ঢাকার ব্যস্ততম এলাকার একটি শাহবাগ। চারদিকে হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান, মানুষের ভিড় আর যানবাহনের অবিরাম চলাচল। কেউ ছুটছেন চিকিৎসার জন্য, কেউ ক্লাসে, কেউ কর্মস্থলে। প্রতিদিন হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখর থাকে এই এলাকা। অথচ এই ব্যস্ততার আড়ালেই পড়ে আছে এক নির্মম বাস্তবতা। এমন অনেক মানুষ এখানে দিন কাটান, যাদের মাথার ওপর ছাদ নেই, অসুস্থ হলে চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য নেই, আর মৃত্যুর পর পরিচয় জানানোর মতো কেউ নেই। তাঁদের জীবনের শেষ ঠিকানা হয়ে ওঠে রাস্তার পাশ, হাসপাতালের দেয়াল কিংবা ফুটপাত। মৃত্যুর পরও তাঁদের অনেকের পরিচয় আর ফিরে পাওয়া যায় না।
গত ৬ অক্টোবর বিকেল পাঁচটার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের পেছনে দেয়ালঘেঁষা একটি খালি জায়গায় শুয়ে ছিলেন আনুমানিক ৪০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি। তাঁর ডান পায়ের গোড়ালিতে ব্যান্ডেজ বাঁধা। শরীরে অসুস্থতার ছাপ, চলাফেরার সামর্থ্যও সীমিত। আশপাশ দিয়ে মানুষ যাতায়াত করছিলেন, কিন্তু তাঁর পাশে থেমে কথা বলার মতো মানুষ ছিল না বললেই চলে। তিনি কোথা থেকে এসেছেন, তাঁর পরিবারের সদস্যরা কোথায়, কিংবা তাঁর জন্য কেউ অপেক্ষা করছেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর জানার উপায় ছিল না। কথা বলার চেষ্টা করেও তাঁর কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
অথচ ওই জায়গা থেকেই সেদিন সকালে উদ্ধার করা হয়েছিল একজনের মরদেহ। কাছাকাছি সময়ে পাওয়া যায় আরও একজনের মরদেহ। দুজনের কারও পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। পুলিশের ধারণা, অসুস্থতাজনিত কারণে তাঁদের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। একই এলাকায় এমন ঘটনা যেন বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। শাহবাগ থানাধীন এলাকায় গত এক মাসেই অন্তত ১৫ জনের মরদেহ উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে, যাঁদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত তাঁদের বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করতে হয়েছে।
একটি মানুষের মৃত্যু মানে শুধু একটি প্রাণের অবসান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের শোক, প্রিয়জনের স্মৃতি, জীবনের অসংখ্য গল্প এবং অসমাপ্ত সম্পর্ক। কিন্তু যাঁদের পরিচয় নেই, তাঁদের মৃত্যুর পর সেই শোকের দৃশ্যমান কোনো সাক্ষীও অনেক সময় থাকে না। কোনো বাড়িতে হয়তো তাঁদের জন্য কেউ অপেক্ষা করেন না, কেউ থানায় গিয়ে নিখোঁজের খবর দেন না, কেউ হাসপাতালের মর্গে এসে মুখ দেখে শনাক্ত করেন না। ফলে তাঁদের মৃত্যু সরকারি নথিতে একটি সংখ্যা হয়ে থাকে। সেই সংখ্যার আড়ালে হারিয়ে যায় একটি জীবন, কখনো কয়েক দশকের স্মৃতি, কখনো একটি পরিবারের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া মানুষের গল্প।
সমকালের প্রতিবেদনে প্রকাশিত পুলিশি তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে শাহবাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও আশপাশের এলাকা থেকে ৭৯টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৪ জনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হলেও ৬৫ জনের পরিচয় মেলেনি। অর্থাৎ উদ্ধার হওয়া মরদেহের বড় একটি অংশের পরিচয় অজানাই থেকে গেছে। এর আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালে, একই এলাকায় ৮১টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধারের তথ্য পাওয়া যায়। সেগুলোর মধ্যে মাত্র ১৩ জনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছিল।
