বাংলাদেশে ‘মব ভায়োলেন্স’ বা দলবদ্ধ সহিংসতা নতুন কোনো ঘটনা নয়, কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর তীব্রতা এবং ঘনঘটা যেভাবে বেড়েছে, তা দেশজুড়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। নবনির্বাচিত সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দায়িত্ব নিয়েই ঘোষণা দিয়েছেন—‘মব কালচারের দিন শেষ’। এই ঘোষণাটি নিঃসন্দেহে জনমনে কিছুটা স্বস্তি এনেছে। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে: রাজনৈতিক ঘোষণা কি বাস্তব পরিস্থিতি বদলাতে পারবে? নাকি এটি হবে আরেকটি প্রতিশ্রুতি, যা সময়ের সঙ্গে ম্লান হয়ে যাবে? বাস্তবতা হলো, মব সহিংসতা শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি সামাজিক মানসিকতা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত একটি জটিল সংকট।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়জুড়ে মব সন্ত্রাস ও গণপিটুনির ঘটনা বারবার আলোচনায় এসেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালেই কয়েকশ মানুষ মব জাস্টিসের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছে। এর আগের বছরগুলোতেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। এসব পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যাই নয়; এগুলো রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগ ক্ষমতা, নাগরিক আস্থা এবং সামাজিক সহনশীলতার একটি অস্বস্তিকর প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, গুজব, রাজনৈতিক লেবেলিং, ধর্মীয় উত্তেজনা বা ব্যক্তিগত প্রতিশোধ—যেকোনো কিছুই মুহূর্তে জনতার সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কিছু ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা বা বিলম্বিত প্রতিক্রিয়ার অভিযোগ উঠেছে, যা জনমনে ‘তাৎক্ষণিক বিচার’-এর সংস্কৃতিকে আরও উৎসাহিত করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মব ভায়োলেন্স বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতার পালাবদলের সময় প্রশাসনিক শিথিলতা প্রায়ই তৈরি হয়। যখন রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব দুর্বল মনে হয়, তখন কিছু গোষ্ঠী সুযোগ নেয়। দ্বিতীয়ত, বিচারহীনতার সংস্কৃতি—যেখানে অপরাধ করেও দ্রুত শাস্তি হয় না—মানুষের একাংশকে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে প্রলুব্ধ করে। তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজবের দ্রুত বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও বিস্ফোরক করে তোলে। কোনো যাচাই ছাড়াই একটি পোস্ট বা ভিডিও মুহূর্তে জনরোষ তৈরি করতে পারে, যা পরে মব হামলায় রূপ নেয়। চতুর্থত, রাজনৈতিক মেরুকরণ এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছে যেখানে ভিন্নমতকে ‘শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করা সহজ হয়ে গেছে।
নতুন সরকারের সামনে তাই চ্যালেঞ্জটি বহুমাত্রিক। শুধু শক্তি প্রয়োগ বা কড়াকড়ি ঘোষণা দিয়ে এই প্রবণতা থামানো সম্ভব নয়। প্রথম কাজ হবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আত্মবিশ্বাস পুনর্গঠন করা। অন্তর্বর্তী সময়ের নানা ঘটনায় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা দূর করা জরুরি। মাঠপর্যায়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়া, গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা চালু করা—এসব পদক্ষেপ কার্যকর হতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিটি মব হামলার ঘটনায় দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষ যখন দেখে অপরাধীর শাস্তি হচ্ছে না, তখন ‘মব জাস্টিস’-এর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যায়।
