
সম্রাটের সিংহাসন সরিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু রাষ্ট্রের ওপর জনগণের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে বদলাতে হয় আরও অনেক কিছু—সেনাবাহিনীর আনুগত্য, অর্থের নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমতা হস্তান্তরের নিয়ম এবং বিরোধী মতের নিরাপত্তা। ১৯১১ সালের চীনা বিপ্লব এই ব্যবধানের একটি বড় ঐতিহাসিক উদাহরণ। বিপ্লব চিং রাজবংশের অবসান ঘটিয়েছিল; কিন্তু নতুন প্রজাতন্ত্রের জন্মের সঙ্গে স্থায়ী গণতন্ত্রের জন্ম হয়নি।
১০ অক্টোবর, উচাং অভ্যুত্থানের ১১৫ বছর। ঘটনাটিকে শুধু একটি রাজবংশের পতন হিসেবে দেখলে এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আড়ালে পড়ে যায়: পুরোনো শাসক চলে যাওয়ার পর নতুন রাষ্ট্রে ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করবে কে?
চিং শাসনের সংকট হঠাৎ তৈরি হয়নি। বিদেশি শক্তির চাপ, সামরিক পরাজয় এবং সংস্কারের সীমাবদ্ধতা রাজদরবারের গ্রহণযোগ্যতা ক্ষয় করেছিল। রাজতন্ত্র সংস্কার করে টিকিয়ে রাখার সমর্থক এবং রাজতন্ত্র উৎখাতের বিপ্লবীরা একই সমাধান চাননি। পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ব্যাপক হলেও পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রের চেহারা নিয়ে ঐকমত্য ছিল না। Wikipedia
১৯১১ সালে রেলপথের মালিকানা ও অর্থায়ন ঘিরে বিরোধ এই সংকটকে তীব্র করে। স্থানীয় উদ্যোগের রেলপ্রকল্প জাতীয়করণ এবং বিদেশি ব্যাংকের অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত করার সরকারি পরিকল্পনা ক্ষোভ সৃষ্টি করে। সিচুয়ানে রেলপথ রক্ষার আন্দোলন দমাতে হুবেই থেকে সেনা সরানোর ফলে উচাংয়ে বিদ্রোহের সুযোগ তৈরি হয়। অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত কীভাবে রাজনৈতিক আস্থার সংকটে পরিণত হয়, ঘটনাটি তারও উদাহরণ। Wikipedia
১০ অক্টোবর উচাংয়ে আধুনিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নিউ আর্মির সদস্যদের বিদ্রোহ শুরু হয়। এরপর বিভিন্ন প্রদেশ চিং সরকারের কর্তৃত্ব প্রত্যাখ্যান করতে থাকে। সুন ইয়াত-সেন বিপ্লবী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক ও প্রতীক হলেও উচাং অভ্যুত্থান সরাসরি তাঁর নেতৃত্বে সংঘটিত হয়নি। বিপ্লব ছিল বহু সংগঠন, স্থানীয় নেতৃত্ব এবং বিদ্রোহী সেনার মিলিত প্রবাহ। Office of the Historian
এই বহুমুখিতা পুরোনো শাসনের বিরুদ্ধে শক্তি তৈরি করেছিল। কিন্তু বিজয়ের পর সেটিই সমন্বয়ের কঠিন সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। রাজদরবারকে প্রত্যাখ্যান করা এবং একটি জবাবদিহিমূলক কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র পরিচালনা করা আলাদা কাজ। প্রথমটির জন্য অভিন্ন প্রতিপক্ষ যথেষ্ট হতে পারে; দ্বিতীয়টির জন্য দরকার অভিন্ন নিয়ম।
১৯১২ সালের ১ জানুয়ারি নানজিংয়ে সুন ইয়াত-সেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। কিন্তু উত্তরে সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী বেইয়াং আর্মির ওপর নিয়ন্ত্রণ ছিল ইউয়ান শিকাইয়ের। ফলে বিপ্লবীদের রাজনৈতিক দাবি এবং ইউয়ানের সামরিক ক্ষমতা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে যায়। দেশকে একত্র করা ও গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি কমানোর সমঝোতায় সুন তাঁর জন্য রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়ে দিতে রাজি হন, যদি তিনি সম্রাটের পদত্যাগ নিশ্চিত করেন। ১২ ফেব্রুয়ারি শেষ চিং সম্রাট পুয়ির পদত্যাগ ঘোষণা হয়; মার্চে ইউয়ান অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। Office of the Historian