দুই বছরের এই হিসাবের বাইরে গিয়ে গত ২১ মাসের তথ্য আরও গভীর উদ্বেগ তৈরি করে। এ সময়ে উদ্ধার হওয়া ১৬০টি মরদেহের মধ্যে পরিচয় শনাক্ত হয়েছে মাত্র ২৭টির। বাকি ১৩৩ জনের পরিচয় পাওয়া যায়নি। হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৮৩ শতাংশ মানুষের পরিচয় অজানাই রয়ে গেছে। সংখ্যাটি শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তের সীমাবদ্ধতা বোঝায় না; এটি নগরজীবনের এমন এক সংকটের দিকে ইঙ্গিত করে, যেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ সমাজের সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেলছেন এবং মৃত্যুর পরও তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত করার মতো কার্যকর ব্যবস্থা অনেক সময় পাওয়া যাচ্ছে না।
রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত শাহবাগে কেন এত অজ্ঞাতপরিচয় মানুষের মরদেহ পাওয়া যায়, তার উত্তর খুঁজতে গেলে সামনে আসে ভাসমান মানুষের দীর্ঘ তালিকা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট, চাঁনখারপুল, হাইকোর্টের মাজার, দোয়েল চত্বর এবং বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার আশপাশে অনেক মানুষ রাস্তায় রাত কাটান। তাঁদের কারও স্থায়ী বাসস্থান নেই, কেউ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, কেউ দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ, আবার কেউ জীবিকার পথ হারিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন ফুটপাত কিংবা হাসপাতালের বারান্দায়।
এই মানুষদের অনেকে একসময় স্বাভাবিক জীবনযাপন করতেন। কারও সংসার ছিল, কারও কর্মস্থল ছিল, কারও হয়তো সন্তান বা আত্মীয়স্বজন রয়েছে। কিন্তু দারিদ্র্য, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, মানসিক অসুস্থতা, কর্মহীনতা কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তিগত বিপর্যয় তাঁদের জীবনকে ঠেলে দিয়েছে অনিশ্চয়তার দিকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে গেছে পরিচিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হারিয়ে গেছে, জাতীয় পরিচয়পত্র কখনো তৈরি হয়নি, কিংবা নিজের পরিচয় জানানোর মতো শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতাও আর অবশিষ্ট নেই। এভাবেই একজন মানুষ ধীরে ধীরে সমাজের পরিচিত পরিসর থেকে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারেন।
শাহবাগ এলাকায় থাকার পেছনে কিছু বাস্তব কারণও রয়েছে। গত দুই মাসে এলাকার ভাসমান মানুষের সঙ্গে কথা বলে সমকাল জানিয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও আশপাশের এলাকাকে তাঁরা তুলনামূলক নিরাপদ মনে করেন। অন্যদিকে হাইকোর্টের মাজার ও দোয়েল চত্বরের আশপাশে বিনামূল্যে খাবার পাওয়ার সুযোগ তাঁদের সেখানে থাকতে উৎসাহিত করে। খাবারের সন্ধানে জাতীয় স্টেডিয়াম, পুরান ঢাকা ও কমলাপুর থেকেও অনেকে এসব এলাকায় আসেন।
জাতীয় ঈদগাহের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত শাহ খাজা শরফুদ্দীন চিশতির মাজার, যা হাইকোর্ট মাজার নামে পরিচিত, সেখানে প্রতিদিন দুপুর ও সন্ধ্যায় খাবার বিতরণ করা হয়। মাজারের বাবুর্চি মো. নাজমুল হোসেনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ৫০০ মানুষের খাবার রান্না করা হয়। তাঁদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই ভবঘুরে বা ভাসমান মানুষ। বিভিন্ন এলাকা থেকে তাঁরা এসে এখানে খাবার গ্রহণ করেন।
