পোকামাকড়ে প্রচুর প্রোটিন থাকলেও প্রাগৈতিহাসিক ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ার শিকারি-সংগ্রাহক মানুষের খাদ্যতালিকায় এগুলো ছিল না। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, সেই সময়কার মানুষের বংশধরদের অনেকেই আজও পোকামাকড় সহজে হজম করার জিনগত সক্ষমতা বহন করেন না। গবেষকদের মতে, পশ্চিমা সমাজের অনেক মানুষের পোকামাকড় খাওয়ার প্রতি অনীহার পেছনে এটি আংশিক কারণ হতে পারে।
বর্তমানে বিশ্বের জনসংখ্যা ৮০০ কোটিরও বেশি। ভবিষ্যতের খাদ্য সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা পোকামাকড়কে একটি টেকসই খাদ্য উৎস হিসেবে বিবেচনা করছে। পৃথিবীতে প্রায় ১,৬১১ প্রজাতির পোকামাকড় ভক্ষণযোগ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছে এবং উষ্ণমণ্ডলীয় অনেক দেশে এগুলো জনপ্রিয় খাদ্য। তবে নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে, বিশেষ করে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায়, পোকামাকড় খাওয়ার সংস্কৃতি খুবই সীমিত।
এই পার্থক্যের কারণ অনুসন্ধান করতে গবেষকরা ১৮ জন নিয়ানডারথাল, ৭৪৫ জন প্রাচীন আধুনিক মানুষ এবং ৯৬টি বৃহৎ বনমানুষের দাঁতের প্লাক থেকে প্রাচীন ডিএনএ বিশ্লেষণ করেন। এসব বনমানুষের মধ্যে শিম্পাঞ্জি ও গরিলাও ছিল।
গবেষণায় দেখা যায়, প্রাগৈতিহাসিক ইউরোপীয় মানুষের দাঁতের প্লাকে খুব অল্প পরিমাণ পোকামাকড়ের ডিএনএ পাওয়া গেছে। এর অর্থ হলো, তারা খুব কম ক্ষেত্রেই পোকামাকড় খেত এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা সম্ভবত দুর্ঘটনাবশত খাদ্যের সঙ্গে চলে আসত।
অন্যদিকে নিয়ানডারথালদের দাঁতের নমুনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পোকামাকড়ের ডিএনএ পাওয়া যায়, যা শিম্পাঞ্জিদের নমুনার কাছাকাছি। বিশেষ করে মাছি ও মশার উপস্থিতি বেশি ছিল। গবেষকদের ধারণা, নিয়ানডারথালরা প্রায়ই পচা মাংস খেত এবং সেই মাংসের মধ্যে থাকা ম্যাগট বা উড়ন্ত পোকামাকড়ের ডিমও তাদের খাদ্যের অংশ হয়ে যেত।
গবেষণার অন্যতম লেখক ম্যানুয়েল পিনিয়েরো বলেন, “আমাদের ফলাফল সেই ধারণাকে সমর্থন করতে পারে যে নিয়ানডারথালদের শরীরে পাওয়া উচ্চ নাইট্রোজেন আইসোটোপের মাত্রা আংশিকভাবে পচা প্রাণীর দেহে থাকা কীটের লার্ভা নিয়মিত খাওয়ার ফল হতে পারে।”
গবেষকরা আরও জানতে চান কেন প্রাগৈতিহাসিক ইউরোপীয় মানুষ পোকামাকড় খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলেনি। এজন্য তারা ১,৬৬৩টি প্রাচীন জিনোম বিশ্লেষণ করেন। বিশেষভাবে তারা এমন জিন খুঁজেছেন, যা কাইটিন নামক পদার্থ হজমের জন্য প্রয়োজনীয় এনজাইম তৈরি করে।
কাইটিন হলো পোকামাকড়ের শক্ত বহিঃকঙ্কালের প্রধান উপাদান। কোনো প্রাণী যদি কাইটিন ভাঙতে না পারে, তাহলে পোকামাকড় হজম করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
ফলাফলে দেখা যায়, বিষুবরেখার কাছাকাছি অঞ্চলের প্রাচীন মানুষের মধ্যে কাইটিন হজম করার উপযোগী জিন ছিল। কিন্তু উষ্ণ অঞ্চল থেকে যত দূরে যাওয়া হয়েছে, এই সক্ষমতা তত কমে গেছে। ফলে ইউরোপ এবং এশিয়ার শীতল অঞ্চলের মানুষেরা ধীরে ধীরে পোকামাকড় হজম করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
গবেষকদের মতে, প্রায় ৯,০০০ বছর আগে কৃষিভিত্তিক সমাজ গড়ে ওঠার আগেই এই জিনগত পরিবর্তন ঘটে। এরপর থেকে ইউরেশিয়ার নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে এই সীমিত হজমক্ষমতা স্থায়ী হয়ে যায়।
ম্যানুয়েল পিনিয়েরো ব্যাখ্যা করেন, “উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে সহজেই বিপুল পরিমাণ ভক্ষণযোগ্য পোকামাকড় সংগ্রহ করা যায়। ফলে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য উৎসে পরিণত হয় এবং প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে সেগুলো হজম করার ক্ষমতা টিকে থাকে।”
তিনি আরও বলেন, “কিন্তু উত্তরাঞ্চলের ঠান্ডা এলাকায় পোকামাকড় তুলনামূলকভাবে বিরল এবং মৌসুমি। বিশেষ করে শীতকালে এগুলো প্রায় অনুপস্থিত থাকে। তাই সেখানে পোকামাকড় হজম করার অভিযোজন ধরে রাখার জন্য কোনো বিশেষ বিবর্তনীয় চাপ ছিল না।”
মজার বিষয় হলো, নিয়ানডারথালরা যদিও ইউরোপ ও এশিয়ার ঠান্ডা অঞ্চলে বাস করত, তবুও তাদের মধ্যে কাইটিন হজম করার প্রয়োজনীয় জিনগত বৈশিষ্ট্য ছিল। গবেষণায় বিশ্লেষণ করা একমাত্র ডেনিসোভান জিনোমেও একই ধরনের সক্ষমতার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
তবে গবেষকরা মনে করেন, যদিও বিশ্বের অনেক মানুষের শরীর পোকামাকড় পুরোপুরি হজম করতে সক্ষম নয়, তবুও ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য পোকামাকড় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এর জন্য পোকামাকড়কে প্রক্রিয়াজাত করে তাদের শক্ত বহিঃকঙ্কাল বা কাইটিন আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে অপসারণ করা যেতে পারে।
পিনিয়েরোর ভাষায়, “বর্তমানে উত্তরাঞ্চলেও খামারে পোকামাকড় উৎপাদন করা সম্ভব। তাই পোকামাকড়ের স্বল্পতা আর বড় সমস্যা নয়। কাইটিন কমিয়ে দিলে এসব খাদ্য আরও সহজপাচ্য ও গ্রহণযোগ্য হতে পারে।”
গবেষণাটি ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। এটি মানুষের খাদ্যাভ্যাসের বিবর্তন, জিনগত অভিযোজন এবং ভবিষ্যতের টেকসই খাদ্যব্যবস্থা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ নতুন তথ্য তুলে ধরেছে। বিশেষ করে এটি ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে কেন পৃথিবীর কিছু অঞ্চলে পোকামাকড় হাজার বছর ধরে জনপ্রিয় খাদ্য হলেও অন্য অঞ্চলে তা এখনও অনেকের কাছে অস্বস্তিকর বা অগ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়।
আপনার মতামত জানানঃ