
ঢাকায় বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিক বৈঠকে শুরু হয়েছে। আজ রবিবার সাড়ে ১১টায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের এ অংশীদারি সংলাপ শুরু হয়। এই বৈঠকের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু র্যাবের উপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা।
প্রসঙ্গত, আজকের বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে থাকছেন দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তরের রাজনৈতিকবিষয়ক আন্ডারসেক্রেটারি ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড।
বৈঠকে অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের রাজনীতিবিষয়ক আন্ডারসেক্রেটারি ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড গতকাল শনিবার বাংলাদেশে এসেছেন। তিনি আজ অংশীদারি সংলাপ শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। বাংলাদেশের পর তিনি ভারত ও শ্রীলঙ্কা সফর করবেন।
বৈঠকের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর গত শুক্রবার সন্ধ্যায় এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড তার পাঁচ দিনের বাংলাদেশ, ভারত ও শ্রীলঙ্কা সফরে নাগরিক সমাজ ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
এর আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন বলেন, বাংলাদেশ এই বৈঠকে র্যাবের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি তুলে ধরে তা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানাবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিকের শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা অন্বেষণের লক্ষ্যে সম্পর্ক জোরদার ও অর্থনৈতিক অংশীদারিতে গুরুত্ব দিচ্ছে। বৈঠকে রোহিঙ্গাসংকট সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা চাইবে বাংলাদেশ।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, আসন্ন অংশীদারি সংলাপে যুক্তরাষ্ট্র পাঁচটি ইস্যুতে গুরুত্ব দেবে। এগুলো হলো—বাণিজ্য, শ্রম ও বিনিয়োগ, মানবাধিকার ও সুশাসন, জলবায়ু পরিবর্তনসহ বৈশ্বিক হুমকি, অবাধ ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিকসহ আঞ্চলিক ইস্যু ও নিরাপত্তা সহযোগিতা।
যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে বাংলাদেশের শক্তিশালী অংশীদার হিসেবে থাকবে—এই বার্তাও মিলবে এবারের সংলাপে।
র্যাবের নিষেধাজ্ঞা
যুক্তরাষ্ট্রে পররাষ্ট্র দপ্তরের রাজনৈতিকবিষয়ক আন্ডারসেক্রেটারি ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড বলেছেন, র্যাবের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি জটিল। র্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা এখনই উঠছে না।
আরো আলোচনা চায় যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অগ্রগতির নথি দেওয়া হয়েছে। তিন মাসের অগ্রগতি সন্তোষজনক বলছে যুক্তরাষ্ট্র।
এদিকে, পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেন, গণতান্ত্রিক চর্চা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, শ্রম অধিকার এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির মতো বিষয়েও আমরা আমাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছি।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর উপায় ও ব্লু ইকোনমিতে সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়েও আমরা গভীর আলোচনা করেছি।
প্রসঙ্গত, ২০১২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ওয়াশিংটনে প্রথম অংশীদারি সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। তারপর থেকে প্রতিবছর একবার ঢাকা, পরের বার ওয়াশিংটনে এই সংলাপের আয়োজন করা হয়। তবে করোনার কারণে গত দুই বছর এই সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়নি। সবশেষ ২০১৯ সালের জুন মাসে ঢাকায় অংশীদারি সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
র্যাবের বিরুদ্ধে অভিযোগ
করোনা মহামারিকালে রাষ্ট্রের নানা সঙ্কটের মধ্যেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের’ ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া ক্রসফায়ার বা কথিত বন্দুকযুদ্ধসহ রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে বছরের বিভিন্ন সময়ে।
এ সময় করোনা মহামারির কারণে রাষ্ট্রের নানা সঙ্কটের মধ্যে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ ও গুমের মতো ঘটনাও ঘটেছে। এমন অভিযোগ করে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)।
গত তিন বছরে পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু, কথিত বন্ধুকযুদ্ধ ও ক্রসফায়ারসহ বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন ৫৬টি জেলার ৫৯১ জন। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) পরিচালিত এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
সিজিএস বলছে, এই ৫৯১ জনের মধ্যে ৮৬ শতাংশেরই মৃত্যু হয়েছে কথিত বন্ধুকযুদ্ধে। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সদস্যরা সরাসরি এসব ঘটনায় জড়িত ছিল বলে মন্তব্য করেছে সিজিএস।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের অনুরোধ
চলতি বছরের শুরুতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে এলিট ফোর্স র্যাব এবং বাহিনীটির সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর যুক্তরাষ্ট্র যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে তা পুনর্বিবেচনা করতে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনকে চিঠি দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন।
২০২২ সালের নববর্ষ উপলক্ষে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে চিঠি দেন ড. আব্দুল মোমেন। চিঠিতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক শক্তিশালী করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
চিঠিতে সন্ত্রাস, জঙ্গী, মাদক বিরোধী কর্মকাণ্ডে র্যাবের ভূমিকাও তুলে ধরেন তিনি। প্রসঙ্গত, চলতি বছর ১০ ডিসেম্বর বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে বাংলাদেশ সরকার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। একইসঙ্গে এটিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বড় ধরনের কূটনৈতিক চাপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
নিষেধাজ্ঞা পাওয়া ব্যক্তিরা হলেন র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক ও পুলিশের বর্তমান মহাপরিদর্শক তথা আইজিপি বেনজীর আহমেদ, র্যাবের বর্তমান মহাপরিচালক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুন, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) খান মোহাম্মদ আজাদ, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) তোফায়েল মুস্তফা সরওয়ার, মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম ও আনোয়ার লতিফ খান এবং বাহিনীটির সাবেক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ।
এসডব্লিউ/এসএস/১৭১০
আপনার মতামত জানানঃ