
বাংলাদেশের নির্বাচন মানেই এক সময় চোখে পড়ত দেয়ালজুড়ে পোস্টার, গাছের গায়ে সাঁটানো প্রার্থীর ছবি, রাস্তাজুড়ে ব্যানার আর ফেস্টুনের ছড়াছড়ি। বাড়ি থেকে বেরোলেই বোঝা যেত—নির্বাচন এসেছে। পোস্টার ছিল ভোটের দৃশ্যমান প্রতীক, প্রার্থীর পরিচিতি তুলে ধরার সহজ ও বহুল ব্যবহৃত মাধ্যম। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সেই চেনা দৃশ্য এবার আর থাকছে না। নির্বাচন কমিশনের সংশোধিত আচরণবিধির ফলে প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনে পোস্টার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি প্রচারণার আরও বহু প্রচলিত কৌশলের ওপরও এসেছে কড়াকড়ি বিধিনিষেধ, যা বাংলাদেশের নির্বাচনী সংস্কৃতিতে এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচন সামনে রেখে গত বছরের নভেম্বরে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বা আরপিও অনুসরণ করে ‘রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা’ চূড়ান্ত করে নির্বাচন কমিশন। তফসিল ঘোষণার পর সেই বিধিমালা বাস্তবায়নে এবার বেশ কঠোর অবস্থান নিয়েছে সংস্থাটি। এরই মধ্যে আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে একাধিক প্রার্থী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিকে জরিমানার মুখোমুখি হতে হয়েছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে—এবার নিয়ম ভাঙার বিষয়ে ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনা কম।
নতুন আচরণবিধির সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তন হলো পোস্টার নিষিদ্ধ করা। বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে পোস্টারের ব্যবহার নিয়ে সহিংসতা, সংঘাত ও বিশৃঙ্খলার ঘটনা বহুবার ঘটেছে, কিন্তু কখনোই জাতীয় নির্বাচনে পোস্টার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়নি। রাস্তার মোড়ে মোড়ে, গলির মাথায় কিংবা গাছের ডালে ডালে পোস্টার ঝোলানো যেন এক ধরনের অলিখিত রীতিতে পরিণত হয়েছিল। তবে নির্বাচন কমিশনের মতে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সংস্কৃতি পরিবেশ, জনজীবন ও আইনশৃঙ্খলার জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠেছে। কমিশনের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, পোস্টার ছাপাতে গিয়ে সেগুলো লেমিনেটিং করা হয়, যা ড্রেনেজ ব্যবস্থায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে। পোস্টারের কালি কৃষিজমিতে ক্ষতির কারণ হয়। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের আপত্তির কথাও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। সব দিক বিবেচনা করেই কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে—ভোটের প্রচারণায় আর পোস্টার নয়।
পোস্টার নিষিদ্ধ হলেও প্রার্থীরা পুরোপুরি প্রচারণার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন না। লিফলেট, হ্যান্ডবিল, ফেস্টুন ও ব্যানার ব্যবহার করা যাবে, তবে সেখানেও রয়েছে কড়াকড়ি শর্ত। এসব প্রচারণা সামগ্রী কোনো দালান, দেয়াল, গাছ, বেড়া, বিদ্যুৎ বা টেলিফোনের খুঁটি, সরকারি কিংবা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের স্থাপনায় লাগানো যাবে না। এমনকি যানবাহনেও এসব লাগানো নিষিদ্ধ। বিলবোর্ড বা ফেস্টুনে রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে দলীয় প্রধান ছাড়া অন্য কারো ছবি ব্যবহার করা যাবে না। অর্থাৎ প্রচারণায় ব্যক্তিপূজা বা অতিরিক্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রদর্শনের সুযোগ সীমিত করা হয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারণায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের ক্ষেত্রেও স্পষ্ট সীমারেখা টেনেছে নির্বাচন কমিশন। ড্রোন ব্যবহার করে প্রচারণা চালানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিদেশে বসে কোনো ধরনের নির্বাচনী প্রচারণাও করা যাবে না। একজন প্রার্থী তার সংসদীয় আসনে সর্বোচ্চ ২০টির বেশি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন না। এই বিধিনিষেধগুলোর লক্ষ্য একদিকে যেমন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে তেমনি সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।
নতুন আচরণবিধিতে যানবাহন ব্যবহার করে প্রচারণার ওপর এসেছে সবচেয়ে কঠোর বিধিনিষেধগুলোর একটি। তফসিল ঘোষণার পর প্রতীক বরাদ্দের আগ পর্যন্ত কোনো ধরনের প্রচারণা চালানো যাবে না—এই নিয়ম ভেঙে এরই মধ্যে জরিমানার নজির তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রাম-১৫ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী নাজমুল মোস্তফা আমিন তফসিল ঘোষণার পর বিশাল মোটরসাইকেল ও গাড়িবহর নিয়ে শোডাউন করায় নির্বাচন কমিশন তাঁকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে। কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, সতর্ক করার পরও একই অপরাধ পুনরাবৃত্তি হওয়ায় আইন প্রয়োগ করা হয়েছে।
