কাগজে-কলমে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় তিন হাজার ডলারের ঘরে পৌঁছেছে। উন্নয়নের পরিসংখ্যানে এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। কিন্তু বাজারে নিত্যপণ্য কিনতে গিয়ে যখন একজন গৃহিণীকে হিসাব মেলাতে হিমশিম খেতে হয়, নির্মাণশ্রমিক দিন শেষে মজুরি হাতে পেয়েও সংসারের খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন, কিংবা একজন তরুণ শিক্ষাজীবন শেষ করে চাকরির সন্ধানে বছরের পর বছর ঘুরে বেড়ান, তখন মাথাপিছু আয়ের এই পরিসংখ্যান তাঁদের জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। প্রশ্ন ওঠে, দেশের আয় বাড়লে সাধারণ মানুষের স্বস্তি বাড়ছে না কেন? অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় এবং উন্নয়নের বড় বড় লক্ষ্য থাকার পরও কেন মানুষের জীবনে বাড়ছে আর্থিক চাপ?
বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতা বুঝতে হলে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে আয়, ব্যয়, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি, শিল্পের অবস্থা এবং রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে। কারণ অর্থনীতির সাফল্য কেবল জাতীয় আয়ের অঙ্ক দিয়ে বিচার করা যায় না। সেই আয় কীভাবে তৈরি হচ্ছে, কারা আয় করছে, কর্মসংস্থান কতটা বাড়ছে এবং সাধারণ মানুষ তার সুফল কতটা পাচ্ছে—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ২০ ডলার। কিন্তু এই হিসাব করা হয়েছিল ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তিতে। পরে সংশোধিত হিসাবে প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৬৮ শতাংশে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাসেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগের ইঙ্গিত রয়েছে। অর্থাৎ জাতীয় আয়ের অঙ্ক বাড়লেও অর্থনীতির গতিতে প্রত্যাশিত শক্তি দেখা যাচ্ছে না।
মাথাপিছু আয় একটি গড় হিসাব। দেশের মোট জাতীয় আয়কে জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে এই সূচক নির্ধারণ করা হয়। ফলে এটি দিয়ে প্রত্যেক নাগরিকের প্রকৃত আয় বোঝা যায় না। কোনো দেশে ধনী মানুষের আয় দ্রুত বাড়লেও জাতীয় গড় আয় বাড়তে পারে, অথচ নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনে তার প্রতিফলন নাও ঘটতে পারে। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে এই পার্থক্যটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার পরিচয় পাওয়া যায় তাঁদের ক্রয়ক্ষমতা, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোর সক্ষমতার মধ্য দিয়ে।
দারিদ্র্যের সাম্প্রতিক চিত্র এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে। ২০১৬ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০২২ সালে তা কমে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসে। এটি ছিল দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে জাতীয় দারিদ্র্যের হার বেড়ে আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার হিসাব অনুযায়ী, গত অর্থবছরেই প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দারিদ্র্য কমানোর দীর্ঘদিনের অগ্রগতি এভাবে পিছিয়ে পড়ার অর্থ হলো, বহু পরিবার আবার আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে। যাঁরা সামান্য আয় বাড়িয়ে দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠেছিলেন, তাঁদের একটি অংশ মূল্যস্ফীতি, আয় কমে যাওয়া কিংবা কর্মসংস্থান হারানোর কারণে আবার সংকটে পড়তে পারেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক সুরক্ষার সীমাবদ্ধতা। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের দরিদ্র মানুষের প্রায় ৬২ শতাংশ সামাজিক সুরক্ষার আওতার বাইরে রয়েছেন। ফলে অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলানোর জন্য অনেক পরিবারের হাতে কার্যকর সহায়তা থাকে না।
