গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের খুকশিয়া গ্রামের দিনমজুর মন্টু মিয়া হয়তো ভেবেছিলেন, একটি কিডনি বিক্রি করে জীবনের অভাব কিছুটা হলেও দূর করতে পারবেন। দালালদের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা অগ্রিম পাওয়ার পর চলতি বছরের জানুয়ারির শুরুতে তিনি নেপালে যান। সেখানে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর একটি কিডনি অপসারণ করা হয়। চুক্তি ছিল ১০ লাখ টাকার। কিন্তু প্রতিশ্রুত অর্থের বাকি সাড়ে ৯ লাখ টাকা আর তাঁর হাতে পৌঁছায়নি। মাত্র ৫০ হাজার টাকা নিয়ে দেশে ফিরতে হয়েছে তাঁকে।
মন্টু মিয়ার ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো প্রতারণার গল্প নয়। বাংলাদেশের জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার কয়েকটি গ্রামের মানুষের কিডনি বিক্রির ইতিহাসের সঙ্গে এটি মিলে যায়। বছরের পর বছর ধরে দারিদ্র্য, ঋণ, বেকারত্ব এবং জীবিকার সংকটে পড়ে এসব গ্রামের মানুষ কিডনি বিক্রি করছেন। তাঁদের কাছে দালালেরা আসেন আর্থিক স্বচ্ছলতার প্রতিশ্রুতি নিয়ে। বলা হয়, একটি কিডনি দিয়েও স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সম্ভব। বিনিময়ে মিলবে কয়েক লাখ টাকা। কিন্তু অস্ত্রোপচারের পর প্রতিশ্রুত অর্থের বড় অংশ আর পাওয়া যায় না। যাঁরা কিডনি হারান, তাঁদের অনেকেই শেষ পর্যন্ত আগের দারিদ্র্যের মধ্যেই ফিরে যান, সঙ্গে যুক্ত হয় শারীরিক জটিলতা ও সামাজিক অপমান।
এই ব্যবসার বিস্তার শুধু বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়। ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ইরানসহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা একটি আন্তর্জাতিক অঙ্গ বাণিজ্যের সঙ্গে এর যোগসূত্র পাওয়া যায়। রোগীর কাছ থেকে নেওয়া হয় বিপুল পরিমাণ অর্থ। অথচ যাঁর শরীর থেকে অঙ্গটি নেওয়া হচ্ছে, তাঁর ভাগে পৌঁছায় মোট অর্থের সামান্য অংশ। মাঝখানে থাকে দালাল, চিকিৎসা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, নথি জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত লোকজন এবং বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্যস্থতাকারী। শেষ পর্যন্ত লাভের বড় অংশ চলে যায় এই নেটওয়ার্কের সদস্যদের হাতে।
কালাই উপজেলার উদয়পুর ইউনিয়নের নয়াপাড়া ও পাইকপাড়া গ্রামে কিডনি বিক্রির ঘটনা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত। প্রথম আলোর অনুসন্ধানে এই দুই গ্রামে ২৭ জন কিডনি বিক্রেতার সন্ধান পাওয়া গেছে, যাঁদের মধ্যে নয়জন নারী। ভেরেন্ডি গ্রামের একই পরিবারের চারজনের তথ্য যুক্ত করলে তিন গ্রামে মোট বিক্রেতার সংখ্যা দাঁড়ায় ৩১। অথচ এই সংখ্যা কয়েকটি গ্রামের প্রকৃত চিত্রের পুরোটা নয়। ২০১১ সালে প্রথম আলোর হিসাবেই কালাই এলাকায় কিডনি বিক্রেতার সংখ্যা ছিল প্রায় ২০০। ২০২১ সালে আজকের পত্রিকার প্রতিবেদনে চারটি গ্রামে শতাধিক মানুষের কিডনি বিক্রির তথ্য উঠে আসে।
কেন মানুষ নিজের শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বিক্রি করতে রাজি হন, তার উত্তর খুঁজতে গবেষণা করেছেন জর্জ মেসন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাওরু কোইজুমি ও তাঁর সহকর্মীরা। ২০২৩ সালের নভেম্বরে বিএমজে গ্লোবাল হেলথে প্রকাশিত তাঁদের গবেষণায় কালাইয়ের কিডনি বিক্রেতাদের আর্থসামাজিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, ৮৩ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যের কারণে এবং ৪ শতাংশ ঋণের কারণে কিডনি বিক্রি করেছেন। পুরুষ বিক্রেতাদের ৫৬ শতাংশ কৃষক এবং নারী বিক্রেতাদের ৭৮ শতাংশ গৃহিণী।
