
২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সকাল। দেশের মানুষ তখন প্রতিদিনের মতোই অফিস, আদালত, বাজার কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দিকে ছুটছে। ঠিক সেই সময় কয়েক মিনিটের ব্যবধানে বাংলাদেশের মানচিত্র জুড়ে ঘটে যায় এক অভূতপূর্ব ঘটনা। ঢাকার আদালতপাড়া থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট—দেশের প্রায় প্রতিটি বড় শহরে একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। আতঙ্কে মানুষ দৌড়াতে শুরু করে, কেউ বুঝে উঠতে পারে না কী ঘটছে।
সেই দিন মাত্র আধাঘণ্টার মধ্যে দেশের ৬৩টি জেলার প্রায় পাঁচ শতাধিক স্থানে ছোট ছোট বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। পরে তদন্তে জানা যায়, এই সমন্বিত হামলার পেছনে ছিল জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)। ঘটনাস্থলগুলোতে পাওয়া যায় একটি লিফলেট, যেখানে ঘোষণা করা হয়েছিল যে বাংলাদেশে “আল্লাহর আইন” প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থাকে তারা অস্বীকার করে।
এই হামলায় বিস্ফোরকগুলোর শক্তি তুলনামূলক কম হলেও এর বার্তা ছিল ভয়াবহ। কয়েকজন নিহত হন এবং শতাধিক মানুষ আহত হন। কিন্তু শারীরিক ক্ষতির চেয়েও বড় ছিল এর প্রতীকী তাৎপর্য। কারণ এটি ছিল এমন একটি ঘটনা, যা প্রমাণ করে দেয়—বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রপন্থা আর বিচ্ছিন্ন কোনো গোপন প্রবণতা নয়; বরং এটি সংগঠিত, পরিকল্পিত এবং দেশজুড়ে বিস্তৃত একটি নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে।
এরপর, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী রমনা কালীমন্দির ধ্বংস করলেও স্বাধীনতার পরও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ১৯৭৪ সালে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে হামলার খবর তৎকালীন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
দৈনিক ইত্তেফাক এবং দৈনিক সংবাদ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল যে কিছু উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠী সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে হামলা চালায় এবং তাদের সম্পত্তি লুটপাটের ঘটনাও ঘটে। ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদার এবং পরবর্তী গবেষক আলী রিয়াজের গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় কাঠামো দুর্বল থাকার সুযোগে ধর্মীয় পরিচয়কে ব্যবহার করে কিছু উগ্র গোষ্ঠী সংগঠিত হতে শুরু করে।
পরদিন দেশের প্রধান পত্রিকাগুলো এই ঘটনাকে “বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন জঙ্গি হামলা” হিসেবে উল্লেখ করে। দ্য ডেইলি স্টার (১৮ আগস্ট ২০০৫) লিখেছিল, “Never before has Bangladesh witnessed such a coordinated display of militant power.” একই দিন দৈনিক প্রথম আলো তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় একযোগে বোমা বিস্ফোরণ বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই ঘটনা শুধু একটি সন্ত্রাসী হামলা ছিল না; বরং এটি ছিল দীর্ঘদিন ধরে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা ধর্মীয় উগ্রপন্থী নেটওয়ার্কের প্রকাশ্য আত্মপ্রকাশ। প্রশ্ন উঠতে শুরু করে—কীভাবে একটি রাষ্ট্র, যার জন্ম হয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষতা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ নিয়ে, সেখানে এমন সংগঠনগুলো এত শক্তিশালী হয়ে উঠলো?
