Trial Run

বরিশাল মহানগর ছাত্রলীগ সভাপতির বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনলেন এক তরুণী

ছবি: সংগৃহীত

শিক্ষা, শান্তি, প্রগতি—এই তিনটি হলো ছাত্রলীগের মূলনীতি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম ছাত্রসংগঠনটি তাদের গঠনতন্ত্রে ঘোষিত তিন মূলনীতি থেকে যেন যোজন যোজন দূরে সরে যাচ্ছে। দেশের প্রতিটি ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে যে সংগঠনটি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে, এখন তারাই প্রতিনিয়ত নানা অপকর্মে জড়িয়ে বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে।

ধর্ষণের অভিযোগের বৃত্ত থেকে যেন ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা বের হয়ে আসতে পারছেন না। করোনা পরিস্থিতির মধ্যে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের নামে ধর্ষণ মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। বরিশাল মহানগর ছাত্রলীগ সভাপতি জসীম উদ্দিনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ করেছেন এক তরুণী। গতকাল সোমবার(১৯ এপ্রিল) রাতে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের এয়ারপোর্ট থানায় অভিযোগ দায়ের এবং মামলা রুজুর আবেদন করেন ওই তরুণী।

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতির সঙ্গে ৮ বছর ধরে সর্ম্পক চলে আসছিল ওই তরুণীর। সম্পর্কের বিভিন্ন সময় শারীরিক সম্পর্ক করার প্রস্তাব দেয়। ওই তরুণী প্রস্তাবে রাজি না হলে জসিম উদ্দিন বিয়ের প্রলোভন দেখায়। এ সময় জসিম উদ্দিন বিভিন্ন ধরনের উপহার সামগ্রী দিয়ে আকৃষ্ট ও বিশ্বাস অর্জন করতে চায়।  সেই সূত্র ধরে ২০১৯ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ওই তরুণীর বাসায় বেড়াতে গিয়ে ধর্ষণ করেন। এতে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন তরুণী।

জসিম উদ্দিন এই খবর শুনে গর্ভপাত করার প্রস্তাব দেন। কিন্তু রাজি না হলে সমাজে মুখ দেখানোর উপায় থাকবে না বলে বোঝায়। শেষে গর্ভপাত করার জন্য পিল এনে দেয় জসিম। এতেও কাজ না হলে বরিশাল জেনারেল হাসপাতালে ডা. তানিয়া আফরোজের মাধ্যমে গর্ভপাত করান।

পরবর্তীতে ঢাকা, বরিশালের বিভিন্ন হোটেল ও রেস্তোরাঁয় দেখা করার সময় বিয়ের প্রলোভন দিয়ে একাধিকবার ধর্ষণ করেন। সর্বশেষ ২০২১ সালের ৫ মার্চ রাত সাড়ে ১১টায় তরুণীর বাসায় গিয়ে সারারাত এক সঙ্গে থাকেন জসিম উদ্দিন। এ সময় তরুণীকে তিনবার ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করেন।

স্থানীয়ভাবে জানা গেছে, ওই তরুণী এপ্রিল মাসের শুরুর দিকে নগরীর সাগরদিতে জসিম উদ্দিনের বাসায় গিয়ে বিয়ের দাবিতে হট্টগোল করেন। এর কিছুদিন পরে জানতে পারেন, জসিম উদ্দিন তাকে বাদ দিয়ে অন্য এক মেয়ের সঙ্গে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি জসিম উদ্দিন বলেন, সেই মেয়েকে আমি চিনি। তিনি আমার আত্মীয় হন। তার সঙ্গে প্রেমের সর্ম্পক ছিল না। ষড়যন্ত্র করে আমার বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দিয়েছেন।

জসীম উদ্দিন জানান, তিনি বিবাহিত। গত রোববার তার বিয়ে হয়েছে। অভিযোগকারী তার আত্মীয়। রাজনৈতিক কারণে ওই মেয়েকে ব্যবহার করে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।

এয়ারপোর্ট থানার ওসি কমলেশ চন্দ্র হালদার জানান, তরুণীর অভিযোগটি ধর্ষণের। আমরা প্রাথমিক তদন্ত করছি। কিছু ‘ডকুমেন্টস’ নিচ্ছি। এরপর আমরা মামলা আকারে গ্রহণ করবো।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বুদ্ধিজীবীদের মতে, জাতীয় রাজনীতি দূষিত হয়ে পড়া এবং স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক নেতাদের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েই ধর্ষণের মতো ঘৃণিত অপরাধে জড়ানোর সাহস পাচ্ছেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