সংশোধিত আচরণবিধি অনুযায়ী, নির্বাচনী প্রচারণায় কোনো বাস, ট্রাক, নৌযান, মোটরসাইকেল বা অন্য কোনো যান্ত্রিক বাহনসহ মিছিল, জনসভা বা শোডাউন করা যাবে না। যানবাহন থাকুক বা না থাকুক, কোনো ধরনের মশাল মিছিলও নিষিদ্ধ। মনোনয়নপত্র দাখিলের সময়ও কোনো মিছিল বা শোডাউন করা যাবে না। ভোটের দিন যান চলাচলের নিষেধাজ্ঞা চলাকালে ভোটকেন্দ্রের ভেতরে কোনো যানবাহন প্রবেশ করতে পারবে না। এসব বিধিনিষেধের মাধ্যমে নির্বাচনী পরিবেশকে শান্তিপূর্ণ রাখাই কমিশনের মূল উদ্দেশ্য।
আকাশপথে প্রচারণার ক্ষেত্রেও এসেছে বড় পরিবর্তন। রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রে দলীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছাড়া অন্য কেউ হেলিকপ্টার বা কোনো আকাশযান ব্যবহার করতে পারবেন না। ব্যক্তিপর্যায়ের প্রার্থীদের জন্য এই সুযোগ একেবারেই বন্ধ। অতীতে ক্ষমতাশালী বা অর্থবিত্তশালী প্রার্থীরা হেলিকপ্টার ব্যবহার করে যে প্রভাব বিস্তার করতেন, তা ঠেকাতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বিস্তারিত বিধিনিষেধ যুক্ত করেছে নির্বাচন কমিশন। কোনো প্রার্থী, তাঁর নির্বাচনী এজেন্ট বা দলের সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট, আইডি, ই-মেইলসহ সব শনাক্তকরণ তথ্য প্রচারণা শুরুর আগে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দিতে হবে। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করা যাবে না। ভুয়া ভিডিও, বিকৃত ছবি, ডিপফেক বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট তৈরির ওপর স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণা বা বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, ভুল তথ্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ, নারী বা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক ভাষা ব্যবহারও নিষিদ্ধ। ধর্মীয় বা জাতিগত অনুভূতির অপব্যবহার করে কোনো ধরনের প্রচারণা চালানো যাবে না। সত্যতা যাচাই ছাড়া নির্বাচন সংক্রান্ত কোনো কনটেন্ট শেয়ার বা প্রকাশ করাও আচরণবিধির লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে। বিধিমালায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ভোটারদের বিভ্রান্ত করা, চরিত্রহনন বা সুনাম নষ্টের উদ্দেশ্যে মিথ্যা, পক্ষপাতমূলক, বিদ্বেষপূর্ণ বা অশ্লীল কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নির্বাচনী জনসভা আয়োজনের ক্ষেত্রেও সময় ও শব্দ ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। কোনো প্রার্থী জনসভা করতে চাইলে নির্ধারিত সময়ের অন্তত ২৪ ঘণ্টা আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে স্থান ও সময় জানাতে হবে। একক কোনো জনসভায় একইসঙ্গে তিনটির বেশি মাইক্রোফোন বা লাউড স্পিকার ব্যবহার করা যাবে না। অতীতে উচ্চ শব্দ, রাতভর মাইক ব্যবহার নিয়ে যে অভিযোগ ও জনভোগান্তি ছিল, তা কমাতেই এই নিয়ম।
আচরণবিধি ভাঙলে শাস্তির বিষয়েও স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ব্যক্তির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড ও দেড় লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেও দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের সুযোগ রয়েছে। গুরুতর ক্ষেত্রে আরপিও অনুযায়ী প্রার্থিতা বাতিলের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, এবার নিয়ম শুধু কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবেও প্রয়োগ করা হবে।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, এসব পরিবর্তনের পেছনে মূল লক্ষ্য হলো সমান মাঠ নিশ্চিত করা, ব্যয় কমানো, পরিবেশ রক্ষা করা এবং সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা এড়ানো। পোস্টার ছেঁড়াকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, শোডাউনের নামে শক্তি প্রদর্শন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া প্রচারণা—এই সবকিছু মিলেই নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। নতুন বিধিনিষেধের মাধ্যমে সেই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে এসব পরিবর্তন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়াও রয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, পোস্টার নিষিদ্ধ হলে গ্রামীণ বা প্রযুক্তি-সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় প্রার্থীর পরিচিতি তুলে ধরতে সমস্যা হতে পারে। আবার অনেকে মনে করছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কড়াকড়ি থাকলেও বাস্তবে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। তবু সামগ্রিকভাবে নির্বাচন কমিশনের এই উদ্যোগকে বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে আরও শৃঙ্খলাবদ্ধ ও আধুনিক করার একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন তাই শুধু নতুন সংসদ গঠনের নির্বাচন নয়, বরং একটি নতুন প্রচারণা সংস্কৃতির পরীক্ষাও। পোস্টারমুক্ত নির্বাচন, শোডাউনবিহীন প্রচারণা, নিয়ন্ত্রিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—এই সবকিছু কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে ভবিষ্যতের নির্বাচনী ধারা। নির্বাচন কমিশন বলছে, তারা সতর্ক এবং প্রস্তুত। এখন দেখার বিষয়, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা এই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে কতটা মানিয়ে নিতে পারেন।
আপনার মতামত জানানঃ