
জুলাই অভ্যুত্থানের পর দুই বছর কেটে গেছে। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর যখন গুম শব্দটি অতীতের অধ্যায় হয়ে যাওয়ার কথা ছিল, তখন মংলার এক জেলের নিখোঁজ হওয়া সেই আশাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হেফাজতে থাকা অবস্থায় কাউকে “গায়েব” করে দেওয়ার পুরনো চর্চা কি ফিরে এলো, নাকি এটি বিচ্ছিন্ন একটি ঘটনা?
কী ঘটেছিল মিরাজ শেখের সঙ্গে?
২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল রাতে সুন্দরবন–সংলগ্ন মংলার জয়মনিরঘোল এলাকায় জেলে মিরাজ শেখকে কোস্ট গার্ড সদস্যরা আটক করে স্পিডবোটে তুলে নিয়ে যান বলে একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন। পরদিন পরিবার মংলার দিগরাজে কোস্ট গার্ড কার্যালয়ে গেলে প্রথমে বলা হয়, তিনি “অপারেশনে” আছেন, বিকেলে আসতে বলা হয়। বিকেলে গেলে কর্তৃপক্ষ সরাসরি অস্বীকার করে যে তিনি সেখানে কখনো ছিলেন। দশ দিন পর যে চায়ের দোকানে তার মোটরসাইকেল রেখে যাওয়া হয়েছিল, সেখানে কোস্ট গার্ড পরিচয়ে এক ব্যক্তি এসে মোটরসাইকেলটি নিয়ে যান এবং পরদিন ফেরত দেন—একটি ইঙ্গিত যে ঘটনার সঙ্গে কোস্ট গার্ডের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে।
পরিবার অভিযোগ দায়ের, সংবাদ সম্মেলন এবং একাধিক দপ্তরে চিঠি লেখার পরও কোনো সাড়া না পেয়ে হেবিয়াস কর্পাস আবেদন করে। এর ভিত্তিতে গত ১২ জুলাই হাইকোর্ট ১৫ দিনের মধ্যে মিরাজকে খুঁজে বের করে আদালতে হাজির করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দেয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ভাষ্যমতে, এটি ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর প্রথম নিশ্চিত জোরপূর্বক গুমের ঘটনা বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া: অস্বীকৃতির চক্র
কোস্ট গার্ডের পশ্চিম অঞ্চলের মিডিয়া কর্মকর্তা লে. কমান্ডার মাহবুব হোসেন বারবার মিরাজকে আটকের কথা অস্বীকার করেছেন এবং গণমাধ্যমকে বলেছেন তার সম্পর্কে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। এই ধরনের অস্বীকৃতি বাংলাদেশে গুমের পুরনো ধরনের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়—আটকের কথা প্রথমে ঘুরিয়ে স্বীকার করা, পরে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা।
সংখ্যা যা প্রেক্ষাপট বলে দেয়
অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত গুম কমিশন ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১,৫৬৯টি গুমের ঘটনা চিহ্নিত করেছিল। এর মধ্যে ১,২৮২ জন গোপন আটকাবস্থার পর ফিরে এসেছেন, ২৫১ জন কখনো ফেরেননি এবং তাদের মৃত ধরে নেওয়া হচ্ছে, আর ৩৬ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। কমিশন নিজেই এই সংখ্যাকে “যথেষ্ট কম করে দেখানো” বলে অভিহিত করেছিল। পুলিশের গোয়েন্দা শাখা, কাউন্টার টেররিজম ইউনিট, র্যাব এবং সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই—এই বাহিনীগুলোর নাম বারবার এসেছে এসব ঘটনায়।
সংস্কার যেখানে থমকে গেছে
অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে দুটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল—জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ—যা কমিশনকে স্বাধীনভাবে তদন্তের এবং বিনা আদালতি অনুমতিতে যেকোনো আটক কেন্দ্র পরিদর্শনের ক্ষমতা দিয়েছিল। কিন্তু নির্বাচিত বিএনপি সরকার এই অধ্যাদেশ মেয়াদোত্তীর্ণ হতে দিয়েছে এবং নতুন যে “জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল ২০২৬” প্রস্তাব করেছে, তাতে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা কার্যত কমিশনের হাত থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত আইনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে কমিশন শুধু “সংশ্লিষ্ট বাহিনীর প্রধানের কাছ থেকে প্রতিবেদন চাইতে” পারবে—অর্থাৎ বাহিনী নিজেই নিজের বিরুদ্ধে তদন্ত করবে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ ১২টি আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সংগঠন যৌথ বিবৃতিতে এই বিলকে “প্যারিস নীতিমালা লঙ্ঘনকারী” ও কমিশনকে “প্রতীকী প্রতিষ্ঠানে” পরিণত করার উদ্যোগ বলে আখ্যা দিয়েছে।
কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
আরমান নামে পরিচিত আইনজীবী মীর আহমদ বিন কাসেম আট বছর গোপন আটকাবস্থায় থাকার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট মুক্তি পান। তার ভাষায়, আট বছর তিনি সূর্যের আলো দেখেননি। এমন নজিরের পরও যদি প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার কাঠামো দুর্বল করে ফেলা হয়, তাহলে মিরাজ শেখের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়—বরং একটি প্যাটার্নের পুনরাবৃত্তি হতে পারে বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করেছে।
পরবর্তী নজর রাখার বিষয়
- হাইকোর্টের ১৫ দিনের সময়সীমার মধ্যে মিরাজ শেখকে হাজির করা হয় কিনা
- জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল ২০২৬ সংসদে কী আকারে পাস হয়, নাকি সংশোধিত হয়
- সরকার গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশের বিকল্প কোনো কাঠামো আনে কিনা
আপনার মতামত জানানঃ