
১৯৪৭ সালের ১৪ ও ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ ভারত থেকে জন্ম নিয়েছিল পাকিস্তান ও ভারত। মানচিত্রে একটি সাম্রাজ্য ভেঙে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে দেশভাগ সম্পন্ন হয়েছিল বলে মনে হতে পারে। কিন্তু ৭৯ বছর পরও দক্ষিণ এশিয়ার সীমান্ত, নাগরিকত্ব, ধর্মীয় পরিচয়, উদ্বাস্তু রাজনীতি এবং রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের দিকে তাকালে দেখা যায়—দেশভাগ আসলে শেষ হয়নি।
র্যাডক্লিফের টানা রেখা আজ কাঁটাতারের বেড়া, সীমান্তচৌকি, ভিসা, পাসপোর্ট ও নাগরিকত্বের আইনে পরিণত হয়েছে। ১৯৪৭ সালে যারা বাড়ি হারিয়েছিল, তাদের স্মৃতি এখনো পরবর্তী প্রজন্ম বহন করছে। ভারত ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক বৈরিতা, কাশ্মীর সংঘাত, বাংলাদেশ–ভারত সীমান্ত, ‘অনুপ্রবেশকারী’ বিতর্ক এবং ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব নির্ধারণের চেষ্টা—সবকিছুর ভেতরেই ফিরে আসে সেই অসমাপ্ত বিভাজন।
দেশভাগ তাই কেবল অতীতের একটি ঘটনা নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমানকে নিয়ন্ত্রণ করা একটি জীবন্ত রাজনৈতিক কাঠামো।
স্বাধীনতার আগেই বিভাজিত সমাজ
ব্রিটিশ ভারতের সাম্প্রদায়িক বিভাজন ১৯৪৭ সালে হঠাৎ তৈরি হয়নি। ঔপনিবেশিক শাসন জনগণকে ধর্ম, জাতি ও বর্ণের ভিত্তিতে গণনা, শ্রেণিবিন্যাস এবং রাজনৈতিকভাবে প্রতিনিধিত্ব করার ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী মুসলমান, হিন্দু, শিখ ও অন্যান্য সম্প্রদায়কে রাজনৈতিক নাগরিকের পরিবর্তে ধর্মীয় গোষ্ঠী হিসেবে দেখতে উৎসাহিত করে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল জমি, চাকরি, শিক্ষা ও রাজনৈতিক ক্ষমতা নিয়ে বাস্তব বৈষম্য। বাংলায় হিন্দু জমিদার ও শিক্ষিত মধ্যবিত্তের প্রাধান্যের বিপরীতে বৃহৎ মুসলিম কৃষকসমাজের বঞ্চনা মুসলিম স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত শক্ত করেছিল। অন্যদিকে মুসলিম লীগের পাকিস্তান আন্দোলন অনেক হিন্দুর মধ্যে সংখ্যালঘু হয়ে পড়ার ভয় তৈরি করে।
১৯৪৬ সালের নির্বাচন, কলকাতার ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, নোয়াখালী ও বিহারের হত্যাযজ্ঞ পারস্পরিক অবিশ্বাসকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যায়, যেখানে পাশাপাশি বসবাসকারী মানুষও প্রতিবেশীকে সম্ভাব্য শত্রু হিসেবে দেখতে শুরু করে।
তবু দেশভাগ অনিবার্য ছিল—এমন সিদ্ধান্ত ইতিহাসকে অতিরিক্ত সরল করে। স্বাধীন যুক্তবাংলার প্রস্তাবসহ বিভাজন এড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগ ছিল। কিন্তু কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, হিন্দু মহাসভা, ব্রিটিশ সরকার এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্বে সেগুলো ব্যর্থ হয়। সাম্রাজ্য দ্রুত বিদায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে আলোচনার সময় আরও সংকুচিত হয়ে পড়ে।

পাঁচ সপ্তাহে আঁকা একটি সীমান্ত
পাঞ্জাব ও বাংলা ভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ব্রিটিশ আইনজীবী স্যার সিরিল র্যাডক্লিফকে। তিনি আগে কখনো ভারত সফর করেননি। হাতে ছিল প্রায় পাঁচ সপ্তাহ। এই সময়ের মধ্যে তাঁকে মানচিত্র, জনগণনা, ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা, যোগাযোগব্যবস্থা, নদী, রেলপথ ও প্রশাসনিক এলাকা বিবেচনা করে প্রায় ৮ কোটি ৮০ লাখ মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে হয়েছিল।
ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পরও মানুষ জানত না তাদের গ্রাম কোন দেশে পড়েছে। র্যাডক্লিফ সীমানা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয় ১৭ আগস্ট ১৯৪৭—স্বাধীনতার দুই দিন পর। ফলে নতুন পতাকা ও স্বাধীনতা উদ্যাপনের মধ্যেই লাখো মানুষ আবিষ্কার করে, তারা রাতারাতি অন্য একটি রাষ্ট্রের সংখ্যালঘু নাগরিক হয়ে গেছে। British Online Archives
সীমানা শুধু ভূমি ভাগ করেনি। এটি গ্রাম, বাজার, রেললাইন, নদী, চাষের জমি এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক কেটে দিয়েছিল। কারও বাড়ি এক দেশে, জমি অন্য দেশে; কারও কর্মস্থল সীমান্তের ওপারে; কারও ধর্মীয় স্থান কিংবা পূর্বপুরুষের কবর হঠাৎ বিদেশে পড়ে যায়।
বাংলার মানচিত্রে অনেক সিদ্ধান্তই সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর কাছে বিস্ময়কর ছিল। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মুর্শিদাবাদ ভারতের অংশ হয়, আর হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ খুলনা যায় পূর্ব পাকিস্তানে। পার্বত্য চট্টগ্রামে অমুসলিম জনগোষ্ঠীর বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও অঞ্চলটি পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। ভূগোল, নদীপথ, বন্দর ও প্রশাসনিক প্রয়োজন ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার নীতিকে বিভিন্ন জায়গায় অতিক্রম করেছিল।
অর্থাৎ দেশভাগকে শুধু ‘হিন্দু ভারত’ ও ‘মুসলিম পাকিস্তান’-এর পরিষ্কার বিচ্ছেদ হিসেবে দেখা যায় না। বাস্তবে যে রেখা তৈরি হয়েছিল, সেটি ছিল ধর্ম, ভূগোল, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক দর-কষাকষির এক অসংগত সমন্বয়।
মানুষের ইতিহাসে দেশভাগ
দেশভাগের সবচেয়ে বড় মূল্য দিয়েছিল সাধারণ মানুষ। অন্তত ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করতে বাধ্য হয়েছিল। মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে; বিভিন্ন হিসাবে তা কয়েক লাখ থেকে প্রায় ২০ লাখ পর্যন্ত। বিপুলসংখ্যক নারী অপহরণ, ধর্ষণ ও জোরপূর্বক ধর্মান্তরের শিকার হন। পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়, ঘরবাড়ি লুট হয় এবং শত শত গ্রাম জনশূন্য হয়ে পড়ে। British Red Cross, National Library of Medicine
পাঞ্জাবে দেশভাগের অভিঘাত ছিল দ্রুত ও বিস্ফোরক। অল্প সময়ের মধ্যে পশ্চিম পাঞ্জাব থেকে হিন্দু ও শিখরা পূর্বদিকে এবং পূর্ব পাঞ্জাব থেকে মুসলমানরা পশ্চিমদিকে চলে যায়। ট্রেন, সড়ক ও দীর্ঘ পদযাত্রায় চলা উদ্বাস্তুদের ওপর সংঘবদ্ধ হামলা হয়। কখনো সীমান্তে পৌঁছেছিল মৃতদেহে পূর্ণ ট্রেন।
বাংলায় স্থানান্তর ছিল তুলনামূলক ধীর, অসম এবং দীর্ঘস্থায়ী। পূর্ববঙ্গ থেকে হিন্দুদের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরায় যাত্রা এবং ভারত থেকে মুসলমানদের পূর্ব পাকিস্তানে আগমন একবারে শেষ হয়নি। ১৯৫০ সালের দাঙ্গা, ১৯৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং ১৯৬৫ সালের ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধের পরও নতুন ঢেউয়ে মানুষ সীমান্ত পার হয়েছে।
কলকাতার শিয়ালদহ স্টেশন বছরের পর বছর উদ্বাস্তুদের অস্থায়ী আশ্রয়ে পরিণত হয়েছিল। কেউ সরকারি শিবিরে জায়গা পেয়েছে, কেউ পরিত্যক্ত জমি দখল করে কলোনি গড়ে তুলেছে, আবার অনেককে পশ্চিমবঙ্গ থেকে ভারতের দূরবর্তী পুনর্বাসন এলাকায় পাঠানো হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৪৬ থেকে ষাটের দশকের শেষ পর্যন্ত শিয়ালদহের প্ল্যাটফর্মে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা উদ্বাস্তুদের উপস্থিতি ছিল। SAGE Journals