এই সংকটের অন্যতম বড় কারণ কর্মসংস্থানের দুর্বলতা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ২৪ হাজার। তাঁদের মধ্যে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণের সংখ্যা ২০ লাখ ৩২ হাজার। অর্থাৎ বেকার জনগোষ্ঠীর বড় অংশই তরুণ। উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার। এই পরিসংখ্যান শুধু চাকরির অভাবের চিত্র তুলে ধরে না; এটি শিক্ষা, দক্ষতা এবং শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যকার অসংগতির কথাও সামনে আনে।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জন করেও যখন একজন তরুণ উপযুক্ত চাকরি পান না, তখন তাঁর ব্যক্তিগত অনিশ্চয়তার পাশাপাশি পরিবার ও অর্থনীতির ওপরও চাপ তৈরি হয়। শিক্ষায় বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যায় না, ভোগব্যয় কমে এবং নতুন পরিবার গঠন কিংবা উদ্যোক্তা হওয়ার মতো সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যায়। অন্যদিকে, নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণও কমেছে। ২০২২ সালের ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে তা নেমে ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশে এসেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থনীতির সম্ভাব্য জনশক্তির একটি বড় অংশ কার্যকরভাবে কাজে যুক্ত হতে না পারলে উৎপাদনশীলতা ও আয় বৃদ্ধির পথও সংকুচিত হয়।
কর্মসংস্থানের সংকটের আরেকটি বড় দিক হলো শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া। শিল্প পুলিশের হিসাবে, ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দুই বছরে ৪৫৭টি শিল্পকারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে ১৭০টি বস্ত্র ও পোশাক খাতের কারখানা। উদ্যোক্তা সংগঠনগুলোর হিসাবে বন্ধ কারখানার সংখ্যা পাঁচ শতাধিক হতে পারে। শুধু পোশাক খাতেই প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর হিসাবের উল্লেখ রয়েছে।
একটি কারখানা বন্ধ হওয়া মানে শুধু একজন উদ্যোক্তার ব্যবসা বন্ধ হওয়া নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শত শত শ্রমিকের আয়, তাঁদের পরিবারের খাবার, সন্তানের পড়াশোনা, বাসাভাড়া এবং চিকিৎসার ব্যয়। পাশাপাশি কারখানার সরবরাহকারী, পরিবহনকর্মী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাজারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এভাবে একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংকট বৃহত্তর অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে।
গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা, কার্যাদেশ কমে যাওয়া, ঋণপ্রাপ্তির জটিলতা, ঋণপত্র বা এলসি খুলতে সমস্যা এবং শ্রম অসন্তোষ—শিল্প খাতের দুরবস্থার পেছনে বিভিন্ন কারণ কাজ করছে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে দেশীয় পণ্যের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমে যায়। বিদেশি ক্রেতারা অন্য দেশের সরবরাহকারীর দিকে ঝুঁকতে পারেন। ফলে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান তৈরির সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিল্প খাতকে সচল রাখতে তাই শুধু প্রণোদনা ঘোষণা যথেষ্ট নয়; উৎপাদনের পরিবেশ, জ্বালানি সরবরাহ এবং আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে মূল্যস্ফীতি। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। অর্থাৎ গড় মজুরি বৃদ্ধির তুলনায় মূল্যস্ফীতি বেশি থাকায় শ্রমজীবী মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। আইএমএফের অক্টোবর ২০২৬-এর পূর্বাভাসে চলতি অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে যাওয়ার সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে। এসব পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হবে কি না, তা সময়ই বলবে; তবে এগুলো অর্থনীতির ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্কবার্তা দিচ্ছে।
মূল্যস্ফীতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের পরিবারে। যাঁদের মাসিক আয় নির্দিষ্ট, তাঁদের পক্ষে প্রতিবার পণ্যের দাম বাড়ার সঙ্গে আয় বাড়ানো সম্ভব নয়। ফলে সংসারের বাজেট সামলাতে খাবারের পরিমাণ বা মান কমানো, চিকিৎসা পিছিয়ে দেওয়া, সন্তানের শিক্ষার খরচ সংকুচিত করা কিংবা সঞ্চয় ভেঙে খরচ চালানোর মতো সিদ্ধান্ত নিতে হয়। অনেক পরিবারকে আবার ধারদেনার আশ্রয় নিতে হয়। এভাবে মূল্যস্ফীতি শুধু অর্থনৈতিক সূচক হয়ে থাকে না; এটি মানুষের জীবনযাত্রার মান, পুষ্টি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকেও প্রভাবিত করে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এই চাপ আরও বাড়ায়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার পর বাংলাদেশেও জ্বালানির দাম সমন্বয় করা হয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেলের দাম প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। জুনে বিদ্যুতের খুচরা দাম গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বেড়ে ইউনিটপ্রতি ১০ টাকা ৬৩ পয়সা হয়েছে। অক্টোবরে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দামও বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
