বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা আজ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। দীর্ঘদিন ধরেই আদালতে মামলার জট নিয়ে আলোচনা হলেও সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যায়, পরিস্থিতি এখন শুধু ‘মামলাজট’ শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, বিচারপ্রার্থী জনগণ এবং সামগ্রিক আইনের শাসনের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। দেশে বর্তমানে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ৪৮ লাখ। এর চেয়েও উদ্বেগজনক তথ্য হলো, গত ছয় বছরে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩৪০০-এর বেশি নতুন মামলা আদালতে এসেছে। অর্থাৎ বিচারব্যবস্থার ওপর যে চাপ তৈরি হচ্ছে, তা বিদ্যমান কাঠামোর পক্ষে সামাল দেওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
২০০৭ সালে বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক হওয়ার সময় দেশে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল প্রায় ১৬ লাখ। তখন দেশের জনসংখ্যা ছিল ১৪ কোটির কিছু বেশি। প্রায় দুই দশক পরে দেশের জনসংখ্যা ১৮ কোটির ঘর অতিক্রম করেছে এবং বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বেড়ে প্রায় তিনগুণ হয়েছে। সংখ্যার এই বৃদ্ধি কেবল জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফল নয়; বরং এটি সমাজ, প্রশাসন, আইন প্রয়োগ এবং বিচার কাঠামোর নানা সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন।
মামলা বৃদ্ধির পেছনে বহুস্তরীয় কারণ রয়েছে। জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের পারস্পরিক বিরোধ, সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব, পারিবারিক সংঘাত এবং অপরাধের পরিমাণও বেড়েছে। বিশেষ করে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ বাংলাদেশের আদালতগুলোতে মামলার অন্যতম বড় উৎস। একটি জমির মালিকানা নিয়ে কখনো কখনো একাধিক মামলা বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে। একই বিষয়ে বিভিন্ন আদালতে পৃথক মামলা দায়ের হওয়ার ঘটনাও বিরল নয়। ফলে আদালতের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয় এবং বিচারপ্রক্রিয়া আরও দীর্ঘায়িত হয়।
এ ছাড়া সমাজে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতির ব্যবহার এখনও সীমিত। অনেক ক্ষেত্রে সালিশ, মধ্যস্থতা বা আপসের মাধ্যমে সমাধানযোগ্য বিষয়ও আদালতে চলে আসে। মানুষের মধ্যে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে আদালতের রায়ই চূড়ান্ত ও সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। ফলে ছোটখাটো বিরোধও মামলা পর্যন্ত গড়ায়। এর ফলে আদালতের মূল্যবান সময় এমন অনেক বিষয়ে ব্যয় হয়, যেগুলো আদালতের বাইরে সমাধান করা সম্ভব ছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনের শাসনের দুর্বলতাও মামলা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। যখন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত আইন অনুযায়ী হয় না বা নাগরিকরা ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হন, তখন তারা আদালতের শরণাপন্ন হতে বাধ্য হন। অনেক সরকারি সিদ্ধান্তও আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়। ফলে বিচারব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে আইন অমান্য করার প্রবণতা এবং মিথ্যা বা হয়রানিমূলক মামলা দায়েরের সংস্কৃতিও সমস্যা বাড়িয়ে তুলছে।
শুধু মামলা বৃদ্ধিই নয়, মামলা নিষ্পত্তির ধীরগতিও বর্তমান সংকটকে ভয়াবহ রূপ দিয়েছে। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মামলা আদালতে এলেও তার তুলনায় নিষ্পত্তির হার অনেক কম। গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কোনো কোনো বছরে ৫০ থেকে ৬৪ লাখ বিচারাধীন মামলার বিপরীতে নিষ্পত্তি হয়েছে গড়ে ১০ লাখের মতো মামলা। অর্থাৎ নতুন মামলা যোগ হওয়ার গতি নিষ্পত্তির গতির চেয়ে অনেক বেশি। ফলে বছরের পর বছর ধরে অনিষ্পন্ন মামলার সংখ্যা বাড়তেই থাকে।
বিচারক সংকটও এ সমস্যার একটি বড় কারণ। অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে অধস্তন আদালতেই অন্তত ১০ হাজার বিচারকের প্রয়োজন। অথচ বর্তমানে কর্মরত বিচারকের সংখ্যা এর তুলনায় অনেক কম। একজন বিচারকের ওপর বিপুলসংখ্যক মামলার দায়িত্ব থাকায় প্রতিটি মামলায় পর্যাপ্ত সময় দেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে শুনানির তারিখ পিছিয়ে যায় এবং বিচারপ্রার্থীদের অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ হয়।
