মানুষের শরীরের প্রতিটি কোষের ভেতরে লুকিয়ে রয়েছে জীবনের এক বিশাল নির্দেশনাপত্র। এই নির্দেশনাপত্রের নাম ডিএনএ (DNA)। মানুষের চোখের রং, উচ্চতা, চুলের বৈশিষ্ট্য থেকে শুরু করে শরীরের অসংখ্য জৈবিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে এই ডিএনএতে থাকা জিন। কিন্তু এই জিনের কোনো অংশে ত্রুটি থাকলে জন্ম নিতে পারে ভয়াবহ জিনগত রোগ। এত দিন চিকিৎসাবিজ্ঞান এসব রোগের উপসর্গ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও রোগের মূল জিনগত কারণ পরিবর্তন করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। বিজ্ঞানীরা এমন একটি প্রযুক্তির সন্ধান করছিলেন, যার সাহায্যে ডিএনএর নির্দিষ্ট অংশ খুঁজে বের করে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করা সম্ভব হবে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, সেই প্রযুক্তির সূত্র পাওয়া গিয়েছিল মানুষের শরীরে নয়, বরং অতি ক্ষুদ্র এককোষী জীব ব্যাকটেরিয়ার আত্মরক্ষার কৌশল থেকে।
এই প্রযুক্তির নাম CRISPR-Cas9। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এটি জিন সম্পাদনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর সাহায্যে ডিএনএর নির্দিষ্ট অংশ শনাক্ত করে কেটে ফেলা, নিষ্ক্রিয় করা কিংবা পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। সহজভাবে বললে, একটি বইয়ের কোনো নির্দিষ্ট শব্দ ভুল থাকলে যেমন সেই শব্দটি খুঁজে সংশোধন করা যায়, CRISPR প্রযুক্তি অনেকটা তেমনভাবেই জীবের জিনগত নির্দেশনাপত্রের নির্দিষ্ট অংশে কাজ করতে পারে। তবে এটি সাধারণ সম্পাদনার মতো সহজ নয়; এর পেছনে রয়েছে জটিল আণবিক প্রক্রিয়া এবং অসংখ্য বছরের গবেষণা।
এই গল্পের শুরু ১৯৮৭ সালে। জাপানের ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ইয়োশিজুমি ইশিনো এবং তাঁর সহকর্মীরা Escherichia coli বা E. coli নামের একটি ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে অদ্ভুত কিছু পুনরাবৃত্ত জিনগত বিন্যাস খুঁজে পান। তাঁরা ব্যাকটেরিয়ার একটি নির্দিষ্ট জিন নিয়ে গবেষণা করছিলেন। সেই গবেষণার মধ্যেই ডিএনএর মধ্যে বারবার ফিরে আসা কিছু বিশেষ ক্রম তাঁদের নজরে আসে। এসব ক্রমের মাঝখানে ছিল আলাদা আলাদা জিনগত অংশ। তখন বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেননি, এই অদ্ভুত বিন্যাসের প্রকৃত কাজ কী। আবিষ্কারটি গবেষণাপত্রে প্রকাশিত হলেও এর ভবিষ্যৎ গুরুত্ব তখনও অজানা ছিল।
পরবর্তী সময়ে স্পেনের বিজ্ঞানী ফ্রান্সিসকো মজিকা এই ধরনের জিনগত বিন্যাস নিয়ে গভীরভাবে গবেষণা শুরু করেন। বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া ও আর্কিয়ার ডিএনএতে একই ধরনের পুনরাবৃত্ত বিন্যাস দেখতে পেয়ে তিনি ধারণা করেন, এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক কার্যক্রম রয়েছে। ২০০২ সালে এই বিশেষ বিন্যাসের জন্য CRISPR নামটি আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। এর পূর্ণরূপ Clustered Regularly Interspaced Short Palindromic Repeats।
কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্যটি সামনে আসে যখন বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, এটি আসলে ব্যাকটেরিয়ার এক ধরনের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। মানুষের শরীরে যেমন রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা বাইরের জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করে, ব্যাকটেরিয়ারও তেমন নিজস্ব প্রতিরক্ষা কৌশল রয়েছে। ভাইরাস ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করলে ব্যাকটেরিয়া সেই ভাইরাসের ডিএনএর ক্ষুদ্র একটি অংশ নিজের জিনগত উপাদানে সংরক্ষণ করতে পারে। ফলে একই ভাইরাস আবার আক্রমণ করলে ব্যাকটেরিয়া আগের সংরক্ষিত তথ্যের সাহায্যে আক্রমণকারীকে শনাক্ত করতে পারে।
