১৮৬৪ সালের ২২ আগস্ট, সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় কয়েকজন কূটনীতিক একটি ছোট্ট দলিলে স্বাক্ষর করেছিলেন। দলিলটিতে ছিল মাত্র দশটি অনুচ্ছেদ। এটি যুদ্ধ নিষিদ্ধ করেনি, কোনো সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণ থামায়নি, এমনকি যুদ্ধ শুরু করার অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তোলেনি। তবু আধুনিক ইতিহাসে খুব কম আইনি দলিলই মানুষের জীবন রক্ষায় এর মতো গভীর প্রভাব ফেলেছে।
দলিলটির নাম ছিল—যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সৈন্যদের অবস্থার উন্নয়নসংক্রান্ত জেনেভা কনভেনশন। আজ আমরা একে প্রথম জেনেভা কনভেনশন নামে জানি।
এর কেন্দ্রীয় নীতিটি ছিল বিপ্লবাত্মক অথচ সহজ: একজন সৈনিক আহত হওয়ার পর আর শুধু শত্রুপক্ষের যোদ্ধা নন; তিনি প্রথমত একজন অসহায় মানুষ। তাঁর পোশাক, পতাকা কিংবা জাতীয়তা যা-ই হোক, তাঁকে উদ্ধার ও চিকিৎসা করতে হবে। যে চিকিৎসক, স্বেচ্ছাসেবক, হাসপাতাল কিংবা অ্যাম্বুলেন্স এই কাজ করবে, তাকেও যুদ্ধের আক্রমণ থেকে সুরক্ষা দিতে হবে।
এই আইন কোনো রাজপ্রাসাদের তাত্ত্বিক আলোচনায় জন্ম নেয়নি। এর জন্ম হয়েছিল রক্ত, পচন, তৃষ্ণা এবং হাজারো আহত মানুষের আর্তনাদের মধ্যে—ইতালির সলফেরিনো নামের একটি ছোট্ট শহরে।
যে যুদ্ধ দেখতে যাননি অঁরি দ্যুনাঁ
১৮৫৯ সালের ২৪ জুন। ইতালির উত্তরাঞ্চলে সলফেরিনোর কাছে ফ্রান্স ও সার্ডিনিয়ার সম্মিলিত বাহিনীর সঙ্গে অস্ট্রীয় সাম্রাজ্যের যুদ্ধ শুরু হয়। এটি ছিল ইতালির স্বাধীনতা ও একীকরণের দীর্ঘ সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
মাত্র এক দিনের যুদ্ধে কয়েক লাখ সৈন্য মুখোমুখি হয়েছিল। প্রায় ১৫ ঘণ্টার সংঘর্ষে কয়েক হাজার মানুষ নিহত এবং প্রায় ৪০ হাজার আহত হয়। বিভিন্ন হিসাবে মৃত, আহত ও নিখোঁজ মিলিয়ে মানুষের সংখ্যা ৪০ থেকে ৪৫ হাজারেরও বেশি ছিল। ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব দ্য রেড ক্রস
সুইস ব্যবসায়ী অঁরি দ্যুনাঁ যুদ্ধ দেখতে সেখানে যাননি। আলজেরিয়ায় নিজের ব্যবসার একটি প্রশাসনিক সমস্যার সমাধানে ফরাসি সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়নের সঙ্গে দেখা করাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। সম্রাট তখন ইতালির যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থান করছিলেন। তাঁর সন্ধানে এসে দ্যুনাঁ এমন একটি দৃশ্যের মুখোমুখি হলেন, যা তাঁর বাকি জীবন বদলে দেয়।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর মাঠজুড়ে পড়ে ছিল আহত ও মৃত সৈন্য। সামরিক চিকিৎসাব্যবস্থা এত বিপুল সংখ্যক আহত মানুষ সামলানোর জন্য প্রস্তুত ছিল না। পর্যাপ্ত চিকিৎসক, ওষুধ, পানি, ব্যান্ডেজ কিংবা পরিবহন—কোনোটিই ছিল না। অনেক সৈন্য সামান্য চিকিৎসা পেলেই বেঁচে যেতে পারতেন; কিন্তু তাঁরা তৃষ্ণা, রক্তক্ষরণ ও সংক্রমণে মারা যাচ্ছিলেন।
দ্যুনাঁ কাছের কাস্তিলিওনে দেল্লে স্তিভিয়েরে শহরের মানুষদের সাহায্যে নামার আহ্বান জানান। গির্জাগুলো অস্থায়ী হাসপাতালে পরিণত হয়। স্থানীয় নারীরা পানি, খাবার ও কাপড় নিয়ে আসেন। কাপড় ছিঁড়ে তৈরি হয় ব্যান্ডেজ। ফরাসি, সার্ডিনীয় ও অস্ট্রীয়—সব পক্ষের আহতদের পাশাপাশি শুইয়ে চিকিৎসা দেওয়া শুরু হয়।
