পুরান ঢাকায় পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত মাদকবিরোধী অভিযানে প্রকাশ্যে পিস্তল প্রদর্শনের অভিযোগ ওঠার ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—তিনি কি আইনের ঊর্ধ্বে?
শনিবার দিনের আলোয় পরিচালিত ওই অভিযানের ভিডিও ইশরাক নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন। তবে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) জানিয়েছে, ঘটনাটি তদন্তাধীন রয়েছে।
তার এ কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা, বিরোধী দলের রাজনীতিক, বিশিষ্ট নাগরিক ও আইন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের বক্তব্য, আগ্নেয়াস্ত্রের বৈধ লাইসেন্স থাকলেও মানুষকে ভয় দেখানো বা আতঙ্কিত করার জন্য সেটি ব্যবহার করা যায় না। লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘন করলে আইনগত শাস্তি হতে পারে।
ইশরাক দাবি করেছেন, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইনকিলাব মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের পর তিনি আইনগতভাবে আগ্নেয়াস্ত্রটি সংগ্রহ করেছিলেন। তবে ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের আগে জমা দেওয়া হলফনামায় আগ্নেয়াস্ত্র-সংক্রান্ত ঘরে তিনি ‘প্রযোজ্য নয়’ লিখেছিলেন।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলেছেন, ওই তথ্য থেকে বোঝা যায় যে তিনি আগ্নেয়াস্ত্র থাকার বিষয়টি হলফনামায় উল্লেখ করেননি।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রতিমন্ত্রীর আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
তিনি টাইমসকে বলেন, “আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য, অপরাধীদের আটক করা বা শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়। একজন প্রতিমন্ত্রী যখন নিজেই আইন হাতে তুলে নেন, তখন তা ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে বিবেচিত হয় এবং পুলিশের প্রতি অনাস্থার বার্তা দেয়।”
২০১৬ ও ২০২৫ সালের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহারসংক্রান্ত নীতিমালা অনুযায়ী, আত্মরক্ষার পরিস্থিতি ছাড়া মানুষকে ভয় দেখানো বা হয়রানি করার উদ্দেশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন নিষিদ্ধ।
১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইনের ২১ ধারা অনুযায়ী, অন্য কোনো ধারায় শাস্তিযোগ্য না হলে লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গের অপরাধে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। কর্তৃপক্ষ অস্ত্রের লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিলও করতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মুরশিদ বলেন, মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা পুলিশের অথবা এ কাজে অনুমোদিত অন্যান্য সংস্থার দায়িত্ব।
তিনি বলেন, “পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট প্রশাসন মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করতে পারে। ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কোনো ঝুঁকি না থাকলে ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন করে কোনো অভিযানে অংশ নেওয়াকে লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করা হবে। দেশে যদি সত্যিকার অর্থে আইনের শাসন থাকে, তাহলে এই ঘটনার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘটনাটিকে সরাসরি সংবিধান লঙ্ঘন বা শপথ ভঙ্গ বলা না গেলেও একজন প্রতিমন্ত্রী সংবিধান ও আইন রক্ষার শপথ নেন। তাই তাঁর আচরণ প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
ইশরাকের নিজের দলেও এ ঘটনা নিয়ে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। বিএনপির দুজন যুগ্ম মহাসচিব এবং দলটির সম্পাদকমণ্ডলীর পদে থাকা দুজন আইনজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, তাঁর কর্মকাণ্ড দল ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে।
বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতারাও ঘটনাটির সমালোচনা করেছেন। তাঁদের মতে, এ ধরনের আচরণ আইনের শাসনের পরিপন্থী।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ টাইমসকে বলেন, “রাষ্ট্রজুড়ে একধরনের বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। এটি সরকারের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা এবং আইন প্রয়োগে ব্যর্থতার একটি উদাহরণ।”