অর্থাৎ ব্যাকটেরিয়া একবার কোনো ভাইরাসের আক্রমণের মুখোমুখি হলে তার জিনগত স্মৃতি সংরক্ষণ করে ভবিষ্যতের আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রস্তুতি নিতে পারে। এই স্মৃতিভিত্তিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অত্যন্ত কার্যকর। ২০০৭ সালে গবেষকরা Streptococcus thermophilus নামের একটি ব্যাকটেরিয়ার ওপর পরীক্ষা চালিয়ে CRISPR ব্যবস্থার এই প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকার পরীক্ষামূলক প্রমাণ দেন। বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, প্রকৃতির ভেতরেই এমন একটি ব্যবস্থা রয়েছে, যা নির্দিষ্ট জিনগত উপাদান শনাক্ত করে সেটিকে আক্রমণ করতে পারে।
এখান থেকেই শুরু হয় বিজ্ঞানের এক নতুন অধ্যায়। বিজ্ঞানীরা ভাবতে থাকেন, ব্যাকটেরিয়ার এই প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে কি মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা সম্ভব? যদি ব্যাকটেরিয়ার এই ব্যবস্থা ভাইরাসের নির্দিষ্ট ডিএনএ খুঁজে বের করতে পারে, তাহলে একই কৌশল ব্যবহার করে মানুষের শরীরের ক্ষতিকর বা ত্রুটিপূর্ণ জিনও কি শনাক্ত করা সম্ভব?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ফরাসি বিজ্ঞানী এমানুয়েল শারপঁতিয়ে এবং মার্কিন বিজ্ঞানী জেনিফার ডাউডনা। তাঁরা CRISPR-Cas9 ব্যবস্থার আণবিক কার্যক্রম নিয়ে গবেষণা করেন। ২০১২ সালে তাঁদের গবেষণা একটি ঐতিহাসিক মোড় তৈরি করে। তাঁরা দেখান, CRISPR-Cas9 ব্যবস্থাকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, যাতে একটি নির্দিষ্ট জিনগত লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করে ডিএনএ কেটে দেওয়া যায়। তাঁরা দুটি গুরুত্বপূর্ণ RNA অণুর কার্যক্রমকে একত্র করে একটি সহজে পরিচালনাযোগ্য নির্দেশনাব্যবস্থা তৈরি করেন। এর ফলে বিজ্ঞানীরা অনেক বেশি সহজে নির্দিষ্ট জিনগত স্থানে কাজ করার সুযোগ পান।
এই প্রযুক্তির মূল শক্তি হলো এর নির্দেশনাব্যবস্থা। একটি গাইড RNA বিজ্ঞানীদের নির্ধারিত ডিএনএ অংশ খুঁজে বের করতে সাহায্য করে। এরপর Cas9 নামের বিশেষ প্রোটিন বা আণবিক কাঁচি সেই নির্দিষ্ট স্থানে ডিএনএ কেটে দেয়। কোষের নিজস্ব মেরামতব্যবস্থা তখন কাটা অংশটি জোড়া লাগানোর চেষ্টা করে। এই প্রক্রিয়াকে কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানীরা কোনো জিনের কার্যক্রম বন্ধ করতে পারেন অথবা উপযুক্ত কৌশলে নির্দিষ্ট জিনগত পরিবর্তন আনতে পারেন।
একসময় যে কাজের জন্য বছরের পর বছর গবেষণা ও বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হতো, CRISPR প্রযুক্তি সেই কাজকে তুলনামূলকভাবে সহজ, দ্রুত ও সাশ্রয়ী করে তুলেছে। ২০১৩ সালে স্তন্যপায়ী প্রাণীর কোষসহ বিভিন্ন জটিল কোষে এই প্রযুক্তির ব্যবহার দেখানো হয়। এরপর থেকে জিন সম্পাদনার গবেষণায় একের পর এক নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলতে থাকে।
২০২০ সালে CRISPR-Cas9 প্রযুক্তির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য জেনিফার ডাউডনা ও এমানুয়েল শারপঁতিয়ে রসায়নে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। কারণ তাঁদের গবেষণা শুধু পরীক্ষাগারের কাজকে সহজ করেনি; বরং চিকিৎসাবিজ্ঞান, কৃষি, জীবপ্রযুক্তি এবং মানবজীবনের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নতুনভাবে চিন্তা করার সুযোগ তৈরি করেছে।
