Trial Run

আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ থেকে বেরিয়ে গেল যুক্তরাজ্য

ছবি : ইন্টারনেট

নতুন বছরে নতুন যুগে প্রবেশ করলো যুক্তরাজ্য। ঘড়ির কাঁটায় রাত ১২টা বাজতেই একদিকে এসেছে ইংরেজি নতুন বছর, অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটেছে যুক্তরাজ্যের।  ব্রেক্সিট চুক্তির চার বছর পর অবশেষে ইউরোপীয় ইউনিয়ন(ইইউ) থেকে বেরিয়ে এলো যুক্তরাজ্য। স্থানীয় সময় রাত ১১ টা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে আলাদা হয়ে যায় ব্রিটেন । অর্থাৎ ১ জানুয়ারি থেকে আর ইইউ’র অংশ নয় দেশটি।

গেল বছরের ৩১ জানুয়ারি ব্রেক্সিট কার্যকর হলেও এতদিন পর্যন্ত ব্রাসেলসের বাণিজ্যিক নিয়ম মেনে চলে এসেছে যুক্তরাজ্য। সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে উভয় পক্ষ নতুন এই চুক্তিতে পৌঁছায়। এর মধ্যে নতুন বাণিজ্য, নিরাপত্তা সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা হয়েছে। গত বুধবার যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্সে ৫২১-৭৩ ভোটে দ্রুতই চুক্তিটি অনুমোদন পায়। পরে উচ্চকক্ষ হাউস অব লর্ডসে অনুমোদিত হওয়ার পর ব্রিটিশ রানির সম্মতির মধ্য দিয়ে আইনটি কার্যকর হয়।

কয়েক মাসের দর-কষাকষির পর বড়দিনের আগের দিন ব্রেক্সিট-পরবর্তী বাণিজ্য চুক্তিতে একমত হয় যুক্তরাজ্য ও ইইউ। এরপর, ২৮ ডিসেম্বর এই চুক্তি সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন করেন ইইউ’র ২৭টি সদস্যদেশের রাষ্ট্রদূতেরা। পরে ইইউ’র শীর্ষ কর্মকর্তারা চুক্তিটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে সই করে। সর্বশেষ ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সেটি অনুমোদন করল।

২০১৬ সালে ব্রেক্সিট ভোটের পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছিলেন বরিস জনসন। ক্ষমতায় বসার মাত্র ছয় মাসের মধ্যে যুক্তরাজ্যকে বহুদলীয় ওই জোট থেকে বের করেও আনেন তিনি। স্বাভাবিকভাবেই, সেই ব্যবস্থা চূড়ান্ত রূপ পাওয়ায় যারপরনাই খুশি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী।

নতুন বছরের শুভেচ্ছার সঙ্গে তিনি বলেছেন, যুক্তরাজ্য এখন ভিন্নভাবে কাজ করতে স্বাধীন। এই ব্যবস্থা ইইউ’র অন্য দেশগুলোর তুলনায় অনেক ভালো বলেও মন্তব্য করেছেন জনসন।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতা এখন হাতের মুঠোয় এবং এর সদ্ব্যবহার করার দায়িত্ব আমাদেরই।

ব্রেক্সিটের ফলে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে সদস্যপদ হারালেন যুক্তরাজ্যের এমপিরা। যুক্তরাজ্য থেকে ৭৩ জন সদস্য ছিলেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টে। এখন থেকে বিশেষ আমন্ত্রণ ছাড়া ইইউ’র কাউন্সিল সামিটেও অংশ নিতে পারবেন না ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। ব্রিটিশ মন্ত্রীরাও ইইউ’র কোনো বৈঠকে অংশ নিতে পারবেন না।

ইইউ থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ায় ব্রিটিশ পাসপোর্টেও আসছে পরিবর্তন। ৩০ বছর পর নীল রঙের পাসপোর্ট আবার ফিরে পাবে দেশটি। ১৯২১ সালে প্রথম এ পাসপোর্টের ব্যবহার শুরু হয়েছিল তবে বর্তমান পাসপোর্টটিও বৈধ থাকবে।

ইইউ’র সদস্য থাকায় পণ্য ও বিক্রিতে আলাদাভাবে কোনো দেশের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ ছিল না। এখন থেকে বিশ্বের যে কোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক আলোচনা চালাতে পারবে যুক্তরাজ্য। তবে নতুন কোনো চার্জ আরোপ ছাড়াই যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ইইউ’র বাণিজ্য অব্যাহত থাকবে।

