ইরানের চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নিহত ২৩ বছর বয়সী ছাত্রী রুবিনা আমিনিয়ানের মৃত্যু যেন একটি নাম নয়, বরং একটি প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা, ক্ষোভ ও দমন-পীড়নের প্রতীক হয়ে উঠেছে। খুব কাছ থেকে মাথায় গুলি করে তাঁকে হত্যার ঘটনা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে—ইরানে ভিন্নমত প্রকাশের মূল্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে। রুবিনা ছিলেন তেহরানের শারিয়াতি কলেজের টেক্সটাইল ও ফ্যাশন ডিজাইন বিভাগের শিক্ষার্থী, স্বপ্ন দেখতেন নিজের মতো করে বাঁচার, নিজের মতো করে ভাবার। কিন্তু সেই স্বপ্নের মাঝপথেই থামিয়ে দেওয়া হলো তাঁর জীবন।
৮ জানুয়ারি কলেজ থেকে বেরিয়ে তিনি যোগ দিয়েছিলেন সরকারবিরোধী এক বিক্ষোভে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি তখন উত্তপ্ত হলেও রুবিনা সহ অনেক তরুণ–তরুণী শান্তিপূর্ণভাবেই উপস্থিত ছিলেন। এর মধ্যেই নিরাপত্তা বাহিনীর এক সদস্য খুব কাছ থেকে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। পেছন থেকে ছোড়া গুলিটি সরাসরি তাঁর মাথায় লাগে। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। মুহূর্তের মধ্যে একটি প্রাণ নিভে যায়, আর সেই সঙ্গে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি সমাজের আশা।
রুবিনা ছিলেন কুর্দি জনগোষ্ঠীর একজন তরুণী। তাঁর বাড়ি পশ্চিম ইরানের মারিভান শহরে। ইরানে কুর্দি জনগোষ্ঠী বরাবরই বৈষম্য, নজরদারি ও দমন-পীড়নের শিকার। সাম্প্রতিক বিক্ষোভে এই অঞ্চলের তরুণদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। স্বাধীনতা, নারীর অধিকার ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে তাঁদের কণ্ঠ আরও স্পষ্ট। রুবিনাও ছিলেন সেই কণ্ঠের একজন। তাঁর চাচা নেজার মিনুইয়ের ভাষায়, রুবিনা ছিলেন দৃঢ়চেতা ও সাহসী। যা সঠিক মনে করতেন, তার জন্য লড়াই করতে দ্বিধা করতেন না। তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ ছিল না—এটাই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় ‘অপরাধ’।
মৃত্যুর পরও যেন রুবিনার পরিবারকে শান্তিতে থাকতে দেওয়া হয়নি। পশ্চিম ইরানের কেরমানশাহ থেকে তেহরানে গিয়ে বহু মরদেহের ভিড় থেকে তাঁরা রুবিনার দেহ শনাক্ত করেন। সেই অভিজ্ঞতা নিজেই ছিল ভয়াবহ—একটি পরিবারের সদস্যকে খুঁজে বের করতে হয় অসংখ্য অচেনা মৃতদেহের মাঝখান থেকে। এরপর শুরু হয় আরেক লড়াই, মরদেহ বাড়িতে ফেরানোর লড়াই। নানা প্রশাসনিক জটিলতা ও বাধা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত তাঁরা মরদেহ কেরমানশাহে নেওয়ার অনুমতি পান।
কিন্তু বাড়িতে পৌঁছানোর পর দেখা যায়, গোয়েন্দা বাহিনী তাঁদের বাড়ি ঘিরে রেখেছে। রুবিনার দাফনও যেন রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়। পরিবারকে জানানো হয়, তাঁকে স্বাভাবিকভাবে দাফন করার অনুমতি নেই। শেষ পর্যন্ত মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি অনুযায়ী, পরিবারকে বাধ্য করা হয় কেরমানশাহ ও পার্শ্ববর্তী কামিয়ারান শহরের মধ্যবর্তী একটি সড়কের পাশে রুবিনার মরদেহ দাফন করতে। কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, কোনো শোকযাত্রা নয়, যেন রাষ্ট্র চেয়েছে তাঁর মৃত্যুকেও নিঃশব্দে মুছে ফেলতে।
