Trial Run

কারখানায় হেঁটে যান ৮১% পোশাক শ্রমিক— বেতন দিতে প্রণোদনা চান মালিকেরা

ছবি: যুগান্তর

করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় লকডাউন ও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। সারা দেশে গণপরিবহন বন্ধ রয়েছে, এর মধ্যেও খোলা রয়েছে পোশাক কারখানা। এক জরিপে দেখা গেছে, কাছাকাছি বাসা হওয়ায় তৈরি পোশাক শিল্পের ৮১ শতাংশ শ্রমিকই হেঁটে কারখানায় যান।

এদিকে শ্রমিক-কর্মচারীদের আসছে ঈদের বোনাস এবং এপ্রিল, মে ও জুন মাসের বেতন-ভাতা দেওয়ার জন্য গত বছরের মতোই সহজ শর্তে আবারও ঋণ প্রণোদনা চায় ব্যবসায়ীরা।

কারখানায় হেঁটে যান ৮১% পোশাক শ্রমিক

দেশের তৈরি পোশাক শিল্প খাতে বর্তমানে ৪০ লাখের বেশি শ্রমিক কাজ করেন। সম্প্রতি এশিয়ান সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট (এসিডি) নামের একটি প্রতিষ্ঠানের জরিপে উঠে আসে, শ্রমিকদের ৮১.১ শতাংশই হেঁটে কর্মক্ষেত্রে যাতায়াত করেন। আর ৫.৬ শতাংশ শ্রমিক যাতায়াত করেন মোটরবিহীন যানবাহনে, বাসে যাতায়াত করেন ৭.৩ শতাংশ শ্রমিক।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন বর্তমানে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যপারগুলো নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দ্রুতই তাদের করোনার ভ্যাকসিন দিতে হবে।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ)  সভাপতি ফারুক হাসান গণমাধ্যমকে বলেন, “আমরা দেখেছি কারখানার আশেপাশে যারা থাকেন তারাই আমাদের শ্রমিক। ৮০ শতাংশের মতো শ্রমিকের বাসা কাছাকাছি হওয়ায় তারা আগে থেকেই হেঁটে কারখানায় যাতায়াত করতেন,”

শ্রমিকরা যেন স্বাস্থ্যবিধি মেনে কারখানায় প্রবেশ করতে পারেন তা নিশ্চিত করতে কাজের সময় কয়েকটি ভাগে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।

বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি ও এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী বলেন,  “শ্রমিকরা বেশিরভাগই কারখানার আশেপাশে বসবাস করেন। যারা দূর থেকে আসেন তাদের জন্য কিছু কারখানার নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা আছে। মারচেন্ডাইজার, প্রোডাকশন ম্যানেজারসহ মধ্যম সারির কর্মকর্তা যারা আছেন, তারা নিজেদের গাড়িতে আসা যাওয়া করেন।”

বাংলাদেশ জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রনি বলেন,”যে শ্রমিকরা কারখানার আশেপাশে থাকেন তাদের কারখানায় আসতে সমস্যা হয় না। কিন্তু যারা দূরে থাকেন তাদের সমস্যা হয়। এখন গাড়ি চলছে না বিধায় তাদের রিক্সায় যেতে হয়। শ্রমিকরা নিজ উদ্যোগে কারখানায় যাচ্ছেন। যাতায়াতের জন্য মালিকদের যে ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা ছিল তা মানা হচ্ছে না। স্বাস্থ্যবিধি মেনে কারখানা চলুক এটিই আমরা চাই।”

বেতন-বোনাস দিতে প্রণোদনা চান মালিকেরা

তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের শ্রমিকদের মজুরি ও ঈদ বোনাস দিতে আবার সরকারের কাছে প্রণোদনা চাইল এই খাতের তিন সংগঠন বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএ। গতবারের মতো একই শর্তে এ বছরের এপ্রিল, মে ও জুন তিন মাসের বেতন-ভাতা ও বোনাস দেওয়ার জন্য বস্ত্র খাতের তিনটি সংগঠনের পক্ষ থেকে অর্থমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করা হয়।

তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি ফারুক হাসান, নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি এ কে এম সেলিম ওসমান এবং বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএর সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন আজ রোববার অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালকে চিঠি দিয়ে ঋণ দেওয়ার অনুরোধ করেছেন। চিঠির অনুলিপি প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখ্য সচিব, অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বরাবরও পাঠানো হয়েছে।

চিঠিতে দাবি করা হয়েছে, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে বিশ্বের অনেক দেশই আগের মতো লকডাউনে রয়েছে। ফলে যেসব ক্রেতা অর্থ পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তারাও এখন অপারগতা প্রকাশ করছে। এমন অবস্থায় ঈদের আগে সচল কারখানাগুলোর শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও বোনাস প্রদানের জন্য মালিকদের ওপর প্রচণ্ড চাপ রয়েছে। আর্থিক সংকটের কারণে শ্রমিকের বেতন-ভাতা ও বোনাস পরিশোধে অর্থের জোগান দেওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পকে সহায়তা করার জন্য শ্রমিক-কর্মচারীদের এপ্রিল, মে ও জুন মাসের বেতন-ভাতা ও বোনাস দেওয়ার জন্য আগের মতো সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া প্রয়োজন।

