প্রতি বছর বর্ষা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে দেশের লাখো মানুষের আরেকটি দুশ্চিন্তা ফিরে আসে—বিদ্যুৎ বিল। জুন মাস এলেই যেন পরিচিত এক আতঙ্ক গ্রাস করে সাধারণ গ্রাহকদের। মাসজুড়ে একই জীবনযাপন, একই বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ব্যবহার, কোথাও কোথাও দীর্ঘ সময় লোডশেডিং—সবকিছু মিলিয়েও যখন আগের মাসের তুলনায় দুই, তিন, এমনকি দশ গুণ বেশি বিদ্যুৎ বিল হাতে আসে, তখন বিস্ময়ের সঙ্গে যুক্ত হয় ক্ষোভ ও অসহায়ত্ব। এবারের জুনও সেই পুরোনো প্রশ্নকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে—যদি ব্যবহার না বাড়ে, তাহলে বিল বাড়ে কীভাবে?
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় পাঁচ কোটি বিদ্যুৎ গ্রাহক রয়েছে। এদের একটি বড় অংশ এখনও পোস্টপেইড মিটার ব্যবহার করেন। আবার শহরাঞ্চলে দ্রুত বাড়ছে প্রিপেইড মিটারের ব্যবহারও। কিন্তু প্রযুক্তির এই পরিবর্তনও গ্রাহকদের দুর্ভোগ কমাতে পারেনি। বরং এবার দেখা গেছে, পোস্টপেইড ও প্রিপেইড—উভয় ধরনের গ্রাহকই অস্বাভাবিক বিলের অভিযোগ তুলেছেন। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে নারায়ণগঞ্জ, সাভার, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুড়িগ্রাম, হবিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা উঠে এসেছে।
অনেক গ্রাহক বলছেন, বাসায় নতুন কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্র যোগ হয়নি। এসি থাকলে সেটিও আগের মতোই ব্যবহার হয়েছে। কোথাও আবার লোডশেডিংয়ের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎই ছিল না। তবুও জুন মাসের বিল দেখে যেন বাস্তবতার সঙ্গে কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছেন না তারা। কেউ যেখানে প্রতি মাসে দেড় হাজার টাকা বিল দিতেন, সেখানে জুনে বিল এসেছে চৌদ্দ হাজার টাকার বেশি। আবার কারও ছয়-সাত হাজার টাকার নিয়মিত বিল এক লাফে পৌঁছে গেছে প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকায়। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং এতটাই বিস্তৃত যে এটি এখন একটি জাতীয় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে অবশ্য এই অতিরিক্ত বিলের ব্যাখ্যাও দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, জুন মাসে তাপমাত্রা তুলনামূলক বেশি ছিল। ফলে ফ্যান, এসি ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুতের ইউনিট মূল্যও আগের তুলনায় বেশি হওয়ায় অনেক গ্রাহকের বিল স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে। এই ব্যাখ্যায় কিছু সত্যতা থাকলেও প্রশ্ন থেকে যায়—ব্যবহার সামান্য বাড়লেও কীভাবে বিল কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে? একজন গ্রাহকের বিল যদি এক হাজার পাঁচশ টাকা থেকে চৌদ্দ হাজার টাকায় পৌঁছে যায়, কিংবা সাত হাজার টাকা থেকে প্রায় ঊনপঞ্চাশ হাজার টাকায় ওঠে, তাহলে সেটিকে কি কেবলমাত্র ‘গরম বেশি ছিল’ বলে ব্যাখ্যা করা যায়?
বিদ্যুৎ খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা বলছেন, সমস্যার মূল কারণ অনেক ক্ষেত্রেই বিলিং ব্যবস্থার দুর্বলতা। অনেক এলাকায় নিয়মিত মিটার রিডিং নেওয়া হয় না। কখনও অনুমাননির্ভর বিল করা হয়, আবার কখনও কয়েক মাসের রিডিং একসঙ্গে যুক্ত করে বিল তৈরি করা হয়। এতে গ্রাহক হঠাৎ করেই উচ্চতর স্ল্যাবে চলে যান এবং ইউনিটপ্রতি বেশি দামে বিদ্যুতের বিল দিতে বাধ্য হন। অর্থাৎ, এক মাসে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়েছে বলে দেখানো হচ্ছে, বাস্তবে সেটি হয়তো দুই বা তিন মাসের সম্মিলিত ব্যবহার। কিন্তু বিলটি যাচ্ছে এক মাসের নামে। ফলে গ্রাহকের কাছে সেটি অস্বাভাবিক বলেই মনে হয়।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে ভুল ধরা পড়লেও সেটি শুধুমাত্র অভিযোগ করার পর সংশোধন করা হয়। রাজধানীর এক গ্রাহকের বিল দেড় হাজার টাকা থেকে বেড়ে সাড়ে চৌদ্দ হাজার টাকায় পৌঁছায়। পরে বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে জানা যায়, একটি ডিজিট ভুল বসানোর কারণে এই বিপত্তি ঘটেছে। সংশোধনের পর বিল আবার স্বাভাবিক হয়ে আসে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যিনি অভিযোগ করার সুযোগ বা সামর্থ্য রাখেন না, কিংবা ভুল বুঝতেই পারেন না, তাঁর কী হবে? তিনি কি অযৌক্তিক বিল পরিশোধ করতে বাধ্য হবেন?