এ খাবার অনেকের কাছে কেবল একবেলার আহার নয়; বরং প্রতিদিন বেঁচে থাকার অন্যতম ভরসা। কারও আয় নেই, কারও কাজ করার সামর্থ্য নেই, আবার কেউ অসুস্থতার কারণে নিয়মিত উপার্জন করতে পারেন না। ফলে বিনামূল্যে খাবার পাওয়া যায়, এমন জায়গার আশপাশেই তাঁরা আশ্রয় খোঁজেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আশপাশের অস্থায়ী খাবারের দোকান, আনন্দবাজার এবং বিভিন্ন আবাসিক এলাকার সামনেও কেউ কেউ খাবার সংগ্রহ করেন। শহরের কেন্দ্রস্থলে মানুষের বিপুল সমাগম থাকলেও তাঁদের জীবনযাপনের বাস্তবতা অনেকটাই অদৃশ্য থেকে যায়।
দোয়েল চত্বরের পাশে ঢাকা গেট এলাকায় থাকা সাগর নামের এক মধ্যবয়সী ভবঘুরে সমকালকে জানিয়েছেন, পরিবার ছেড়ে তিনি পাঁচ-ছয় বছর ধরে ওই এলাকায় থাকছেন। এই সময়ে তাঁর আশপাশে থাকা সাত-আটজন মানুষ মারা গেছেন। প্রতিদিনের মতো তিনিও আশপাশের মাজার থেকে খাবার খান। তাঁর এই অভিজ্ঞতা দেখায়, একই জায়গায় একসঙ্গে বসবাস করলেও এসব মানুষের জীবন কতটা অনিশ্চিত। একজন অসুস্থ হয়ে পড়লে কিংবা মারা গেলে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর মতো পরিচিত মানুষ হয়তো থাকেন, কিন্তু চিকিৎসা নিশ্চিত করা বা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা তাঁদের অনেকেরই নেই।
হাইকোর্টের মাজারের ফটকের কাছে থাকা নূর আলম নামের আরেক ব্যক্তি জানিয়েছেন, তিনি কোনো কাজ করেন না; মাজার থেকেই খাবার খান। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের পাশে থাকা জাহাঙ্গীর আলমের কথাতেও উঠে এসেছে অসহায়তার একই ছবি। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকায় তিনি বেশি নড়াচড়া করতে পারেন না। আশপাশের দোকানিরা তাঁকে খাবার দেন। তাঁদের সহায়তায় কোনোভাবে দিন পার করেন তিনি।
এই মানুষদের দুর্দশার সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্বাস্থ্যসেবার অভাব। চিকিৎসার জন্য হাসপাতালের সামনে অবস্থান করলেও তাঁদের অনেকের পক্ষে চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হয় না। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, ওষুধ, নিয়মিত পরিচর্যা কিংবা পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করার মতো অর্থ তাঁদের হাতে থাকে না। অসুস্থতা বাড়তে থাকলেও অনেক সময় তাঁরা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান না, আবার কেউ চিকিৎসা নিতে চাইলেও নিজের অবস্থা বোঝাতে কিংবা প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে পারেন না। ফলে সাধারণ একটি রোগও তাঁদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
পুলিশ ও চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাতপরিচয় মানুষের বড় একটি অংশের বয়স ৪০ বছরের বেশি। তাঁদের মধ্যে অনেকে মাদকাসক্ত, কেউ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত, আবার অনেকে দীর্ঘদিন চিকিৎসার বাইরে থাকেন। অপুষ্টি, শারীরিক দুর্বলতা, বার্ধক্যজনিত জটিলতা এবং সংক্রমণ তাঁদের জীবনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় মারা যাওয়া অনেকের শরীরে সেপটিক শকের লক্ষণও পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। সেপটিক শকে সংক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যক্রম বিপর্যস্ত হয়ে পড়তে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে পরিস্থিতি প্রাণঘাতী হয়।