জানতে চাইলে বিকেএমইএ জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জাতীয় এক দৈনিককে বলেন, ‘তিন সংগঠনের সভাপতি অর্থমন্ত্রীর কাছে এই চিঠি হস্তান্তর করেন। কভিডের কারণে বর্তমান যে সংকটকাল যাচ্ছে, এ বিষয়গুলো তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন এবং তা বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন।’

শিল্প খাতে সংকটের কথা তুলে ধরে হাতেম আরো বলেন, ‘স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ঈদকে কেন্দ্র করে পাওনা পরিশোধে অতিরিক্ত চাপ থাকে। এ ছাড়া করোনা এবং সামনে দুটি ঈদ। এ সময় শ্রমিকদের ঈদ বোনাস এবং পর পর কয়েক মাসে মজুরির চাপ থাকে। তাই সামাল দিতে না পারায় সরকারের কাছে প্রণোদনা চাওয়া হয়েছে।’

চিঠিতে শিল্পের বর্তমান সংকট তুলে ধরে আরো বলা হয়, রপ্তানীকৃত পণ্যের বিপরীতে পেমেন্ট পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ক্রেতারা ক্রয়াদেশ বাতিল ও স্থগিত করছে এবং নির্দিষ্ট সময়ে পেমেন্ট দিচ্ছে না। ফলে পোশাক খাত আর্থিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। বিশ্ববাজারে রপ্তানি সক্ষমতা বজায় রাখার জন্য বাংলাদেশের পোশাকশিল্প অন্যান্য দেশের তুলনায় হ্রাসকৃত মূল্যে পোশাক রপ্তানি করে। যার মধ্যে মুনাফার অংশ খুবই কম থাকে, টিকে থাকার জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রে লোকসান দিয়ে ক্রয়াদেশ নিতে বাধ্য হচ্ছে। শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ব্যয় পরিশোধ করা হতো ক্রেতার নিকট হতে পেমেন্ট পাওয়া এবং নগদ সহায়তা বাবদ প্রণোদনার অর্থ পাওয়ার পর, কিন্তু রপ্তানি মূল্য প্রত্যাবাসন না হওয়ার কারণে নগদ সহায়তার আবেদনও করতে পারছে না। আবার অনেক ক্রেতা ডিসকাউন্ট হারে মূল্য পরিশোধ করছে। যার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো তারল্য সংকট নিরসন করতে পারছে না।

করোনার কারণে গত মার্চে একের পর এক ক্রয়াদেশ বাতিল ও স্থগিতাদেশ আসতে থাকে। তখন পোশাকশিল্পের মালিকেরা আতঙ্কিত হয়ে পড়লে সরকার রপ্তানিমুখী শ্রমিকদের এপ্রিল, মে ও জুন—তিন মাসের মজুরি দেওয়ার জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। এই ঋণের বিপরীতে সেবা মাশুল ছিল ২ শতাংশ। পরে পোশাকশিল্পের মালিকেরা আরও এক মাসের মজুরি দেওয়ার জন্য ঋণ দেওয়ার দাবি করেন। সরকারও মেনে নেয়। তখন তহবিলের আকার বেড়ে ৯ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা দাঁড়ায়। তবে চতুর্থ মাসের জন্য ঋণের মালিকদের সুদ দিতে হবে সাড়ে ৪ শতাংশ। বাকি সাড়ে ৪ শতাংশ ভর্তুকি দেবে সরকার।

রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীদের জন্য প্যাকেজটি ঘোষিত হলেও তহবিল থেকে সবচেয়ে বেশি প্রায় ১ হাজার ৮০০ কারখানামালিক ঋণ নিয়েছেন। এই ঋণের গ্রেস পিরিয়ড ছিল ছয় মাস। পরবর্তী ১৮ মাসের কিস্তিতে সেই ঋণ পরিশোধের শর্ত ছিল। তবে গত বছরের শেষ দিকে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ প্রণোদনার ঋণের গ্রেস পিরিয়ডের সময় বাড়ানোর দাবি জানায়। সরকারও তা মেনে নেয়।

অর্থ মন্ত্রণালয় গত ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে প্রণোদনা তহবিল থেকে নেওয়া ঋণ পরিশোধে ১ মার্চ থেকে বাড়তি ছয় মাস সময় দেওয়ার নির্দেশনা দেয়। তার ফলে আগামী সেপ্টেম্বর থেকে ঋণের কিস্তি দিতে হবে মালিকদের।

এসডব্লিউ/এমএন/কেএইচ/১৪৩৩ 


State watch সকল পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত সংবাদ মাধ্যম, যেটি পাঠকদের অর্থায়নে পরিচালিত হয়। যে কোন পরিমাণের সহযোগীতা, সেটি ছোট বা বড় হোক, আপনাদের প্রতিটি সহযোগিতা আমাদের নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বড় অবদান রাখতে পারে। তাই State watch-কে সহযোগিতার অনুরোধ জানাচ্ছি।

ছড়িয়ে দিনঃ
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আপনার মতামত জানানঃ