সমঝোতাটিকে কেবল সুনের ভুল বলে ব্যাখ্যা করা সহজ, কিন্তু অসম্পূর্ণ। বিপ্লবীরা সামরিক বাস্তবতা এড়িয়ে দেশ পরিচালনা করতে পারতেন না। সমস্যা ছিল, প্রয়োজনীয় আপসের সঙ্গে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা গেল না। যাঁর হাতে সংগঠিত সশস্ত্র শক্তি ছিল, তাঁকে সংবিধানের সীমা মানাতে নবীন প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা কম ছিল।
এখানেই প্রজাতন্ত্র ও গণতন্ত্রের পার্থক্য স্পষ্ট হয়। প্রজাতন্ত্রে রাষ্ট্রপ্রধান বংশগত সম্রাট না-ও হতে পারেন। কিন্তু রাষ্ট্রপ্রধানকে প্রশ্ন করা, তাঁর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা এবং নিয়ম মেনে তাঁকে সরানো সম্ভব না হলে জনগণের কর্তৃত্ব অসম্পূর্ণ থেকে যায়। চীনে পদবির পরিবর্তন হয়েছিল; ক্ষমতার ভারসাম্য ততটা বদলায়নি।
তবু গণতান্ত্রিক সম্ভাবনা একেবারে অনুপস্থিত ছিল না। রাজনৈতিক দল গড়ে ওঠে এবং ১৯১২–১৩ সালে সংসদীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সুনের সহযোগী সং জিয়াওরেনের নেতৃত্বে সংগঠিত কুওমিনতাং বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে আসে। সংসদ ও মন্ত্রিসভার মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনা তৈরি হয়। তবে ভোটাধিকার ছিল সীমিত: বয়সের পাশাপাশি শিক্ষা, সম্পত্তি বা কর এবং বসবাসের যোগ্যতার শর্ত ছিল; নারীরা ভোটাধিকার পাননি। নতুন প্রজাতন্ত্র তখনো সর্বজনীন রাজনৈতিক অংশগ্রহণের রাষ্ট্র হয়ে ওঠেনি। Wikipedia
নির্বাচনের পরে মূল দ্বন্দ্ব ছিল, রাষ্ট্রপতি কি সংসদীয় নিয়ন্ত্রণ মেনে নেবেন? জনগণের প্রতিনিধিত্বের দাবি এবং সামরিক শক্তিনির্ভর নির্বাহী ক্ষমতা মুখোমুখি হয়ে যায়।
১৯১৩ সালের মার্চে সাংহাই রেলস্টেশনে সং জিয়াওরেন গুলিবিদ্ধ হন এবং পরে মারা যান। হত্যার সঙ্গে ইউয়ানের সরকারের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। তবে ইউয়ান নিজে সরাসরি নির্দেশ দিয়েছিলেন—এটিকে বিতর্কহীনভাবে নিষ্পত্তি হওয়া সত্য বলা উচিত নয়। রাজনৈতিক পরিণতি ছিল স্পষ্ট: সমঝোতার আস্থা ভেঙে পড়ে এবং সংসদীয় প্রতিযোগিতা সহিংস সংঘাতের দিকে এগোয়। The Splendid Chinese Culture
একই বছরে সংসদের সম্মতি ছাড়াই ইউয়ান বিদেশি ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে বড় ঋণ নেন। তাঁর বিরুদ্ধে বিপ্লবীদের সশস্ত্র প্রতিরোধ, যা ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’ নামে পরিচিত, বেইয়াং বাহিনীর কাছে পরাজিত হয়। এরপর কুওমিনতাং নিষিদ্ধ হয়। ১৯১৪ সালে সংসদ ভেঙে দেওয়া হয় এবং ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত হয়। The Splendid Chinese Culture
এই ঘটনাপ্রবাহ দেখায়, নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া এবং নির্বাচনের ফল কার্যকর থাকা এক বিষয় নয়। নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান যদি অর্থ, প্রশাসন ও বলপ্রয়োগের ওপর কার্যকর নজরদারি করতে না পারে, তবে তার আনুষ্ঠানিক মর্যাদা তাকে রক্ষা করার জন্য যথেষ্ট হয় না। বিরোধীদের অস্তিত্ব নির্বাহী শাসকের সম্মতির ওপর নির্ভর করলে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নিরাপদ থাকে না।