শীতকালে অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বাড়ে বলেও চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়। খোলা আকাশের নিচে রাত কাটানো, পর্যাপ্ত গরম কাপড়ের অভাব, অপুষ্টি এবং আগে থেকেই থাকা অসুস্থতা তাঁদের মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। যাঁদের স্থায়ী বাসস্থান নেই, তাঁদের জন্য শীত শুধু অস্বস্তির ঋতু নয়; অনেক ক্ষেত্রে এটি জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন অ্যান্ড টক্সিকোলজি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত সেখানে ১ হাজার ৬৯০টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২১ সালে ২৪৮টি, ২০২২ সালে ২৩০টি, ২০২৩ সালে ২৫০টি, ২০২৪ সালে ৩২৪টি, ২০২৫ সালে ৩৮৪টি এবং ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ২৫৪টি মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। প্রায় পৌনে ছয় বছরের এই হিসাব অনুযায়ী, বছরে গড়ে প্রায় ২৯২টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের ময়নাতদন্ত হয়েছে।
প্রতিটি মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করার জন্য ময়নাতদন্তের সময় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা হয়। দাঁত ও হাড়ের নমুনা সংরক্ষণ করা হয়, যাতে পরবর্তী সময়ে স্বজনের সন্ধান পাওয়া গেলে ডিএনএ পরীক্ষাসহ অন্যান্য পদ্ধতিতে পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। কিন্তু এসব প্রক্রিয়া থাকা সত্ত্বেও পরিচয় শনাক্তের কাজ সব ক্ষেত্রে সফল হয় না। বিশেষ করে মরদেহ দীর্ঘ সময় পড়ে থাকলে পচনের কারণে শনাক্তকরণ জটিল হয়ে ওঠে।
পুলিশের পক্ষ থেকেও পরিচয় শনাক্তের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। প্রথমে আঙুলের ছাপ সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়। এরপর সিআইডি ও পিবিআইয়ের সহায়তায় জাতীয় তথ্যভান্ডারের সঙ্গে সেগুলো মিলিয়ে দেখা হয়। আঙুলের ছাপের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করা না গেলে দেশের বিভিন্ন থানায় তথ্য পাঠানো হয় এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যমকেন্দ্রের মাধ্যমেও পরিচয় শনাক্তের জন্য তথ্য প্রচার করা হয়। দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হলে মরদেহের ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণ করা হয়।
তবে এই প্রক্রিয়ারও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেকের জাতীয় পরিচয়পত্র নেই, ফলে সরকারি তথ্যভান্ডারের সঙ্গে তাঁদের তথ্য মেলানো সম্ভব হয় না। আবার মরদেহ পচে যাওয়ার কারণে আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। জীবিত অবস্থায় যাঁদের পরিচয় নথিভুক্ত হয়নি, মৃত্যুর পর তাঁদের পরিচয় শনাক্ত করার কাজ আরও জটিল হয়ে ওঠে। পরিচয় শনাক্ত করা না গেলে আইনগত প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে দাফন সম্পন্ন করে।
রাজধানীতে বেওয়ারিশ মরদেহ দাফনের পরিসংখ্যানও পরিস্থিতির ব্যাপ্তি তুলে ধরে। আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে রাজধানীতে ৪৯০টি, ২০২৪ সালে ৫৭০টি, ২০২৫ সালে ৬৪৪টি এবং ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪৬০টি মরদেহ দাফন করা হয়েছে। চার বছরের এই সময়ে মোট ২ হাজার ১৬৪টি মরদেহ দাফন করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, এই সময় বছরে গড়ে প্রায় ৫৭৭টি মরদেহ দাফন করা হয়েছে। মরদেহগুলো রায়েরবাজার ও জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