এই অভিজ্ঞতাই পাঞ্জাব ও বাংলার দেশভাগকে আলাদা করে। পাঞ্জাবে মূল জনস্থানান্তর ছিল ভয়াবহ কিন্তু তুলনামূলকভাবে অল্প সময়ে কেন্দ্রীভূত। বাংলায় দেশভাগ বহু পরিবারের জন্য দশকের পর দশক ধরে চলা অনিশ্চয়তা।
ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের সীমা দেখিয়েছে বাংলাদেশ
পাকিস্তান তৈরি হয়েছিল ভারতীয় মুসলমানদের স্বতন্ত্র জাতিসত্তার দাবির ভিত্তিতে। কিন্তু পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে ছিল প্রায় ১ হাজার মাইল ভারতীয় ভূখণ্ড। ধর্ম ছাড়া ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতায় দুই অংশের পার্থক্য ছিল গভীর।
রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার চেষ্টা করলে পূর্ববাংলায় প্রতিরোধ তৈরি হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন দেখিয়ে দেয়, ধর্মীয় পরিচয় বাঙালির ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে বিলীন করতে পারেনি।
পরবর্তী দুই দশকে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, রাজস্ব বণ্টন, বৈদেশিক মুদ্রা, সামরিক ক্ষমতা ও উন্নয়নব্যয়ে বৈষম্য বাঙালি জাতীয়তাবাদকে শক্তিশালী করে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফল মানতে অস্বীকৃতি, ১৯৭১ সালের সামরিক অভিযান এবং মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশের জন্ম ছিল ১৯৪৭-এর একটি মৌলিক ধারণার বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক রায়: একই ধর্ম থাকলেই দুটি ভৌগোলিক, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিকভাবে পৃথক জনগোষ্ঠী একটি ন্যায়সংগত রাষ্ট্রে পরিণত হয় না। ব্রিটিশ ন্যাশনাল আর্কাইভসও বাংলাদেশের স্বাধীনতার পটভূমিতে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সংঘাত এবং ১৯৭১ সালের যুদ্ধকে চিহ্নিত করেছে। UK National Archives
কিন্তু বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ১৯৪৭-এর উত্তরাধিকার শেষ হয়নি। বরং পূর্ব পাকিস্তানের সীমানাই স্বাধীন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সীমানা হয়ে যায়। র্যাডক্লিফের আঁকা বাংলার রেখা নতুন রাষ্ট্রের ভূগোল নির্ধারণ করতে থাকে।
ছিটমহল: মানচিত্রের ভেতরে আটকে থাকা মানুষ
দেশভাগের সবচেয়ে অদ্ভুত উত্তরাধিকারের একটি ছিল ভারত–বাংলাদেশ ছিটমহল। এক দেশের ভূখণ্ডের ভেতরে অন্য দেশের ছোট ছোট এলাকা—কখনো আবার ছিটমহলের ভেতরে আরেক ছিটমহল—হাজারো মানুষকে কার্যত রাষ্ট্রহীন অবস্থায় রেখেছিল।
বাসিন্দারা নিজেদের দেশের মূল ভূখণ্ডে যেতে বিদেশি সীমান্ত অতিক্রম করতে বাধ্য হতেন। অনেক এলাকায় নিয়মিত পুলিশ, বিদ্যালয়, হাসপাতাল, বিদ্যুৎ ও সরকারি নথির সুবিধা ছিল না। মানচিত্রে নাগরিক হলেও বাস্তবে রাষ্ট্রের অধিকাংশ সেবা তাদের নাগালের বাইরে ছিল।
১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ ও ভারত সীমান্ত চুক্তি করলেও পূর্ণ বাস্তবায়নে চার দশকের বেশি সময় লাগে। ২০১৫ সালের স্থলসীমান্ত চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশে থাকা ১১১টি ভারতীয় এবং ভারতে থাকা ৫১টি বাংলাদেশি ছিটমহল বিনিময় করা হয়। বাসিন্দাদের নাগরিকত্ব বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, Brookings Institution
