১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করছে। জন্ম নিচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশ। কিন্তু এই বিজয়ের পেছনে শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম কিংবা ভারতীয় সামরিক বাহিনীর সহযোগিতার ইতিহাস নেই। এর আড়ালে ছিল আরেকটি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও সামরিক সমীকরণ। একদিকে যখন পাকিস্তানি বাহিনী পূর্ব বাংলায় গণহত্যা, নির্যাতন ও ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছিল, অন্যদিকে তখন বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খানের প্রতি বিশেষ কূটনৈতিক সমর্থন বজায় রেখেছিলেন। এমনকি যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে বঙ্গোপসাগরের দিকে পাঠানো হয়েছিল মার্কিন সপ্তম নৌবহরের একটি শক্তিশালী নৌবহর। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন যুক্তরাষ্ট্র এমন অবস্থান নিয়েছিল? পাকিস্তানকে রক্ষা করতে কি সত্যিই সামরিক প্রস্তুতি নিয়েছিল ওয়াশিংটন? আর বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার পেছনে কী ছিল সেই গোপন আন্তর্জাতিক কূটনীতি?
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগকে নিরঙ্কুশ বিজয় এনে দেয়। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায় পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব। শুরু হয় রাজনৈতিক অচলাবস্থা। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চলাইটের নামে ঢাকাসহ পূর্ব বাংলার বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ সামরিক অভিযান চালায়। বিশ্ববিদ্যালয়, ছাত্রাবাস, পুলিশ ব্যারাক ও সাধারণ মানুষের বসতিতে হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়। লাখ লাখ মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু এই মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার ছিল ভিন্ন।
এর পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার গোপন উদ্যোগ। তখন স্নায়ুযুদ্ধের সময়। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বরাজনীতিতে পরস্পরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। অন্যদিকে চীনের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্পর্কও তখন তীব্রভাবে অবনতিশীল। নিক্সন প্রশাসন বুঝতে পেরেছিল, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে পারলে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে একটি নতুন কৌশলগত ভারসাম্য তৈরি করা সম্ভব হবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সরাসরি কূটনৈতিক যোগাযোগ তখন প্রায় বন্ধ। এই যোগাযোগের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান।
১৯৭১ সালের জুলাই মাসে হেনরি কিসিঞ্জার পাকিস্তান সফরের সময় অসুস্থতার অজুহাতে জনসমক্ষে অনুপস্থিত হয়ে গোপনে চীনের উদ্দেশে যাত্রা করেন। পাকিস্তানের সহায়তায় তাঁর এই গোপন সফরেই ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের পথ তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে নিক্সনের ঐতিহাসিক চীন সফরের ভিত্তিও তৈরি হয়েছিল এই উদ্যোগের মাধ্যমে। অর্থাৎ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান শুধু যুক্তরাষ্ট্রের পুরোনো মিত্র ছিল না; চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রেও দেশটি ওয়াশিংটনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সহযোগী হয়ে উঠেছিল। ফলে পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানি বাহিনীর অভিযান নিয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে নিক্সন প্রশাসনের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছিল সীমিত।
এই অবস্থানের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাডের পাঠানো ঐতিহাসিক বার্তায়। ১৯৭১ সালের ৬ এপ্রিল ঢাকার মার্কিন কনস্যুলেটের কর্মকর্তারা ওয়াশিংটনের নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে একটি বার্তা পাঠান। ইতিহাসে এটি ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ নামে পরিচিত। সেখানে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থান বিপর্যস্ত হচ্ছে। মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করছিলেন, তাদের সরকার পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে যথাযথ প্রতিবাদ জানাচ্ছে না। কিন্তু নিক্সন প্রশাসন সেই প্রতিবাদকে গুরুত্ব দেয়নি। বরং আর্চার ব্লাডের মতো কর্মকর্তাদের অবস্থান প্রশাসনের সঙ্গে সংঘাত তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে তাঁকে ঢাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। এই ঘটনা দেখায়, মার্কিন প্রশাসনের ভেতরেও পাকিস্তাননীতি নিয়ে গভীর মতবিরোধ ছিল।