বিদেশি শক্তির ভূমিকাও উপেক্ষা করা যায় না। ঋণ, বাণিজ্যিক স্বার্থ ও কূটনৈতিক সম্পর্ক নতুন রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছিল। বাইরের অর্থসংস্থানের সুযোগ শাসককে অভ্যন্তরীণ প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন পাশ কাটাতে সাহায্য করতে পারে। তবে চীনের গণতান্ত্রিক ব্যর্থতাকে শুধু বিদেশি ষড়যন্ত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করলে সামরিক কর্তৃত্ব, স্থানীয় ক্ষমতার প্রতিযোগিতা এবং নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের দায় আড়ালে পড়ে।
ইউয়ানের ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণের সবচেয়ে নাটকীয় পরিণতি আসে ১৯১৫ সালের শেষে, যখন তিনি নিজেকে সম্রাট হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। ব্যাপক বিরোধিতায় ১৯১৬ সালের মার্চে সেই উদ্যোগ বাতিল করতে হয়। জুনে তাঁর মৃত্যুর পর কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব আরও দুর্বল হয় এবং আঞ্চলিক সামরিক নেতাদের প্রতিযোগিতা বিস্তৃত হয়। Wikipedia
সুতরাং বিপ্লবের পর সমস্যা শুধু একজন শক্তিশালী ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা জমা হওয়া ছিল না। সেই ব্যক্তির পতনের পরও এমন রাষ্ট্রীয় কাঠামো প্রতিষ্ঠিত ছিল না, যা ব্যক্তিগত সামরিক আনুগত্যের বদলে অভিন্ন নিয়মে দেশ চালাবে। স্বৈরশাসকের দুর্বলতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে গণতন্ত্রের শক্তি হয়ে ওঠেনি; অনেক ক্ষেত্রে তা ক্ষমতার খণ্ডীকরণে রূপ নেয়।
এ কারণে ১৯১১ সালের বিপ্লবকে অর্থহীন বলা ভুল। এটি রাজবংশের বংশগত শাসনের বৈধতা ভেঙেছিল এবং প্রজাতন্ত্রকে বাস্তব রাজনৈতিক সম্ভাবনা করেছিল। দল, নির্বাচন ও সংসদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টাও হয়েছিল। কিন্তু রাজতন্ত্রের অবসানকে পূর্ণ গণতান্ত্রিক রূপান্তর ধরে নেওয়াও ভুল।
ইতিহাসের এই অভিজ্ঞতাকে কোনো জাতির গণতন্ত্রের অযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে পড়া যায় না। এখানে ব্যর্থ হয়েছিল একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক রূপান্তর—যেখানে সশস্ত্র শক্তি, অর্থ এবং প্রতিনিধিত্বমূলক কর্তৃত্বের মধ্যে গভীর অসমতা ছিল। বিপ্লবের ফল আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল না; নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত ও প্রতিষ্ঠান গড়ার সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
উচাংয়ের ১১৫ বছর পর তাই সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক প্রশ্নটি শুধু কে ক্ষমতায় এলেন, তা নয়। নতুন শাসককে কে নিয়ন্ত্রণ করবে? বিরোধী পক্ষ কীভাবে নিরাপদ থাকবে? রাষ্ট্রের অর্থের হিসাব কে চাইবে? সেনাবাহিনী কার নিয়ম মানবে? ক্ষমতা হারানোর পরও রাজনৈতিক পক্ষগুলোর জন্য নিয়মের ভেতরে থাকার সুযোগ থাকবে কি?
১৯১১ সালের চীনা বিপ্লব দেখিয়েছে, রাজতন্ত্রের পতন একটি ঐতিহাসিক দরজা খুলে দিতে পারে। সেই দরজা দিয়ে গণতন্ত্র প্রবেশ করবে কি না, তা নির্ভর করে ক্ষমতাকে নিয়মের অধীন করার ওপর। সিংহাসন খালি হওয়ার মুহূর্তটি দৃশ্যমান; নাগরিকের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার কাজ দীর্ঘ, কঠিন এবং প্রতিদিনের।
আপনার মতামত জানানঃ