সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার একটি অবকাঠামো প্রকল্প—যার মূল উদ্দেশ্য ছিল জ্বালানি তেল চুরি রোধ, নিরাপদ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং পরিবহন খরচ কমানো—সেই প্রকল্পই আজ নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ডিজেল সরবরাহের জন্য নির্মিত বহুল আলোচিত পাইপলাইনে ছিদ্র করে তেল চুরির চেষ্টা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি দেশের জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দুর্বল নজরদারি এবং বাস্তবায়নে গাফিলতির একটি স্পষ্ট প্রতিফলন। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—এই বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত পাইপলাইন আসলে কতটা নিরাপদ, আর আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা ব্যবস্থাই বা কতটা কার্যকর।
চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের হাদি ফকিরহাট এলাকায়, রাস্তার পাশেই মাটির প্রায় ১০ ফুট গভীরে থাকা ডিজেল পরিবহন পাইপলাইনে ছিদ্র করার ঘটনা ঘটে। দীর্ঘ সময় ধরে পরিকল্পিতভাবে মাটি খুঁড়ে পাইপলাইনে পৌঁছানো হয়, সেখানে আলাদা পাইপ ও মিটার বসানোর প্রস্তুতিও নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিপুল পরিমাণ ডিজেল বেরিয়ে সড়কে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি বিবেচনায় সঙ্গে সঙ্গে পাইপলাইনে তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। কয়েক দিন পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে আবার সরবরাহ চালু করা হয়। কিন্তু এই সাময়িক বন্ধ বা পুনরায় চালু হওয়াই মূল প্রশ্ন নয়; আসল প্রশ্ন হলো, এত গভীরে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইনে কীভাবে দীর্ঘ সময় ধরে খোঁড়াখুঁড়ি চলল, অথচ তা কারও নজরে এলো না।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন ও পুলিশ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পাইপলাইনের ঠিক ওপরেই একটি টিনশেড ঘর নির্মাণ করা হয়েছিল, যা পরে ভাড়া দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, ভাড়াটিয়াই পরিকল্পিতভাবে পাইপলাইন পর্যন্ত খনন করে ছিদ্র করেন এবং তেল চুরির প্রস্তুতি নেন। এখানেই প্রথম বড় প্রশ্নটি উঠে আসে—পাইপলাইনের ওপর কীভাবে স্থাপনা নির্মাণ হলো, সেই নির্মাণ কীভাবে অনুমোদন পেল, কিংবা আদৌ কোনো তদারকি ছিল কি না। জ্বালানি নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর অবকাঠামোর ওপর অবৈধ বা অননুমোদিত স্থাপনা থাকা মানেই নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গুরুতর ফাঁক রয়ে গেছে।
পাইপলাইন প্রকল্পটি নির্মাণ করা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা বলে। বিপিসির ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো পাইপলাইনের সঙ্গে সেন্সরযুক্ত কেবল সংযুক্ত রয়েছে, যার মাধ্যমে কোথাও চাপের পরিবর্তন, ফাটল বা ছিদ্র হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণকক্ষে সংকেত পৌঁছানোর কথা। কিন্তু বাস্তবে এই ঘটনায় কোনো সংকেত পাওয়া যায়নি, কোনো স্বয়ংক্রিয় সতর্কতাও আসেনি। প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তার যে দাবি করা হয়েছিল, তা এখানে কার্যত অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। পরে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রযুক্তির পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার এখনো সম্ভব হয়নি, সেন্সরসহ সব ব্যবস্থা কার্যকর হতে আরও এক বছর সময় লাগবে। প্রশ্ন হলো, তাহলে এত বড় প্রকল্প চালু করা হলো কীভাবে, যখন তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখনো অসম্পূর্ণ।
এই পাইপলাইনের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৫০ কিলোমিটার। বর্তমানে প্রতি পাঁচ কিলোমিটার পরপর একজন করে লোক বসিয়ে পাহারা দেওয়া হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি জাতীয় অবকাঠামোর নিরাপত্তা যদি মূলত মানুষের চোখের ওপর নির্ভর করে, তাহলে সেটিকে আধুনিক বা টেকসই নিরাপত্তা বলা যায় না। মানুষ ক্লান্ত হয়, প্রভাবিত হয়, ভয় পায় কিংবা প্রলোভনের শিকার হয়। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ছাড়া এমন অবকাঠামো দীর্ঘদিন নিরাপদ রাখা প্রায় অসম্ভব।
বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৬৫ লাখ টনের কাছাকাছি। সর্বশেষ অর্থবছরে সরবরাহ করা হয়েছে প্রায় ৬৮ লাখ টন, যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ডিজেল। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সেচব্যবস্থা, শিল্পকারখানা ও পরিবহন—সব ক্ষেত্রেই ডিজেলের ওপর নির্ভরতা সবচেয়ে বেশি। ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইনের মাধ্যমে বছরে সর্বোচ্চ ২৭ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করার সক্ষমতা রয়েছে, অর্থাৎ এটি দেশের মোট ডিজেল চাহিদার একটি বড় অংশ বহন করে। ফলে এই পাইপলাইনে সামান্য বিঘ্নও জাতীয় অর্থনীতি ও জনজীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
এর আগেও চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় পাঠানো ডিজেল পরিমাণে কমে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত তিনটি তেল কোম্পানি—পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা—এই পাইপলাইনে তেল পাঠানোর পর হিসাবের গরমিল ধরা পড়ে। বিষয়টি তদন্ত করতে একাধিক কমিটি গঠন করা হয়। গত ডিসেম্বর মাসে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া একটি প্রতিবেদনে তেলের হিসাবে গরমিলের তথ্য উঠে আসে। অর্থাৎ পাইপলাইন চালুর পর থেকেই কোথাও না কোথাও ফাঁক রয়ে গেছে, যা এখন প্রকাশ্যে আসছে একের পর এক ঘটনায়।
এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যাটি কেবল চুরি বা একটি অপরাধচক্রে সীমাবদ্ধ নয়। পাইপলাইনের ওপর অবৈধ স্থাপনা, স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের দৌরাত্ম্য, দুর্বল প্রশাসনিক নজরদারি এবং প্রযুক্তি বাস্তবায়নে বিলম্ব—সব মিলিয়ে একটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হয়েছে। শুধু উচ্ছেদ অভিযান চালানো বা ভবিষ্যতে প্রযুক্তি বসানোর আশ্বাস দিলেই এই ঝুঁকি কমবে না। এখন থেকেই কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা না নিলে এমন ঘটনা আবারও ঘটবে, হয়তো আরও বড় পরিসরে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর মতে, হাজার হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প যদি জনগণের অর্থ ও সম্পদ সুরক্ষায় ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই উন্নয়নের টেকসইতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। জ্বালানি খাতের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত এবং দায় এড়িয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি এই ধরনের ঘটনার পেছনে বড় ভূমিকা রাখে। তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, কিন্তু প্রতিবেদন দাখিল হতে দেরি হয়; দায় নির্ধারণ অস্পষ্ট থাকে; শাস্তির নজির খুব কমই দেখা যায়। ফলে একই ধরনের সমস্যা বারবার ফিরে আসে।
মিরসরাইয়ের ঘটনায় এখনো কাউকে হাতেনাতে তেলসহ আটক করা যায়নি। মামলা হয়েছে, তদন্ত চলছে—এমন বক্তব্য শোনা যাচ্ছে। কিন্তু শুধু তদন্তই যথেষ্ট নয়; দরকার স্পষ্ট দায় নির্ধারণ, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সর্বোপরি একটি কার্যকর, প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা কাঠামো। জ্বালানি নিরাপত্তা কেবল একটি সংস্থার বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার অংশ। এই খাতে সামান্য গাফিলতিও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি, শিল্প ও সাধারণ মানুষের জীবনে বড় সংকট তৈরি করতে পারে।
সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার পাইপলাইন প্রকল্প আজ আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে—উন্নয়ন কি শুধু অবকাঠামো নির্মাণেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সেই অবকাঠামোর নিরাপত্তা ও সুশাসন নিশ্চিত করাও উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হবে? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে আজকের সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের ওপর। এখনই যদি নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব না দেওয়া হয়, তাহলে এই পাইপলাইন শুধু তেল নয়, ভবিষ্যতের আস্থা ও বিশ্বাসও গড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।
আপনার মতামত জানানঃ