বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন সময় নিজেই একজন মানুষকে ডেকে বলে—এবার তোমার পালা। সবাই সেই ডাক শোনেন না, আর শুনলেও সবাই সাড়া দিতে পারেন না। ইতিহাস সবাইকে সমান সুযোগ দেয় না; কাউকে কাউকে দেয় রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠার সুযোগ। কেউ সেই সুযোগ ধারণ করেন, কেউ বা বুঝে ওঠার আগেই হারিয়ে ফেলেন সম্ভাবনার সব দরজা। কীর্তিমান জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক-এর একটি মন্তব্য বহুবার উদ্ধৃত হয়েছে আহমদ ছফা রচিত যদ্যপি আমার গুরু গ্রন্থে—ইতিহাস নাকি শেখ সাহেবকে রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার সুযোগ দিয়েছিল, কিন্তু তিনি তা কাজে লাগাতে পারেননি। সেই প্রেক্ষাপট ছিল ১৯৭২ সালের সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ—অগণিত সম্ভাবনা আর গভীর সংকটের এক জটিল সন্ধিক্ষণ।
আজ, পঞ্চান্ন বছর পর, ভিন্ন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আবারও আমরা এক সন্ধিক্ষণের মুখোমুখি। সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় পেয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরেছে, আর তাদের নেতা তারেক রহমান হয়েছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। এই বিজয় কেবল একটি দলের বিজয় নয়; এটি বহু মানুষের হতাশা, ক্ষোভ, প্রত্যাশা ও ভবিষ্যৎ-স্বপ্নের সম্মিলিত বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম নিয়ম হলো—যত বড় জয়, তত বড় দায়।
স্বাধীনতার পরের সময়ের সঙ্গে আজকের সময়ের হুবহু মিল নেই, কিন্তু কিছু অস্বস্তিকর সাদৃশ্য অস্বীকার করার উপায়ও নেই। জাতীয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতির টানাপোড়েনের ভেতর বাংলাদেশ যেন এক জ্বলন্ত স্ফুলিঙ্গের ওপর বসে আছে। অর্থনীতি চাপে, সমাজে বিভাজন, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ক্ষয়িষ্ণু, আর আস্থার সংকট গভীর। গত কয়েক বছরে আন্দোলন, পাল্টা আন্দোলন, সহিংসতা, অনলাইন বিদ্বেষ, মববাজি, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা—সব মিলিয়ে এক ধরনের অস্থির সামাজিক মনস্তত্ত্ব তৈরি হয়েছে। ‘বিকল্প কে?’—এই প্রশ্ন একসময় রাজপথে উচ্চারিত হয়েছিল; তার জবাবে মানুষ বলেছিল, ‘তুমি ও আমি।’ কিন্তু দীর্ঘ অস্থিরতার পর জনগণ শেষ পর্যন্ত ব্যালটের মাধ্যমেই তাদের বিকল্প বেছে নিয়েছে।
এই নির্বাচনে ভোটাররা কেবল অতীতের হিসাব কষেননি; তাঁরা বর্তমানের অনিশ্চয়তা আর রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগকে প্রাধান্য দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িকতা, নারী-অধিকার, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য—এসব প্রশ্ন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ভোট যেন পরিণত হয়েছে একটি নীতিগত অবস্থানের প্রকাশে—বাংলাদেশ কোন পথে যাবে? ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে বহু মানুষ এমন একটি রাষ্ট্রকাঠামোর পক্ষে রায় দিয়েছেন, যা মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকারকে ধারণ করবে এবং রাজনৈতিক সহিষ্ণুতা ফিরিয়ে আনবে। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির বিজয় অনেকের কাছে একটি সুযোগ—আবারও রাজনীতিকে মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার সুযোগ।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, নির্বাচনে জেতা মানেই কি সাংগঠনিকভাবে প্রস্তুত হওয়া? ২০০৬ থেকে ২০২৬—দুই দশকের রাজনৈতিক সংকট, দমন-পীড়ন, নেতৃত্বের বিচ্ছিন্নতা, সাংগঠনিক স্থবিরতা—এসব কি এক নির্বাচনী জয়ে মুছে যায়? দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা একটি দলের জন্য ক্ষমতায় ফেরা যেমন সম্ভাবনা, তেমনি বিপুল ঝুঁকিও। হঠাৎ ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এলে ‘দুধের মাছি’ বাড়ে—সুযোগসন্ধানী, সুবিধাভোগী, অনুপ্রবেশকারী—যারা আদর্শের চেয়ে স্বার্থকে বড় করে দেখে। দল কি তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে? দলীয় সংস্কৃতি কি যথেষ্ট পরিণত, যাতে রাষ্ট্রক্ষমতার চাপ সামলেও রাজনৈতিক শুদ্ধতা বজায় থাকে?