অর্থাৎ এটি কেবল ব্যক্তিগত লোভের গল্প নয়; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকট। যাঁদের নিয়মিত আয় নেই, যাঁদের জমি বা সম্পদ নেই, যাঁরা ঋণের বোঝা বহন করছেন, তাঁদের কাছে কয়েক লাখ টাকা অনেক সময় জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা বলে মনে হয়। দালালেরা সেই দুর্বলতাকেই কাজে লাগান।
কিন্তু কিডনি বিক্রির পর তাঁদের জীবনে কী পরিবর্তন আসে? পাইকপাড়ার মতিয়ার রহমান প্রথম আলোকে বলেছেন, কিডনি বিক্রি করে চার লাখ টাকা পেয়েও তাঁর অভাব দূর হয়নি। এই একটি বক্তব্যই পুরো ব্যবস্থার বাস্তবতা বুঝিয়ে দেয়। যে অর্থের জন্য মানুষ নিজের শরীরের স্থায়ী ক্ষতি মেনে নেন, সেই অর্থও তাঁদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না।
বিভিন্ন সময়ের ঘটনাগুলো পাশাপাশি রাখলে প্রতিশ্রুত অর্থ ও বাস্তবে পাওয়া অর্থের ব্যবধান আরও স্পষ্ট হয়। ২০১৪ সালে কামরুন নাহারকে সাত লাখ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। তিনি টাকা তো পানইনি, বরং তাঁকে আটকে রেখে তাঁর পরিবারের কাছ থেকে দুই লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ২০১৯ সালে জোসনা বেগমকে প্রথমে পাঁচ লাখ, পরে সাত লাখ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। আল জাজিরার ২০২৫ সালের ৪ জুলাইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কলকাতায় অস্ত্রোপচারের পর তিনি পেয়েছিলেন মাত্র তিন লাখ টাকা।
একই প্রতিবেদনে সাজলের ঘটনা উঠে এসেছে। ২০২২ সালে দিল্লিতে কিডনি দেওয়ার বিনিময়ে তাঁকে ১০ লাখ টাকা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হাতে পান সাড়ে তিন লাখ টাকা। ২০২৪ সালে বৈগুনি গ্রামের সফিরুদ্দিন ভারতে কিডনি দিয়ে পান সাড়ে তিন লাখ টাকা। আর ২০২৬ সালে মন্টু মিয়ার প্রতিশ্রুত অর্থ ছিল ১০ লাখ টাকা। তাঁর হাতে পৌঁছেছে মাত্র ৫০ হাজার।
অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে প্রতিশ্রুত অর্থের পরিমাণ বাড়লেও বিক্রেতাদের হাতে পৌঁছানো অর্থের পরিমাণে তেমন পরিবর্তন হয়নি। বরং প্রতারণার ধরন আরও বিস্তৃত হয়েছে। নয়াপাড়ার রাসেদ মিয়া কিডনি বিক্রির বাকি ৪০ হাজার টাকা না পেয়ে প্রতারণার মামলা করেছিলেন। পরে টাকা পাওয়ার পর মামলা প্রত্যাহার করেন। তাঁর বক্তব্য, টাকা না পাওয়ায় মামলা করেছিলেন, টাকা দেওয়ায় তুলে নিয়েছেন। এমন ঘটনা দেখায়, ভুক্তভোগীদের অনেকের কাছে আইনি লড়াইয়ের চেয়ে আটকে থাকা সামান্য অর্থ উদ্ধার করাই বেশি জরুরি হয়ে ওঠে।
প্রশ্ন হচ্ছে, রোগীর কাছ থেকে নেওয়া বিপুল অর্থ কোথায় যায়? কালাইয়ের দালাল মিজানুর রহমান আল জাজিরাকে দেওয়া বক্তব্যে একটি সম্ভাব্য হিসাব তুলে ধরেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিক্রেতা তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা পান। বাকি অর্থের ভাগ যায় দালাল, কাগজপত্র জাল করার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি এবং চিকিৎসকদের কাছে। চিকিৎসকেরা অনেক ক্ষেত্রে বড় অংশ নেন বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
২০২১ সালের অক্টোবরে ঢাকায় একটি কিডনি পাচারকারী চক্রকে আটক করে র্যাব। সংস্থাটির তৎকালীন মুখপাত্র খন্দকার আল মঈন সাংবাদিকদের জানান, চক্রটি রোগীদের কাছ থেকে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা নিত। অন্যদিকে কিডনি বিক্রেতাদের তিন থেকে চার লাখ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হতো। অগ্রিম হিসেবে দুই লাখ টাকা দেওয়া হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বাকি অর্থ পরিশোধ করা হতো না।
২০২৪ সালে মিরপুরের রবিনের ঘটনা এই ব্যবস্থার আরও ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের ১২ মে ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের গুজরাটের একটি হাসপাতালে রবিনের কিডনি অপসারণ করা হয়। মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়, তাঁর কিডনি ৫০ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়েছিল। অথচ তাঁর স্ত্রীর বিকাশ হিসাবে পৌঁছেছিল মাত্র তিন লাখ টাকা। রোগীর কাছ থেকে নেওয়া অর্থ এবং বিক্রেতার পরিবারের হাতে পৌঁছানো অর্থের ব্যবধান এখানে ৪৭ লাখ টাকা।
