বাংলাদেশের নদীমাতৃক পরিচয়ের সঙ্গে পদ্মা নদীর সম্পর্ক শুধু ভৌগোলিক নয়, অর্থনীতি, কৃষি, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। অথচ গত কয়েক দশকে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বহু নদী ধীরে ধীরে পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। কোথাও নদীর বুক জেগে উঠেছে চর, কোথাও শুকিয়ে গেছে প্রবাহ, আবার কোথাও লবণাক্ততা কৃষি ও জনজীবনের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় সরকার এবার প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মা নদীর ওপর একটি বিশাল ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। “পদ্মা ব্যারাজ” নামে এই প্রকল্প আগামী সাত বছরে বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানিয়েছে সরকার। ২০২৬ সালের মে মাসে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়, বরং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোকে পুনর্জীবিত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ।
ব্যারাজ শব্দটি সাধারণ মানুষের কাছে খুব পরিচিত না হলেও এটি মূলত পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্মিত একটি বিশেষ কাঠামো। ড্যাম বা বাঁধের মতো পুরো নদীর পানি আটকে না রেখে ব্যারাজের মাধ্যমে পানির গতি ও প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সাধারণত এতে অনেকগুলো গেট বা দরজা থাকে, যেগুলোর মাধ্যমে প্রয়োজন অনুযায়ী পানি ছাড়া বা আটকে রাখা যায়। কৃষি, নদী পুনরুদ্ধার, সেচ, নৌচলাচল এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো বিভিন্ন কাজে ব্যারাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশ্বের বহু দেশে নদী ব্যবস্থাপনায় এটি ব্যবহার করা হয়। ভারত যেমন ফারাক্কা ব্যারাজের মাধ্যমে গঙ্গার পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে, তেমনি বাংলাদেশও এবার পদ্মাকে কেন্দ্র করে নতুন পরিকল্পনায় এগোচ্ছে।
সরকারের দাবি, পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ হলে দেশের ২৪টি জেলার পানিসংকট অনেকাংশে দূর হবে। বিশেষ করে যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, মাগুরা, নড়াইল, পাবনা, রাজশাহীসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কৃষিকাজে নতুন গতি আসবে। শুষ্ক মৌসুমে এসব এলাকায় নদীতে পানির অভাবে সেচ সংকট তৈরি হয়। অনেক জমি অনাবাদি পড়ে থাকে। আবার দক্ষিণাঞ্চলে নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে লবণাক্ততা বাড়ে, যার প্রভাব পড়ে কৃষি, মাছ এবং সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের ওপর। পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে সংরক্ষিত পানি বিভিন্ন নদীতে সরবরাহ করে এই পরিস্থিতি বদলানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পদ্মা ব্যারাজের মূল উদ্দেশ্য হলো মৃতপ্রায় নদীগুলোতে আবার স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা। গড়াই-মধুমতী, হিসনা-মাথাভাঙ্গা, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদীগুলো বর্তমানে নানা সংকটে ভুগছে। বর্ষাকালে কোথাও জলাবদ্ধতা তৈরি হয়, আবার শুষ্ক মৌসুমে পানি থাকে না। ফলে নদীকেন্দ্রিক জীবনযাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে নদীগুলোর পুনঃখনন ও ড্রেজিং করা হবে। এর মাধ্যমে শুধু পানির প্রবাহ বাড়ানো নয়, নদীর নাব্যতাও ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে।
পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায়। প্রায় দুই দশমিক এক কিলোমিটার দীর্ঘ এই ব্যারাজে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে ও ১৮টি আন্ডার স্লুইস। এছাড়া মাছের নিরাপদ চলাচলের জন্য থাকবে বিশেষ ফিশ পাস। পানি সংরক্ষণ ও বণ্টনের জন্য তৈরি হবে বিশেষ অবকাঠামোও। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই ব্যারাজের মাধ্যমে প্রায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। পরবর্তীতে সেই পানি বিভিন্ন খাল ও নদীপথে সরবরাহ করা হবে।
বাংলাদেশে ব্যারাজ নির্মাণের ইতিহাস নতুন নয়। ১৯৮৩ সালে মৌলভীবাজারে মনু নদীর ওপর প্রথম ব্যারাজ নির্মাণ করা হয়। এরপর তিস্তা ব্যারেজ ও টাঙ্গন ব্যারেজ নির্মিত হয়। তবে পদ্মা ব্যারাজের পরিধি ও পরিকল্পনা আগের যেকোনো প্রকল্পের তুলনায় অনেক বড়। কারণ এটি শুধু একটি নদী নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প নয়, বরং পুরো অঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনা ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের পরিকল্পনার অংশ।
পদ্মা ব্যারাজের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উঠে আসে ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজের প্রসঙ্গ। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের পর শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকায় পানির প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলো শুকিয়ে যেতে শুরু করে। কৃষি উৎপাদন কমে, মৎস্যসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং নৌপথ সংকুচিত হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে এ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে পদ্মা ব্যারাজকে অনেকে দেশের পানি নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
তবে প্রকল্পটি নিয়ে শুধু আশাবাদই নেই, রয়েছে নানা প্রশ্নও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় ধরনের নদী প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত প্রভাব গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি। কারণ ভুল পরিকল্পনা নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি বদলে দিতে পারে। কোথাও পলি জমে নতুন সংকট তৈরি হতে পারে, আবার কোথাও জলাবদ্ধতা বাড়তে পারে। নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না, সেটির সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় ব্যয়বহুল প্রকল্প হয়েও প্রত্যাশিত সুফল নাও মিলতে পারে।
বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ব্যারাজের সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে এর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ওপর। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পলি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং স্থানীয় মানুষের প্রয়োজন—সবকিছু বিবেচনায় রেখে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কথাও মাথায় রাখতে হবে। কারণ আগামী দশকগুলোতে বন্যা, খরা ও লবণাক্ততার ধরন আরও পরিবর্তিত হতে পারে।
সরকারের পরিকল্পনায় পদ্মা ব্যারাজকে ঘিরে শুধু পানি ব্যবস্থাপনাই নয়, আরও বড় অর্থনৈতিক কর্মপরিকল্পনা রয়েছে। ২০৩৩ সালের পর দ্বিতীয় ধাপে তিনটি পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি সাতটি স্যাটেলাইট শহর গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। এর মাধ্যমে শিল্প, কৃষি, বিদ্যুৎ ও নগরায়ণের নতুন সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করছে সরকার। একইসঙ্গে গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প, উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্প, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পানি সরবরাহ সহজ হবে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হবে। এতে ধান উৎপাদন বাড়বে প্রায় ২৪ লাখ টন এবং মাছ উৎপাদন বাড়বে কয়েক লাখ টন। অর্থনৈতিকভাবে বছরে প্রায় আট হাজার কোটি টাকার সুবিধা পাওয়া যেতে পারে বলে দাবি করা হচ্ছে। যদিও এই হিসাব বাস্তবে কতটা অর্জিত হবে, তা নির্ভর করবে প্রকল্প বাস্তবায়নের কার্যকারিতার ওপর।
পদ্মা ব্যারাজ এখন শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়, বরং বাংলাদেশের পানি রাজনীতি ও ভবিষ্যৎ কৃষি অর্থনীতির একটি বড় আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। কেউ এটিকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য আশার প্রতীক হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ সতর্ক করছেন সম্ভাব্য পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—বাংলাদেশের নদীগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে। পদ্মা ব্যারাজ সেই বৃহৎ পরিকল্পনারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হতে যাচ্ছে।
আপনার মতামত জানানঃ