেকে পাওয়া যায় মাত্র ৩০ হাজার টনের মতো, বাকি ৯৮ শতাংশই আমদানি করতে হয়। এই আমদানির বড় কাজটি করে থাকে পাঁচটি শিল্পগোষ্ঠী—সিটি, মেঘনা, এস আলম, আবদুল মোনেম ও দেশবন্ধু সুগার মিল। বহু বছর ধরে এই গ্রুপগুলোই ‘র’ চিনি ব্রাজিল থেকে আমদানি করে নিজেদের মিলগুলোতে পরিশোধন করে বাজারে ছাড়ত। বাজারের দামে ওঠানামা হতো মূলত এই গ্রুপগুলোর সিদ্ধান্ত ও ডিও ভিত্তিক কাঠামোর ওপর। সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার প্রধান ক্ষেত্রও ছিল এই সরবরাহ শৃঙ্খল।
কিন্তু ২০২৪ সালের পর রাজনৈতিক পরিবর্তন বড় দুটি ধাক্কা তৈরি করে। প্রথমত, পূর্ববর্তী সরকারের পতনের পর প্রশাসনিক কাঠামোতে আগের সম্পর্কভিত্তিক সুবিধা আর কার্যকর থাকে না। দ্বিতীয়ত, কয়েকটি প্রধান গ্রুপ আর্থিক ও আইনি চাপে পড়ে। বিশেষ করে এস আলম গ্রুপের ওপর রাষ্ট্রীয় নজরদারি বাড়ে এবং দেশবন্ধু মিল দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বাজারের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে যায়। ফলে অন্য গ্রুপগুলো আগের মতো বাজারকে উচ্চ দামে ধরে রাখতে পারে না। পাশাপাশি আমদানি বাড়তে থাকে, যা সরাসরি সরবরাহ বাড়িয়ে দাম কমানোর পরিবেশ তৈরি করে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য বলছে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে দেশে ৯.৮ লাখ টনের বেশি চিনি আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই ‘র’ চিনি। আর চলতি অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩.৯ লাখ টনে—গত বছরের তুলনায় ৪ লাখ টনের বেশি। এই অতিরিক্ত সরবরাহই বাজারকে নরম করে ফেলে। যখন কোনো একটি পণ্যের সরবরাহ বাড়ে এবং বাজার নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি দুর্বল হয়, তখন দাম কমে যাওয়া স্বাভাবিক। চিনি বাজার ঠিক এই একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে গত দেড় বছরে।
খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা বলছেন—চাহিদা আগের মতো নেই। দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে; সেই সঙ্গে বাজারে আমদানি করা চিনির সরবরাহ প্রচুর। ফলে মিলাররা আগের মতো দাম বাড়ানোর পরিবেশ পাচ্ছেন না। অনেক ডিও ব্যবসায়ী মনে করছেন, দাম আরও কমতে পারে। কেউ কেউ তো মনে করছেন, বাজার যদি এমনই থাকে তবে কেজিপ্রতি চিনি ৬০–৭০ টাকাতেও নামতে পারে। অবশ্য সেটি সম্ভব হবে কিনা, তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক মাসের আমদানি প্রবাহ, আর্থিক নীতির স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক বাজারের ওপর।
খুচরা বাজারেও এই পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি দেখা যাচ্ছে। আগে যে দোকানিরা ১৫০ টাকা কেজিতে চিনি বিক্রি করতেন, তারা এখন ৯৫ টাকায় খোলা চিনি বিক্রি করছেন। প্যাকেট চিনির দামও কমে ১০০ টাকায় নেমেছে এবং প্যাকেটের গায়েও নতুন দাম ছাপা হচ্ছে। অর্থাৎ মিল মালিকরা নিজেরাই স্বীকার করে নিচ্ছেন—পুরনো উচ্চমূল্য আর ধরে রাখা সম্ভব নয়। যে অদৃশ্য ‘অবস্থান’ বা ‘চাপ’ আগে ছিল, তা এখন আর নেই।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাব বলছে—এই দাম কমার পেছনে মূল কারণ সিন্ডিকেটের ভাঙন। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যবসায়িক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়, ফলে বাজার স্বাভাবিক হতে থাকে। চিনির দাম ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়ায় প্রমাণ মিলছে—চাইলে ব্যবসায়ীরা অন্য পণ্যের দামও কমাতে সক্ষম। তাই তাদের মতে ভোজ্যতেল, ডাল, চাল, পেঁয়াজ—সকল সেক্টরেই যদি একইভাবে সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া যায়, তাহলে সাধারণ মানুষ প্রকৃত সুফল পাবে।
এই পুরো পরিস্থিতি আসলে একটি গভীর বাস্তবতা সামনে নিয়ে আসে—বাংলাদেশের ভোগ্যপণ্যের বাজার কেবল আমদানি বা উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং বড় শিল্পগোষ্ঠীর ক্ষমতা, রাজনৈতিক সম্পর্ক, প্রশাসনিক দৌড়ঝাঁপ এবং খাতুনগঞ্জের মতো পাইকারি বাজারের অনানুষ্ঠানিক প্রভাব পুরো বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করে। সিন্ডিকেট কেবল একটি শব্দ নয়; এটি ছিল বাজারের ওপর ছায়া-শাসনের একটি স্থায়ী পদ্ধতি। সেখানেই পরিবর্তন এসেছে। মানুষ দেখেছে—শক্তি বদলালে বাজারও বদলায়।
এখন প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তন কতটা স্থায়ী? ইতিহাস বলছে—বাংলাদেশে বাজার কখনোই খুব স্থায়ীভাবে পরিবর্তিত থাকে না। যেকোনো মুহূর্তে নতুন একটি শক্তিশালী গোষ্ঠী বাজার দখল করলে আবারও দামের ওপর কৃত্রিম চাপ সৃষ্টি হতে পারে। ফলে প্রকৃত আশা এখানেই যে সরকারী নীতিমালা, আমদানি-কর কাঠামো, ভোক্তা অধিকার এবং বাজার নজরদারি সক্রিয় থাকলে ভবিষ্যতে আর কেউ সহজে বাজারকে একচ্ছত্র দখলে রাখতে পারবে না। চিনির বাজার যে শিক্ষা দিয়েছে—নিয়ন্ত্রণ ভাঙলে দাম কমে, বাজার স্থিতিশীল হয়—তা অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ হওয়া সময়ের দাবি।
আজ খাতুনগঞ্জে চিনি যেমন খোলা বাজারে ৩২৪০ থেকে ৩২৫০ টাকায় প্রতি মণ বিক্রি হচ্ছে, তেমনই খুচরা বিক্রেতারা ৯৫ থেকে ১০০ টাকায় চিনি বিক্রি করছেন। দেড় বছর আগেও যা ছিল অকল্পনীয়। এই পরিবর্তন দেখিয়ে দিয়েছে—বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়লে, সিন্ডিকেট দুর্বল হলে এবং ব্যবসায়ী-সরকার-আমদানিকারকের একটি স্বচ্ছ সম্পর্ক তৈরি হলে ভোক্তা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো বহু চ্যালেঞ্জে ভারসাম্য রক্ষার লড়াই করছে, কিন্তু একটি ভোগ্যপণ্যের বাজারে বাস্তব পরিবর্তন হওয়া মানে অন্যান্য খাতেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। মানুষের মনেও এক ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে—যদি চিনি পারে, তবে তেল-ডাল-পেঁয়াজ-চালও পারে। এখানেই এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য।
আপনার মতামত জানানঃ