জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) যে সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, তা শুধু একটি দলীয় সিদ্ধান্তকে ঘিরে মতভেদ নয়, বরং দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অভিমুখ, আদর্শিক অবস্থান ও সাংগঠনিক দৃঢ়তা নিয়েই বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করছে। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্তের পর থেকে দলটির ভেতরে যে টানাপড়েন শুরু হয়েছে, তা দিন দিন আরও স্পষ্ট রূপ নিচ্ছে। একের পর এক কেন্দ্রীয় নেতার পদত্যাগে এনসিপি কার্যত ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে আছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।
গত মাত্র নয় দিনের ব্যবধানে এনসিপির ১১ জন কেন্দ্রীয় নেতা পদত্যাগ করেছেন। এই সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি দলটির ভেতরে জমে থাকা অসন্তোষ, হতাশা ও অবিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোটে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্তই এই পদত্যাগের মূল কারণ। তবে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আসন বণ্টন নিয়ে অস্পষ্টতা, ব্যক্তিগত প্রত্যাশা পূরণ না হওয়া এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ও এনসিপির ঘোষিত আদর্শের সঙ্গে জোট সিদ্ধান্তের সংঘাত।
এনসিপির নেতাদের বড় একটি অংশ শুরু থেকেই নিজেদের একটি বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গড়ে ওঠা এই দলটি দাবি করেছিল, তারা পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাইরে গিয়ে নতুন ধারার রাজনীতি করবে। সেই প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত অনেক নেতার কাছেই অপ্রত্যাশিত এবং আদর্শিকভাবে অগ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছে। দলের ভেতরের অসন্তোষ ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকেই।
দলীয় সূত্র অনুযায়ী, গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর রাতে এনসিপির নির্বাহী কাউন্সিলের বৈঠকে জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই সিদ্ধান্তের খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই দলের ভেতরে প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। পরদিন ২৫ ডিসেম্বর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরার দিন তাকে সমর্থন জানিয়ে পদত্যাগ করেন এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব মীর আরশাদুল হক। তাঁর পদত্যাগ ছিল প্রথম বড় ধাক্কা, যা দলের ভেতরের অস্বস্তিকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে।
এরপর ২৭ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা। তিনি শুধু পদত্যাগ করেই থেমে যাননি, বরং স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণাও দেন। একই দিনে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে জোটবদ্ধ নির্বাচনের বিরোধিতা করে স্মারকলিপি দেন এনসিপির ৩০ জন নেতা। ওই স্মারকলিপিতে দলীয় সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানানো হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই ৩০ জনের মধ্যে অনেকেই ইতোমধ্যে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বা নিতে প্রস্তুত।
তাসনিম জারার পদত্যাগের পরদিন ২৮ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবীন। তাঁর ফেসবুক পোস্টে দেওয়া ব্যাখ্যা দলের ভেতরের ক্ষোভকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। তিনি লেখেন, জামায়াতের সঙ্গে জোটের বিরোধিতা শুধু ঐতিহাসিক বা নারী বিষয়ক কারণে নয়, বরং যেভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেই প্রক্রিয়াটাই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। তাঁর ভাষায়, এটি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়ার ফল। এই বক্তব্য দলের নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়েই প্রশ্ন তোলে।
৩০ ডিসেম্বর এনসিপির ভাঙন আরও স্পষ্ট হয়। ওই দিন একসঙ্গে পদত্যাগ করেন যুগ্ম সদস্য সচিব আরিফ সোহেল, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আসিফ মোস্তফা জামাল (নেহাল) এবং কৃষক উইংয়ের প্রধান সমন্বয়কারী আজাদ খান ভাসানী। আজাদ খান ভাসানী মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নাতি হওয়ায় তাঁর পদত্যাগ প্রতীকীভাবেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেকে। এতে দলটির আদর্শিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়।
২০২৫ সাল শেষ হলেও পদত্যাগের ধারা থামেনি। বছরের প্রথম দিনেই পদত্যাগ করেন খান মুহাম্মদ মুরসালীন, ফারহাদ আলম ভূঁইয়া, মুশফিক উস সালেহীন এবং আল আমিন আহমেদ টুটুল। বিশেষ করে একদিনে চারজন কেন্দ্রীয় নেতার পদত্যাগ দলটির জন্য বড় ধরনের সাংগঠনিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবারই পদত্যাগ করা এই চার নেতার মধ্যে ছিলেন যুগ্ম সদস্য সচিব, যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক, সংগঠক এবং কেন্দ্রীয় সদস্য—যা প্রমাণ করে, পদত্যাগ শুধু কোনো এক স্তরে সীমাবদ্ধ নেই, বরং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বিভিন্ন স্তরেই অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে।
