ঢাকার সকাল এখন আর আগের মতো নেই। একসময় ভোর হলেই গলির ভেতর ক্রিকেট ব্যাটের শব্দ শোনা যেত, স্কুল শেষে মাঠে ছুটে যেত বাচ্চারা, ছাদের কোণে হতো লুকোচুরি, কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে গল্প। এখন সেই দৃশ্য বদলে গেছে। একটি শিশু স্কুল থেকে ফিরে ব্যাগ নামিয়ে প্রথমেই হাতে নেয় মোবাইল। কেউ ইউটিউব দেখে, কেউ গেম খেলছে, কেউ টিকটকের ছোট ছোট ভিডিওতে ডুবে যাচ্ছে। বাসার ভেতর সবাই আছে, অথচ যেন কেউ কারও সঙ্গে নেই। একই ঘরে বসে থেকেও আলাদা এক জগতে হারিয়ে যাচ্ছে পরিবারগুলো। আর এই নীরব পরিবর্তনই ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে এক ভয়ংকর সামাজিক সংকটে।
ঢাকার শিশুদের নিয়ে আইসিডিডিআর,বির সাম্প্রতিক গবেষণা সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। গবেষণায় উঠে এসেছে, শহরের শিশুরা এখন গড়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা স্ক্রিনে কাটাচ্ছে। কারও ক্ষেত্রে এটি আট থেকে দশ ঘণ্টা পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যেখানে ১৭ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য দিনে সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা স্ক্রিন টাইমের সুপারিশ করেছে, সেখানে বাস্তবতা তার দ্বিগুণেরও বেশি। বিষয়টি শুধু পরিসংখ্যানের উদ্বেগ নয়; এর ভেতরে লুকিয়ে আছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক দক্ষতা এবং মানবিক সম্পর্কের গভীর সংকট।
আইসিডিডিআর,বির সহকারী বিজ্ঞানী ও গবেষক শাহ্রিয়া হাফিজ কাকনের মতে, এই পরিস্থিতির শুরুটা হয়েছিল কোভিড-১৯ মহামারির সময়। তখন শিক্ষা, যোগাযোগ, বিনোদন—সবকিছুই চলে গিয়েছিল অনলাইনে। অভিভাবকেরা বাধ্য হয়েই শিশুদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন মোবাইল, ট্যাব কিংবা ল্যাপটপ। অনলাইন ক্লাস, ভার্চুয়াল বন্ধুত্ব, ডিজিটাল বিনোদন—সবকিছু তখন ছিল সময়ের দাবি। কিন্তু মহামারি শেষ হলেও সেই নির্ভরতা আর কমেনি। বরং প্রযুক্তি এখন শিশুদের জীবনের স্থায়ী অংশ হয়ে গেছে।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই আসক্তিকে অনেক পরিবার এখন স্বাভাবিক হিসেবে ধরে নিচ্ছে। বাসায় অতিথি এলে শিশু অন্য ঘরে চলে গিয়ে মোবাইল নিয়ে বসে থাকে—এটিকে এখন আর অস্বাভাবিক মনে করা হয় না। শিশুর কান্না থামাতে মোবাইল দেওয়া, খাওয়ানোর সময় ভিডিও চালিয়ে রাখা, কিংবা ব্যস্ততার অজুহাতে শিশুদের হাতে স্ক্রিন তুলে দেওয়া এখন শহুরে জীবনের অংশ হয়ে গেছে। কিন্তু এর পেছনে যে মানসিক দূরত্ব তৈরি হচ্ছে, সেটি অনেকেই বুঝতে পারছেন না।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো শৈশব ও কৈশোর। এই সময়ে অতিরিক্ত স্ক্রিন এক্সপোজার মনোযোগ কমিয়ে দেয়, আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দুর্বল করে এবং বাস্তব সামাজিক সম্পর্ক তৈরির দক্ষতা কমিয়ে দেয়। একটি শিশু যখন দীর্ঘ সময় ভার্চুয়াল জগতে থাকে, তখন বাস্তব জীবনের সম্পর্ক তার কাছে ধীরে ধীরে কম আকর্ষণীয় হয়ে পড়ে। সে আর মাঠে খেলতে চায় না, পরিবারের সঙ্গে গল্প করতে চায় না, বন্ধুদের সঙ্গে বাস্তব সময় কাটানোর আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।
শুধু শিশু নয়, এই সংকটের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছেন অভিভাবকেরাও। গবেষণায় দেখা গেছে, বাবা-মায়েরাও দৈনিক প্রায় চার ঘণ্টা স্ক্রিনে কাটাচ্ছেন। অফিস শেষে বাসায় ফিরেও অনেকেই ল্যাপটপে কাজ করেন, মোবাইলে নাটক দেখেন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডুবে থাকেন। ফলে শিশুরা পরিবারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় মনোযোগ ও সময় পায় না। একটি শিশু যখন দেখে, তার বাবা-মাও সারাক্ষণ স্ক্রিনে ব্যস্ত, তখন সে স্বাভাবিকভাবেই সেই আচরণ অনুসরণ করে।
ঢাকার ব্যস্ত নাগরিক জীবনে এই দূরত্ব আরও প্রকট হয়ে উঠছে। অনেক পরিবারে বাবা-মা দুজনই কর্মজীবী। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে সন্তানকে সময় দেওয়ার শক্তি বা ধৈর্য অনেকের থাকে না। তখন মোবাইলই হয়ে ওঠে সবচেয়ে সহজ সমাধান। শিশু ব্যস্ত, বাবা-মাও ব্যস্ত। বাইরে থেকে সবকিছু শান্ত মনে হলেও ভেতরে ভেতরে তৈরি হচ্ছে এক অদৃশ্য বিচ্ছিন্নতা।
