
গত ২৪ ঘণ্টায় হরমুজ প্রণালিতে অন্তত তিনটি জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতিকে নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, ওমানের লিমাহ উপকূল থেকে প্রায় ৮ নটিক্যাল মাইল পূর্বে একটি ট্যাংকার অজ্ঞাত বস্তুর আঘাতে আগুন ধরে যায়, যদিও এতে কোনো হতাহতের ঘটনা বা পরিবেশগত ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। একই দিনে দ্বিতীয় আরেকটি জাহাজও কাঠামোগত ক্ষতির শিকার হয়।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি অভিযোগ করেছেন, কাতারের পতাকাবাহী ট্যাংকার “আল রেকায়াত”-এ হামলা চালানো হয়েছে, যাকে তিনি আন্তর্জাতিক নৌচলাচল ও বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত বলে অভিহিত করেছেন এবং আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে বর্ণনা করেছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম অজ্ঞাতনামা সূত্রের বরাত দিয়ে ইঙ্গিত দিয়েছে যে তেহরান নিজেই এই হামলা চালিয়েছে, তবে ইসলামিক রিপাবলিকের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক দায় স্বীকার করা হয়নি।
প্রেক্ষাপট: কেন হরমুজ ফের অস্থির
এই হামলাগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়—এগুলো একটি দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী সংকটের ধারাবাহিকতা মাত্র। গত ফেব্রুয়ারির শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ বিমান হামলা শুরু করার পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল। ওই হামলাতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন, যিনি তিন দশকের বেশি সময় ধরে দেশটি শাসন করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর ছেলে মোজতবা খামেনি নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নিলেও নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে তিনি এখনো জনসমক্ষে হাজির হননি, যা দেশটির নেতৃত্বের স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বর্তমানে তেহরানে খামেনির ছয় দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যানুষ্ঠান চলছে, যেখানে লাখো মানুষ অংশ নিচ্ছেন এবং “প্রতিশোধ” নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন।
যুদ্ধ চলাকালে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) প্রণালিতে মাইন বসায় এবং বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায়, ফলে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ সমুদ্রপথে তেল বাণিজ্য বিঘ্নিত হয়। গত জুন মাসে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র একটি সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) সই করার পর প্রণালি ধীরে ধীরে পুনরায় সচল হতে শুরু করে এবং ৬০ দিনের জন্য বিনা মাশুলে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়। তবে ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে যুদ্ধ-পূর্ব অবাধ চলাচলের অবস্থায় আর ফেরা হবে না—দেশটি নিজস্ব অনুমোদিত করিডর ব্যবহারের শর্ত আরোপ করেছে এবং সতর্ক করেছে যে নির্ধারিত পথের বাইরে গেলে জাহাজগুলো ঝুঁকিতে পড়বে।
হোয়াইট হাউসে সোমবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানকে হুঁশিয়ার করে বলেছেন, ইরানকে হয় চুক্তিতে আসতে হবে, নয়তো যুক্তরাষ্ট্র “কাজ শেষ” করবে। তিনি ইরানের সেতু ও জ্বালানি সরবরাহ অবকাঠামো এক ঘণ্টার মধ্যে ধ্বংস করে দেওয়ার সক্ষমতার কথাও উল্লেখ করেছেন।
অর্থনৈতিক অভিঘাত
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর—যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল ও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই পথে পরিবাহিত হতো। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এই সংকট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল বাজার ধাক্কার জন্ম দিয়েছে—মার্চ মাসের মধ্যেই ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৬৫ শতাংশ বেড়ে যায়। এশিয়া—বিশেষত চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া—এই সরবরাহ বিঘ্নের সবচেয়ে বড় শিকার, কারণ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তেল-গ্যাসের প্রায় ৮৪ শতাংশই এশিয়ামুখী।
গত কয়েক সপ্তাহে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বিকল্প পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল রপ্তানি করে সরবরাহ ঘাটতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে, আর যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশ মজুত তেল বাজারে ছেড়ে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছে। জুলাইয়ের শুরুতে প্রণালি পুনরায় সচল হওয়ার আশায় তেলের দাম কিছুটা কমে এসেছিল এবং সরবরাহ-ঘাটতি বরং সরবরাহ-উদ্বৃত্তের শঙ্কায় রূপ নিচ্ছিল। কিন্তু মঙ্গলবারের নতুন হামলাগুলো সেই স্বস্তিতে আবার অনিশ্চয়তার ছায়া ফেলল।
শুধু তেল নয়—মিথানল, সালফার, সিন্থেটিক গ্র্যাফাইট ও সারের কাঁচামালের মতো অন্তত ন’টি গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলও এই সংকটে বিপর্যস্ত হয়েছে বলে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভিয়েতনামের মতো তেল-আমদানিনির্ভর দেশগুলো এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে—বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে মন্দার মতো প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করা হয়েছে।
আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া ও ঝুঁকি
জাতিসংঘের সামুদ্রিক সংস্থা ইউএস নেভি-পরিচালিত জয়েন্ট মেরিটাইম ইনফরমেশন সেন্টার সম্প্রতি জাহাজ পরিচালনাকারীদের জানিয়েছে, ওমান উপকূল ঘেঁষা বিকল্প পথ এখন সব ধরনের চলাচলের জন্য প্রশস্ত ও উন্মুক্ত রয়েছে। তারপরও ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ড গত সপ্তাহেই সতর্ক করেছিল যে সব তেল ট্যাংকারকে তাদের অনুমোদিত পথ ব্যবহার করতে হবে এবং মার্কিন বাহিনীর কোনো হস্তক্ষেপের “দ্রুত ও কঠোর জবাব” দেওয়া হবে।
যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স ইতিমধ্যে হরমুজে নৌচলাচলের স্বাধীনতা রক্ষায় সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে, যার বিরুদ্ধে ইরান কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে। এদিকে খামেনির শেষকৃত্যকে কেন্দ্র করে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে দোহায় চলা পরোক্ষ আলোচনা সাময়িকভাবে স্থগিত রয়েছে, যা পরিস্থিতি সমাধানের পথে সাম্প্রতিক অগ্রগতিকে থমকে দিয়েছে।
সামনে কী
বিশ্লেষকদের মতে, প্রণালির নিরাপত্তা মূলত নির্ভর করছে দুটি বিষয়ের ওপর—এক, খামেনির শেষকৃত্যের পর ইরানের নতুন নেতৃত্ব দৃশ্যমান ও স্থিতিশীল হয় কিনা, এবং দুই, দোহার পরোক্ষ আলোচনা পুনরায় শুরু হয়ে স্থায়ী শান্তিচুক্তির দিকে এগোয় কিনা। জ্বালানি বাজার বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, প্রণালি দীর্ঘ সময় অস্থির থাকলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৭০ থেকে ২০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধির ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে—বিশেষত বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য যা হবে বাড়তি চাপ।
সব মিলিয়ে, মঙ্গলবারের হামলাগুলো প্রমাণ করে যে যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালি এখনো একটি অত্যন্ত ভঙ্গুর ভূ-রাজনৈতিক বিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে একটিমাত্র ঘটনা গোটা অঞ্চলকে আবারও পূর্ণমাত্রার সংকটে ঠেলে দিতে পারে।
আপনার মতামত জানানঃ