কিন্তু ইতিহাস বলে, এভাবে কাউকে মুছে ফেলা যায় না। রুবিনার মৃত্যু আরও অনেক তরুণ–তরুণীর কণ্ঠে আগুন জ্বেলে দিয়েছে। ইরানে চলমান আন্দোলন শুধু কোনো একটি ঘটনার প্রতিবাদ নয়; এটি জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ। নারীর পোশাক, ব্যক্তিস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার—সবকিছু মিলিয়ে একটি প্রজন্ম আর আগের মতো চুপ থাকতে রাজি নয়। রাষ্ট্রের কঠোর দমননীতি সেই ক্ষোভকে দমাতে পারছে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে তা আরও তীব্র করে তুলছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী, চলমান বিক্ষোভ ঘিরে সহিংসতায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৫৩৮ জন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৪৯০ জনই বিক্ষোভকারী। ১০ হাজার ৬০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি করে গল্প, একটি করে পরিবার, একটি করে থেমে যাওয়া জীবন। রুবিনা আমিনিয়ান সেই গল্পগুলোর একটি মাত্র নাম, কিন্তু তাঁর পরিচিতি স্পষ্ট হওয়ার কারণে তিনি হয়ে উঠেছেন প্রতীকি চরিত্র।
বিশেষভাবে চোখে পড়ছে শিক্ষার্থী ও তরুণদের অংশগ্রহণ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একসময় ছিল চিন্তার স্বাধীনতার সীমিত হলেও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। এখন সেখানেও কড়া নজরদারি, গ্রেপ্তার ও সহিংসতা নিত্যদিনের ঘটনা। রুবিনার মতো শিক্ষার্থীরা এই বাস্তবতার মধ্যেই বড় হয়েছেন। তাঁরা জানেন ঝুঁকি আছে, তবু রাস্তায় নামছেন। কারণ তাঁদের কাছে ভবিষ্যৎটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
রুবিনার পড়াশোনার বিষয় ছিল টেক্সটাইল ও ফ্যাশন ডিজাইন—যা নিজেই একধরনের সৃজনশীল প্রকাশ। ইরানের মতো রাষ্ট্রে নারীর পোশাক ও শরীর নিয়ন্ত্রণের রাজনীতির ভেতরে এই বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। অনেকেই মনে করেন, তাঁর এই শিক্ষাজীবন ও চিন্তাভাবনাও তাঁকে আরও সচেতন ও প্রতিবাদী করে তুলেছিল। ফ্যাশন শুধু কাপড় নয়, এটি পরিচয় ও স্বাধীনতার ভাষা—এই বোধ রুবিনার প্রজন্মের অনেকের মধ্যেই গড়ে উঠছে।
রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের একটি বড় দিক হলো ভয় তৈরি করা। প্রকাশ্যে হত্যা, দাফনে বাধা, পরিবারকে হুমকি—সবই এই ভয় তৈরির কৌশল। কিন্তু ভয় সব সময় কাজ করে না। অনেক সময় ভয় থেকেই জন্ম নেয় প্রতিরোধ। রুবিনার মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ছবি, নাম ও গল্প ছড়িয়ে পড়েছে। সরকারি সেন্সরশিপ সত্ত্বেও মানুষ জানছে, বলছে, লিখছে। তাঁকে নিয়ে কবিতা লেখা হচ্ছে, গ্রাফিতি আঁকা হচ্ছে। রাষ্ট্র হয়তো দেহকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু স্মৃতি ও গল্পকে নয়।
ইরানে নারীর অধিকার আন্দোলনের ইতিহাস দীর্ঘ। প্রতিটি দশকেই নারীরা কোনো না কোনোভাবে রাস্তায় নেমেছেন, প্রতিবাদ করেছেন। বর্তমান আন্দোলনে সেই ধারার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন প্রজন্মের ভাষা ও সাহস। রুবিনা আমিনিয়ান সেই ধারারই একজন প্রতিনিধি। তাঁর মৃত্যু দেখিয়ে দেয়, এই লড়াই কতটা অসম, কতটা রক্তাক্ত। তবু এটি থেমে নেই।
এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিন্দা জানানো হচ্ছে, বিবৃতি আসছে, কিন্তু বাস্তব পরিবর্তন খুব সীমিত। ইরানের ভেতরে যারা রাস্তায় নামছেন, তাঁদের জন্য সবচেয়ে বড় ভরসা একে অপরের সাহস ও সংহতি। রুবিনার গল্প সেই সংহতিরই অংশ হয়ে উঠেছে।
একজন ২৩ বছর বয়সী ছাত্রী—যার জীবন মাত্র শুরু হয়েছিল—আজ আর নেই। কিন্তু তাঁর নাম উচ্চারিত হচ্ছে সীমান্ত পেরিয়ে। তিনি আর শুধু রুবিনা আমিনিয়ান নন; তিনি ইরানের চলমান আন্দোলনের এক নীরব, কিন্তু শক্তিশালী সাক্ষ্য। খুব কাছ থেকে ছোড়া একটি গুলি তাঁর জীবন কেড়ে নিয়েছে, কিন্তু তাঁর কণ্ঠকে থামাতে পারেনি। বরং সেই কণ্ঠ আরও অনেক কণ্ঠের সঙ্গে মিশে একটি বড় প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে—একটি রাষ্ট্র কত দিন নিজের নাগরিকদের ভয় দেখিয়ে শাসন করতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা। কিন্তু রুবিনার মতো তরুণদের আত্মত্যাগ নিশ্চিত করেছে, প্রশ্নটি আর চাপা থাকবে না।
আপনার মতামত জানানঃ