এই বিচ্ছিন্নতার আরেকটি বড় কারণ হলো শহরে খেলার জায়গার অভাব। একসময় প্রতিটি মহল্লায় ছোটখাটো মাঠ ছিল, এখন সেগুলোর জায়গা দখল করেছে বহুতল ভবন। অনেক স্কুলেই নেই পর্যাপ্ত খেলার মাঠ। ফলে শিশুদের স্বাভাবিক খেলাধুলার সুযোগ কমে গেছে। তারা যে বয়সে মাঠে দৌড়াবে, সাইকেল চালাবে, বন্ধুদের সঙ্গে খেলবে—সেই বয়সে তারা মোবাইল স্ক্রিনে যুদ্ধ করছে, ভার্চুয়াল গাড়ি চালাচ্ছে কিংবা একের পর এক ভিডিও দেখছে।
শিশুদের জীবন এখন এমন এক চক্রে আটকে গেছে, যেখানে পড়াশোনা, বিনোদন, যোগাযোগ—সবকিছুই স্ক্রিননির্ভর। অনলাইন ক্লাসের পর ইউটিউব, তারপর গেম, এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসছে। ফলে শিশুদের মধ্যে একাকিত্ব বাড়ছে। তারা মানুষের সঙ্গে মিশতে ভয় পায়, আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে, অনেকের মধ্যে তৈরি হচ্ছে সামাজিক ভীতি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে শিশুদের উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং ঘুমের সমস্যার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে রাতে দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহারের কারণে ঘুমের স্বাভাবিক চক্র নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অনেক শিশু রাত জেগে গেম খেলছে বা ভিডিও দেখছে, ফলে সকালে ক্লান্তি, মনোযোগের অভাব এবং আচরণগত সমস্যা দেখা দিচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে চোখের সমস্যা, মাথাব্যথা এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্ক্রিন শিশুদের আবেগ প্রকাশের স্বাভাবিক পদ্ধতিও বদলে দিচ্ছে। আগে শিশুরা রাগ করলে বন্ধুদের সঙ্গে খেলত, মন খারাপ হলে পরিবারের সঙ্গে কথা বলত। এখন তারা চুপচাপ মোবাইলের ভেতর আশ্রয় খুঁজছে। ফলে তারা নিজের অনুভূতি প্রকাশ করার ক্ষমতা হারাচ্ছে। বাস্তব জীবনের সমস্যা মোকাবিলার বদলে ভার্চুয়াল জগতে পালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।
তবে প্রযুক্তিকে পুরোপুরি দায়ী করলে ভুল হবে। প্রযুক্তি এখন জীবনের অপরিহার্য অংশ। সমস্যা প্রযুক্তিতে নয়, বরং নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহারে। শিশুদের জন্য প্রযুক্তি যেমন শেখার সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি বিনোদনের নতুন দরজাও খুলেছে। কিন্তু প্রয়োজন সীমা নির্ধারণের। একটি শিশুর হাতে মোবাইল দেওয়া সহজ, কিন্তু সেই ব্যবহারের সীমানা ঠিক করা কঠিন। আর সেই দায়িত্বটি সবচেয়ে বেশি নিতে হবে পরিবারকেই।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিশুদের স্ক্রিন টাইম কমাতে হলে প্রথমে বদল আনতে হবে পরিবারের আচরণে। বাবা-মাকে নিজেরাও স্ক্রিন ব্যবহারে সচেতন হতে হবে। প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় সন্তানকে একান্ত সময় দিতে হবে। শুধু একই বাসায় থাকা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন একসঙ্গে গল্প করা, খেলা, হাঁটাহাঁটি কিংবা সাধারণ কিছু মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়া।
শিশুদের বিকল্প বিনোদনের সুযোগও বাড়াতে হবে। গান শেখা, বই পড়া, ছবি আঁকা, গাছের যত্ন নেওয়া কিংবা পাখি পালন—এসব ছোট ছোট অভ্যাস শিশুদের স্ক্রিন থেকে দূরে রাখতে সাহায্য করতে পারে। একই সঙ্গে স্কুল ও সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে। খেলার মাঠ বাড়ানো, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বৃদ্ধি এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সংকটকে এখনই গুরুত্ব দেওয়া। কারণ এটি শুধু প্রযুক্তির সমস্যা নয়; এটি সম্পর্কের সংকট, সামাজিকতার সংকট এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক সুস্থতার সংকট। আজ যে শিশু সারাদিন স্ক্রিনে ডুবে আছে, আগামী দিনে সেই শিশুই হয়তো বাস্তব সম্পর্ক তৈরি করতে হিমশিম খাবে, আবেগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যায় পড়বে কিংবা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।
ঢাকার এই নীরব মহামারি তাই শুধু একটি গবেষণার বিষয় নয়। এটি আমাদের সময়ের প্রতিচ্ছবি। এমন এক সময়, যেখানে মানুষ প্রযুক্তির মাধ্যমে আগের চেয়ে বেশি সংযুক্ত, অথচ বাস্তবে আগের চেয়ে বেশি একা। আর সেই একাকিত্বের সবচেয়ে বড় শিকার হয়ে উঠছে শিশুরা। এখনই যদি পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র একসঙ্গে সচেতন না হয়, তাহলে হয়তো ভবিষ্যতের প্রজন্মকে আমরা প্রযুক্তিতে দক্ষ কিন্তু আবেগে শূন্য, সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন এক পৃথিবীর দিকে ঠেলে দেব।
আপনার মতামত জানানঃ