সরকারের যুক্তি হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দ্বিগুণের বেশি বাড়লেও দেশে পুরোপুরি সেই চাপ সমন্বয় করা হয়নি। অন্যদিকে, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের লোকসান প্রায় ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জ্বালানি আমদানির ব্যয় ও ভর্তুকির চাপ বাস্তব সমস্যা। কিন্তু জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব শুধু গাড়ির জ্বালানি বা বিদ্যুৎ বিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কৃষিতে সেচ, পণ্য পরিবহন, কারখানার উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণের খরচ বাড়ে। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ চাল, ডাল, সবজি, মাছসহ নিত্যপণ্যের দামে গিয়ে যুক্ত হয়।
অর্থনীতির আরেকটি গভীর সমস্যা ব্যাংক খাতের দুর্বলতা। ২০২৬ সালের জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ বলে প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। এত বিপুল অঙ্কের ঋণ খেলাপি হয়ে পড়লে ব্যাংকের অর্থ ব্যবস্থাপনা ও নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে সৎ উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়ার পেছনে এই পরিস্থিতিও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
খেলাপি ঋণের সমস্যা সমাধানে শুধু নতুন ঋণ বিতরণ বাড়ালেই হবে না। ঋণ অনুমোদনের মানদণ্ড, ঋণের অর্থের ব্যবহার, তদারকি এবং আদায়প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি ও ব্যবসায়িক কারণে সাময়িক সমস্যায় পড়া উদ্যোক্তাদের মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী পরিচয়ের কারণে কেউ যেন আইনের বাইরে সুবিধা না পান, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংক খাতের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে স্বচ্ছতা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য।
এদিকে রাষ্ট্রের ঋণের বোঝাও বাড়ছে। অর্থ বিভাগের হিসাবে, ২০২৪ সালের জুনে সরকারের ঋণ ছিল ১৮ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে ঋণ বেড়ে প্রায় ২৩ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে বলে প্রকাশিত কলামে উল্লেখ করা হয়েছে। চলতি বাজেটে শুধু সুদ পরিশোধের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। সরকারের ঋণ সব সময় নেতিবাচক নয়; উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, অবকাঠামো ও মানবসম্পদ উন্নয়নে ঋণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু ঋণের অর্থ যদি যথাযথভাবে ব্যবহার না হয়, প্রকল্পের ব্যয় ও সময় নিয়ন্ত্রণে না থাকে এবং রাজস্ব আয় পর্যাপ্ত না বাড়ে, তাহলে ঋণের সুদ পরিশোধের চাপ ক্রমেই বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের সামনে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও এলডিসি উত্তরণের প্রশ্নও রয়েছে। ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের নির্ধারিত সময় উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারের অনুরোধে ২০২৯ সাল পর্যন্ত সময় বাড়ানোর সুপারিশ করা হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়টি তখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। উত্তরণ দেশের উন্নয়নের স্বীকৃতি হলেও এর সঙ্গে বাণিজ্যসুবিধা, রপ্তানির প্রতিযোগিতা এবং নীতিগত প্রস্তুতির প্রশ্ন জড়িত। তাই সময় বাড়ানোর সুযোগ পাওয়া গেলে সেটিকে কাঠামোগত সংস্কার ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর কাজে ব্যবহার করতে হবে।
সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। লক্ষ্যটি উচ্চাভিলাষী, তবে অর্থনীতির বর্তমান প্রবৃদ্ধির গতি, বিনিয়োগের স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের ঘাটতি এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতা বিবেচনায় নিলে সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অর্থনীতির আকার বাড়ানোর পাশাপাশি মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো, দারিদ্র্য কমানো এবং মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে বড় অর্থনীতির স্বপ্ন সাধারণ মানুষের কাছে অর্থবহ হবে না।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রথমেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য নীতি, বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং সরবরাহব্যবস্থার অযৌক্তিক ব্যয় কমানো প্রয়োজন। পাশাপাশি নতুন দরিদ্রদের চিহ্নিত করে লক্ষ্যভিত্তিক নগদ সহায়তা ও সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ করতে হবে। বন্ধ কারখানা পুনরুজ্জীবন এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরির জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া হলে তার সঙ্গে স্বচ্ছতা, উৎপাদন ও শ্রমিকের চাকরি রক্ষার শর্ত যুক্ত থাকা দরকার।
ব্যাংক ও রাজস্ব খাতের সংস্কারও পিছিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে কর প্রশাসনের দক্ষতা, করের আওতা এবং স্বেচ্ছায় কর দেওয়ার পরিবেশ উন্নত করতে হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের জন্য স্থিতিশীল নীতি, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, দক্ষ মানবসম্পদ এবং সহজে অর্থায়ন পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। তরুণদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও আর্থিক সহায়তা দিতে হবে। নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে, উন্নয়নের সাফল্য মাপার ক্ষেত্রে মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দিতে হবে। মাথাপিছু আয় তিন হাজার ডলার হওয়া একটি পরিসংখ্যানগত অর্জন, কিন্তু একজন মানুষ তাঁর আয় দিয়ে প্রয়োজনীয় খাবার কিনতে পারছেন কি না, একটি পরিবার সন্তানের পড়াশোনা ও চিকিৎসার খরচ মেটাতে পারছে কি না, একজন তরুণ কাজ পাচ্ছেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরই অর্থনীতির বাস্তব অবস্থার পরিচয় দেয়।
বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনা রয়েছে, আবার চ্যালেঞ্জও কম নয়। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অতীতের দায় নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রয়োজন। প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হবে, কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধির সুফল মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে। বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, তবে তা থেকে টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে কি না, সেটিও দেখতে হবে। রাষ্ট্রের আয় বাড়াতে হবে, কিন্তু মানুষের ওপর অযৌক্তিক চাপ না দিয়ে ন্যায়সংগত ও কার্যকর রাজস্বব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন দেখা দোষের নয়। তবে সেই স্বপ্নের ভিত্তি হতে হবে শক্তিশালী শিল্প, কর্মসংস্থান, নিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি, দায়িত্বশীল আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর। যে অর্থনীতিতে লাখ লাখ মানুষ কাজের অনিশ্চয়তায় থাকেন, বহু পরিবার দারিদ্র্যের দিকে ফিরে যান এবং শ্রমজীবী মানুষ আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম খান, সেখানে উন্নয়নের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো সাধারণ মানুষের জীবন কতটা স্বস্তিদায়ক হচ্ছে।
অর্থনীতির প্রকৃত সাফল্য কেবল জাতীয় আয়ের অঙ্কে নয়; সেই আয়ের সুফল কত মানুষের জীবনে পৌঁছাচ্ছে, তার মধ্যেই নিহিত। বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন এমন উন্নয়ন, যেখানে মাথাপিছু আয়ের পরিসংখ্যানের সঙ্গে মানুষের বাস্তব জীবনও এগিয়ে যাবে। কারণ উন্নয়নের লক্ষ্য শুধু অর্থনীতিকে বড় করা নয়, দেশের মানুষের জীবনকে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বচ্ছল করে তোলা।
আপনার মতামত জানানঃ