বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে, দীর্ঘ হচ্ছে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর তালিকা, বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। বর্ষা মৌসুম পেরিয়ে অক্টোবরেও পরিস্থিতির উদ্বেগজনক অবনতি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। এমন পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু মোকাবিলার প্রথম শর্ত হওয়ার কথা নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ, আক্রান্তদের শনাক্তকরণ এবং মৃত্যুর প্রকৃত হিসাব নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজেই দেখা দিয়েছে বড় ধরনের ঘাটতি। দেশের ৮৪ শতাংশের বেশি সরকারি হাসপাতাল থেকে ডেঙ্গু রোগীর তথ্য পাচ্ছে না স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ফলে সরকারি পরিসংখ্যানে উঠে আসা আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা দিয়ে দেশের প্রকৃত পরিস্থিতি কতটা বোঝা যাচ্ছে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে গুরুতর প্রশ্ন।
বণিক বার্তার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট সরকারি হাসপাতালের সংখ্যা ৬১৯টি। এর মধ্যে মাত্র ৯৭টি হাসপাতাল থেকে ডেঙ্গু রোগীর তথ্য পাচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বাকি ৫২২টি হাসপাতাল থেকে কোনো তথ্য আসছে না। অর্থাৎ দেশের মাত্র ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ সরকারি হাসপাতাল ডেঙ্গু-সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ করছে। বিপরীতে প্রায় ৮৪ দশমিক ৩ শতাংশ সরকারি হাসপাতালের তথ্য কেন্দ্রীয় হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছে।
এই পরিসংখ্যান কেবল তথ্য সংগ্রহের প্রশাসনিক দুর্বলতার চিত্র নয়; এটি দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি মূল্যায়ন, রোগের বিস্তার শনাক্ত এবং চিকিৎসাসেবার প্রস্তুতি নেওয়ার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে। কারণ কোনো সংক্রামক রোগের প্রকৃত বিস্তার বুঝতে হলে শুধু বড় হাসপাতাল কিংবা রাজধানীকেন্দ্রিক তথ্য যথেষ্ট নয়। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা হাসপাতাল এবং অন্যান্য চিকিৎসাকেন্দ্রের তথ্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার একটি বড় অংশ পরিচালিত হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মাধ্যমে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স রয়েছে ৪৯২টি, জেলা হাসপাতাল ৬১টি, সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল ৩৮টি এবং বিশেষায়িত হাসপাতাল ২৮টি। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। জ্বর, শরীরব্যথা, মাথাব্যথা কিংবা ডেঙ্গুর সন্দেহজনক উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের মধ্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হয়। তাঁদের কেউ হাসপাতালে ভর্তি হন, কেউ চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফেরেন, আবার গুরুতর অবস্থায় থাকা রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়।
কিন্তু এসব রোগীর তথ্য যদি নিয়মিতভাবে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থায় না পৌঁছায়, তাহলে রোগের বিস্তার সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সংক্রমণ বাড়তে থাকলেও কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যানে তার প্রতিফলন দেরিতে আসতে পারে। এতে কোনো এলাকায় সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে কি না, কোথায় বেশি রোগী শনাক্ত হচ্ছে এবং কোন অঞ্চলে জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী পাঠানো প্রয়োজন—এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া জটিল হয়ে ওঠে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে তথ্যের গুরুত্ব এখানেই। এডিস মশার বিস্তার, রোগীর সংখ্যা, হাসপাতালে ভর্তির হার এবং মৃত্যুর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে সংক্রমণের প্রবণতা বোঝা যায়। কোন এলাকায় রোগীর চাপ বেশি, কোথায় হাসপাতালে শয্যার সংকট তৈরি হচ্ছে কিংবা কোথায় নিবিড় পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন বাড়ছে—এসব নির্ধারণে নির্ভরযোগ্য তথ্য অপরিহার্য। তথ্যের ঘাটতি থাকলে রোগ নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ আব্দুস সবুর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য প্রকাশের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, বিপুলসংখ্যক হাসপাতাল ডেঙ্গুর তথ্য না পাঠালেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তথ্য সরবরাহ না করার কারণ জানতে চেয়ে নোটিশ দেওয়া কিংবা সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষেত্রেও ঘাটতি রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারি পরিসংখ্যান কতটা নির্ভরযোগ্য, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