স্থানীয় নারীদের মুখে তখন একটি কথা শোনা যাচ্ছিল—“তুত্তি ফ্রাতেল্লি”, অর্থাৎ “সবাই ভাই”। শত্রুপক্ষের আহত সৈনিককে সাহায্য করতে দ্বিধা দেখা দিলে এই কথাটিই মনে করিয়ে দিত, ইউনিফর্মের নিচে সবাই মানুষ।
একটি বই, যা রাজাদের দরজায় পৌঁছেছিল
সলফেরিনো থেকে ফিরে দ্যুনাঁ স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। আহতদের মুখ, তৃষ্ণার্ত মানুষের আর্তনাদ এবং পরিচর্যার অভাবে ঘটে যাওয়া মৃত্যু তাঁকে তাড়া করছিল।
তিনি যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও নিজের প্রস্তাব নিয়ে একটি বই লিখলেন—Un souvenir de Solférino বা A Memory of Solferino। বইটি ১৮৬২ সালের অক্টোবরে নিজের অর্থে প্রকাশ করেন। প্রথম সংস্করণের ১ হাজার ৬০০ কপির গায়ে লেখা ছিল—বিক্রির জন্য নয়। দ্যুনাঁ বইটি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন ইউরোপের রাজা, মন্ত্রী, সেনাপতি, চিকিৎসক, লেখক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে। ICRC-এর ঐতিহাসিক গবেষণা
বইটিতে দুটি মৌলিক প্রস্তাব ছিল।
প্রথমটি, শান্তির সময় থেকেই প্রতিটি দেশে প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবী দল গড়ে তুলতে হবে, যারা যুদ্ধ শুরু হলে সামরিক চিকিৎসাব্যবস্থাকে আহতদের সেবায় সহায়তা করবে।
দ্বিতীয়টি আরও সাহসী। যুদ্ধক্ষেত্রে আহত মানুষ, চিকিৎসাকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীদের সুরক্ষায় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটি বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক চুক্তি হতে হবে।
প্রথম প্রস্তাব থেকে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশের জাতীয় রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির জন্ম হয়। দ্বিতীয় প্রস্তাবটি পথ দেখায় জেনেভা কনভেনশনের।
বইটি প্রকাশের পর দ্যুনাঁর ধারণা দ্রুত ইউরোপজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। কিন্তু নৈতিক আবেদনকে আইনে পরিণত করতে প্রয়োজন ছিল সংগঠন ও কূটনীতি।

ছবি: StateWatch-এর জন্য তৈরি ঐতিহাসিক শিল্পরূপ।
পাঁচজন মানুষের ছোট একটি কমিটি
জেনেভার আইনজীবী ও জনকল্যাণকর্মী গুস্তাভ মোয়নিয়ে দ্যুনাঁর বইয়ের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন। ১৮৬৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে জেনেভা পাবলিক ওয়েলফেয়ার সোসাইটি দ্যুনাঁর প্রস্তাব পর্যালোচনার জন্য পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে।
কমিটিতে ছিলেন অঁরি দ্যুনাঁ, গুস্তাভ মোয়নিয়ে, সুইস সেনাবাহিনীর জেনারেল গিয়োম অঁরি দুফুর এবং চিকিৎসক লুই আপিয়া ও থিওদর মোনোয়া। এই ছোট কমিটিই পরবর্তী সময়ে ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব দ্য রেড ক্রস বা ICRC-তে পরিণত হয়। ICRC-এর ইতিহাস
কমিটির সামনে দুটি কঠিন প্রশ্ন ছিল। প্রথমত, যুদ্ধরত সেনাবাহিনী কেন শত্রুপক্ষের আহত সৈনিককে সেবা দেবে? দ্বিতীয়ত, স্বেচ্ছাসেবী ও চিকিৎসাকর্মীদের কীভাবে এমন পরিচয় দেওয়া যাবে, যা উভয় পক্ষই চিনবে ও সম্মান করবে?