রোববার বিকেলে নিজের যাচাইকৃত ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইশরাক তাঁর কর্মকাণ্ডের পক্ষে যুক্তি দেন। বিবৃতিটি তাঁর প্রেস কর্মকর্তা মাহফুজ কবির মুক্তার স্বাক্ষরে প্রকাশ করা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর ৩০ থেকে ৩৫ জন ব্যক্তি আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে তাঁর গাড়িবহরের দিকে এগিয়ে আসেন। তাঁরা চিৎকার করছিলেন এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছিলেন।
বিবৃতি অনুযায়ী, হামলার আশঙ্কা এবং জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ইশরাক ও তাঁর সরকারি নিরাপত্তারক্ষীরা গাড়ি থেকে নেমে আত্মরক্ষার জন্য অল্প সময়ের জন্য তাঁদের লাইসেন্সধারী আগ্নেয়াস্ত্র উঁচু করেন।
বিবৃতিতে আরও অভিযোগ করা হয়, ভিডিওটি সম্পাদনা করে এমনভাবে প্রচার করা হচ্ছে, যাতে ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি আড়াল হয়ে যায়।
শনিবার বিকেলে পুরান ঢাকার দয়াগঞ্জ এলাকায় গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনের কাছে পরিচালিত মাদকবিরোধী অভিযানের ভিডিও ইশরাক ফেসবুকে প্রকাশ করার পর বিতর্ক শুরু হয়। পরে তিনি ভিডিওটি সরিয়ে নেন এবং বিবৃতি দেন।
নির্বাচনী হলফনামায় কেন আগ্নেয়াস্ত্রের তথ্য উল্লেখ করেননি, তা জানতে ফোনে ইশরাকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সফল হওয়া যায়নি।
তাঁর প্রেস কর্মকর্তা মাহফুজ কবির মুক্তা এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
তিনি বলেন, “আমরা আনুষ্ঠানিক বিবৃতির বাইরে কিছু বলছি না।”
শনিবার প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, ইশরাক একটি গাড়ি থেকে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নেমে রেললাইনের কাছে কয়েকজন ব্যক্তিকে ধাওয়া করছেন।
ধাওয়া খাওয়া কয়েকজনকে বলতে শোনা যায়, “স্যার, আমি কিছু করিনি। আমি গরিব মানুষ স্যার।”
জবাবে ইশরাককে বলতে শোনা যায়, “পুলিশ আসুক, তারপর কথা বলব।”
অভিযানের সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন ব্যক্তিগতভাবে নিয়োগ করা দুই দেহরক্ষী তফাজ্জল হোসেন ও লাভলু এবং একজন সরকারি নিরাপত্তারক্ষী।
ভিডিওতে আরও দেখা যায়, একজন ব্যক্তি অন্য একজনকে লাথি মারছেন।
পরে ইশরাক ভিডিওটি ফেসবুকে ‘Ishraque in action’ ক্যাপশন দিয়ে প্রকাশ করেন।
ডিএমপির গোয়েন্দা শাখার প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেছেন, ঘটনাটি তদন্তের জন্য ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
তদন্তে আইনের কোনো লঙ্ঘন পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া ও জনসংযোগ) কামরুম মুনিরা টাইমসকে বলেন, নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান চলমান থাকলেও শনিবার ইশরাকের পরিচালিত অভিযান সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন না।
তিনি বলেন, বিষয়টি পর্যালোচনার পর পরবর্তী পদক্ষেপ জানানো হবে।
গেন্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ইশরাক ছয়জনকে আটক করার পর পুলিশকে বিষয়টি জানানো হয়।
পরে থানায় ফোন করার পর পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আটক ব্যক্তিদের নিয়ে আসেন।
আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে সাদা গুঁড়ার মতো একটি পদার্থ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে সেটি হেরোইন কি না, তা নিশ্চিত করতে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে জানান ওই কর্মকর্তা।
সাবেক ঢাকা সিটি মেয়র সাদেক হোসেন খোকার ছেলে এবং বিএনপি নেতা ইশরাক এর আগেও তাঁর আচরণ নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছেন।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের কবরে ফুল দিতে যাওয়ার সময় দলীয় কর্মীদের সঙ্গে কথিত অনুপযুক্ত আচরণের অভিযোগে তিনি সমালোচিত হয়েছিলেন।
তাঁর আচরণ নিয়ে একাধিকবার বিতর্ক তৈরি হলেও এখন পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে দলীয় কোনো সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
২০২৫ সালের মে মাসে ইশরাকের সমর্থকেরা তাঁকে মেয়র হিসেবে শপথ পড়ানো এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার দাবিতে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারি বাসভবন যমুনার সামনে অবস্থান ও অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন।
এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকারবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া দায়িত্ব নেওয়ার পর ইশরাক তাঁর সমর্থকদের দিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে বিক্ষোভ করান। এর ফলে সংস্থাটির কার্যক্রমে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়।
আপনার মতামত জানানঃ