তবে কোনো হাসপাতাল থেকে তথ্য না আসার অর্থ এই নয় যে সেখানে ডেঙ্গু রোগী নেই। বরং তথ্য না আসা এবং রোগী না থাকার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানে রোগী শনাক্ত হওয়ার পরও প্রতিবেদন পাঠানো না হলে কেন্দ্রীয় হিসাব অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে। আবার জনবল সংকট, প্রতিবেদন তৈরির দুর্বল ব্যবস্থা, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা কিংবা প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাবও তথ্য সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তাই ঘাটতির প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করা যেমন জরুরি, তেমনি নিয়মিত প্রতিবেদন নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
ডেঙ্গুর প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের তথ্যের মধ্যে সম্ভাব্য ব্যবধান। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ডেঙ্গু রোগীরা চিকিৎসা নিচ্ছেন। কিন্তু সব প্রতিষ্ঠানের তথ্য যদি সমন্বিতভাবে সংগ্রহ করা না হয়, তাহলে মোট আক্রান্তের হিসাব অসম্পূর্ণ হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে জানান, তাঁদের পর্যবেক্ষণে ঢাকায় ডেঙ্গু ও ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত মানুষের চাপ উল্লেখযোগ্য। তাঁর মতে, সরকারি পরিসংখ্যানে প্রতিদিন হাসপাতালে ভর্তি রোগীর যে সংখ্যা দেখানো হচ্ছে, তা দিয়ে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি পুরোপুরি বোঝা যাচ্ছে না। তিনি আরও জানান, সাম্প্রতিক সময়ে শিরায় দেওয়ার স্যালাইনের সংকট দেখা দিয়েছিল। রোগীর চাপের সঙ্গে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর সরবরাহের সমন্বয় না থাকলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁদের হাসপাতাল নিয়মিতভাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ডেঙ্গু ও হামের তথ্য পাঠায়। সে ক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালগুলোর বড় অংশ থেকে তথ্য না আসার বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক। কারণ সরকারি ও বেসরকারি—উভয় ধরনের প্রতিষ্ঠানের তথ্য একত্র করা গেলে সংক্রমণের বিস্তার সম্পর্কে তুলনামূলক পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া সম্ভব।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের অক্টোবরের প্রথম নয় দিনে ডেঙ্গুতে ৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯৫। একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৩০০ রোগী। চলতি বছরে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৫ হাজার ৪৫১। এসব সংখ্যা দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতির চাপ ও ব্যাপকতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেয়। তবে সরকারি হাসপাতালের বড় অংশের তথ্য অনুপস্থিত থাকায় এই পরিসংখ্যান দিয়ে সামগ্রিক পরিস্থিতি কতটা নির্ভুলভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানেও ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ড্যাশবোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ডেঙ্গুতে দুজন করে মারা যান। মার্চ ও এপ্রিলে কোনো মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি। মে মাসে একজন এবং জুনে ১৩ জনের মৃত্যু হয়। এরপর জুলাইয়ে ৩৬ জন, আগস্টে ৪৩ জন এবং সেপ্টেম্বরে ১৪৮ জন মারা যান। অক্টোবরের প্রথম নয় দিনেই মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ৫০। এর মধ্যে ৬ অক্টোবর এক দিনেই ১০ জনের মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করা হয়।
এই পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, বছরের প্রথম ভাগের তুলনায় বর্ষা-পরবর্তী সময়ে মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। সেপ্টেম্বরে মৃত্যুর বড় উল্লম্ফন এবং অক্টোবরের শুরুতেই প্রাণহানির ধারাবাহিকতা পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরে। তবে রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যুর তথ্যের মধ্যে কোনো অসামঞ্জস্য থাকলে তা বিশ্লেষণ করতে আরও পূর্ণাঙ্গ এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন।
এলাকাভিত্তিক মৃত্যুর হিসাবেও ডেঙ্গুর বিস্তারের চিত্র পাওয়া যায়। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ৮০ জন এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ৩৫ জন মারা গেছেন। দুই সিটি করপোরেশনের বাইরে ঢাকায় মৃত্যু হয়েছে ১৭ জনের। এ ছাড়া খুলনায় ৬০ জন, চট্টগ্রাম ও বরিশালে ২৫ জন করে, ময়মনসিংহে ২৩ জন, রাজশাহীতে ২১ জন, রংপুরে ছয়জন এবং সিলেটে তিনজনের মৃত্যুর তথ্য রয়েছে।
এই হিসাব অনুযায়ী, রাজধানীর পাশাপাশি দেশের অন্যান্য বিভাগেও ডেঙ্গুতে প্রাণহানি ঘটছে। বিশেষ করে খুলনায় মৃত্যুর উল্লেখযোগ্য সংখ্যা আঞ্চলিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। তবে কোনো এলাকায় মৃত্যুর সংখ্যা বেশি হওয়ার পেছনে সংক্রমণের হার, রোগীদের হাসপাতালে পৌঁছানোর সময়, চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা এবং অন্যান্য কারণ ভূমিকা রাখতে পারে। সঠিক তথ্য ছাড়া এসব কারণ আলাদা করে মূল্যায়ন করা কঠিন।
কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার ডেঙ্গুর তথ্য সরবরাহের বাধ্যবাধকতার বিষয়টি সামনে এনেছেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮ অনুযায়ী ডেঙ্গুর তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে জানানো বাধ্যতামূলক। তাঁর মতে, যেসব প্রতিষ্ঠান তথ্য দিচ্ছে না, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে তথ্য সংগ্রহে ব্যর্থতার দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও এড়ানোর সুযোগ নেই।