এ ধরনের ব্যবসায় অস্ত্রোপচারের পরও বিক্রেতারা নিরাপদ থাকেন না। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অস্ত্রোপচারের পর দালালেরা অনেক সময় বিক্রেতাদের পাসপোর্ট ও চিকিৎসার প্রেসক্রিপশন নিজেদের কাছে রেখে দেন। সফিরুদ্দিন তাঁর পাসপোর্ট ফেরত পাননি, এমনকি অস্ত্রোপচারের পর প্রয়োজনীয় ওষুধও পাননি। ফলে নিজের শরীরে কী অস্ত্রোপচার হয়েছে, কোথায় হয়েছে এবং ভবিষ্যতে কোথায় চিকিৎসা নিতে হবে, সে সম্পর্কেও অনেকের কাছে পর্যাপ্ত নথি থাকে না।
বাংলাদেশের কালাইয়ের মানুষের কিডনি অপসারণের জন্য ভারত একটি পরিচিত গন্তব্য হলেও সাম্প্রতিক সময়ে অন্যান্য দেশের নামও সামনে এসেছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে জোসনা বেগমের অস্ত্রোপচারের স্থান হিসেবে কলকাতার রবীন্দ্রনাথ টেগোর ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কার্ডিয়াক সায়েন্সেস এবং সাজলের ক্ষেত্রে দিল্লির ভেঙ্কটেশ্বর হাসপাতালের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে আল জাজিরার প্রশ্নের জবাব হাসপাতাল দুটির পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে দিল্লির পুলিশ চিকিৎসক বিজয়া রাজাকুমারীকে গ্রেপ্তার করে। অভিযোগ ছিল, ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশি রোগীদের প্রায় ১৫টি কিডনি প্রতিস্থাপনের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন। একই বছরের ৩০ আগস্ট কলকাতার বাগুইআটিতে বাংলাদেশি নাগরিক রাসেল আহমেদকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ একটি রেটচার্ট ও হাসপাতালের কাগজপত্র পায় বলে সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
পাকিস্তানেও বাংলাদেশি রোগীদের কিডনি প্রতিস্থাপনের ঘটনা সামনে এসেছে। প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদনে জয়পুরহাটের এক বাসিন্দার কথা বলা হয়েছে, যাঁর দুই কিডনি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তিনি ঢাকায় চাকরি করতেন। পরে কালাইয়ের একজন কিডনি বিক্রেতাকে সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তানে যান এবং ২২ লাখ টাকায় কিডনি প্রতিস্থাপন করান। সেই বিক্রেতা এখন ঢাকায় রিকশা চালান। তবে তিনি কত টাকা পেয়েছিলেন, প্রতিবেদনে তা উল্লেখ করা হয়নি।
পাকিস্তানের ২০১০ সালের অঙ্গ ও টিস্যু প্রতিস্থাপন আইনে বিদেশি নাগরিকের কাছে পাকিস্তানি নাগরিকের অঙ্গ বিক্রি নিষিদ্ধ। আইনের ৭(১) ধারায় এ ধরনের প্রতিস্থাপনের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ১১ ধারায় অঙ্গের বিনিময়ে অর্থ দেওয়া ও নেওয়া অপরাধ হিসেবে বিবেচিত এবং এর জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
তারপরও পাকিস্তানে অঙ্গ বাণিজ্যের নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকার খবর পাওয়া যায়। ২০২৬ সালে দেশটিতে অন্তত তিনটি চক্রের সন্ধান পাওয়ার তথ্য সংবাদমাধ্যমে এসেছে। জুনে ইসলামাবাদে ডা. নাদিরের নেতৃত্বাধীন একটি চক্রের বিরুদ্ধে রোগীপ্রতি ৬০ লাখ থেকে এক কোটি রুপি নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ডন ও এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চক্রটি প্রায় ১৮৭টি প্রতিস্থাপন করেছিল। বিক্রেতারা পেয়েছিলেন কয়েক লাখ রুপি।