পদত্যাগকারী নেতাদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কারণগুলো একমাত্রিক নয়। কেউ জামায়াতকে জোটসঙ্গী করার সিদ্ধান্তকে নীতিগতভাবে মেনে নিতে পারেননি। কেউ আসন বণ্টনে প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন। আবার কেউ দলের ভেতরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতিকে অগণতান্ত্রিক বা পূর্বপরিকল্পিত বলে অভিযোগ তুলেছেন। এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব মুশফিক উস সালেহীন তাঁর পদত্যাগপত্রে স্পষ্টভাবে লিখেছেন, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোটে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে তিনি নীতিগতভাবে একমত নন। এই বক্তব্য দলটির আদর্শিক বিভাজনকে সামনে নিয়ে আসে।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, জামায়াতের সঙ্গে প্রায় ৩০টি আসনে সমঝোতার গুঞ্জন থেকেই মূলত এনসিপির ভেতরে অসন্তোষের সূত্রপাত। যদিও দলটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে আসন সমঝোতা বা প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেনি। এ নিয়ে দলীয় নেতাদের মধ্যেই রয়েছে চরম অস্পষ্টতা। কোন আসনে এনসিপির প্রার্থী থাকবে, কোথায় ছাড় দিতে হবে—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না পাওয়ায় অনেক নেতা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।
এনসিপির এক যুগ্ম আহ্বায়ক জানিয়েছেন, এখনো চাওয়া-পাওয়ার আলোচনা চলছে। জোটেরও কিছু দাবি আছে, এনসিপিরও আছে। মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা না করলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যাবে না। এই বক্তব্য স্পষ্ট করে, দলটির নেতৃত্ব এখনো আসন সমঝোতা নিয়ে নিশ্চিত নয়। অথচ মাঠপর্যায়ের নেতা ও সম্ভাব্য প্রার্থীরা ইতোমধ্যেই চাপের মধ্যে রয়েছেন।
ঢাকা মহানগর উত্তরের এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব (দপ্তর) আব্দুল্লাহ আল মনসুর বলেছেন, বিষয়টি শুধু জোট হওয়ার কারণে পদত্যাগ নয়। তাঁর মতে, আসন বণ্টন নিয়ে দলের ভেতরে যে অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে, সেটাই অনেকের ক্ষোভের মূল কারণ। এই বক্তব্য ইঙ্গিত দেয়, আদর্শিক প্রশ্নের পাশাপাশি বাস্তব রাজনৈতিক হিসাবও পদত্যাগের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে।
অন্যদিকে দলের যুগ্ম আহ্বায়ক জাভেদ রাসিন এই পরিস্থিতিকে ভিন্নভাবে দেখছেন। তিনি বলেছেন, প্রত্যেকের আলাদা আলাদা মতাদর্শ থাকতে পারে। দলের মেজরিটি যেখানে মতামত দেবে, দল সেদিকেই সিদ্ধান্ত নেবে। কেউ যদি দল ছেড়ে চলে যান, সেটা তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। এই বক্তব্য দলীয় শীর্ষ নেতৃত্বের অবস্থান স্পষ্ট করে—তারা মনে করছেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত, ভিন্নমত থাকলে সেটি ব্যক্তিগত বিষয়।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়, এনসিপির মতো একটি নবগঠিত রাজনৈতিক দলের জন্য এতগুলো কেন্দ্রীয় নেতার পদত্যাগ কি শুধুই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বিষয়? নাকি এটি দলটির ভেতরে গভীর সাংগঠনিক ও আদর্শিক সংকটের ইঙ্গিত? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপি যে পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করেছিল—একটি নতুন রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে—সেই পরিচয়ের সঙ্গে জামায়াতের সঙ্গে জোটের সিদ্ধান্ত সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন দলের বড় একটি অংশ। সেই দ্বন্দ্বই এখন প্রকাশ্যে এসেছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা। এনসিপির অনেক নেতা মনে করেন, ওই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে প্রত্যাশা ও মূল্যবোধ তৈরি হয়েছিল, জামায়াতের সঙ্গে জোট সেই চেতনাকে ক্ষুণ্ন করে। বিশেষ করে নারী অধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা ও অতীত রাজনৈতিক ভূমিকার প্রশ্নে জামায়াতের অবস্থান নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে, তা এনসিপির ভেতরের প্রগতিশীল অংশকে উদ্বিগ্ন করেছে।
এনসিপির সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো—এই ভাঙন থামানো যাবে কি না এবং দলটি নির্বাচনের মাঠে কীভাবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখবে। একদিকে জোট রাজনীতির বাস্তবতা, অন্যদিকে দলীয় আদর্শ ও কর্মীদের আস্থা—এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করা যে সহজ হবে না, তা ইতোমধ্যেই স্পষ্ট। আসন সমঝোতা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই।
সব মিলিয়ে, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত এনসিপির জন্য শুধু একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি দলটির অস্তিত্ব, আদর্শ ও ভবিষ্যৎ রাজনীতির দিকনির্দেশনা নিয়ে গভীর সংকটের জন্ম দিয়েছে। একের পর এক পদত্যাগ সেই সংকটের দৃশ্যমান রূপ। এই পরিস্থিতি থেকে দলটি কীভাবে বেরিয়ে আসে, কিংবা আদৌ বেরিয়ে আসতে পারে কি না—তা নির্ভর করবে আগামী দিনগুলোতে নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত, আসন বণ্টনের চূড়ান্ত রূপ এবং সবচেয়ে বড় কথা, দলীয় কর্মীদের আস্থা পুনর্গঠনের ওপর।
আপনার মতামত জানানঃ