স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই উত্থানের শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। রাজনৈতিক পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক প্রভাব, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং রাষ্ট্রীয় নীতির পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে সেই সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ, যার মধ্যে ধর্মীয় উগ্রপন্থা সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
তারপর ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে আক্রমণ করার পর দক্ষিণ এশিয়ায় “জিহাদ” ধারণা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, সেই সময় পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে জিহাদি মতাদর্শ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
গবেষক আলী রিয়াজ তাঁর বই God Willing: The Politics of Islamism in Bangladesh (2004)-এ উল্লেখ করেছেন যে আফগান যুদ্ধের সময় কিছু বাংলাদেশি তরুণ সেই যুদ্ধে অংশ নেয় এবং পরে দেশে ফিরে এসে চরমপন্থী সংগঠন গঠনে ভূমিকা রাখে।
এ সময় বাংলাদেশে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী (HuJI)-এর মতো সংগঠনের ভিত্তি তৈরি হতে শুরু করে, যা পরবর্তীতে ১৯৯০-এর দশকে সক্রিয় হয়।
মূলত ১৯৭৯ সালের শেষ দিকে আফগানিস্তানের পাহাড়ি উপত্যকায় শুরু হওয়া এই যুদ্ধের প্রভাব হাজার মাইল দূরের বাংলাদেশেও এসে পৌঁছায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে “জিহাদ”-এর ডাক তখন মুসলিম বিশ্বের বহু তরুণকে আকর্ষণ করছিল। পাকিস্তান হয়ে সেই যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়া দক্ষিণ এশিয়ার অনেক তরুণের ভেতর ছিল বাংলাদেশের কিছু মানুষও। যুদ্ধ শেষে তাদের কেউ কেউ দেশে ফিরে আসে নতুন এক মতাদর্শ নিয়ে—একটি কঠোর ধর্মীয় রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, যা রাষ্ট্র ও সমাজকে নতুনভাবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখত।
তখন কেউই হয়তো বুঝতে পারেনি, এই আদর্শিক স্রোত একদিন বাংলাদেশের ভেতরে ধর্মীয় উগ্রপন্থার সংগঠিত রূপ নেবে। কিন্তু পরবর্তী দুই দশকে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের উত্থান, বোমা হামলা এবং রাজনৈতিক সহিংসতার মধ্য দিয়ে সেই আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র গঠনের যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তার ভেতরেই ধীরে ধীরে একটি নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা তৈরি হতে থাকে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের যে আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সময়ের সাথে সাথে তার ভেতরেই ধর্মভিত্তিক রাজনীতির পুনরুত্থান ঘটতে শুরু করে। স্বাধীনতার প্রথম বছরগুলোতে যে শক্তিগুলো রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ ছিল, পরবর্তী দশকগুলোতে বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিবর্তন, সামরিক শাসন, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাবের কারণে তারা আবার সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পায়। ফলে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ধর্মীয় উগ্রপন্থার উত্থান একটি জটিল ও বহুস্তরীয় প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা দেয়।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর একটি বড় অংশ পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয়। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘ যুদ্ধের সময় রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল—এমন তথ্য বিভিন্ন গবেষণা ও ঐতিহাসিক নথিতে উঠে এসেছে।
ইতিহাসবিদ রওনক জাহান তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে, পাকিস্তান আমলে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির একটি সুসংগঠিত কাঠামো ছিল, যা মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি রাষ্ট্রকে সমর্থন করেছিল (Rounaq Jahan, Pakistan: Failure in National Integration, 1972)। যুদ্ধ শেষে স্বাধীন বাংলাদেশে এই রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে নিষিদ্ধ করা হয় এবং ১৯৭২ সালের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়।
তবে স্বাধীনতার পরপরই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট বাংলাদেশের রাজনীতিকে অস্থির করে তোলে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক সংঘাত এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়। এই সময় দেশের বিভিন্ন পত্রিকায় সামাজিক অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক হতাশার খবর নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে। দৈনিক ইত্তেফাক ১৯৭৪ সালের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করে যে খাদ্য সংকট ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছিল। এই পরিস্থিতি রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ তৈরি করে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় মোড় আসে। পরবর্তী সামরিক শাসনের সময় রাষ্ট্রের আদর্শগত ভিত্তিতেও পরিবর্তন দেখা যায়। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম’ সংযোজন করা হয় এবং ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে ‘আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ নীতি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। গবেষক আলী রিয়াজ তাঁর বই God Willing: The Politics of Islamism in Bangladesh (2004)-এ লিখেছেন, এই সময় ধর্মভিত্তিক রাজনীতির জন্য একটি নতুন রাজনৈতিক ক্ষেত্র তৈরি হয়। নিষিদ্ধ ঘোষিত অনেক সংগঠন পুনরায় রাজনীতিতে ফিরে আসার সুযোগ পায়।
