
বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী স্তম্ভ তৈরি পোশাকশিল্প। বৈদেশিক মুদ্রা আয়, শিল্প কর্মসংস্থান, নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ কিংবা গ্রাম থেকে শহরে শ্রমের স্থানান্তর—সব ক্ষেত্রেই গত চার দশকে এই শিল্পের প্রভাব গভীর। কিন্তু ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির যে চিত্র সামনে এসেছে, তা এই দীর্ঘদিনের সাফল্যের ভিত নিয়েই নতুন প্রশ্ন তুলছে।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ কমে ৮ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ইউরোতে নেমেছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১০ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ইউরো। অর্থাৎ মাত্র ছয় মাসে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় কমেছে প্রায় ১ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ইউরো।
প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, ইউরোপীয় বাজারে চাহিদা কমেছে বলেই বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে। ইউরোপের উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়, দুর্বল ভোক্তা আস্থা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে পোশাক কেনাকাটায় মন্দা থাকা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু পরিসংখ্যানটি একটু গভীরভাবে দেখলে উদ্বেগের অন্য কারণ সামনে আসে।
এই ছয় মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামগ্রিক পোশাক আমদানি কমেছে ৯ দশমিক ৭০ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশ থেকে আমদানি কমেছে ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ। অর্থাৎ ইউরোপের বাজার সংকুচিত হওয়ার তুলনায় বাংলাদেশের পতন উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। প্রতিযোগী রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে এত বড় পতন আর কারও হয়নি। তুরস্কের রপ্তানি কমেছে প্রায় ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ; ভারত ও পাকিস্তানের পতন ছিল সাড়ে ১২ শতাংশের কাছাকাছি। ফলে বাংলাদেশের ক্ষতিকে কেবল ইউরোপের বাজার মন্দার ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
অর্ডার কমেছে, দামও কমেছে
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, রপ্তানির মূল্য ও পরিমাণ—দুটিই একসঙ্গে কমেছে। বছরের প্রথমার্ধে রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। একই সঙ্গে গড় রপ্তানিমূল্য কমেছে ৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
এর অর্থ, বাংলাদেশের কারখানাগুলো শুধু কম পোশাক রপ্তানি করছে না; প্রতিটি পণ্যের বিপরীতে আগের চেয়ে কম দামও পাচ্ছে। বৈশ্বিক ক্রেতাদের সঙ্গে দর-কষাকষিতে বাংলাদেশের দুর্বল অবস্থানের পুরোনো সমস্যাটি এর মধ্য দিয়ে আবারও স্পষ্ট হয়েছে।
বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের বড় অংশ এখনো টি-শার্ট, ট্রাউজার, সোয়েটার ও সাধারণ নিট পোশাকের মতো তুলনামূলক কম মূল্যের পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। একই ধরনের পণ্য বহু দেশ উৎপাদন করতে পারে। ফলে ক্রেতারা সহজেই এক সরবরাহকারীকে অন্য সরবরাহকারীর বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দাম কমানোর চাপ দিতে পারেন।
কম দামে বেশি পণ্য বিক্রি করে বাজার ধরে রাখার যে মডেল বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে বড় করেছে, সেটিই এখন শিল্পটির অন্যতম বড় দুর্বলতায় পরিণত হচ্ছে। কারণ মজুরি, কাঁচামাল, ব্যাংকঋণ, পরিবহন ও জ্বালানির ব্যয় বাড়লেও ক্রেতাদের দেওয়া মূল্য একই হারে বাড়ছে না; বরং অনেক ক্ষেত্রে কমছে।
জ্বালানি সংকট প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমাচ্ছে
বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলো দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চয়তার মধ্যে উৎপাদন চালাচ্ছে। ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলে ডিজেল জেনারেটরের ওপর নির্ভরতা বাড়ে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সময়মতো পণ্য সরবরাহ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পর ২০২৬ সালে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় কোনো কোনো এলাকায় দিনে পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত পৌঁছেছিল। আবার প্রয়োজনীয় ডিজেল না পাওয়ায় ব্যাকআপ জেনারেটর চালানোও কঠিন হয়ে পড়ে। Reuters
আন্তর্জাতিক ক্রেতার কাছে একটি পণ্যের দামই একমাত্র বিবেচ্য নয়। নির্দিষ্ট সময়ে বড় চালান সরবরাহ করা, উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং দ্রুত নতুন অর্ডার নেওয়ার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিত হলে ক্রেতারা ঝুঁকি কমাতে অর্ডার অন্য দেশে সরিয়ে দিতে পারেন।
এই ক্ষতি সব সময় তাৎক্ষণিক পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না। একটি কারখানা কোনো মৌসুমে একটি অর্ডার হারালে পরবর্তী মৌসুমে সেই ক্রেতাকে ফিরে পাওয়া কঠিন হয়ে যেতে পারে। ফলে জ্বালানি সংকট কেবল বর্তমান উৎপাদন ব্যাহত করে না; এটি ভবিষ্যতের বাজারও সংকুচিত করতে পারে।
প্রতিযোগীরা কোথায় এগিয়ে যাচ্ছে?