দাফনের পরও সব গল্পের শেষ হয় না। কোনো পরিবার পরে নিখোঁজ স্বজনের সন্ধান পেলে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কবর শনাক্ত করার সুযোগ রয়েছে। আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম দাফন করা মরদেহের তালিকা সংরক্ষণ করে। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে স্বজনদের খোঁজ পাওয়া এবং সংরক্ষিত তথ্যের সঙ্গে প্রয়োজনীয় মিল খুঁজে পাওয়া জরুরি। পরিচয়হীন মানুষের ক্ষেত্রে এই দুই শর্ত পূরণ করাই অনেক সময় কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, গৃহহীন, পারিবারিকভাবে বিচ্ছিন্ন ও মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তিসহ বিভিন্ন কারণে অনেক মানুষ ভবঘুরে হয়ে রাস্তায় আশ্রয় নেন। রাজধানীতে এসব মানুষের পরিচয় ও অবস্থান সম্পর্কে সরকারি তালিকা তৈরি করা প্রয়োজন। এতে একদিকে তাঁদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা সহজ হবে, অন্যদিকে মৃত্যুর পর পরিচয় শনাক্ত করে স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনাও বাড়বে। এটি সরকারের জনকল্যাণমূলক দায়িত্বের অংশ।
এই প্রস্তাবের গুরুত্ব এখানেই যে, মানুষের পরিচয় শনাক্তের উদ্যোগ শুধু মৃত্যুর পর শুরু হলে অনেক ক্ষেত্রেই দেরি হয়ে যায়। যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে রাস্তায় বসবাস করছেন, তাঁদের সম্পর্কে স্থানীয় পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, পরিচয়পত্র তৈরি এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের ব্যবস্থা থাকলে অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব। একই সঙ্গে জরুরি অবস্থায় তাঁদের হাসপাতালে নেওয়া, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং আশ্রয়কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
শাহবাগের ফুটপাত কিংবা হাসপাতালের দেয়ালঘেঁষা জায়গায় শুয়ে থাকা মানুষগুলোও এই শহরের বাসিন্দা। তাঁদের কারও জীবন হয়তো দারিদ্র্যে ক্ষয়ে গেছে, কেউ পরিবার হারিয়েছেন, কেউ অসুস্থতার কাছে অসহায় হয়ে পড়েছেন। কিন্তু এসব কারণে তাঁদের পরিচয়, চিকিৎসা কিংবা নিরাপদ আশ্রয়ের অধিকার হারিয়ে যায় না। মৃত্যুর পর পরিচয় শনাক্ত করার জন্য প্রযুক্তি ও প্রশাসনিক উদ্যোগ যেমন প্রয়োজন, তেমনি জীবিত অবস্থায় তাঁদের খুঁজে বের করে সহায়তা করাও জরুরি।
শহরের ব্যস্ত সড়কে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ একে অপরকে পাশ কাটিয়ে চলে যান। তাঁদের চোখের সামনে হয়তো কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকেন, কেউ খাবারের অপেক্ষায় বসে থাকেন, কেউ দিনের পর দিন একই জায়গায় নিঃশব্দে জীবন কাটান। তাঁদের অনেককে মানুষ হিসেবে দেখার বদলে শহরের পরিচিত দৃশ্যের অংশ বলে মনে করা হয়। এই উদাসীনতা ভাঙা ছাড়া সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
শাহবাগে ২১ মাসে ১৩৩ জন মানুষের পরিচয় হারিয়ে যাওয়ার হিসাব তাই কেবল পুলিশের নথিতে আটকে থাকার মতো কোনো পরিসংখ্যান নয়। এটি এমন এক সামাজিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে মানুষ জীবিত অবস্থায় পরিচিত সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন এবং মৃত্যুর পরও তাঁদের নাম ফিরে পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে না। রাষ্ট্র, সমাজ, হাসপাতাল ও নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই অদৃশ্য মানুষদের জীবনে পরিবর্তন আনা কঠিন।
একজন মানুষ কোথায় জন্মেছেন, তাঁর পরিবার কোথায়, তিনি কী কাজ করতেন—এসব প্রশ্নের উত্তর হয়তো সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে। কিন্তু তাঁর জীবনের মূল্য হারিয়ে যাওয়ার কথা নয়। মৃত্যুর পর একটি নাম শনাক্ত করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি জীবিত অবস্থায় সেই মানুষটির পাশে দাঁড়ানোও সমান জরুরি। শাহবাগের এই পরিচয়হীন মরদেহগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি শহর কতটা উন্নত, তার পরিচয় শুধু উঁচু ভবন, বড় হাসপাতাল কিংবা ব্যস্ত সড়কে নয়; বরং সবচেয়ে অসহায় মানুষটির জীবন ও মর্যাদা রক্ষায় সে কতটা দায়িত্বশীল, তার মধ্যেও নিহিত।
আপনার মতামত জানানঃ