গ্রাহকদের অভিযোগের আরেকটি দিক হলো প্রিপেইড মিটার। এই প্রযুক্তি চালুর সময় বলা হয়েছিল, এতে বিল নিয়ে কোনো বিভ্রান্তি থাকবে না। গ্রাহক যতটুকু ব্যবহার করবেন, ততটুকুই পরিশোধ করবেন। কিন্তু বাস্তবে অনেক প্রিপেইড ব্যবহারকারী অভিযোগ করছেন, রিচার্জ করার পর অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে টাকা কেটে যাচ্ছে। কেউ মাত্র তেরো দিনে নয় হাজার টাকার রিচার্জ শেষ হয়ে যাওয়ার কথা বলছেন, আবার কেউ দেখছেন কয়েক দিনের ব্যবধানে শত শত টাকা মিটার থেকে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। একই ব্যবহার, একই পরিবার, একই যন্ত্রপাতি—তবু ব্যয়ের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি প্রযুক্তির প্রতি মানুষের আস্থাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
বিদ্যুৎ বিল নিয়ে এমন অসন্তোষ নতুন নয়। প্রতিবছর জুনের শেষ দিকে কিংবা অর্থবছরের সমাপ্তির সময় এ ধরনের অভিযোগ বাড়তে দেখা যায়। বিদ্যুৎ খাতের কিছু সূত্রের দাবি, বছরের শেষে রাজস্ব আয় বা সিস্টেম লসের হিসাব সুন্দরভাবে উপস্থাপনের চাপ থেকেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিলিংয়ে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হতে পারে। যদিও এ ধরনের অভিযোগের আনুষ্ঠানিক প্রমাণ মেলেনি, তবুও বিষয়টি নিয়ে স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে।
দেশের ভোক্তা অধিকার ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরাও দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ বিলিং ব্যবস্থায় সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছেন। তাঁদের মতে, যতদিন পর্যন্ত শতভাগ নির্ভুল মিটার রিডিং, স্বয়ংক্রিয় বিলিং এবং কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত না হবে, ততদিন এই ধরনের অভিযোগ চলতেই থাকবে। প্রযুক্তি আছে, ডিজিটাল মিটার আছে, অনলাইন ডাটাবেস আছে—কিন্তু সেগুলোর কার্যকর ব্যবহার না হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমবে না।
সরকারও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক, বিতরণ কোম্পানি এবং বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়ে পর্যালোচনা সভা হয়েছে। সেখানে ভুল বিল দ্রুত সংশোধন, কারিগরি ত্রুটি চিহ্নিত করা এবং অসদুপায় প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি বিদ্যুৎ অফিসে অভিযোগ সেলও চালু করার কথা বলা হয়েছে, যাতে গ্রাহক দ্রুত সমস্যার সমাধান পান।
তবে বাস্তবতা হলো, অভিযোগ সেল থাকলেও অনেক গ্রাহক সেখানে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত সেবা পান না। অনেককে প্রথমে পুরো বিল পরিশোধ করতে বলা হয়, পরে সমন্বয়ের আশ্বাস দেওয়া হয়। কিন্তু একজন মধ্যবিত্ত বা নিম্নআয়ের পরিবারের পক্ষে হঠাৎ কয়েক হাজার কিংবা কয়েক লাখ টাকার ভুল বিল পরিশোধ করা আদৌ সম্ভব নয়। ভুল যদি কর্তৃপক্ষের হয়, তাহলে তার আর্থিক চাপ কেন গ্রাহক বহন করবেন—এই প্রশ্নও ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্যুৎ বিলের ছবি প্রকাশ করে ক্ষোভ জানাচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। কেউ লিখছেন, বিদ্যুৎ বিল দেবেন নাকি সংসার চালাবেন—সেই সিদ্ধান্তই নিতে পারছেন না। আবার কোথাও কোটি টাকার বিদ্যুৎ বিল ইস্যুর মতো ঘটনাও ঘটেছে, যা পরে কম্পিউটারজনিত ভুল বলে সংশোধন করা হয়েছে। কিন্তু এসব ঘটনা মানুষের মনে একটি বড় প্রশ্ন তৈরি করছে—যদি কোটি টাকার ভুল বিল তৈরি হতে পারে, তাহলে ছোট ছোট ভুলও কি নিয়মিত হচ্ছে না?
বিদ্যুৎ একটি মৌলিক সেবা। এর বিলিং ব্যবস্থায় আস্থা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিদ্যুৎ শুধু আলো জ্বালানোর বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবনযাত্রা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তাই বিল নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে সেটি কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক আস্থার সংকটেও পরিণত হয়।
সমাধানের পথও খুব জটিল নয়। প্রথমত, শতভাগ নির্ভুল ও নিয়মিত মিটার রিডিং নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি বিলের সঙ্গে আগের ও বর্তমান রিডিং, ব্যবহৃত ইউনিট এবং স্ল্যাবের হিসাব এমনভাবে দিতে হবে, যাতে সাধারণ গ্রাহক সহজেই তা বুঝতে পারেন। তৃতীয়ত, ভুল বিলের ক্ষেত্রে গ্রাহককে আগে অর্থ পরিশোধে বাধ্য না করে দ্রুত তদন্ত ও সংশোধনের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগ নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনাও জরুরি।
প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট গ্রিড, স্বয়ংক্রিয় মিটার রিডিং এবং ডিজিটাল বিলিং ব্যবস্থার যুগে দাঁড়িয়ে এখনও যদি লাখো মানুষ প্রতি জুনে ‘ভূতুড়ে বিল’-এর আতঙ্কে ভোগেন, তাহলে সেটি শুধু প্রযুক্তির ব্যর্থতা নয়, প্রশাসনিক দুর্বলতারও প্রতিফলন। বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন উৎপাদনের পাশাপাশি গ্রাহকসেবাও সমান গুরুত্ব পাবে। কারণ একজন গ্রাহকের কাছে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো—তিনি যতটুকু বিদ্যুৎ ব্যবহার করবেন, ঠিক ততটুকুরই ন্যায্য বিল পাবেন। সেই ন্যায্যতার নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠাই এখন বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আপনার মতামত জানানঃ