এখানেই শেষ নয়। পাকিস্তানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহযোগিতার প্রশ্নটিও ছিল অত্যন্ত বিতর্কিত। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। তবে ১৯৬৭ থেকে ১৯৭১ সালের মধ্যে পাকিস্তানকে কিছু সামরিক সরঞ্জাম, খুচরা যন্ত্রাংশ এবং অপ্রাণঘাতী সামরিক উপকরণ সরবরাহের নীতি চালু ছিল। ১৯৭১ সালের মার্চে পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পরও আগে অনুমোদিত অস্ত্রের চালান পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি। জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি নথিতে দেখা যায়, পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত সামরিক সরঞ্জামের চালান নিয়ে ওয়াশিংটনে আলোচনা চলছিল। প্রেসিডেন্ট নিক্সনের কাছে পাঠানো এক গোপন স্মারকলিপিতে হেনরি কিসিঞ্জার ব্যাখ্যা করেন, পাকিস্তানের জন্য আনুষ্ঠানিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা জারি না করে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে চালান পরিচালনা করা হচ্ছে। অর্থাৎ প্রকাশ্যে কঠোর নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা না দিয়েও এমন একটি ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল, যাতে আগে অনুমোদিত সামরিক সরঞ্জাম পাকিস্তানে পৌঁছাতে পারে।
এই নীতির বাস্তব চিত্র আরও স্পষ্ট হয় ‘পদ্মা’ নামের একটি পাকিস্তানি জাহাজের ঘটনায়। ১৯৭১ সালের জুন মাসে নিউইয়র্ক থেকে পাকিস্তানের উদ্দেশে সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে জাহাজটির যাত্রার খবর প্রকাশিত হয়। বিষয়টি নিয়ে ভারতের সংসদে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ভারত যুক্তরাষ্ট্রকে এই চালান বন্ধ করার অনুরোধ জানায়। কিন্তু ওয়াশিংটন কার্যকরভাবে তা থামায়নি। মার্কিন প্রশাসনের যুক্তি ছিল, এসব সরঞ্জামের অনুমোদন আগে দেওয়া হয়েছিল। ফলে পূর্ব বাংলায় সামরিক অভিযান চলার মধ্যেও পাকিস্তানের কাছে মার্কিন অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম পৌঁছানোর পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহের প্রশ্নটি শুধু সরাসরি চালানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯৭১ সালের শেষ দিকে তৃতীয় দেশের মাধ্যমে পাকিস্তানে মার্কিন অস্ত্র পৌঁছানোর ঘটনাও সামনে আসে। জর্ডান ও ইরানের মতো দেশ পাকিস্তানকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে আলোচনায় আসে। জর্ডানের মার্কিন নির্মিত F-104 যুদ্ধবিমান পাকিস্তানে পাঠানোর বিষয়টি নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ নথিতে আলোচনা পাওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও তৃতীয় দেশের মাধ্যমে মার্কিন নির্মিত সামরিক সরঞ্জাম পাকিস্তানে পৌঁছানোর অভিযোগ ওঠে। ৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ নিক্সন ও কিসিঞ্জারের একটি কথোপকথনেও জর্ডান থেকে বিমান পাঠানোর বিষয়টি উঠে আসে। মার্কিন নথিতে ইরানের মাধ্যমে F-5 যুদ্ধবিমান পাকিস্তানে পৌঁছানোর বিষয়টিও আলোচিত হয়েছে। এসব ঘটনা থেকে বোঝা যায়, পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখার প্রশ্নে ওয়াশিংটনের নীতিতে প্রকাশ্য অবস্থান ও বাস্তব পদক্ষেপের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান ছিল।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে আলোচিত সামরিক পদক্ষেপটি ছিল বঙ্গোপসাগরের দিকে সপ্তম নৌবহরের একটি শক্তিশালী অংশ পাঠানো। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে থাকে। ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান ভারতের বিভিন্ন বিমানঘাঁটিতে হামলা চালায়। এর পর ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে প্রবেশ করে। পূর্ব পাকিস্তানে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর যৌথ অভিযান দ্রুত সফল হতে থাকে। পাকিস্তানি বাহিনী চারদিক থেকে চাপে পড়ে যায়। ঠিক এই পরিস্থিতিতে নিক্সন প্রশাসন USS Enterprise বিমানবাহী রণতরীকে কেন্দ্র করে গঠিত মার্কিন নৌবহরকে বঙ্গোপসাগরের দিকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
এই নৌবহরটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহরের অংশ। এতে ছিল পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী USS Enterprise, অন্যান্য যুদ্ধজাহাজ এবং সামরিক সহায়তাকারী জাহাজ। এই নৌবহরকে সাধারণভাবে Task Force 74 নামে উল্লেখ করা হয়। মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্য ছিল, ঢাকায় অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের প্রয়োজনে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে এই নৌবহর পাঠানো হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধের সেই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে বঙ্গোপসাগরে এত বড় সামরিক শক্তির উপস্থিতি নিছক উদ্ধার অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে দেখা কঠিন ছিল। ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন বিষয়টিকে পাকিস্তানের পক্ষে মার্কিন শক্তি প্রদর্শন হিসেবে বিবেচনা করে। আন্তর্জাতিক মহলেও এই পদক্ষেপ ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন ভারতের সঙ্গে ১৯৭১ সালের আগস্টে শান্তি, মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ফলে ভারতীয় সামরিক অভিযানের সময় সোভিয়েত সমর্থন একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। মার্কিন নৌবহরের অগ্রযাত্রার পর সোভিয়েত নৌজাহাজও ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে সক্রিয় হয়। দুই পরাশক্তির নৌ-উপস্থিতি দক্ষিণ এশিয়ায় উত্তেজনা বাড়িয়ে তোলে। প্রশ্ন ওঠে, যুক্তরাষ্ট্র কি ভারতীয় বাহিনীর অগ্রযাত্রা থামাতে চেয়েছিল? পাকিস্তানের সামরিক পতন ঠেকাতে কি সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল?