ছিটমহল বিনিময় প্রমাণ করে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে দেশভাগের রেখে যাওয়া জটিলতা সমাধান সম্ভব। একই সঙ্গে এটি মনে করিয়ে দেয়, একটি তড়িঘড়ি সীমানার ভুল সংশোধন করতে প্রায় ৬৮ বছর সময় লেগেছিল।
কাশ্মীরে এখনো ১৯৪৭
কাশ্মীর হলো দেশভাগের সবচেয়ে বিস্ফোরক অসমাপ্ত অধ্যায়। ব্রিটিশ শাসনের অবসানের সময় রাজ্যটির শাসক ছিলেন হিন্দু, কিন্তু জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল মুসলমান। মহারাজার ভারতে যোগদান, পাকিস্তানপন্থী বাহিনীর অভিযান এবং প্রথম ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধের পর কাশ্মীর বিভক্ত হয়ে যায়।
সেই অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির রেখাই পরে নিয়ন্ত্রণরেখায় পরিণত হয়েছে। পরিবার, বাণিজ্যপথ, পশুচারণের এলাকা ও স্থানীয় অর্থনীতি ভাগ হয়ে যায়। কাশ্মীরের মানুষের আত্মপরিচয় ভারত ও পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় দাবির মাঝখানে আটকে পড়ে। গবেষণায় দেখা যায়, সীমান্তরেখাটি শুধু ভূখণ্ড ভাগ করেনি; এটি কাশ্মীরের ঐতিহাসিক অর্থনীতি ও সামাজিক যোগাযোগও ভেঙে দিয়েছে। Royal Society for Asian Affairs
ভারত ও পাকিস্তানের একাধিক যুদ্ধ, সীমান্ত সংঘর্ষ, সশস্ত্র আন্দোলন এবং উভয় দেশের পারমাণবিক অস্ত্র—সবকিছুর কেন্দ্রেই কোনো না কোনোভাবে ১৯৪৭ রয়েছে। যে ভূখণ্ডের চূড়ান্ত রাজনৈতিক অবস্থান স্বাধীনতার সময় নিষ্পত্তি হয়নি, সেটিই আজও দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বিপজ্জনক সামরিক উত্তেজনার উৎস।
নাগরিকত্বের রাজনীতিতে দেশভাগ
দেশভাগ রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে একটি কঠিন প্রশ্ন রেখে গিয়েছিল: ধর্ম, জন্মস্থান, ভাষা ও বসবাসের ইতিহাসের মধ্যে কোনটি নাগরিকত্ব নির্ধারণ করবে?
ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে যাত্রা শুরু করে। পাকিস্তান মুসলমানদের আবাসভূমি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও সেখানে উল্লেখযোগ্য হিন্দু, খ্রিষ্টান ও অন্যান্য সংখ্যালঘু থেকে যায়। পূর্ব পাকিস্তান এবং পরে বাংলাদেশেও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা রাষ্ট্রের নাগরিক হয়।
কিন্তু সীমান্তবর্তী রাজনীতি বারবার নাগরিককে ধর্মীয় পরিচয়ে পুনর্বিন্যাস করেছে। ভারতীয় রাজনীতিতে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ অভিযোগ, আসামের নাগরিকপঞ্জি এবং নাগরিকত্ব সংশোধন আইন নিয়ে বিতর্কে ১৯৪৭ ও ১৯৭১-এর স্মৃতি সরাসরি উপস্থিত।
ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধন আইন বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে যাওয়া ছয়টি অমুসলিম সম্প্রদায়ের নির্দিষ্ট সময়ের আগের অভিবাসীদের দ্রুত নাগরিকত্বের পথ দিয়েছে, কিন্তু মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত করেনি। ভারত সরকার এটিকে নিপীড়িত সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা হিসেবে উপস্থাপন করে; সমালোচকেরা বলেন, এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো ধর্মকে নাগরিকত্বের একটি প্রকাশ্য মানদণ্ডে পরিণত করা হয়েছে। Associated Press
এই বিতর্কের গভীরে রয়েছে দেশভাগের পুরোনো প্রশ্ন—দক্ষিণ এশিয়ায় একজন মানুষের রাজনৈতিক পরিচয় কি তাঁর ধর্ম দ্বারা নির্ধারিত হবে, নাকি সমান নাগরিকত্বের নীতিতে?