তবে এখানে একটি সূক্ষ্ম রাজনৈতিক বাস্তবতা রয়েছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন—যদি আইন প্রয়োগ বাছবিচারহীন ও নিরপেক্ষ না হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। অতীতে দেখা গেছে, ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনীহা বা পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠলে জনআস্থা দ্রুত নষ্ট হয়। নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি হবে এই নিরপেক্ষতা প্রমাণ করা। যদি জনগণ বিশ্বাস করে যে আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হচ্ছে, তাহলে মব সংস্কৃতির সামাজিক ভিত্তি দুর্বল হবে। কিন্তু যদি রাজনৈতিক বিবেচনায় মামলা বাছাই করা হয়, তাহলে কঠোর বক্তব্যও কার্যকারিতা হারাবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক মানসিকতা পরিবর্তন। বাংলাদেশে বহু ক্ষেত্রে গুজবভিত্তিক সহিংসতা—যেমন শিশু চুরি সন্দেহ, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ বা রাজনৈতিক তকমা—খুব দ্রুত ছড়ায়। এর পেছনে রয়েছে ডিজিটাল সাক্ষরতার ঘাটতি এবং আবেগপ্রবণ জনমত। সরকার চাইলে গণসচেতনতা অভিযান, স্কুল-কলেজ পর্যায়ে নাগরিক শিক্ষা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব প্রতিরোধে প্রযুক্তিগত নজরদারি বাড়াতে পারে। পাশাপাশি কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার করা গেলে স্থানীয় পর্যায়ে উত্তেজনা ছড়ানোর আগেই তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক হতাশাও অনেক সময় মব আচরণকে উসকে দেয়—এ কথাও বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন। যখন বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি এবং সামাজিক অসন্তোষ বাড়ে, তখন জনতার ক্ষোভ সহজেই সহিংস রূপ নিতে পারে। ফলে আইনশৃঙ্খলা উন্নতির পাশাপাশি সামগ্রিক শাসনব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক স্বস্তি ফিরিয়ে আনা—দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সরকার ইতোমধ্যে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনীতি সচল করার কথা বলেছে; এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি সামাজিক উত্তেজনা কমাতেও সহায়ক হতে পারে।
এখন প্রশ্ন—বাস্তবে কি মব ভায়োলেন্স কমবে? ইতিহাস বলছে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। অতীতে বিভিন্ন সময় শক্ত অবস্থান নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, মব সংস্কৃতি একবার সামাজিকভাবে স্বাভাবিক হয়ে গেলে তা দ্রুত নির্মূল করা কঠিন। এটি ধীরে ধীরে কমাতে হয় ধারাবাহিক পদক্ষেপের মাধ্যমে। নতুন সরকারের জন্য প্রথম ছয় থেকে বারো মাস হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ের মধ্যে যদি কয়েকটি বড় ঘটনায় দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার দৃশ্যমান হয়, পুলিশি উপস্থিতি কার্যকর হয় এবং রাজনৈতিক বক্তব্যে ধারাবাহিকতা থাকে—তাহলে ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হবে।
তবে ঝুঁকিও কম নয়। যদি রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও বাড়ে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা থাকে, কিংবা মাঠপর্যায়ে প্রশাসনিক দুর্বলতা অব্যাহত থাকে—তাহলে ঘোষণার পরও মব সহিংসতা পুরোপুরি থামবে না। বরং এটি ভিন্ন রূপে অব্যাহত থাকতে পারে। তাই কেবল আইন নয়, নীতি, রাজনৈতিক আচরণ এবং সামাজিক সচেতনতা—এই তিন স্তরে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, নতুন সরকারের ঘোষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা, কিন্তু এটি কোনো জাদুকাঠি নয়। মব ভায়োলেন্স বন্ধ করা সম্ভব—কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ, দ্রুত বিচার এবং সামাজিক মানসিকতার দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন। যদি সরকার এসব ক্ষেত্রে ধারাবাহিক ও বিশ্বাসযোগ্য পদক্ষেপ নিতে পারে, তাহলে সহিংস জনতার সংস্কৃতি ধীরে ধীরে কমতে পারে। আর যদি কথার সঙ্গে কাজের ফারাক থেকে যায়, তাহলে ‘মব কালচার শেষ’—এই ঘোষণা কেবল একটি স্লোগান হিসেবেই থেকে যাবে।
আপনার মতামত জানানঃ