এই প্রযুক্তির সবচেয়ে আলোচিত প্রয়োগগুলোর একটি হলো জিনগত রোগের চিকিৎসা। সিকল সেল ডিজিজ এমন একটি বংশগত রক্তরোগ, যেখানে হিমোগ্লোবিনের জিনগত পরিবর্তনের কারণে লোহিত রক্তকণিকা স্বাভাবিক গোলাকার আকৃতির পরিবর্তে কাস্তের মতো হয়ে যায়। ফলে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে, তীব্র ব্যথা সৃষ্টি হয় এবং বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। দীর্ঘদিন ধরে এই রোগের চিকিৎসা ছিল জটিল ও সীমিত।
২০২৩ সালের ৮ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (FDA) Casgevy নামের একটি চিকিৎসাপদ্ধতিকে অনুমোদন দেয়। এটি ছিল CRISPR প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি প্রথম অনুমোদিত চিকিৎসা। এই পদ্ধতিতে রোগীর রক্ত তৈরির স্টেম সেল সংগ্রহ করে CRISPR-Cas9 প্রযুক্তির সাহায্যে সেগুলোর জিনগত পরিবর্তন করা হয়। পরে পরিবর্তিত কোষগুলো রোগীর শরীরে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে শরীরে ভ্রূণকালীন হিমোগ্লোবিন উৎপাদন বাড়ে, যা সিকল আকৃতির রক্তকণিকা তৈরির সমস্যা কমাতে সাহায্য করে। এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। কারণ প্রথমবারের মতো CRISPR প্রযুক্তি পরীক্ষাগারের সীমানা পেরিয়ে অনুমোদিত চিকিৎসায় বাস্তব প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করে।
তবে CRISPR-এর সম্ভাবনা শুধু রক্তরোগের চিকিৎসায় সীমাবদ্ধ নয়। ক্যানসার চিকিৎসায় রোগীর রোগপ্রতিরোধী কোষকে পরিবর্তন করে ক্যানসার কোষ শনাক্ত ও আক্রমণ করার ক্ষমতা বাড়ানোর গবেষণা চলছে। বংশগত অন্ধত্ব, পেশির কিছু জিনগত রোগ এবং অন্যান্য জটিল রোগের চিকিৎসা নিয়েও গবেষণা হচ্ছে। ভবিষ্যতে কোনো কোনো রোগের ক্ষেত্রে জন্মগত জিনগত ত্রুটি সংশোধনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। যদিও এসব সম্ভাবনার অনেকগুলো এখনো গবেষণা ও পরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে।
কৃষিক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বিজ্ঞানীরা এমন ফসল উদ্ভাবনের চেষ্টা করছেন, যেগুলো খরা, লবণাক্ততা, রোগবালাই ও প্রতিকূল আবহাওয়া সহ্য করতে পারবে। ফসলের পুষ্টিগুণ বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর গবেষণাতেও CRISPR ব্যবহৃত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যখন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে, তখন এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতের কৃষিব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশের জন্যও বিষয়টি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, খরা এবং নতুন নতুন উদ্ভিদরোগ কৃষির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। ভবিষ্যতে যথাযথ গবেষণা ও নিরাপত্তা মূল্যায়নের মাধ্যমে জিন সম্পাদনা প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে সক্ষম ফসল উদ্ভাবনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার হতে হবে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা, পরিবেশগত নিরাপত্তা এবং নৈতিক বিবেচনার ভিত্তিতে।