ডেঙ্গুর মতো মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে তথ্যের প্রয়োজন শুধু দৈনিক আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা প্রকাশের জন্য নয়। রোগের হটস্পট শনাক্ত করা, মশা নিয়ন্ত্রণের কর্মসূচি নির্ধারণ, হাসপাতালের শয্যা প্রস্তুত রাখা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহের পরিকল্পনা তৈরিতেও এসব তথ্য ব্যবহৃত হয়। কোনো এলাকায় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু তথ্য দেরিতে এলে বা অসম্পূর্ণ থাকলে রোগ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগও পিছিয়ে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাসপাতালভিত্তিক প্রতিবেদন নিয়মিত করার জন্য কার্যকর তদারকি প্রয়োজন। কোন প্রতিষ্ঠান তথ্য পাঠাচ্ছে না, কেন পাঠাচ্ছে না এবং সংশ্লিষ্টদের কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন—এসব বিষয় নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে। প্রয়োজনে ডিজিটাল প্রতিবেদনব্যবস্থা আরও সহজ করা, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং তথ্য সরবরাহের নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা যেতে পারে। একই সঙ্গে নিয়মিত অডিটের মাধ্যমে হাসপাতালের রোগী নিবন্ধন ও কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যানের মধ্যে সামঞ্জস্য যাচাই করা প্রয়োজন।
তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ। সব হাসপাতাল ও ক্লিনিকের রোগী শনাক্ত, ভর্তি, স্থানান্তর এবং মৃত্যুর তথ্য একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় যুক্ত করা গেলে একই রোগীকে একাধিকবার গণনা করার ঝুঁকি কমবে। পাশাপাশি হাসপাতাল থেকে তথ্য না আসার কারণে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা বাদ পড়ছে কি না, সেটিও যাচাই করা সম্ভব হবে।
অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের ইনচার্জ ডা. ইসমত আরা দাবি করেছেন, সারা দেশ থেকে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা ডেঙ্গু-সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ করেন। তাঁর মতে, এ কারণে তথ্যে কিছু বাদ পড়া বা ভুল হওয়ার আশঙ্কা খুবই কম। তবে ৬১৯টি সরকারি হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ৯৭টি থেকে তথ্য পাওয়ার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই বক্তব্য এবং হাসপাতালভিত্তিক তথ্যের ঘাটতির মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। কারণ পরিসংখ্যানের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে শুধু নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়; কীভাবে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, কতটি প্রতিষ্ঠান প্রতিবেদন দিচ্ছে এবং কোন সীমাবদ্ধতা রয়েছে, সেসব বিষয়ও পরিষ্কার করা প্রয়োজন। এতে জনসাধারণের আস্থা বাড়বে এবং স্বাস্থ্যনীতিনির্ধারকদের জন্যও বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়ন সহজ হবে।
ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে হাসপাতাল, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার এবং মশা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। কিন্তু কার্যকর সমন্বয়ের ভিত্তি হলো নির্ভুল তথ্য। কোন এলাকায় রোগী বাড়ছে তা জানা না গেলে সেখানে মশা নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম জোরদার করা কঠিন। হাসপাতালে রোগীর চাপ সম্পর্কে আগাম ধারণা না থাকলে শয্যা, স্যালাইন ও অন্যান্য চিকিৎসাসামগ্রীর প্রস্তুতিও ব্যাহত হতে পারে। একইভাবে মৃত্যুর সঠিক হিসাব না থাকলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এবং চিকিৎসাব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ যখন বাড়ছে, তখন সরকারি হাসপাতালের ৮৪ শতাংশের বেশি প্রতিষ্ঠান থেকে তথ্য না পাওয়ার বিষয়টি তাই সাধারণ প্রশাসনিক ত্রুটি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা, যার দ্রুত সমাধান প্রয়োজন। একই সঙ্গে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে অতিরঞ্জন কিংবা অযাচাইকৃত দাবি না ছড়িয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করাও জরুরি।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় সাফল্য নির্ভর করে সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ, যথাযথ চিকিৎসা, কার্যকর মশা নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতার ওপর। এসব উদ্যোগকে কার্যকর করতে হলে দেশের প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য নিয়মিতভাবে সংগ্রহ করতে হবে। তথ্যের ঘাটতি দূর করা, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং পরিসংখ্যান প্রকাশে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি। কারণ রোগের প্রকৃত চিত্র জানা না গেলে তার বিরুদ্ধে পরিকল্পিত লড়াইও কঠিন হয়ে পড়ে। আর ডেঙ্গুর মতো প্রাণঘাতী রোগের ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণ তথ্যের মূল্য শেষ পর্যন্ত দিতে হতে পারে সাধারণ মানুষকেই।
আপনার মতামত জানানঃ