২৩ অক্টোবর ডনের প্রকাশিত পাকিস্তানের ফেডারেল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির একটি মামলার বিবরণে রোগীর দেওয়া অর্থ এবং বিক্রেতার প্রাপ্য অর্থের নির্দিষ্ট হিসাব পাওয়া যায়। সেখানে রোগীর কাছ থেকে নেওয়া হয়েছিল ৩০ লাখ রুপি। বিক্রেতার জন্য নির্ধারিত ছিল তিন লাখ ৪০ হাজার রুপি এবং তিনজন দালালের কমিশন ছিল ৬০ হাজার রুপি। অর্থাৎ বিক্রেতা ও দালালদের জন্য নির্ধারিত অর্থ মিলিয়ে মোট ৪ লাখ রুপি, যা রোগীর দেওয়া অর্থের প্রায় ১৩ শতাংশ। বিক্রেতার একার ভাগ ছিল ১১ শতাংশের কিছু বেশি।
বাকি ২৬ লাখ রুপির বিস্তারিত হিসাব এফআইএ প্রকাশ করেনি। তবে চক্রটির সঙ্গে চিকিৎসক, নার্স, অ্যানেসথেশিয়া প্রদানকারী, ওষুধ সরবরাহকারী, পরীক্ষাগার এবং ডায়ালাইসিস-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার কথা বলা হয়েছে। মামলার দুই অভিযুক্তের সাড়ে ছয় কোটি ও আড়াই কোটি রুপির বাড়ি জব্দ করার তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের বিক্রেতাদের জন্য পাকিস্তান কেন নতুন গন্তব্য হয়ে উঠছে, তার নিশ্চিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তবে কয়েকটি সময়গত পরিবর্তন উল্লেখযোগ্য। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ভারত বাংলাদেশিদের মেডিকেল ভিসা দেওয়ার সংখ্যা কমিয়ে দেয়। একই বছর পাকিস্তান বাংলাদেশসহ ১২৬টি দেশের জন্য ভিসা ফি প্রত্যাহার করে। ২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি ঢাকা-করাচি সরাসরি ফ্লাইটও পুনরায় চালু হয়। এসব পরিবর্তন যাতায়াত সহজ করতে পারে, যদিও কিডনি বাণিজ্যের গন্তব্য পরিবর্তনের সরাসরি কারণ হিসেবে এগুলোকে প্রতিষ্ঠিত করার মতো প্রমাণ নেই।
এমনকি ইরানের নামও এসেছে। যুগান্তরের ১৪ অক্টোবরের প্রতিবেদনে কালাইয়ে ট্রান্সফরমার চুরির মামলায় গ্রেপ্তার ছামছুল ইসলামের পকেটে ইরানের একটি প্রেসক্রিপশন পাওয়ার কথা বলা হয়। পুলিশকে তিনি জানান, চট্টগ্রামে পরিচিত একজনের মাধ্যমে ইরানে গিয়ে এক নারীর শরীরে কিডনি দিয়েছেন।
এই ঘটনাগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতার দিকে ইঙ্গিত করে। অস্ত্রোপচারের গন্তব্য বদলাচ্ছে, কিন্তু বিক্রেতার হাতে পৌঁছানো অর্থের কাঠামো খুব একটা বদলাচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কিডনি বাণিজ্যের এই বৈষম্য নিয়ে গবেষণা করেছেন নাওরু কোইজুমি ও তাঁর সহকর্মীরা। জর্জ মেসন, হার্ভার্ড ও টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের অংশগ্রহণে ২০২৫ সালে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব হেলথ জিওগ্রাফিক্সে প্রকাশিত গবেষণায় ২০০০ থেকে ২০২২ সালের ৫০ হাজার ২২৮টি ইংরেজি সংবাদ কম্পিউটারের মাধ্যমে বাছাই করা হয়। সেখান থেকে ২ হাজার ৪৪টি ঘটনা আলাদা করে গবেষকেরা নিজেরা বিশ্লেষণ করেন।
গবেষণায় দেখা যায়, আন্তর্জাতিক অঙ্গ বাণিজ্যে একটি কিডনির জন্য ক্রেতারা সাধারণত ৫০ হাজার থেকে এক লাখ ২০ হাজার ডলার পর্যন্ত ব্যয় করেন। অথচ বিক্রেতারা প্রায়ই মোট অর্থের ১০ শতাংশেরও কম পান। তবে এই পরিসংখ্যান আন্তর্জাতিক বাজারের বিভিন্ন দেশের ঘটনা থেকে পাওয়া। এটিকে বাংলাদেশের কালাইয়ের নির্দিষ্ট লেনদেনের সরাসরি মূল্যতালিকা হিসেবে দেখা যাবে না।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, প্রথম দশকে সবচেয়ে বড় ক্রেতা দেশ ছিল ইসরাইল। নথিভুক্ত ঘটনার ১৬ শতাংশের সঙ্গে দেশটির ক্রেতারা যুক্ত ছিলেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ১২ শতাংশ এবং যুক্তরাজ্য ১০ শতাংশ। দ্বিতীয় দশকে ভারতের অংশ বেড়ে ২০ শতাংশ হয়। ইসরাইলের অংশ কমে ৯ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ৭ শতাংশে দাঁড়ায়।
গবেষকেরা ভারত, চীন, পাকিস্তান, নেপাল, বাংলাদেশ ও নাইজেরিয়াকে বিক্রেতা দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অন্যদিকে অস্ত্রোপচারের প্রধান গন্তব্যগুলোর মধ্যে ছিল ভারত, পাকিস্তান, চীন, শ্রীলঙ্কা, তুরস্ক, থাইল্যান্ড ও মিসর।