বাংলাদেশের বড় সুবিধা দীর্ঘদিন ধরে ছিল সস্তা শ্রম, বিশাল উৎপাদনক্ষমতা এবং ইউরোপে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার। কিন্তু বৈশ্বিক পোশাকবাজার এখন শুধু কম খরচের ওপর নির্ভর করছে না।
ভিয়েতনাম অপেক্ষাকৃত উচ্চমূল্যের পোশাক, কৃত্রিম তন্তু, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন এবং দ্রুত সরবরাহব্যবস্থায় এগিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে দেশটির মুক্তবাণিজ্য চুক্তিও ক্রমান্বয়ে বাড়তি সুবিধা তৈরি করছে। ভারত নিজস্ব তুলা, সুতা, কাপড় ও বড় অভ্যন্তরীণ সরবরাহব্যবস্থা কাজে লাগাচ্ছে। পাকিস্তানও তুলাভিত্তিক পণ্য এবং ইউরোপের জিএসপি প্লাস সুবিধাকে ব্যবহার করছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ এখনো আমদানি করা তুলা, কৃত্রিম তন্তু, যন্ত্রাংশ ও বিভিন্ন কাঁচামালের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বন্দর, কাস্টমস, সড়ক পরিবহন এবং ব্যাংকিং প্রক্রিয়ায় বিলম্ব উৎপাদনের সময় ও খরচ বাড়ায়।
ফলে কম মজুরি থাকলেই যে বাংলাদেশ সবচেয়ে সস্তায় ও দ্রুত পণ্য সরবরাহ করতে পারবে—সেই সমীকরণ আর আগের মতো সরল নেই।
জুনের ঘুরে দাঁড়ানো কি আশার সংকেত?
প্রথম ছয় মাসের সামগ্রিক চিত্র নেতিবাচক হলেও জুনে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ওই মাসে ইউরোপে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির মূল্য আগের বছরের তুলনায় শূন্য দশমিক ৮৭ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ইউরো হয়েছে। রপ্তানির পরিমাণ বেড়েছে ৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
তবে একই মাসে গড় রপ্তানিমূল্য কমেছে ৫ দশমিক ৩১ শতাংশ। অর্থাৎ বেশি পণ্য পাঠিয়েও তুলনামূলক কম দাম পাওয়া গেছে। জুনের প্রবৃদ্ধিকে তাই নিশ্চিত পুনরুদ্ধার বলা যাবে না। এটি নতুন অর্ডারের স্থায়ী প্রত্যাবর্তন, নাকি কম দামে বাজার ধরে রাখার ফল—তা বোঝার জন্য পরবর্তী কয়েক মাসের তথ্য দেখতে হবে। The Business Standard
একটি খাতের ওপর অতিনির্ভরতার ঝুঁকি
বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানির প্রায় চার-পঞ্চমাংশই তৈরি পোশাক থেকে আসে। প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক সরাসরি এই খাতে কাজ করেন, যাদের বড় অংশ নারী। পরিবহন, প্যাকেজিং, ব্যাংকিং, বীমা, বন্দর, সুতা ও কাপড় উৎপাদনসহ আরও বহু খাত পোশাকশিল্পের ওপর নির্ভরশীল।
তাই ইউরোপের বাজারে দীর্ঘমেয়াদি পতন শুধু কারখানার মালিকদের সমস্যা নয়। এর প্রভাব পড়তে পারে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ, টাকার বিনিময় হার, ব্যাংকঋণ পরিশোধ, শ্রমিকের কর্মসংস্থান এবং শহরকেন্দ্রিক নিম্ন ও মধ্যবিত্ত অর্থনীতিতে।
অর্ডার কমলে বড় কারখানাগুলো হয়তো কিছুদিন লোকসান সামলে নিতে পারবে। কিন্তু ছোট ও মাঝারি কারখানা সাব-কন্ট্রাক্ট হারিয়ে দ্রুত সংকটে পড়তে পারে। প্রথম আঘাত সাধারণত আসে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা কমানো, নিয়োগ বন্ধ করা কিংবা অস্থায়ী শ্রমিক ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে। পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে কারখানা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়।
বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় পরীক্ষা হলো স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ। ইউরোপের বাজারে বিদ্যমান বাণিজ্যসুবিধা স্থায়ী নয়। নতুন ব্যবস্থায় সুবিধা ধরে রাখতে হলে শ্রম অধিকার, পরিবেশ, সুশাসন এবং আন্তর্জাতিক কনভেনশন বাস্তবায়নে আরও কঠোর মান পূরণ করতে হবে। একই সঙ্গে ইউরোপে ডিজিটাল পণ্য-পাসপোর্ট, কার্বন নিঃসরণ, পুনর্ব্যবহার এবং সরবরাহব্যবস্থার স্বচ্ছতার মতো নিয়ম কঠোর হচ্ছে।
এগুলো মানতে না পারলে শুল্কের পাশাপাশি অশুল্ক বাধাও বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা কমিয়ে দিতে পারে।
সংকট থেকে বের হওয়ার পথ
বাংলাদেশের পোশাকশিল্প এখনো ভেঙে পড়ছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো তাড়াহুড়ো হবে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশটির মোট পোশাক রপ্তানি ছিল প্রায় ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার। চার হাজারের বেশি কারখানা, দক্ষ শ্রমশক্তি ও দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক ক্রেতা-সম্পর্ক এখনো বড় শক্তি। BGMEA
কিন্তু কেবল পুরোনো সক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের বাজার ধরে রাখা সম্ভব হবে না। প্রথমত, কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন ও প্রতিযোগিতামূলক মূল্যের জ্বালানি নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কৃত্রিম তন্তু, ক্রীড়াপোশাক, প্রযুক্তিনির্ভর পোশাক ও উচ্চমূল্যের ফ্যাশনপণ্যে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, বন্দর ও কাস্টমসের সময় কমানো এবং স্থানীয় কাঁচামালের সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব কারখানার সনদকে শুধু ভাবমূর্তি তৈরির উপকরণ হিসেবে না দেখে উচ্চমূল্যের অর্ডার পাওয়ার কৌশলে রূপ দিতে হবে। ইউরোপীয় ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের সবুজ কারখানার সংখ্যা বড় অর্জন; কিন্তু উৎপাদনশীলতা ও পণ্যের মূল্য না বাড়লে সেই অর্জনের আর্থিক সুবিধা সীমিত থাকবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সরকার ও শিল্পমালিকদের রপ্তানির পরিমাণকে সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে। এক কেজি পোশাক রপ্তানি করে বাংলাদেশ কত মূল্য পাচ্ছে, সেই মূল্য থেকে শ্রমিক কতটা লাভবান হচ্ছেন এবং উৎপাদন কতটা টেকসই—এই প্রশ্নগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ইউরোপে ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ পতন এখনই বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের পতনের ঘোষণা নয়। তবে এটি একটি স্পষ্ট সতর্কসংকেত। ইউরোপের বাজার সংকুচিত হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের বাজার আরও দ্রুত সংকুচিত হয়েছে। অর্ডার কমেছে, পণ্যের দাম কমেছে এবং প্রতিযোগীরা চাপ বাড়াচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান স্তম্ভ এখনো দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সেই স্তম্ভের ওপর যে চাপ জমছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সময়মতো জ্বালানি, প্রযুক্তি, পণ্য বৈচিত্র্য ও ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা না গেলে আজকের সাময়িক পতনই আগামী দিনের স্থায়ী বাজার হারানোর সূচনা হয়ে উঠতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