বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মানুষের হতাশা নতুন কোনো বিষয় নয়। বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকা, বিচার পেতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম অপেক্ষা করা এবং আদালতের ওপর রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ এ দেশের বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর অনেকেই আশা করেছিলেন যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই বাস্তবতা বদলাবে। কিন্তু নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সেই আশার বড় একটি অংশ আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
৪৫ বছর বয়সী মারজান বেগমের গল্প যেন বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি। লক্ষ্মীপুর থেকে ঢাকায় আসতে তার প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সময় লাগে। তারপরও তাকে বারবার আসতে হয় সুপ্রিম কোর্টের করিডোরে, আইনজীবীর সহকারী বা মুহুরির খোঁজে, মামলার অগ্রগতির খবর জানতে। এই মামলার শুরু ১৯৯০ সালে। তার দাদা মকবুল আহমদ মিয়া অভিযোগ করেছিলেন যে আত্মীয়স্বজন জালিয়াতির মাধ্যমে তার জমির দলিল তৈরি করেছেন। দাদার মৃত্যুর পর মামলা চালিয়ে গেছেন তার বাবা। এরপর বড় ভাই। একে একে সবাই মারা গেছেন। এখন মামলাটি চালিয়ে যাচ্ছেন মারজান বেগম।
২০২৪ সালে দীর্ঘ ২৫ বছরের অপেক্ষার পর লক্ষ্মীপুর জেলা আদালত তাদের পক্ষে রায় দেয়। কিন্তু প্রতিপক্ষ সেই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করে। ফলে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনো হয়নি। বিচার পাওয়ার এই অন্তহীন যাত্রা শুধু মারজানের নয়; এটি বাংলাদেশের লাখো মানুষের অভিজ্ঞতা।
সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত হাইকোর্ট বিভাগে বিচারপতির সংখ্যা ছিল মাত্র ১০২ জন। অথচ বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৬ লাখ ৫৯ হাজার ২৫৬। অর্থাৎ গড়ে প্রতিটি বিচারপতির কাঁধে রয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৪৬৩টি মামলা। গত ১৮ বছরের নিষ্পত্তির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, একজন বিচারপতি বছরে গড়ে ৪৩৫টি মামলা নিষ্পত্তি করতে পারেন। এই হারে যদি নতুন কোনো মামলা আদালতে না-ও আসে, তবুও বিদ্যমান মামলাগুলো নিষ্পত্তি করতে সময় লাগবে ১৫ বছরেরও বেশি।
নিম্ন আদালতের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। সারা দেশের অধস্তন আদালতে ২ হাজার ৩০১ জন বিচারকের সামনে বিচারাধীন রয়েছে ৪০ লাখ ৪১ হাজার ৩৬২টি মামলা। অর্থাৎ প্রত্যেক বিচারকের ওপর গড়ে প্রায় ১ হাজার ৭৫৬টি মামলা রয়েছে। এক বছরের মধ্যে এই জট নিরসন করতে হলে নতুন কোনো মামলা না আসার শর্তে বাংলাদেশের প্রয়োজন হবে প্রায় ৬ হাজার ৩০০ বিচারক, যা বর্তমান সংখ্যার প্রায় তিন গুণ। প্রায় সাত লাখ মামলা পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে জেলা আদালতগুলোতে ঝুলে আছে।
ঢাকা আইনজীবী সমিতির ২০২৫-২৬ মেয়াদের সভাপতি খোরশেদ মিয়া আলম বলেন, মানুষ ন্যায়বিচার সময়মতো পাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে বিচার পেলেও সেটি এত দেরিতে আসে যে ততদিনে ক্ষতির পরিমাণ অপূরণীয় হয়ে যায়।
বিচারব্যবস্থার এই অচলাবস্থার কারণ শুধু মামলার সংখ্যা নয়। সাবেক এক সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতি, কয়েকজন নিম্ন আদালতের বিচারক, আইনজীবী, মামলার বাদী-বিবাদী এবং বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সদস্যদের বক্তব্যে উঠে এসেছে আরও গভীর সংকটের চিত্র। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে বিচার বিভাগকে ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্বল এবং নির্বাহী বিভাগের ওপর নির্ভরশীল রাখা হয়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় বিচারক নিয়োগ, আর্থিক স্বাধীনতার অভাব এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব করা হয়েছে।