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সময়ের সঙ্গে ইসরাইলের ভূমিকার পরিবর্তন। প্রথম দশকে দেশটি বড় ক্রেতা হিসেবে চিহ্নিত হলেও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশের ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে মধ্যস্থতাকারী নেটওয়ার্কের সঙ্গে দেশটির সংশ্লিষ্টতা উঠে আসে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও জার্মানির ক্রেতাদের সঙ্গে রাশিয়া ও তুরস্কের বিক্রেতাদের যোগাযোগ স্থাপনে ইসরাইলি মধ্যস্থতাকারীদের ভূমিকার কথা গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কিছু ঘটনা আদালতে প্রমাণিত হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার হাসপাতাল কোম্পানি নেটকেয়ারের কোয়াজুলু-নাটাল শাখা ২০১০ সালের নভেম্বরে আদালতে দোষ স্বীকার করে। অভিযোগ ছিল, ২০০১ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে ডারবানের সেন্ট অগাস্টিন হাসপাতালে ইসরাইলি রোগীদের শরীরে ইসরাইল, রোমানিয়া ও ব্রাজিলের নাগরিকদের কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। এই ব্যবস্থার মধ্যস্থতাকারী ছিলেন ইসরাইলি নাগরিক ইলান পেরি।
একটি আইনি পর্যালোচনা অনুযায়ী, ওই চক্রে ব্রাজিলের বিক্রেতারা ছয় হাজার ডলারে কিডনি দিতে রাজি হতেন। ইসরাইলি বিক্রেতারা পেতেন ২০ হাজার ডলার। নেটকেয়ারকে ৪০ লাখ র্যান্ড জরিমানা করা হয় এবং কিডনি বাণিজ্য থেকে অর্জিত লাভ হিসেবে আরও ৩৮ লাখ র্যান্ড বাজেয়াপ্ত করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রেও কিডনি বাণিজ্যের মধ্যস্থতাকারীর বিরুদ্ধে দণ্ডের নজির রয়েছে। ইসরাইলি নাগরিক লেভি ইজহাক রোজেনবাউম নিউ জার্সির তিন রোগীর জন্য তিনটি কিডনি প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা করেছিলেন। প্রতিটি প্রতিস্থাপনের জন্য তিনি এক লাখ ২০ হাজার ডলার বা তার বেশি নিয়েছিলেন বলে কৌঁসুলিরা জানান। তাঁদের অভিযোগ, তিনি ইসরাইলের অসহায় মানুষের কাছ থেকে কিডনি কিনতেন মাত্র ১০ হাজার ডলারে। ২০১২ সালের ১১ জুলাই ট্রেন্টনের ফেডারেল আদালত তাঁকে আড়াই বছরের কারাদণ্ড দেন। অঙ্গ বিক্রির জন্য যুক্তরাষ্ট্রে এটি ছিল প্রথম ফেডারেল দণ্ডের ঘটনা।
ইসরাইল ২০০৮ সালে অঙ্গ বাণিজ্য নিষিদ্ধ করে এবং স্বাস্থ্য তহবিলের মাধ্যমে বিদেশে অবৈধ প্রতিস্থাপনের খরচ দেওয়া বন্ধের ব্যবস্থা নেয়। ২০১০ সালে আইনটি পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হয়। পরবর্তী সময়ে বিদেশে গিয়ে কিডনি প্রতিস্থাপনের ঘটনা কমে যাওয়ার তথ্যও গবেষণায় উঠে এসেছে।
তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এসব ঘটনা এবং কালাইয়ের কিডনি বিক্রির মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র পাওয়া যায়নি। কালাইয়ের বিক্রেতাদের কিডনি কোন রোগীর শরীরে প্রতিস্থাপন হয়েছে, তার সব তথ্য প্রকাশিত নয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশি ও ভারতীয় রোগীর কথা এসেছে, পাকিস্তানে বাংলাদেশি রোগীর কাছে কিডনি যাওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। তাই আন্তর্জাতিক গবেষণাকে কালাইয়ের প্রতিটি ঘটনার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু বিক্রেতার প্রাপ্য অর্থ এবং মধ্যস্থতাকারীদের লাভের মধ্যে যে বৈষম্য রয়েছে, তা দুই ক্ষেত্রেই স্পষ্ট।
কিডনি বিক্রির আরেকটি বড় মূল্য হলো দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিক্রেতাদের অনেকে অস্ত্রোপচারের পর ঢাকায় চলে আসেন। কেউ রিকশা চালান, কেউ পোশাক কারখানায় কাজ করেন, কেউ বাসাবাড়িতে শ্রম দেন। সামাজিক লাঞ্ছনা ও গ্রেপ্তারের ভয়ে অনেকেই নিজ গ্রামে ফিরে থাকতে চান না।