১৮৬৩ সালের অক্টোবরে জেনেভায় একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন ডাকা হয়। সেখানে ১৪টি সরকারের প্রতিনিধিসহ সামরিক ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। সম্মেলনে যুদ্ধকালীন স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসা সমিতির ভিত্তি এবং একটি অভিন্ন সুরক্ষা প্রতীকের ধারণা গৃহীত হয়।
নির্বাচিত প্রতীকটি ছিল সাদা পটভূমিতে লাল ক্রস। সাধারণভাবে একে সুইজারল্যান্ডের পতাকার রং উল্টে তৈরি প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়—নিরপেক্ষ সুইজারল্যান্ড ও জেনেভার উদ্যোগের প্রতি সম্মান জানিয়ে। এটি কোনো ধর্মীয় পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি; উদ্দেশ্য ছিল দূর থেকে দেখা যায় এমন সহজ, অভিন্ন ও নিরপেক্ষ একটি চিহ্ন তৈরি করা।
২২ আগস্টের সেই সম্মেলন
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তৈরির সিদ্ধান্ত যথেষ্ট ছিল না। যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের আইনগত সুরক্ষা দিতে রাষ্ট্রগুলোর আনুষ্ঠানিক সম্মতি প্রয়োজন ছিল।
সুইস সরকার ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোকে একটি কূটনৈতিক সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানায়। ১৮৬৪ সালের ৮ আগস্ট জেনেভায় সম্মেলন শুরু হয়। ১৬টি দেশের প্রতিনিধিরা আলোচনায় অংশ নেন। জেনারেল দুফুর সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। মোয়নিয়েও সুইস প্রতিনিধিদলের সদস্য ছিলেন। দ্যুনাঁসহ কমিটির অন্য সদস্যরা আলোচনায় ভোট দিতে না পারলেও পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
মূল বিতর্ক তৈরি হয়েছিল স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসাকর্মীদের আইনগত অবস্থান নিয়ে। কিছু দেশ আশঙ্কা করছিল, সামরিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে স্বাধীন স্বেচ্ছাসেবীদের নিরপেক্ষতা স্বীকার করলে যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন জটিলতা তৈরি হতে পারে। শেষ পর্যন্ত সমঝোতা হয়—স্বেচ্ছাসেবীরা সামরিক চিকিৎসা বিভাগের শৃঙ্খলার অধীনে কাজ করলে একই সুরক্ষা পাবেন।
দুই সপ্তাহের আলোচনা শেষে ২২ আগস্ট চুক্তিটি গৃহীত হয়। ১২টি রাষ্ট্রের প্রতিনিধি এতে স্বাক্ষর করেন। ICRC-এর ইতিহাস অনুযায়ী, এই চুক্তির মাধ্যমে প্রথমবার আহত ও অসুস্থ সৈন্যদের রক্ষায় রাষ্ট্রগুলোর আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা প্রতিষ্ঠিত হয়। ICRC ঐতিহাসিক টাইমলাইন
মাত্র দশটি অনুচ্ছেদ কী বদলে দিয়েছিল
১৮৬৪ সালের কনভেনশনটি আজকের আন্তর্জাতিক আইনের তুলনায় খুবই ছোট ছিল। কিন্তু এর নীতিগুলো ছিল যুগান্তকারী।
সামরিক হাসপাতাল ও অ্যাম্বুলেন্সকে নিরপেক্ষ হিসেবে গণ্য করে সুরক্ষা দেওয়ার কথা বলা হয়। চিকিৎসক, চিকিৎসা পরিবহনকর্মী, প্রশাসনিক কর্মী ও ধর্মীয় সেবাদাতাদের দায়িত্ব পালনকালে নিরপেক্ষ মর্যাদা দেওয়া হয়। স্থানীয় অধিবাসীরা আহতদের সাহায্য করলে তাঁদের সম্মান ও সুরক্ষা দেওয়ার বিধান রাখা হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ষষ্ঠ অনুচ্ছেদ: আহত বা অসুস্থ যোদ্ধা যে দেশেরই হোক, তাকে সংগ্রহ করে চিকিৎসা দিতে হবে। ১৮৬৪ কনভেনশনের পাঠ, ICRC
এই বাক্যটি যুদ্ধের পুরোনো যুক্তিতে একটি মৌলিক পরিবর্তন আনে। আগে আহত শত্রুকে ফেলে রাখা, বন্দী করা কিংবা মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া বিজয়ীর ইচ্ছার বিষয় ছিল। নতুন আইন বলল, আহত হওয়ার পর একজন যোদ্ধা আর সক্রিয় হুমকি নন। তাঁর মানবিক অধিকার তাঁর জাতীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভর করবে না।