অথচ ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত করার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার সেই লক্ষ্য সামনে রেখে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ প্রণয়ন করে। কিন্তু পরবর্তী নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেসব উদ্যোগ কার্যকর আইন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
বিচার বিভাগের আর্থিক সংকটের চিত্রও উদ্বেগজনক। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মধ্যে বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২ হাজার ২৭৯ কোটি টাকা। একই সময়ে সুপ্রিম কোর্টের জন্য বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বিচার বিভাগ অপেক্ষা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বেশি অর্থ পেয়েছে।
এই অর্থ সংকটের প্রভাব বিচারক ও আদালতের দৈনন্দিন কার্যক্রমে স্পষ্ট। অনেক আদালতে পর্যাপ্ত কক্ষ নেই। ফলে একজন বিচারককে দুপুরের আগেই কক্ষ ছাড়তে হয়, যাতে আরেকজন বিচারক একই কক্ষে আদালত পরিচালনা করতে পারেন। আদালতগুলোর ডিজিটাল নথি সংরক্ষণ ব্যবস্থা নেই। বহু স্থানে কর্মচারীর ঘাটতি রয়েছে। পর্যাপ্ত যানবাহনও নেই। এমনকি কোনো কোনো জেলা বিচারককে একটি প্রিন্টার সংগ্রহ করার জন্যও আইন মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিক আবেদন করতে হয়েছে।
এই নির্ভরশীলতার শিকড় রয়েছে সংবিধানেই। সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিচারকদের নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, ছুটি এবং শৃঙ্খলাবিষয়ক ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত। বাস্তবে এসব সিদ্ধান্ত আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক নির্বাহী বিভাগের প্রভাবের আওতায় চলে যায়।
এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের লক্ষ্যে ২০২৫ সালে একটি সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে প্রধান বিচারপতির অধীনে একটি স্বতন্ত্র সচিবালয় গঠনের প্রস্তাব ছিল। এতে নিম্ন আদালতের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, বিচারকদের বদলি ও শৃঙ্খলাবিষয়ক ক্ষমতা নির্বাহী বিভাগের হাত থেকে সরিয়ে বিচার বিভাগের হাতে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। পাশাপাশি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষমতাও প্রধান বিচারপতির কাছে দেওয়ার প্রস্তাব ছিল।
বিচার বিভাগে রাজনৈতিক প্রভাবের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র হিসেবে উঠে এসেছে বিচারক নিয়োগ। সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্টের বিচারক নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। কিন্তু রাষ্ট্রপতি কার্যত প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করেন। ফলে বিচারক নিয়োগের ওপর নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।
বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সদস্য ব্যারিস্টার তানিম আহমেদ শাওন বলেন, অতীতে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আনুগত্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যোগ্যতা, আইনি দক্ষতা কিংবা সততার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় ছিল বড় বিবেচ্য বিষয়।
একজন নিম্ন আদালতের বিচারক স্বীকার করেন, স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় বিচার বিভাগও দায় এড়াতে পারে না। তার ভাষায়, পুলিশ মিথ্যা মামলা করেছে, গোয়েন্দা সংস্থা হয়রানি করেছে, কিন্তু বিচারক হিসেবে তারাও বারবার জামিন নাকচ করেছেন, রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত সাজা দিয়েছেন। তিনি বলেন, বিচার বিভাগও এক অর্থে সেই শাসনব্যবস্থার সক্রিয় অংশ ছিল।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে বিবেচিত প্রায় ২৩ হাজার ৮৬৫টি মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করে। পাশাপাশি ১৮ জন নিম্ন আদালতের বিচারককে আগাম অবসরে পাঠানো হয়। কিন্তু ভয় এখনো কাটেনি। কয়েকজন বিচারক জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে জামিন দিলে বা অনুকূল আদেশ দিলে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে—এমন আশঙ্কা এখনো কাজ করে।