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে আমরা দেখেছি, ক্ষমতায় দীর্ঘদিন থাকা একটি দল কীভাবে সংগঠন হিসেবে দুর্বল হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ টানা শাসনের সময় প্রশাসনিক প্রভাব বাড়ালেও দলীয় বিকাশের ক্ষেত্রে স্থবির হয়ে পড়েছিল—এমন অভিযোগ বহু বিশ্লেষকের। ক্ষমতার দম্ভে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্নতা, তৃণমূলে মতবিনিময়ের অভাব, সমালোচনার জায়গা সংকুচিত হওয়া—এসবের পরিণতি শেষ পর্যন্ত দলকেই ভুগতে হয়েছে। একইসঙ্গে বিরোধী রাজনীতির স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হলে পুরো রাজনৈতিক সংস্কৃতিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শক্তিশালী বিরোধী দল ছাড়া গণতন্ত্র কার্যকর থাকে না—এ সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই।
এবার বিএনপির সামনে দ্বৈত চ্যালেঞ্জ। একদিকে সরকার পরিচালনা—অর্থনীতি সচল করা, বিনিয়োগে আস্থা ফেরানো, কর্মসংস্থান বাড়ানো, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় কাঠামোগত সংস্কার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, নারী ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পুনর্গঠন। অন্যদিকে দল পুনর্গঠন—তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নেতৃত্বের বিকাশ, রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ, মতবিনিময়ের সংস্কৃতি, ভিন্নমত সহ্য করার মানসিকতা। রাষ্ট্র পরিচালনার ফাঁপরে পড়ে দল যেন আবার অবহেলিত না হয়—এই ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে সবচেয়ে কঠিন কাজ।
তারেক রহমান দীর্ঘ প্রবাসজীবনের পর দেশে ফিরে ব্যাপক জনসংযোগ করেছেন। নির্বাচনের আগে অল্প সময়ে ৬৪টি জনসভা করা নিঃসন্দেহে তাঁর রাজনৈতিক পুনঃপ্রতিষ্ঠার অংশ। জনসভায় তাঁর ভাষণে সংযম ও সহিষ্ণুতার সুর ছিল—যা অনেকের কাছে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই তাঁর চারপাশে তৈরি হবে প্রটোকল, নিরাপত্তা বলয়, আমলাতান্ত্রিক স্তর—যা তাঁকে জনগণ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। এই দূরত্ব যদি দ্রুত বাড়ে, তাহলে জনআস্থার সেতু দুর্বল হয়ে পড়বে। ইতিহাস বলছে, ক্ষমতার কক্ষপথে ঢুকে গেলে নেতারা প্রায়ই ‘প্রকোষ্ঠে’ বন্দি হয়ে যান।
বাংলাদেশে এক নেতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান। ‘এক নেতা, এক দেশ’—এই ধারণা যেমন ভক্তি তৈরি করে, তেমনি বিপদেরও কারণ। সব সাফল্যের কৃতিত্ব যেমন একজনের কাঁধে যায়, তেমনি সব ব্যর্থতার দায়ও শেষ পর্যন্ত তাঁর ওপরেই বর্তায়। তারেক রহমান এখন দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি—কেউ তাঁকে দেখছেন সম্ভাব্য রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে, কেউ দেখছেন ঝুঁকিপূর্ণ পরীক্ষার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে। তাঁর সামনে সুযোগ এসেছে—কেবল সরকারপ্রধান নয়, রাজনৈতিক সংস্কারক হিসেবে আত্মপ্রকাশের।
রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার প্রথম শর্ত হলো—অগ্রাধিকার নির্ধারণের দক্ষতা। সব সমস্যা একসঙ্গে সমাধান করা যায় না। অর্থনীতি যদি স্থিতিশীল না হয়, তাহলে সামাজিক সংস্কারও টেকসই হয় না। আবার রাজনৈতিক সহিষ্ণুতা না থাকলে অর্থনৈতিক অগ্রগতিও টেকসই হয় না। তাই তাঁকে বেছে নিতে হবে—কোন খাতে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ, কোন খাতে দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ। বিচার ও সংস্কারের প্রশ্নে ভারসাম্য জরুরি; প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার—এই বার্তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। বিরোধী মতকে দমন নয়, আলোচনায় আনা—এটাই হতে পারে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা।
দলের ভেতরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সিদ্ধান্ত গ্রহণে পরামর্শপ্রক্রিয়া, তরুণ নেতৃত্বের উত্থান, নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি—এসব পদক্ষেপ দলকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করবে। প্রবীণ নেতারা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে ব্যস্ত হয়ে পড়লে সংগঠনের দৈনন্দিন চর্চা কে দেখবে—এই প্রশ্নও প্রাসঙ্গিক। দল টিকিয়ে রাখতে হলে সংগঠনিক কাঠামোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে, যাতে ব্যক্তি-নির্ভরতা কমে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও উপেক্ষণীয় নয়। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, আঞ্চলিক কূটনীতি—সব মিলিয়ে বাংলাদেশকে সতর্ক ও কৌশলী হতে হবে। পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য রক্ষা, উন্নয়ন সহযোগিতায় আস্থা ফিরিয়ে আনা, প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বাড়ানো—এসবই সরকারের সক্ষমতার পরীক্ষা নেবে। একইসঙ্গে মানবাধিকার, নির্বাচন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা—এসব প্রশ্নে আন্তর্জাতিক নজরদারি থাকবে।
সবচেয়ে বড় কথা, জনগণের প্রত্যাশা এখন আকাশচুম্বী। মানুষ মনে করছে—এইবার কিছু বদলাতেই হবে। এই প্রত্যাশা পূরণ করা যেমন কঠিন, তেমনি এটিই সবচেয়ে বড় শক্তি। জনগণের সমর্থন থাকলে কঠিন সংস্কারও সম্ভব। কিন্তু সমর্থন ধরে রাখতে হলে যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে হবে। নিয়মিত জেলা সফর, উন্মুক্ত সংলাপ, নাগরিক সমাজের সঙ্গে আলোচনার প্ল্যাটফর্ম—এসব উদ্যোগ আস্থার পরিবেশ তৈরি করবে।
ইতিহাসের বিচার ধীর কিন্তু নির্মম। আজকের উচ্ছ্বাস পাঁচ বছর পর টিকে থাকবে কি না, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের ওপর। যদি দলীয় নেতা-কর্মীরা শৃঙ্খলা মানেন, দুর্নীতি থেকে দূরে থাকেন, ভিন্নমতকে সম্মান করেন—তাহলে এই বিজয় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। আর যদি পুরোনো ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটে, তাহলে জনগণ আবারও গণেশ উল্টে দিতে দেরি করবে না।
তারেক রহমানের সামনে তাই দ্বিধাহীন এক সত্য দাঁড়িয়ে আছে—এই মুহূর্ত তাঁর ব্যক্তিগত গৌরবের চেয়ে অনেক বড়। এটি একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। তিনি কি কেবল একজন সফল নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হবেন, নাকি রাজনৈতিক সংস্কৃতির নবযাত্রার স্থপতি হয়ে উঠবেন—সেটিই এখন দেখার বিষয়। ইতিহাসের দরজা একবারই কড়া নাড়ে। সেই কড়া নাড়ার শব্দ তিনি শুনেছেন। এখন প্রশ্ন, তিনি কি সেই ডাকের মর্যাদা রাখতে পারবেন?
আপনার মতামত জানানঃ