কনভেনশনটি সাদা পটভূমিতে লাল ক্রসকে সামরিক চিকিৎসাসেবা ও স্বীকৃত সাহায্যকারী সংগঠনের অভিন্ন সুরক্ষা প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করে। যুদ্ধক্ষেত্রে এই চিহ্নের অর্থ ছিল—এখানে আহত মানুষ ও তাদের চিকিৎসাকারীরা আছেন; আক্রমণ করা যাবে না। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আইনবিষয়ক নথি
আইনটি তখনো অসম্পূর্ণ ছিল
প্রথম জেনেভা কনভেনশন মানবতার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি আজকের অর্থে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ আইন ছিল না। এর সুরক্ষা মূলত স্থলযুদ্ধে আহত সেনা এবং তাঁদের চিকিৎসাকারীদের মধ্যে সীমিত ছিল।
যুদ্ধবন্দীদের অধিকার, দখলকৃত এলাকার সাধারণ মানুষ, সমুদ্রে আহত ও জাহাজডুবির শিকার নাবিক, নারী ও শিশু কিংবা গৃহযুদ্ধের শিকার মানুষের জন্য এতে পূর্ণাঙ্গ বিধান ছিল না। আইন লঙ্ঘনের জন্য শক্তিশালী বিচারব্যবস্থাও তৈরি হয়নি। বাস্তব প্রয়োগ শেষ পর্যন্ত যুদ্ধরত রাষ্ট্রগুলোর সদিচ্ছার ওপর অনেকখানি নির্ভর করত।
আরও একটি ঐতিহাসিক বৈপরীত্য ছিল। ইউরোপীয় শক্তিগুলো নিজেদের পারস্পরিক যুদ্ধে মানবিক নিয়ম মানার কথা বললেও একই সময়ে আফ্রিকা ও এশিয়ায় উপনিবেশ বিস্তার, গণহত্যা ও দমনমূলক অভিযান চালাচ্ছিল। যে মানবতাকে তারা ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্রে আইনের স্বীকৃতি দিচ্ছিল, উপনিবেশের মানুষের ক্ষেত্রে সেই মানবতা প্রায়ই অনুপস্থিত ছিল।
তারপরও ১৮৬৪ সালের কনভেনশনের গুরুত্ব কমে না। কারণ প্রথমবার রাষ্ট্রগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নিয়েছিল—যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তারও একটি সীমা আছে এবং শত্রুর মানবিক মর্যাদা সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয় না।

দশ অনুচ্ছেদ থেকে চারটি কনভেনশন
১৮৬৪ সালের আইনকে পরবর্তী সময়ে বারবার সংশোধন ও সম্প্রসারণ করা হয়। ১৯০৬ সালে স্থলযুদ্ধে আহত ও অসুস্থ সেনাদের সুরক্ষা শক্তিশালী করা হয়। ১৯২৯ সালে যুদ্ধবন্দীদের অধিকার নিয়ে পৃথক কনভেনশন গৃহীত হয়।
কিন্তু প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ দেখিয়ে দেয়, শুধু আহত সৈনিক ও যুদ্ধবন্দীকে রক্ষা করলেই যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বেসামরিক মানুষের গণহত্যা, বন্দিশিবির, নির্বাসন ও পরিকল্পিত নির্যাতন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভয়াবহ দুর্বলতা প্রকাশ করে।
এর পর ১৯৪৯ সালের ১২ আগস্ট চারটি নতুন জেনেভা কনভেনশন গৃহীত হয়। প্রথমটি স্থলযুদ্ধে আহত ও অসুস্থ সেনাদের, দ্বিতীয়টি সমুদ্রে আহত ও জাহাজডুবির শিকার সামরিক সদস্যদের, তৃতীয়টি যুদ্ধবন্দীদের এবং চতুর্থটি যুদ্ধের সময় বেসামরিক মানুষকে সুরক্ষা দেয়।
১৯৭৭ সালে দুটি অতিরিক্ত প্রটোকল আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র সংঘাতে সুরক্ষার নিয়ম আরও বিস্তৃত করে। ২০০৫ সালে রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্টের পাশাপাশি রেড ক্রিস্টালকে অতিরিক্ত নিরপেক্ষ প্রতীক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
বর্তমানে ১৯৪৯ সালের চারটি জেনেভা কনভেনশন পৃথিবীর সব রাষ্ট্র অনুমোদন করেছে। এর বহু বিধান আন্তর্জাতিক প্রথাগত আইনের অংশ হিসেবেও বিবেচিত—অর্থাৎ কোনো রাষ্ট্র বা সশস্ত্র গোষ্ঠী শুধু চুক্তির বাইরে থাকার দাবি করে এসব মৌলিক নিয়ম উপেক্ষা করতে পারে না। সুইস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
মানবতার আইন আছে, কিন্তু যুদ্ধ কি বদলেছে?