স্মৃতিরও আলাদা সীমান্ত আছে
ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ একই ইতিহাসকে তিনভাবে স্মরণ করে। পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় বয়ানে ১৯৪৭ মূলত মুসলমানদের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্র অর্জনের সাফল্য। ভারতে এটি ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পাশাপাশি দেশভাগের ট্র্যাজেডি। বাংলাদেশে ১৯৪৭ অনেক সময় ১৯৫২ ও ১৯৭১-এর মাঝখানে থাকা একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রীয় সূচনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
কিন্তু প্রতিটি রাষ্ট্রের বয়ানেই সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা আড়ালে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। কোনো বয়ান মুসলমানের উদ্বাস্তু হওয়ার ইতিহাসকে গুরুত্ব দেয়, কোনোটি হিন্দু ও শিখের ক্ষতিকে সামনে আনে। আবার নারীর ওপর সংঘটিত সহিংসতা, দলিত উদ্বাস্তুর বৈষম্য এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা প্রায়ই রাষ্ট্রীয় স্মৃতির বাইরে থাকে।
দেশভাগের স্মৃতি যখন কেবল নিজের সম্প্রদায়ের ভুক্তভোগিতাকে প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যবহৃত হয়, তখন ইতিহাস পুনর্মিলনের বদলে নতুন বিদ্বেষ তৈরি করে। অতীতের মৃতদের স্মরণ করার নামে বর্তমানের নাগরিকদের সন্দেহের চোখে দেখা শুরু হয়।
ইতিহাস তখন আর সহিংসতার বিরুদ্ধে সতর্কতা থাকে না; রাজনৈতিক মেরুকরণের অস্ত্র হয়ে ওঠে।
সীমান্ত আছে, কিন্তু জীবন সীমান্ত মানে না
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৪ হাজার কিলোমিটারের বেশি স্থলসীমান্ত রয়েছে। সীমান্তের দুই পাশে ভাষা, খাবার, গান, নদী, আত্মীয়তা ও অর্থনীতির বহু যোগসূত্র এখনো জীবিত। বৈধ বাণিজ্যের পাশাপাশি সীমান্ত হাট, কৃষিকাজ এবং স্থানীয় যোগাযোগ দেখায় যে রাষ্ট্রের রেখা মানুষের ঐতিহাসিক সম্পর্ক পুরোপুরি মুছে দিতে পারেনি।
অন্যদিকে কাঁটাতার, সীমান্তে প্রাণহানি, চোরাচালান, অনিয়মিত অভিবাসন এবং নদীর গতিপথ নিয়ে বিরোধ সেই সম্পর্ককে প্রতিনিয়ত জটিল করে। র্যাডক্লিফ মানচিত্রে যে রেখা এঁকেছিলেন, বাস্তবে সেটি নদী, চর ও মানুষের চলাচলের সঙ্গে প্রতিনিয়ত সংঘর্ষে জড়ায়।
দেশভাগের সীমান্ত তাই স্থির কোনো রেখা নয়। এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং সীমান্তবাসীর দৈনন্দিন জীবনের মধ্যে চলমান দর-কষাকষি।
দেশভাগ কখন শেষ হবে?
দেশভাগের মানচিত্র বদলে আবার অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠা বাস্তবসম্মত বা প্রয়োজনীয় কোনো সমাধান নয়। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ তিনটি স্বাধীন রাষ্ট্র, প্রত্যেকটির নিজস্ব জাতীয় ইতিহাস ও রাজনৈতিক বৈধতা রয়েছে।
দেশভাগ শেষ হওয়ার অর্থ সীমান্ত বিলুপ্ত হওয়া নয়। এর অর্থ হবে সীমান্তকে মানুষের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার না করা; নাগরিকত্বকে ধর্মীয় পরিচয়ের পরীক্ষায় পরিণত না করা; উদ্বাস্তু স্মৃতিকে সাম্প্রদায়িক ঘৃণার জ্বালানি না বানানো এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে স্থায়ী শত্রুতাকে দেশপ্রেমের শর্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠা না করা।
১৯৪৭ আমাদের শেখায়, নিরাপত্তার নামে তৈরি বিভাজন সব সময় নিরাপত্তা আনে না। ধর্মের ভিত্তিতে ভূখণ্ড আলাদা করলেও ধর্মীয় সংখ্যালঘুর প্রশ্ন শেষ হয় না। নতুন রাষ্ট্র তৈরি করলেও ভাষা, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের দাবি মুছে যায় না। ১৯৭১ সেই সত্যের সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
দেশভাগ ৭৯ বছর আগে মানচিত্রে সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু মানুষের স্মৃতি, নাগরিকত্বের আইন, কাঁটাতারের সীমান্ত এবং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভাষায় এটি এখনো চলছে।
যেদিন রাষ্ট্র একজন মানুষের ধর্মের আগে তার নাগরিকত্ব দেখবে, সীমান্তবাসীর জীবনকে নিরাপত্তার সমান গুরুত্ব দেবে এবং ইতিহাসের সব সম্প্রদায়ের কষ্ট স্বীকার করবে—সেদিন হয়তো দেশভাগ সত্যিই অতীত হতে শুরু করবে।
আপনার মতামত জানানঃ