যুক্তরাজ্য-ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে অবাধ চলাচলের সুবিধা আর নেই। এর বদলে পয়েন্টভিত্তিক নতুন ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা চালু করেছে ব্রিটিশরা। যুক্তরাজ্যের কেউ ইইউ দেশগুলোতে ১৮০ দিন সময়সীমার মধ্যে ৯০ দিনের বেশি থাকতে চাইলে তাদের ভিসা নিতে হবে।

শুল্কমুক্ত কেনাকাটার সুবিধা থাকছে। ইইউ থেকে যুক্তরাজ্যে ফেরা ব্যক্তি সর্বোচ্চ ৪২ লিটার বিয়ার, ১৮ লিটার ওয়াইন, চার লিটার স্পিরিটি ও ২০০ সিগারেট বিনাশুল্কে সঙ্গে নিতে পারবেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সুবিশাল ক্রিমিনাল রেকর্ড ডাটাবেজের সুবিধা হারিয়েছে যুক্তরাজ্য। ইইউ দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এখন থেকে ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড এবং ওয়েলসকে বাড়তি কাগজপত্র সামলাতে হবে।

ব্রেক্সিট নিয়ে ২০১৬ সালের ২৩ জুন যুক্তরাজ্যে এক গণভোট হয়। তখন ব্রেক্সিটের পক্ষে রায় দিয়েছিলেন ব্রিটিশ জনগণ।আর এর পরে ঐ বছরেই ব্রেক্সিট চুক্তি সম্পন্ন হয়।

জানা যায়, ব্রিটেন মূলত তাদের দেশের বিপুল মানুষের অভিবাসনের ব্যাপারে খুবই অসন্তুষ্ট ছিল, যেটা আসলে তাদের ইইউ থেকে বেরিয়ে আসার মূল কারণ। ব্যাপারটা ছিল এ রকম যে, তারা মুক্তবাণিজ্যের বিনিময়ে মানুষের অবাধ চলাচল চায় কি না। দলে দলে মানুষ ব্রিটেনে বসতি স্থাপনের কারণে সেখানকার চাকরির বাজার ও সরকারি পরিষেবায় ব্যাপক চাপ পড়েছিল, এ কারণেও মানুষের মনে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। ওদিকে ২০০৪ ও ২০০৭ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পূর্বমুখী সম্প্রসারণ হওয়ার কারণে যে কত মানুষ ব্রিটেনে বসতি স্থাপন করেছে, এই সত্যটা রাজনীতিকেরা স্বীকার না করায় ব্রিটেনবাসীর মনে এ অনুভূতি আরও তীব্র হয়।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পক্ষপাতী গোষ্ঠী অভিবাসনের চেয়ে অর্থনীতি ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নেই বেশি জোর দিয়েছিল, কিন্তু তারা দ্রুতই বুঝে ফেলে, অভিবাসনের ওপর ‘নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার’ ব্যাপারটা সবচেয়ে জোরালো বার্তা। একই সঙ্গে তারা অভিবাসনের সঙ্গে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জায়গার সংকট, ডাক্তারদের নিয়োগসহ মজুরি হ্রাসের প্রসঙ্গগুলো জুড়ে দেয়। আর তার সঙ্গে ব্রাসেলসের ক্ষমতাবান হয়ে ওঠার ব্যাপারটা তো ছিলই।

তবে ব্রিটেন কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হওয়ার জন্য কখনোই ভোট করেনি। ১৯৯৩ সালে মাসট্রিখ্ট চুক্তির মাধ্যমে আসলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠিত হয়। ইউরোপিয়ান ইকোনমিক কমিউনিটি ছিল তার পূর্বসূরি, যার আওতা ছিল শুধু অর্থনীতি। আর ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠনের মধ্য দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিচার ও পুলিশিংও এর আওতায় চলে আসে। ত্যাগের পক্ষপাতীরা বলে, ব্রাসেলস আসলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মাধ্যমে নিজের ক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছিল, যেটার জন্য তারা তো এতে যোগ দেয়নি। ফলে যে ইউনিয়নে যাওয়ার জন্য তারা সম্মতি দেয়নি বা তাকে অন্তঃকরণে মেনে নিতে পারেনি, সেখান থেকে তো বেরিয়ে আসাই যায়।

এসডাব্লিউ/এমএন/কেএইচ/১৩১৩

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 6
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    6
    Shares