১৯৭০ ও ৮০-এর দশকে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক প্রভাবও বাংলাদেশের ধর্মীয় রাজনীতির ওপর বড় প্রভাব ফেলে। তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোতে শ্রমবাজার খোলার ফলে লাখ লাখ বাংলাদেশি সেখানে কাজ করতে যান। তাদের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের ধর্মীয় সংস্কৃতি ও মতাদর্শ দেশে প্রবেশ করতে শুরু করে। গবেষক আহমেদ মুনির তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেন যে, এই সময় সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশের অর্থায়নে বাংলাদেশে বহু মাদ্রাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয় (Ahmed Munir, Islam and Politics in Bangladesh, 1995)।
একই সময় আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধও দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলামী জিহাদি রাজনীতির একটি নতুন মাত্রা তৈরি করে। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে আফগান যুদ্ধের সময় অনেক দক্ষিণ এশীয় তরুণ বিভিন্ন জিহাদি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়। কিছু বাংলাদেশিও সেই যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়েছিল বলে পরবর্তীতে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ পাওয়া যায়। ব্রিটিশ সাংবাদিক জেসন বার্ক তাঁর বই Al-Qaeda: The True Story of Radical Islam (2003)-এ দক্ষিণ এশিয়ায় জিহাদি নেটওয়ার্ক বিস্তারের বিষয়টি বিশদভাবে আলোচনা করেছেন।
১৯৮০-এর দশকে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনামলেও ধর্মকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার প্রবণতা আরও বাড়ে। ১৯৮৮ সালে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনের মাধ্যমে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করা হয়। সে সময় দেশের বিভিন্ন সংবাদপত্রে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক প্রকাশিত হয়। দৈনিক সংবাদ এবং দৈনিক ইত্তেফাক-এর সম্পাদকীয়তে এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছিল।
১৯৯০-এর দশকে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পরও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বাংলাদেশে শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখে। জামায়াতে ইসলামী আবারও মূলধারার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে শুরু করে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তারা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন পায় এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন জোট সরকারের অংশ হয়। গবেষক আলী রিয়াজ উল্লেখ করেন, এই সময় ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলো রাজনৈতিক বৈধতা অর্জন করে এবং সামাজিক ভিত্তি আরও বিস্তৃত করতে সক্ষম হয়।
২০০০-এর দশকের শুরুতে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের একটি নতুন ঢেউ দেখা যায়। জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি) এবং হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ (হুজি-বি) নামের সংগঠনগুলো দেশব্যাপী হামলা চালাতে শুরু করে। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট বাংলাদেশের ৬৩টি জেলায় একযোগে বোমা হামলার ঘটনা আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। সে সময় দ্য ডেইলি স্টার এবং প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে এই হামলার মাধ্যমে সংগঠনগুলো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল।
গবেষক হাসান মাহমুদ এবং আলী রিয়াজের গবেষণায় দেখা যায়, এসব জঙ্গি সংগঠনের উত্থানের পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সামাজিক বৈষম্য, রাজনৈতিক মেরুকরণ, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক জিহাদি নেটওয়ার্কের প্রভাব। পাশাপাশি কিছু মাদ্রাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চরমপন্থী মতাদর্শ ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
২০১০-এর দশকে বাংলাদেশ সরকার জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়। বিভিন্ন অভিযান ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনেক জঙ্গি সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়ে। ২০১৬ সালের হলি আর্টিজান হামলার পর এই অভিযান আরও জোরদার হয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম যেমন BBC, The Guardian এবং New York Times এই ঘটনার পর বাংলাদেশে জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযানের ওপর বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
তবে গবেষকরা মনে করেন, ধর্মীয় উগ্রপন্থার উত্থানকে কেবল নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র বোঝা যায় না। এটি একটি দীর্ঘ সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ফল। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় আদর্শের পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাব, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভেতরেই এই প্রবণতা ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ধর্মীয় উগ্রপন্থার উত্থান তাই একক কোনো ঘটনার ফল নয়। বরং এটি বহু দশকের রাজনৈতিক পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক প্রভাব এবং সামাজিক বাস্তবতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি জটিল ইতিহাস। এই ইতিহাস বোঝা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতে সমাজকে আরও সহনশীল ও স্থিতিশীল করার পথ খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা।
আপনার মতামত জানানঃ