জোসনা বেগম আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, অস্ত্রোপচারের পর তিনি ভারী কাজ করতে পারেন না এবং নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়। পাকিস্তানের ১০৪ জন কিডনি বিক্রেতাকে আত্মীয় দাতাদের সঙ্গে তুলনা করে ২০০৮ সালে আমেরিকান জার্নাল অব ট্রান্সপ্লান্টেশনে প্রকাশিত নকভি ও সহকর্মীদের গবেষণায় দেখা যায়, বিক্রেতাদের ১৭ শতাংশের উচ্চ রক্তচাপ ছিল। আত্মীয় দাতাদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৯ দশমিক ২ শতাংশ।
চেন্নাইয়ের ৩০৫ জন কিডনি বিক্রেতাকে অস্ত্রোপচারের গড়ে ছয় বছর পর নিয়ে করা আরেকটি গবেষণা ২০০২ সালে জেএএমএতে প্রকাশিত হয়। গোয়াল ও সহকর্মীদের গবেষণায় দেখা যায়, ৮৬ শতাংশ বিক্রেতার স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছিল। তাঁদের পরিবারের আয় এক-তৃতীয়াংশ কমে গিয়েছিল এবং চারজনের মধ্যে তিনজন তখনও ঋণের বোঝা বহন করছিলেন।
বাংলাদেশের ৩৩ জন কিডনি বিক্রেতাকে নিয়ে ২০১২ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, কেউই প্রতিশ্রুত চিকিৎসা বা সম্পূর্ণ অর্থ পাননি। আবার ২০২৬ সালের ৫ জুন বিএমসি মেডিক্যাল এথিক্সে প্রকাশিত পাকিস্তানের পাঁচজন বিক্রেতার সাক্ষাৎকারভিত্তিক গবেষণায় কেউ অস্ত্রোপচারের পর ফলোআপ চিকিৎসা পাননি। একজনের ২০ লাখ রুপি পাওয়ার কথা থাকলেও তিনি পেয়েছিলেন মাত্র দুই লাখ।
অবশ্য বৈধভাবে কিডনি দান এবং অর্থের বিনিময়ে কিডনি বিক্রি এক বিষয় নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ৯৬ হাজার ২১৭ জন বৈধ কিডনি দাতাকে নিয়ে ২০১৪ সালে জেএএমএতে প্রকাশিত মুজালে ও সহকর্মীদের গবেষণায় দেখা যায়, ১৫ বছরে কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি প্রতি ১০ হাজার দাতার মধ্যে ৩০ দশমিক ৮ জন। তুলনামূলকভাবে একই ধরনের সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ছিল ৩ দশমিক ৯। আপেক্ষিক ঝুঁকি প্রায় আট গুণ হলেও সামগ্রিক ঝুঁকি ১০০ জনে একজনেরও কম। তবে এসব বৈধ দাতা আগে থেকেই স্বাস্থ্য পরীক্ষায় নির্বাচিত হন এবং নিয়মিত চিকিৎসার আওতায় থাকেন। কালাইয়ের অনেক বিক্রেতার ক্ষেত্রে এমন স্বাস্থ্য পরীক্ষা, অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসা ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা ছিল না।
বাংলাদেশের আইনেও কিডনি বিক্রেতাদের অবস্থান জটিল। ১৯৯৯ সালের মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইনের ৯ ধারায় অঙ্গের ক্রয়-বিক্রয় বা এর বিনিময়ে কোনো সুবিধা লাভ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ১০(২) ধারায় বিধান ভাঙলে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের কথা বলা হয়েছে। এখানে বিক্রেতাদের জন্য আলাদা কোনো অব্যাহতি নেই।
২০২৬ সালের ৫৩ নম্বর আইন, যা ১০ এপ্রিল গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে এবং এর আগে ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর অধ্যাদেশ হিসেবে কার্যকর ছিল, সেখানেও একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা ও শাস্তির বিধান রয়েছে। ফলে দালালের প্রলোভনে নিজের কিডনি বিক্রি করা মানুষও আইনের চোখে অপরাধের ঝুঁকিতে পড়েন।
কিন্তু মানব পাচার প্রতিরোধের আইনে একই মানুষকে অন্যভাবে দেখার সুযোগ রয়েছে। ২০১২ সালের মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন এবং ২০২৬ সালের ৫৫ নম্বর আইনে ব্যবসার উদ্দেশ্যে কোনো ব্যক্তির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গহানিকে শোষণের আওতায় রাখা হয়েছে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শোষণটি সম্মতিক্রমে হোক বা সম্মতি ছাড়া হোক, সেটি মানব পাচারের সংজ্ঞার মধ্যে পড়তে পারে।
এই আইনের ৪৬ ধারায় ট্রাইব্যুনাল অপরাধীর কাছ থেকে ভুক্তভোগীর শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসার ব্যয়সহ ক্ষতিপূরণ আদায়ের নির্দেশ দিতে পারে। ৫২ ধারায় শোষণের শিকার ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য সরকারি আশ্রয় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার বিধান রয়েছে।