এই প্রেক্ষাপটে বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়া সংস্কারের জন্য একটি পৃথক অধ্যাদেশ আনা হয়েছিল। সেখানে একটি স্বাধীন কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব ছিল, যাতে প্রধান বিচারপতি, জ্যেষ্ঠ বিচারপতি, অ্যাটর্নি জেনারেল, একজন আইন অধ্যাপক এবং একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি থাকবেন। এই কাউন্সিলের সুপারিশ অনুযায়ী বিচারক নিয়োগের বাধ্যবাধকতা থাকত, ফলে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সুযোগ কমে যেত।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল দীর্ঘদিন ধরে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেওয়ার দাবি করে এসেছে। ২০১৭ সালে ভিশন ২০৩০ ঘোষণার সময় খালেদা জিয়া বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছ মানদণ্ড এবং পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে দলটির ৩১ দফা কর্মপরিকল্পনাতেও বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়।
২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণার সময় দলের নেতা তারেক রহমানও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, তার পরিবার বিচারব্যবস্থার দুর্ভোগের শিকার হয়েছে এবং ক্ষমতায় গেলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে।
কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি সরকার বিচার বিভাগ সংস্কারের জন্য প্রণীত অধ্যাদেশগুলো কার্যকর আইন হিসেবে পাস করেনি। ফলে সেগুলো মেয়াদ শেষ হয়ে বাতিল হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মত প্রকাশ করেছিলেন এমন ২৮ জন নিম্ন আদালতের বিচারককে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেওয়া হয়।
সংসদে এ বিষয়ে প্রশ্ন উঠলে আইনমন্ত্রী বলেন, সরকার আরও ভালো আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা করছে। তবে অনেক আইন বিশেষজ্ঞ এই যুক্তিতে সন্তুষ্ট নন। অবসরপ্রাপ্ত আপিল বিভাগের বিচারপতি এম এ মতিন বলেন, যদি সত্যিই সংস্কারের ইচ্ছা থাকত, তাহলে প্রথমে বিদ্যমান অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত করা হতো। পরে প্রয়োজন হলে সংশোধন আনা যেত। কিন্তু ভিত্তিটাই ধ্বংস করে দিয়ে আরও ভালো আইন করার যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, নতুন সরকারও পূর্বসূরিদের পথেই হাঁটছে। স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক সুবিধার জন্য বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে আরও বঞ্চিত হবে।
বিচারপতি এম এ মতিনের মতে, সমস্যা কোনো একক রাজনৈতিক দলের নয়। ক্ষমতায় আসা প্রায় প্রতিটি সরকারই বিচার বিভাগকে নিজেদের প্রভাবের আওতায় রাখতে চায়। আগে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠতা বিবেচনা করা হতো, এখন বিএনপির ঘনিষ্ঠতা বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা তখনও নিশ্চিত হবে না।
ব্যারিস্টার তানিম আহমেদ শাওনের ভাষায়, প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়িত না হলে বিচার বিভাগ আবারও নির্বাহী বিভাগের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হবে। আর সেই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হবেন সাধারণ মানুষ।
এদিকে সুপ্রিম কোর্টের করিডোরে দাঁড়িয়ে মারজান বেগম এখনো অপেক্ষা করছেন। তার অপেক্ষা শুধু একজন মুহুরির জন্য নয়; একটি শুনানির জন্যও নয়। তিনি অপেক্ষা করছেন এমন একটি রায়ের জন্য, যা হয়তো তার দাদার শুরু করা লড়াইয়ের সমাপ্তি ঘটাবে। কিন্তু সেই মামলাটি ইতোমধ্যেই তিন প্রজন্ম অতিক্রম করেছে। বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার বর্তমান বাস্তবতা যেন এই এক গল্পেই ধরা পড়ে—যেখানে ন্যায়বিচার আছে, কিন্তু তার কাছে পৌঁছাতে কখনো কখনো একটি জীবনও যথেষ্ট নয়।
আপনার মতামত জানানঃ