তারা বলেন, এসব ঘটনা খুবই দুঃখজনক। এটা যে হঠাৎ করে হচ্ছে তা নয়। পর্যায়ক্রমে নিচে যেতে যেতে একটা গভীর সংকটে এসে আমরা দাঁড়িয়েছি। অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে, সম্পদ বাড়ছে, কিন্তু মানুষের মানবিক গুণাবলি কমে যাচ্ছে। এখন আমাদের সামনে কোনো আদর্শ নাই। আদর্শহীনতা, নীতিহীনতা—এগুলো দ্বারা রাজনীতি দূষিত হয়ে গেছে। জাতীয় রাজনীতি যদি দূষণমুক্ত হতো তাহলে সরকারের নীতি ভিন্ন হতো।

তারা বলেন, একটি যুক্তি দেওয়া হয় এবং তা অসত্য নয় যে, সমাজের সর্বক্ষেত্রে অধঃপতন ঘটেছে। নৈতিক মূল্যবোধ শিক্ষক-শিক্ষার্থী তথা শিক্ষাঙ্গন থেকে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। শিবির-ছাত্রদল-ছাত্রলীগের অস্ত্রধারী ক্যাডারদেরও কেউ কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছে। যার প্রভাব ছাত্রলীগের ওপরও পড়েছে। এই যুক্তি দিয়ে ছাত্রলীগের চাঁদাবাজি-ঠিকাদারি, সন্ত্রাস-মাস্তানি, প্রতিপক্ষ সংগঠনের ওপর আক্রমণ-ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়ন জাতীয় কর্মকাণ্ডগুলোকে হয়তো কিছুটা জাস্টিফাই করা যায়। এমন যুক্তিও হয়তো দেওয়া যায় যে, দল ক্ষমতায় থাকলে ছাত্র সংগঠন কিছুটা বাড়াবাড়ি করে। বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন ছাত্রদলও বাড়াবাড়ি করতো। এমন দাবিও হয়তো মেনে নেওয়া যায়।

কিন্তু, ধর্ষণের মতো অপরাধ কোনো যুক্তি দিয়ে জাস্টিফাই করা যায় না। সে কারণেই হয়তো ভয়-ভীতি দেখানো বা হুমকি দিয়ে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করার ধারাবাহিক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। সংগঠন হিসেবে ছাত্রলীগ গত দুই দশক ধরে এমন নীতিতে অটল আছে। ফলে তারা ঘটনাক্রম থেকে বের হয়ে আসতে পারছে না।

তারা মনে করেন, এই পরিচিতি থেকে ছাত্রলীগের বের হয়ে আসা বা বের করে আনা অসম্ভব নয়। সামগ্রিকভাবে দেশের যে পরিস্থিতি, আর দশটি সেক্টরে যে পরিস্থিতি বিরাজমান, জাতীয় রাজনীতির যে বৈশিষ্ট্য, তারচেয়ে ছাত্রলীগ সম্পূর্ণ আলাদা কিছু হবে, সেটা ভাবা যায় না। এমন ইউটোপিয়ান কল্পনা করা গেলেও, বাস্তবে অসম্ভব। যেটা সম্ভব সেটা হলো, নারী নিপীড়ন বা ধর্ষণের ঘটনা থেকে ছাত্রলীগকে বের করে আনা। এরজন্যে আওয়ামী লীগের মূল নেতৃত্বকে কঠিন-কঠোর কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

এসডব্লিউ/এমএন/কেএইচ/১৫৪৮ 


State watch সকল পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত সংবাদ মাধ্যম, যেটি পাঠকদের অর্থায়নে পরিচালিত হয়। যে কোন পরিমাণের সহযোগিতা, সেটি ছোট বা বড় হোক, আপনাদের প্রতিটি সহযোগিতা আমাদের নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বড় অবদান রাখতে পারে। তাই State watch-কে সহযোগিতার অনুরোধ জানাচ্ছি। 

ছড়িয়ে দিনঃ
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আপনার মতামত জানানঃ