এ বিষয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ব্যাখ্যায় বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তার কথা বলা হলেও নিক্সন ও কিসিঞ্জারের পাকিস্তানপন্থী নীতি এবং নৌবহর পাঠানোর সময়কালকে একসঙ্গে বিবেচনা করলে বোঝা যায়, এটি ছিল শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামরিক সংকেত। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে—মার্কিন নৌবহর শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি সামরিক আক্রমণ চালায়নি। পাকিস্তানি বাহিনীকে রক্ষা করতে মার্কিন সেনা বাংলাদেশে অবতরণও করেনি। তাই যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে সামরিকভাবে আক্রমণ করেছিল—এমন দাবি ঐতিহাসিকভাবে সঠিক নয়। বরং নৌবহরের উপস্থিতি ছিল এমন একটি শক্তি প্রদর্শন, যা ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পাকিস্তান—সব পক্ষের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করেছিল।
এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল জাতিসংঘের কূটনীতি। যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন তৈরির চেষ্টা করে এবং ভারতকে সামরিক অভিযান থেকে বিরত রাখার জন্য চাপ প্রয়োগ করে। অন্যদিকে ভারত যুক্তি দেয়, পূর্ব বাংলার শরণার্থী সংকট ও পাকিস্তানি বাহিনীর দমন-পীড়নের কারণে পরিস্থিতি আর শুধু পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। প্রায় এক কোটি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। ভারতের অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও সামাজিক পরিস্থিতির ওপর এর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছিল। নিক্সন প্রশাসন ভারতকে সামরিক অভিযানের জন্য দায়ী করার প্রবণতা দেখালেও পূর্ব বাংলার মানবিক বিপর্যয়ের বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।
শেষ পর্যন্ত ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঠেকানোর সব আন্তর্জাতিক হিসাব ব্যর্থ হয়। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবহর বঙ্গোপসাগরে উপস্থিত থাকলেও যুদ্ধের ফলাফল পরিবর্তন করতে পারেনি। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে একটি নতুন বাস্তবতা প্রতিষ্ঠিত হয়।
তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরও এই অধ্যায়ের প্রভাব শেষ হয়নি। পাকিস্তানের প্রতি নিক্সন প্রশাসনের অবস্থান বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের সূচনাপর্বে অবিশ্বাস তৈরি করেছিল। অন্যদিকে পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয় এবং দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। ইতিহাসের এই অধ্যায় তাই শুধু ১৯৭১ সালের সামরিক সংঘাতের গল্প নয়; এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নৈতিকতা, কৌশলগত স্বার্থ এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বেরও এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের একটি কঠিন সত্য মনে করিয়ে দেয়—বিশ্বরাজনীতিতে ন্যায়বিচার ও মানবিকতার প্রশ্ন সব সময় রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হয় না। অনেক সময় একটি দেশের মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে পরাশক্তির কৌশলগত স্বার্থ। পাকিস্তানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের পেছনে ছিল চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের পরিকল্পনা, স্নায়ুযুদ্ধের হিসাব, সামরিক ও কূটনৈতিক প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই হিসাবের ঊর্ধ্বে উঠে এসেছিল বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতার সংগ্রাম। বঙ্গোপসাগরে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী নৌবহরের উপস্থিতিও থামাতে পারেনি একটি জাতির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তাই শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতার ইতিহাস নয়; এটি প্রমাণ করে, আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী সমীকরণও কখনো কখনো জনগণের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের কাছে পরাজিত হতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