অর্থাৎ আইনের একটি অংশে কিডনি বিক্রেতা অপরাধের আসামি হওয়ার ঝুঁকিতে থাকলেও অন্য অংশে তিনি শোষণের শিকার ব্যক্তি এবং সরকারি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন পাওয়ার অধিকারী। কিন্তু কালাইয়ে সাম্প্রতিক মামলাগুলো প্রধানত অঙ্গ সংযোজন ও প্রতারণা আইনে হয়েছে। মানব পাচার আইনে মামলা হওয়ার নজির পাওয়া যায় না বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাও এই ব্যবসা বন্ধে বড় বাধা। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১১ সাল থেকে কালাইয়ে কিডনি কেনাবেচা নিয়ে ১৭টি মামলা হয়েছে। এর একটিরও রায় হয়নি। ১১টি মামলার বাদী পুলিশ এবং ছয়টির বাদী ভুক্তভোগীরা। এসব মামলায় আসামির সংখ্যা দেড় শতাধিক।
জয়পুরহাটের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি শাহনুর রহমান শাহীন ১৫ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোকে এ তথ্য জানান। মন্টু মিয়ার ঘটনায় আদালতের নির্দেশে ১৩ জুন কালাই থানায় মামলা নেওয়া হলেও ১০ অক্টোবর প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, তখনও অভিযোগপত্র জমা পড়েনি।
নতুন আইনে নিকটাত্মীয়ের বাইরে নিঃস্বার্থবাদী দাতার কাছ থেকে কিডনি নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ২০১৯ সালে ব্যারিস্টার রাশনা ইমামের করা রিটের পর হাইকোর্ট যাচাইসাপেক্ষে এ ধরনের দানের সুযোগ দিতে ছয় মাসের মধ্যে আইন সংশোধনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। প্রায় সাত বছর পর নতুন আইনে সেই সুযোগ এসেছে।
গত ১০ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো নিঃস্বার্থবাদী দাতার কিডনি প্রতিস্থাপন হয়েছে বলে বাসসের প্রতিবেদনে জানানো হয়। নতুন ব্যবস্থায় দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে আর্থিক লেনদেন বা প্রতিশ্রুতি নেই কি না, কোনো দালাল জড়িত কি না, পুরোনো যৌথ ছবি, ব্যাংক হিসাব এবং নিকটাত্মীয়ের মতামতসহ বিভিন্ন বিষয় যাচাই করার বিধান রয়েছে।
তবে এই যাচাই মূলত অস্ত্রোপচারের আগের। দানের পর দাতার স্বাস্থ্য, জীবনযাত্রা বা ব্যাংক হিসাব পর্যবেক্ষণের জন্য একই ধরনের নির্দিষ্ট ব্যবস্থা কতটা রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। কালাইয়ের কিডনি বাণিজ্যে নগদ অর্থ ও মোবাইল আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে টাকা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে কেবল ব্যাংক হিসাব পরীক্ষা করে সব অবৈধ লেনদেন শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে কিডনি বিক্রেতাদের জন্য সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো তাঁদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা। যাঁরা ইতিমধ্যে একটি কিডনি হারিয়েছেন, তাঁদের অপরাধী হিসেবে বিবেচনা না করে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার আওতায় আনা দরকার। বছরে অন্তত দুইবার রক্তচাপ, সিরাম ক্রিয়েটিনিন এবং প্রস্রাবের অ্যালবুমিন পরীক্ষা করা যেতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী নেফ্রোলজি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ও চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।
২০১৭ সালের আন্তর্জাতিক কেডিআইজিও নির্দেশিকায় বৈধ কিডনি দাতাদের জন্যও এসব পরীক্ষার নিয়মিত পর্যবেক্ষণের সুপারিশ রয়েছে। তাহলে অবৈধভাবে কিডনি হারানো, স্বাস্থ্য পরীক্ষার বাইরে থাকা এবং অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসাবঞ্চিত মানুষদের ক্ষেত্রে এমন ব্যবস্থা আরও জরুরি।