জেনেভা কনভেনশন যুদ্ধ বন্ধ করতে পারেনি। হাসপাতাল, অ্যাম্বুলেন্স ও চিকিৎসাকর্মীর ওপর আজও হামলা হয়। সাধারণ মানুষকে অবরুদ্ধ রাখা, অনাহারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার, নির্যাতন, জিম্মি করা এবং বন্দীদের অপমান করার ঘটনাও থামেনি।
এই বাস্তবতা দেখে মনে হতে পারে, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ব্যর্থ। কিন্তু আইনের অস্তিত্ব ও আইনের লঙ্ঘন এক বিষয় নয়। হত্যা নিষিদ্ধ হওয়ার পরও হত্যা ঘটে; তাই বলে হত্যাবিরোধী আইন অর্থহীন হয়ে যায় না। বরং আইনই নির্ধারণ করে কোন কাজ গ্রহণযোগ্য নয়, কার দায় নির্ধারণ করতে হবে এবং ভুক্তভোগী কোন অধিকারের দাবি তুলতে পারেন।
জেনেভা কনভেনশন যুদ্ধকে মানবিক করে তোলে—এমন দাবি করাও বিভ্রান্তিকর। যুদ্ধ নিজেই ধ্বংসাত্মক। এই আইন যুদ্ধকে ভালো করে না; বরং সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতেও নিষ্ঠুরতার একটি সীমা টানার চেষ্টা করে।
আহত শত্রুকে চিকিৎসা দেওয়া, বন্দীকে নির্যাতন না করা, চিকিৎসাকর্মীকে আক্রমণ না করা এবং যুদ্ধে অংশ না নেওয়া মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া—আজ এসব নীতি স্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু ১৮৬৪ সালে এগুলোকে আন্তর্জাতিক আইনে লেখা ছিল এক বৈপ্লবিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।
সলফেরিনো থেকে আজকের পৃথিবী
২২ আগস্ট ১৮৬৪-এর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, ইতিহাসের বড় পরিবর্তন সব সময় ক্ষমতাবানদের পরিকল্পনা থেকে আসে না। কখনো একজন সাধারণ প্রত্যক্ষদর্শীর বিবেক, কয়েকজন নাগরিকের উদ্যোগ এবং আহত মানুষের পাশে দাঁড়ানো গ্রামীণ নারীদের মানবিক আচরণও আন্তর্জাতিক আইন বদলে দিতে পারে।
অঁরি দ্যুনাঁ কোনো সেনাপতি ছিলেন না। তাঁর হাতে কোনো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ছিল না। তিনি যুদ্ধ থামাতে পারেননি। তিনি শুধু যা দেখেছিলেন, তা ভুলে যেতে অস্বীকার করেছিলেন।
সলফেরিনোর মাঠে আহত শত্রুকে পানি দেওয়া সেই নারীরা কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তির ভাষা জানতেন না। কিন্তু তাঁদের “তুত্তি ফ্রাতেল্লি”—সবাই ভাই—উচ্চারণের মধ্যেই ভবিষ্যৎ জেনেভা কনভেনশনের নৈতিক ভিত্তি উপস্থিত ছিল।
পাঁচ বছর পর সেই মানবিক উপলব্ধি আইনের ভাষা পেল। রাষ্ট্রগুলো প্রথমবার যৌথভাবে স্বীকার করল, যুদ্ধ শুরু হলে সব আইন শেষ হয়ে যায় না। শত্রুও মানুষ, আহতেরও অধিকার আছে এবং জীবন রক্ষাকারী হাতকে আক্রমণ করা যাবে না।
২২ আগস্ট তাই শুধু একটি চুক্তি স্বাক্ষরের দিন নয়। এটি সেই দিনের স্মৃতি, যেদিন যুদ্ধের নৃশংসতার মাঝখানে মানবতা প্রথমবার আন্তর্জাতিক আইনের একটি স্থায়ী ঠিকানা পেয়েছিল।

আপনার মতামত জানানঃ