কিন্তু যে প্রযুক্তি মানবসভ্যতার জন্য এত বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে, তার সামনে রয়েছে কিছু গুরুতর প্রশ্নও। CRISPR প্রযুক্তি সব সময় শতভাগ নির্ভুলভাবে কাজ করে না। কখনো কখনো নির্ধারিত স্থানের বাইরে ডিএনএর অন্য অংশেও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন ঘটতে পারে। একে বলা হয় Off-target effect। এমন পরিবর্তন ভবিষ্যতে নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি মানুষের ভ্রূণের জিন পরিবর্তন করে সেই পরিবর্তন পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি আরও জটিল নৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
২০১৮ সালে চীনের বিজ্ঞানী হে জিয়ানকুই জিন সম্পাদিত মানবশিশু তৈরির ঘোষণা দিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেন। তাঁর এই কাজ আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সমাজে তীব্র সমালোচিত হয়। কারণ মানুষের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জিনগত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তনের আগে নিরাপত্তা, সম্মতি, নৈতিকতা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে যথেষ্ট নিশ্চয়তা থাকা প্রয়োজন। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, জিন সম্পাদনার ক্ষমতা যেন মানুষের ওপর অনিয়ন্ত্রিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার হাতিয়ার হয়ে না ওঠে।
আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো অর্থনৈতিক বৈষম্য। অত্যাধুনিক জিন সম্পাদনা চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হতে পারে। উন্নত দেশগুলোর মানুষ যদি এই প্রযুক্তির সুবিধা পায়, অথচ দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশের মানুষ তা থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই বিপ্লব নতুন বৈষম্যও তৈরি করতে পারে। তাই প্রযুক্তির উন্নয়নের পাশাপাশি এর সহজলভ্যতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল এমন এক জৈবিক প্রক্রিয়া থেকে, যার প্রকৃত উদ্দেশ্য বিজ্ঞানীরা প্রথমে বুঝতেই পারেননি। ১৯৮৭ সালে ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএতে অদ্ভুত কিছু পুনরাবৃত্ত বিন্যাস আবিষ্কারের সময় কেউ কল্পনাও করেননি যে একদিন সেই বিন্যাস ব্যবহার করে মানুষের জিন সম্পাদনার প্রযুক্তি তৈরি হবে। একটি ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া কোটি কোটি মানুষের চিকিৎসার ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সম্ভাবনার দরজা খুলে দেবে।
মানবসভ্যতার ইতিহাসে অনেক বড় পরিবর্তন এসেছে প্রকৃতির কোনো সাধারণ ঘটনা থেকে পাওয়া বৈজ্ঞানিক সূত্রের মাধ্যমে। আগুনের ব্যবহার, বিদ্যুতের আবিষ্কার, টেলিফোন, কম্পিউটার কিংবা ইন্টারনেট—প্রতিটি আবিষ্কার মানুষের জীবনযাত্রাকে নতুনভাবে সাজিয়েছে। CRISPR প্রযুক্তিও হয়তো তেমনই একটি সন্ধিক্ষণ। পার্থক্য হলো, এবার মানুষ শুধু বাইরের পৃথিবীকে পরিবর্তন করার ক্ষমতা অর্জন করছে না; বরং জীবনের ভেতরে থাকা জিনগত নির্দেশনাপত্র পরিবর্তনের ক্ষমতাও অর্জন করছে।
একটি ব্যাকটেরিয়ার আত্মরক্ষার কৌশল থেকে শুরু হওয়া এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে হয়তো বংশগত অনেক রোগের চিকিৎসা, উন্নত খাদ্য উৎপাদন এবং জীববিজ্ঞানের নতুন অধ্যায়ের ভিত্তি তৈরি করবে। তবে এই শক্তির ব্যবহার কতটা দায়িত্বশীল হবে, তার ওপরই নির্ভর করবে মানবসভ্যতার আগামী দিনের অনেক কিছু। কারণ প্রকৃতিকে বোঝার পর মানুষ যখন প্রকৃতির নিয়ম পরিবর্তন করার ক্ষমতা অর্জন করে, তখন সেই ক্ষমতার সঙ্গে দায়িত্বও বহুগুণ বেড়ে যায়।
আপনার মতামত জানানঃ