এই সেবার আইনি ভিত্তিও রয়েছে মানব পাচার আইনে। ব্যবসার উদ্দেশ্যে কারও অঙ্গ অপসারণ শোষণ হিসেবে বিবেচিত হলে, সম্মতি থাকলেও ভুক্তভোগী চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের অধিকারী হতে পারেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে কালাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং ঢাকার সরকারি হাসপাতালগুলোকে এ উদ্যোগে যুক্ত করা যেতে পারে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের দরিদ্র রোগীদের আর্থিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় কিডনি বিক্রেতাদের জন্য আলাদা সহায়তা চালু করাও সম্ভব।
তবে এই উদ্যোগ কার্যকর করতে দুটি নিশ্চয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, চিকিৎসার জন্য আসা ব্যক্তির স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য পুলিশের কাছে পাঠানো যাবে না। দ্বিতীয়ত, শুধু পরীক্ষা করাতে আসার কারণে তাঁকে অঙ্গ বিক্রির আইনে আসামি করা যাবে না। অন্যথায় গ্রেপ্তারের ভয়ে ভুক্তভোগীরা চিকিৎসা নিতে আসবেন না। একই সঙ্গে যারা পরবর্তী সময়ে দালাল হিসেবে কাজ করেন, তাদের এই সুরক্ষার অপব্যবহার ঠেকাতে আলাদা ব্যবস্থা রাখতে হবে।
ইসলামাবাদের ৩০ লাখ রুপির লেনদেন, ঢাকার রবিনের ৫০ লাখ টাকার কিডনি এবং কালাইয়ের মন্টু মিয়ার ১০ লাখ টাকার প্রতিশ্রুতি—সবগুলো ঘটনা একই প্রশ্ন সামনে আনে: একটি মানুষের শরীর থেকে নেওয়া অঙ্গের বিনিময়ে যে বিপুল অর্থ আদায় করা হয়, তার ন্যায্য অংশ কোথায় যায়?
রোগীর কাছে কিডনি পৌঁছে দেওয়ার জন্য মধ্যস্থতাকারীরা লাখ লাখ টাকা পান। চিকিৎসা ও কাগজপত্রের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন দেশে অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোটি টাকার সম্পদ জব্দ হয়, কোথাও দালালেরা আদালতে দণ্ডিত হন। অথচ কালাইয়ের বিক্রেতারা কয়েক লাখ টাকা পেয়েও দারিদ্র্য থেকে বের হতে পারেন না। কেউ ৫০ হাজার টাকা নিয়ে ফেরেন, কেউ প্রতিশ্রুত অর্থের অপেক্ষায় থাকেন, কেউ আবার নিজের শরীরের ক্ষতি নিয়ে বাকি জীবন কাটান।
সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো, যে মানুষটি শোষণের শিকার, তাকেই অনেক সময় অপরাধী হিসেবে দেখা হয়। আর যাঁরা এই ব্যবসার মাধ্যমে বিপুল অর্থ উপার্জন করেন, তাঁদের বিরুদ্ধে মামলার নিষ্পত্তি হতে বছরের পর বছর লেগে যায়।
কিডনি বাণিজ্য বন্ধ করতে শুধু দালাল গ্রেপ্তার বা নতুন আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়। দরকার দ্রুত বিচার, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অপরাধী চক্র শনাক্ত, হাসপাতাল ও চিকিৎসা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাবদিহি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে কিডনি হারানো মানুষদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা।
কারণ কিডনি বিক্রির পর একজন মানুষের জীবন শেষ হয়ে যায় না। বরং তখনই শুরু হয় নতুন এক সংগ্রাম—একটি কিডনি নিয়ে বেঁচে থাকা, কাজ করে সংসার চালানো, চিকিৎসার খরচ জোগানো এবং সমাজের চোখে নিজের পরিচয় লুকিয়ে রাখা।
মন্টু মিয়ার হাতে প্রতিশ্রুত ১০ লাখ টাকার বদলে পৌঁছেছিল মাত্র ৫০ হাজার। মতিয়ার রহমান চার লাখ টাকা পেয়েও দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পাননি। আর এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত চক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে বছরের পর বছর মামলা চললেও বিচার শেষ হয়নি।
অঙ্গের বাজারে কিডনির দাম লাখ লাখ টাকা। কিন্তু সেই কিডনির মালিক মানুষের জীবনের দাম যেন কয়েক লাখ টাকার বেশি নয়। লাভের টাকা ভাগ হয়ে যায় বহু হাতে, আর তার চূড়ান্ত মূল্য দিতে হয় কালাইয়ের মতো গ্রামের অসহায় মানুষদের—একটি কিডনি হারিয়ে, চিকিৎসার নিশ্চয়তা ছাড়া, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে।
আপনার মতামত জানানঃ