আদালতের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। দেশের অনেক আদালতে পর্যাপ্ত এজলাস নেই, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি নেই এবং মামলার নথি সংরক্ষণ ব্যবস্থাও এখনও পুরোপুরি আধুনিক হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে একটি মামলার নথি খুঁজে পেতেই দীর্ঘ সময় লেগে যায়। ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি চালু না হওয়ায় বিচারপ্রক্রিয়া আরও ধীরগতির হয়ে পড়ে।
শুনানি বারবার মুলতবি হওয়ার প্রবণতাও মামলাজট বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। বিভিন্ন কারণে আইনজীবী, পক্ষভুক্ত ব্যক্তি বা সাক্ষী আদালতে উপস্থিত না থাকলে মামলার শুনানি পিছিয়ে যায়। একটি মামলার ক্ষেত্রে এমন ঘটনা বহুবার ঘটতে পারে। ফলে একটি মামলা নিষ্পত্তি হতে পাঁচ, দশ কিংবা কখনো কখনো তারও বেশি বছর সময় লেগে যায়। এতে বিচারপ্রার্থীরা মানসিক, আর্থিক এবং সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন।
মামলার দীর্ঘসূত্রতা সাধারণ মানুষের জীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। একজন ব্যক্তি যখন আদালতের দ্বারস্থ হন, তখন তিনি মূলত ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করেন। কিন্তু বছরের পর বছর মামলা চলতে থাকলে সেই প্রত্যাশা হতাশায় পরিণত হয়। অনেকেই বিচার পাওয়ার আগেই অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। আইনজীবীর ফি, আদালতে যাতায়াত, নথিপত্র সংগ্রহসহ নানা খরচ তাদের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। কখনো কখনো মামলার পক্ষভুক্ত ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করেন, অথচ মামলার নিষ্পত্তি হয় না। তখন উত্তরাধিকারীদের সেই মামলা বহন করতে হয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হলে শুধু বিচারকের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না; প্রয়োজন একটি সমন্বিত জাতীয় মহাপরিকল্পনা। মামলার উৎস কমানো, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতি সম্প্রসারণ, ডিজিটাল কোর্ট ব্যবস্থার উন্নয়ন, আদালতের অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং বিচারক নিয়োগ বৃদ্ধি—সবকিছু একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় বর্তমান সংকট আরও জটিল আকার ধারণ করবে।
অনেক দেশ ইতোমধ্যে আদালতের বাইরে বিরোধ নিষ্পত্তির ওপর জোর দিয়ে সফলতা পেয়েছে। বাংলাদেশেও দেওয়ানি ও পারিবারিক বিরোধের ক্ষেত্রে মধ্যস্থতা ও সালিশ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা যেতে পারে। এতে আদালতের ওপর চাপ কমবে এবং মানুষ তুলনামূলক দ্রুত সমাধান পাবে। একই সঙ্গে অনলাইনে মামলা দাখিল, ভার্চুয়াল শুনানি এবং ডিজিটাল নথি ব্যবস্থাপনা সম্প্রসারণের মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করা সম্ভব।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনসচেতনতা বৃদ্ধি। অনেক মানুষ আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকার কারণে অপ্রয়োজনীয় মামলায় জড়িয়ে পড়েন। আইন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো গেলে এবং স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে মামলার সংখ্যা কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হবে।
বিচারব্যবস্থা একটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। এই স্তম্ভ দুর্বল হয়ে পড়লে নাগরিকদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং আইনের শাসনও প্রশ্নের মুখে পড়ে। বর্তমানে বাংলাদেশের আদালতগুলো যে বিপুলসংখ্যক মামলার ভার বহন করছে, তা কেবল বিচার বিভাগের সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের সামগ্রিক সমস্যা। প্রতিদিন গড়ে ৩৪০০-এর বেশি নতুন মামলা আদালতে আসার বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন তুলে ধরছে—বর্তমান কাঠামো দিয়ে কি এই চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। মামলা নিষ্পত্তির গতি বাড়াতে হবে, বিচারক ও অবকাঠামো বৃদ্ধি করতে হবে এবং মামলা সৃষ্টির কারণগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো কমানোর জন্য নীতিগত পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় মামলার পাহাড় আরও উঁচু হবে এবং বিচারপ্রার্থীদের দীর্ঘশ্বাস আরও দীর্ঘ হবে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার মানুষের মৌলিক প্রত্যাশা। সেই প্রত্যাশা পূরণে বিচারব্যবস্থাকে সক্ষম ও কার্যকর করে তোলাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
আপনার মতামত জানানঃ